রমজানে সফর: কীভাবে রোজা পালন করবেন?

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৯, ১৪:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

  মনযূরুল হক

ছবি: সংগৃহীত

জীবনযাপনের তাগিদেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে চলতে হয় আমাদের। হোক তা ব্যবসায়িক স্বার্থে কিংবা অন্য কোনো সৎ উদ্দেশে। পবিত্র রমজান মাসেও থেমে থাকে না আমাদের জীবনযাপন প্রক্রিয়ার এই গতি। কখনো কখনো এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাতে হয়।

সফরকারী, ভ্রমণকারী, পর্যটক ইত্যাদি শব্দের ইসলামি পরিভাষা হলো : মুসাফির।

আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সেই সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং কঠিন চান না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)

এ-আয়াত প্রমাণ করে, মুসাফিরের জন্য রমজানের রোজা ভঙ্গের অনুমতি আছে। তাকে পরবর্তী সময়ে সে-পরিমাণ কাজা আদায় করতে হবে। তবে তিনি যদি রোজা রাখেন, তাহলে তার রোজা হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৪০৩)

রমজানের সফরে নবীজির (সা.) আমল

রাসূল সা. রমজানে সফর করতেন; সফরে তিনি কখনো কখনো রোজা পালন করতেন, কখনো ত্যাগ করতেন; এবং পানাহার করতেন, অন্যদেরও আদেশ দিতেন রোজা ভঙ্গের। ইবনে আব্বাস রা. হতে তাউস বর্ণনা করেন : রাসূল রমজানে রোজা অবস্থায় সফরে বের হলেন, পথে উসফান নামক এলাকায় পৌঁছে পানপাত্র আনার নির্দেশ দিলেন।

লোকদের দেখানোর জন্য তিনি প্রকাশ্যেই পানি পান করলেন। মক্কায় পৌঁছা অবধি তিনি পানাহার বজায় রাখলেন। ইবনে আব্বাস বলতেন : রাসূল সা. রমজানে সফররত অবস্থায় রোজা পালন করেছেন এবং ভঙ্গ করেছেন। সুতরাং যার ইচ্ছা রোজা রাখবে, যার ইচ্ছা ভঙ্গ করবে। (বোখারি, হাদিস ৪২৮৯)

কখন সফরে রোজা রাখা উত্তম

রমজানের সফরে রাসূল সা.-এর রোজা রাখা এবং ভঙ্গ করার বিষয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে,যদি কষ্টের সম্ভাবনা না থাকে,রোজা ভাঙ্গার মতো কিছু না ঘটে,তবে রোজা রাখাই উত্তম। (রদ্দুল মুহতার ২/৪২১)

কারণ,রাসূল এমনই করেছেন। আবু দারদা বলেন : প্রচণ্ড তাপে আমরা রসূলের সাথে রমজানে সফরে বের হলাম,এমনকি আমাদের কেউ কেউ অধিক তাপের ফলে মাথায় হাত দিচ্ছিল। রাসূল সা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ব্যতীত আমাদের মাঝে কেউ রোজাদার ছিলেন না। (মুসলিম, হাদিস ১১২২)

হাদিসটি প্রমাণ করে,সম্ভব হলে রোজা পালনই উত্তম। এর মাধ্যমে বান্দা দ্রুত দায়-মুক্ত হবে,রোজা পালন করতে পারবে সঠিক সময়ে,সকলের সঙ্গে একই সময়ে রোজা রাখার ফলে বিষয়টি তার জন্য সহজ হবে। 

তবে,রোজা ভাঙ্গার মতো যদি কোনও কারণ থাকে,তবে রোজা না রাখাই উত্তম। রাসূল সা. এরশাদ করেন : আল্লাহ পছন্দ করেন তার প্রদত্ত রুখসত যাপন করা,যেমন অপছন্দ করেন তার পাপে লিপ্ত হওয়া। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৫৮৬৬)

যখন সফরে রোজা রাখা মাকরুহ

জিহাদ কিংবা ইসলামের জন্য শক্তি খরচ করতে হবে এমন সময়ে রোজা রাখা আলেমগণ মাকরূহ বলেছেন। (রদ্দুল মুহতার ২/৪২১)

কেননা,তাতে দুর্বল হয়ে আসল উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে অসফল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। মক্কা বিজয়ের অভিযানকালে রমজান মাসে রাসূল রোজা পালন করেন নি। ইবনে আব্বাস রা. বলেন : রোজা পালনরত অবস্থায় রাসূল কুদাইদ ও উসফান নামক স্থানের মধ্যবর্তী প্রস্রবনে অবতীর্ণ হয়ে রোজা ভেঙে ফেললেন, মাস শেষ হওয়া অবধি তিনি এভাবেই পানাহার করে চললেন। (বোখারি, হাদিস ৪২৭৫)

আনাস রা. বলেন : আমরা (সে-সময়) রাসূল সা.-এর সঙ্গে ছিলাম, আমাদের মাঝে অধিক ছায়া গ্রহণকারী ছিল সে ব্যক্তি, যে তার কাপড় দিয়ে ছায়া নিচ্ছিল। যারা রোজাদার ছিল তারা কিছুই করল না,আর যারা পানাহার করেছিল,তারা বাহন হাঁকাল,কাজে আত্মনিয়োগ করল এবং প্রচুর পরিশ্রম করল। রাসূল বললেন : পানাহারকারীগণ আজ সওয়াব নিয়ে গেছে। (বোখারি,হাদিস ২৭৩৩)

যখন সফরে রোজা না-রাখা বাধ্যতামূলক

যদি রোজা পালন খুবই কঠিন হয়ে পড়ে এবং পানাহার আবশ্যক হয়,তবে পানাহার বাধ্যতামূলক। কেননা,আল্লাহ তায়ালা যেমন কারও ওপর বিধান চাপিয়ে দেন না,তেমনি নিজের ওপর জবরদস্তিমূলক কোনো বিধান বানিয়ে নেয়াও বৈধ নয়। কঠিন অবস্থায় রোজা পালনকারীকে লক্ষ্য করে রাসূল সা. বলেছিলেন : এরা পাপী,এরা পাপী। (মুসলিম, হাদিস ১১১৪)

এক ব্যক্তি এমন কঠিন দু:সাধ্য সময়ে রোজা রেখেছিলো। একদল লোক তাকে ঘিরে ছিলো এবং ছায়া দিচ্ছিলো। রাসূল সা. তা দেখে বললেন :  (এভাবে) সফরে রোজা পালন কোনো পুণ্যের কাজ নয়। (আবু দাউদ, হাদিস ২৪০৭)

একইভাবে জিহাদের সফরে যদি কঠিন শত্রুর মুখোমুখী হতে হয় এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের বিকল্প না থাকে,যখন রোজা রাখলে দুর্বল হয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে,তখন রোজা রাখা কিছুতেই সঙ্গত নয়। একদল আলেম বলেছেন : এ-সময় রোজা রাখা হারাম। তবে সকলে একমত যে,রোজা রাখলে তা শুদ্ধ হয়ে যাবে এবং পুনরায় কাজা করতে হবে না—তবে গুনাহগার হবে। 

আবু সাইদ খুদরি রা. বলেন : রোজা পালনরত অবস্থায় আমরা রাসূল সা.-এর সঙ্গে মক্কায় সফরে বের হলাম। এক স্থানে যাত্রা বিরতিকালে রাসূল সা. বললেন: তোমরা শত্রুব্যুহের কাছাকাছি পৌঁছে গেছ,পানাহার তোমাদেরকে শারীরিকভাবে সবল করে তুলবে। সুতরাং আমাদের রুখসত প্রদান করা হয়েছিলো। আমাদের কেউ রোজা রেখেছিলো, পানাহার করেছিলো কেউ কেউ। অতঃপর ভিন্ন এক স্থানে উপনীত হলে রাসূল সা. আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন : তোমরা ভোরে শত্রুর মুখোমুখী হবে,পানাহার হবে তোমাদের জন্য বলদায়ক, সুতরাং, তোমরা পানাহার করো। পানাহার ছিলো বাধ্যতামূলক। তাই আমরা সকলে পানাহার করলাম। তিনি বলেন : এরপর আমরা অনেকবার রমজানের সফরে রাসূল সা.-এর সঙ্গে রোজা রেখেছি। (মুসলিম, হাদিস ১১২০)

রমজানের সফরে কখন থেকে পানাহার বৈধ

ইবনে কায়্যিম বলেন : সাহাবিগণ যখন সফরের সূচনা করতেন, গৃহ-প্রাঙ্গণ অতিক্রম ব্যতীতই পানাহার করে নিতেন। তারা একে রাসূল সা.-এর সুন্নত মনে করতেন। মুহাম্মাদ ইবনে কাব বলেন : আমি রমজানে আনাস ইবনে মালেকের নিকট আগমন করলে দেখতে পেলাম তিনি সফরে যাবার মনস্থ করেছেন,তার ঘোড়া প্রস্তুত রয়েছে,পরিধান করেছেন তিনি সফরের পোশাক। তিনি খাবারের নির্দেশ দিলেন এবং খাদ্য গ্রহণ করলেন, আমি বললাম : এটাই কি সুন্নত? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সুন্নত। অত:পর তিনি সফরে বের হলেন। (যাদুল মাআদ, ২/৫৫-৫৬)

তবে অগ্রগণ্য মত হলো : এই মত ব্যক্তিগতভাবে আনাস রা.-এর। সফরের সূচনা ব্যতীত কেউ রুখসত পালন করতে পারবে না। কারণ, রাসূল সা.-এর অসংখ্য সফরের কোথাও আমরা এর দৃষ্টান্ত পাই না। এবং কোরআনে এসেছে— তোমাদের মাঝে যে অসুস্থ হবে,কিংবা সফরে থাকবে,ভিন্ন সময় রোজা রেখে নিবে। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৪)

সুতরাং যে সফরের সূচনা করে নি,সে সফরকারী হতে পারে না। অধিকাংশ আলেমের মতামত : সফরের সূচনা ব্যতীত পানাহার করা যাবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/২০৬)

কখন মুসাফির বলে গণ্য হবে

সফরের দূরত্ব ৪৮ মাইল বা ৭২ কিলোমিটার। পূর্বেকার যুগে মানুষ পায়ে হেঁটে অথবা উটের পিঠে চড়ে স্বাভাবিক গতিতে চললে তিনদিনে ৭২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারত। তাই ৭২ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের উদ্দেশ্যে যাত্রাকারী মুসাফির হয়ে যায়।

এ ক্ষেত্রে হঠাৎ সফর করা এবং যারা সবসময় সফরে থাকে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রুখসত সকলের ক্ষেত্রেই সমান। যেমন গাড়ী চালক সে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সব সময় সফরে থাকে। স্বভাবিকভাবেই সে সব সময় মুসাফির থাকবে এবং তার জন্য রোজা না রাখাই উত্তম। যখন সে মুকিম হবে তখন রোজা রাখবে। মুসাফির রোজার দিনে বাড়িতে ফিরে আসলে তাকে দিনের বাকি অংশ না খেয়ে থাকতে হবে এবং রোজা কাজা করবে।

মুসাফির হওয়ার মেয়াদ ১৫ দিনের কম। কোনো মুসাফির নিজ সফরে ১৫ দিনের বেশি একস্থানে থাকার নিয়ত করলে তাকে অন্যান্য মুকিমের মতো রোজা পালন করতে হবে এবং নামাজ পুরোই আদায় করতে হবে। আর যদি ১৫ দিনের অথবা তার থেকে কম থাকার নিয়ত করে, অথবা কোনো কাজে বের হয়েছে কিন্তু জানে না কাজটি কবে শেষ হবে তার জন্য রোজা না রাখা ও নামাজ কসর করা জায়েয আছে, তাতে বছর পূর্ণ হোক না কেনো। কারণ তার পক্ষে সফরের বিধান এখনো বলবৎ রয়েছে । (শারহু উমদাতিল ফিকহ, ইবনে জিবরিন, সিয়াম অধ্যায়)

মনে রাখতে হবে

সফর অবস্থায় নিয়ত করে রোজা রাখা শুরু করলে তা ভাঙা জায়েয নয়। কেউ ভেঙে ফেললে গোনাহগার হবে। তবে কাফফারা দিতে হবে না। শুধু কাজা করবে। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৩১)

যে ব্যক্তি মুকিম অবস্থায় সাহরি খেয়ে সফর শুরু করেছে তার জন্য সফরের অজুহাতে রোজা ভাঙা জায়েয নয়। ভাঙলে গোনাহগার হবে এবং শুধু কাজা ওয়াজিব হবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/২০৬)

মুসাফির সফরের কারণে রোজা রাখেনি, কিন্তু দিন শেষ হওয়ার আগেই মুকিম হয়ে গেছে। সেদিনের অবশিষ্ট সময় রমজানের মর্যাদা রক্ষার্থে পানাহার থেকে বিরত থাকবে। আর পরে এ রোজার কাজা করে নেবে। (ফাতওয়ায়ে শামি ৩/৩১)