রমজানে পরিবারের সঙ্গে বিশ্বনবীর আচরণ

  মনযূরুল হক ২৫ মে ২০১৯, ১৬:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

রমজানে রাসূল
ছবি: সংগৃহীত

পরিবার সম্পর্কে রাসূলের (সা.) হাদিস : তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। আমি তোমাদের মাঝে আমার পরিবারের নিকট সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি। (তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫)

রমজানে পরিবারকে শিক্ষাদান

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন— আপনি আপনার নিকটবর্তী পরিবার-পরিজনকে সতর্ক করুন। (সূরা শুআরা, আয়াত ২১৪)

রাসূল রমজান মাসে নানাভাবে তার স্ত্রীদের শিক্ষা দান করতেন। হাদিসের পাঠক মাত্রই জানেন, রমজান বিষয়ক অধিকাংশ হাদিস তার স্ত্রীদের কর্তৃক বর্ণিত। স্ত্রীদের শিক্ষার ব্যাপারে রাসূলের গুরুত্বারোপের উত্তম প্রমাণ এসব হাদিস। যেমন একবার আয়েশা (রা.) বলেন : ‘হে আল্লাহর রাসূল আপনার কি মত, আমি যদি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জ্ঞাত হই, তাহলে আমি কী দোয়া পাঠ করব?

রাসূল তাকে বললেন : তুমি দোয়া করবে : হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল সম্মানিত, আপনি ক্ষমা পছন্দ করেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিজি, হাদিস ৩৪৩৫)

বর্তমান সময়ের নারী সমাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো, তারা নানা রকম ধর্মীয় মূর্খতা ও বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত, এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে তারা অনবগত, যা কিছুতেই মানা যায় না। তাই তাদের শিক্ষাদানে পুরুষকে, বিশেষ করে স্বামীকে অবশ্যই যত্নবান হতে হবে। এবং তার জন্য রমজানই সুন্দর ও উপযুক্ত সময়।

রাসূল বলেন : ব্যক্তির জন্য পাপ হিসেবে এ-ই যথেষ্ট যে, যার ভরণ-পোষণ তার দায়িত্ব তাকে সে বিনষ্ট করে দেয়। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৬৪৯৫)

কল্যাণ কর্মে উৎসাহ প্রদান

আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল তার পরিবারকে রমজানের শেষ দশ দিনে রাতে জাগিয়ে দিতেন। (তিরমিজি, হাদিস ৭৯৫)

আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : ...অত:পর মাসের তিন দিন অবশিষ্ট অবধি তিনি আমাদের নিয়ে নামাজ আদায় করলেন না। তৃতীয় দিনে তিনি আমাদের নিয়ে নামাজ আদায় করলেন, তার পরিবার ও স্ত্রীদের আহ্বান করলেন, এতটা দীর্ঘ সময় তিনি জাগরণ করলেন যে, আমরা সাহরি পরিত্যাগের আশঙ্কা করলাম। (তিরমিজি, হাদিস ৮০৬)

অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে : চার দিন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্তও তিনি আমাদের নিয়ে রাত্রি যাপন করলেন না। অত:পর যখন অবশিষ্ট ছিলো মাত্র তিন দিন, তখন তিনি তার কন্যা ও স্ত্রীদের নিকট সংবাদ পাঠালেন, এবং লোকেরা জমায়েত হলো। তিনি আমাদের নিয়ে এতটা সময় জাগরণ করলেন যে, সাহরি ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা হলো। (নাসায়ি, হাদিস ১৩৬৪)

জয়নব বিনতে উম্মে সালামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : যখন মাসের মাত্র দশ দিন অবশিষ্ট থাকতো, তখন পরিবারের সক্ষম সকলকে রাসূল রাত্রি জাগরণ করাতেন। (মারওয়াজি, কিয়ামু রমাজান, পৃষ্ঠা ৩১)

তারাবি জামাতে নারীদের অংশ গ্রহণের বৈধতা সম্পর্কিত এই সকল হাদিস থেকে রমজানের কল্যাণকাজে নারীদের আহ্বান করার নির্দেশনা সুস্পষ্ট। তবে নারীদের জন্য তাদের ঘরই উত্তম’। (আবু দাউদ, হাদিস ৫৬৭)

ইতেকাফ যাপনে অনুমতি প্রদান

নারীদের জন্য শর্ত হচ্ছে অভিভাবকের অনুমতি লাভ। তবে রাসূল সা. নারীদের ইতেকাফের অনুমতি প্রদানকে উপেক্ষা করেন নি। যেমন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আছে : রাসূল সা. শেষ দশ দিনে ইতেকাফের উল্লেখ করলেন, আয়েশা অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দিলেন। হাফসা আয়েশা রা.-কে তার জন্য অনুমতির কথা বললে তিনি অনুমতি নিলেন...। (বুখারি, হাদিস ২০৪৫)

অন্য রেওয়ায়েতে আছে : আমি তার কাছে অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দিলেন। হাফসাও অনুমতি প্রার্থনা করলো, তিনি তাকেও অনুমতি দিলেন। (আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস ৮০৩১)

স্ত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা

রমজানে অনেকেই স্ত্রী-পরিজনকে বর্জন করাতেই প্রকৃত সংযমের অর্থ খুঁজে পান। অথচ রাসূলের জীবন থেকে আমরা এমনটি পাই না। বরং তিনি রমজানেও স্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা অব্যাহত রেখেছেন। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সা. ইতেকাফকালীন আমার দিকে মস্তক এগিয়ে দিতেন, আমি তার কেশবিন্যাস করে দিতাম, মানবিক প্রয়োজন ব্যতীত তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন না। (মুসলিম, হাদিস ২৯৭)

অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে : আমি হায়েজা অবস্থাতেও তা ধৌত করে দিতাম। (বুখারি, হাদিস ৩০১) এটাই স্বামী-স্ত্রীর প্রীতির নিদর্শন। রোজা অবস্থাতেও রাসূল তার স্ত্রীদের চুম্বন করতেন, মেলামেশা করতেন ঘনিষ্ঠভাবে।

এক রেওয়ায়েতে এসেছে, আয়েশা রা. বলেন : রাসূল চুম্বনের জন্য আমার নিকট ঝুঁকে এলেন, আমি বললাম : আমি তো রোজাদার, তিনি বললেন, আমিও রোজাদার। আয়েশা বলেন : অত:পর তিনি ঝুঁকে এসে আমাকে চুম্বন করলেন। (আহমদ, হাদিস ২৫০২২)

হাফসা রা. বলেন : রাসূল রোজা রাখা অবস্থায় চুম্বন করতেন। (মুসলিম, হাদিস ১১০৭) এমনকি আলিঙ্গনও করতেন তিনি। আয়েশা রা. বলেন : রসূল সা. আমাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করলে আমি তাকে বললাম, আমি তো রোজাদার , তিনি বললেন : আমিও রোজাদার। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৫২৯০)

রোজা অবস্থায় মেলামেশা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আয়েশা রা. মাসরুক ও আসওয়াদকে জানান : হ্যা, (তিনি মেলামেশা করতেন) কিন্তু তিনি ছিলেন তোমাদের মাঝে সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণশীল। (মুসলিম, হাদিস ১১০৬)

এ হাদিসগুলো প্রমাণ রোজা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার জন্য রোজা রেখে স্ত্রীকে চুম্বন বা ঘনিষ্ঠ মেলামেশা বৈধ নয়।

রমজানের রাতে মিলন

রমজানের রাতে স্ত্রী-সহবাস বৈধ। এবং ইবাদতপ্রিয় লোকদের অবগত থাকা উচিত, রমজান কোনো বৈরাগ্য নয়, বরং একটি সংযমী ইবাদত মাত্র। বিবাহিত পুরুষের জন্য স্ত্রী-সহবাস কোথাও কোথাও সদকা সমতুল্যও বলা হয়েছে।

রাসূল সা. রমজানের রাতে স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হতেন। তবে শেষ দশ দিনে ইতেকাফকালীন তা হতে বিরত থাকতেন। আয়েশা রা. বলেন : স্বপ্নদোষে নয়, (সহবাসের কারণে) রমজানে অপবিত্র অবস্থায় রাসূলের ফজর হয়ে যেত। অত:পর তিনি গোসল করে রোজা পালন করতেন। (মুসিলম, হাদিস ১১০৯)

উম্মে সালামা রা. থেকেও বর্ণিত আছে : স্ত্রী সহবাসের ফলে অপবিত্র অবস্থাতেও রাসূলের ফজর হয়ে যেত। অত:পর তিনি গোসল করে রোজা পালন করতেন। (বুখারি, হাদিস ১৯২৬)

তবে রাসূল কেবল রমজানের প্রথম বিশ দিনে স্ত্রী সহবাস করতেন, শেষ দশ দিনে তিনি ইতেকাফ পালন করতেন। আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছে, শেষ দশ দিনে রসূল স্ত্রী সহবাস বর্জন করতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন, এবং জাগিয়ে দিতেন পরিবারকে। (বুখারি, হাদিস ২০২৪)

এ-ক্ষেত্রে সালমান ফারসির এক উক্তি খুবই প্রাসঙ্গিক; যা শ্রবণ করে রাসূল সা. সমর্থন ব্যক্ত জানিয়ে বলেছেন : সালমান সত্য বলেছে। সালমান রা.-এর উক্তি ছিলো : তোমার ওপর হক রয়েছে তোমার রবের, তোমার আত্মার এবং তোমার পরিবারের। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারের প্রাপ্য বুঝিয়ে দাও। (বুখারি, হাদিস ৬১৩৯)

ইতেকাফ অবস্থায় পরিবারের খোঁজ নেওয়া

ইতেকাফকালেও পরিবার থেকে বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। বরং পরিবারের প্রধান দায়িত্ববান হিসেবে ইতেকাফ কিছুতেই দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেয় না। তাই রাসূল সা.-এর জীবনে দেখি, তিনি ইতেকাফকালেও পরিবারকে ভুলে যেতেন না। এমনকি নিয়মিত খোঁজ নিতেন, তাদের সুযোগ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। সাফিয়া রা. হতে বর্ণিত, তিনি রমজানের শেষ দশ দিনে রাসূলের মসজিদে ইতেকাফরত অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে এলেন, তিনি কিছু সময় তথায় অবস্থান করে কথা বললেন, অত:পর উঠে প্রস্থান করলেন। (বুখারি, হাদিস ৬২১৯)

অন্য রেওয়ায়েতে আছে : রাসূল মসজিদে ছিলেন, তার স্ত্রী-গণ আনন্দে তার সংসর্গ যাপন করছিলেন। সাফিয়া বিনতে হাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, তুমি তাড়াহুড়ো করো না...। (বুখারি, হাদিস ২০৩৮)

এমনকি তিনি ফিরে যাবার উদ্যোগ করলে, রাসূলও তাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলেন। একটি বর্ণনায় আছে, সাফিয়াকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন : তাড়াহুড়ো করো না, আমি তোমার সাথে বেরুবো। তার আবাস ছিলো উসামার বাড়িতে, (রাসূল পৌঁছে দেয়ার জন্য) বেরিয়ে এলেন। (বুখারি, হাদিস ২০৩৮)

লেখক : প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট, মুহম্মদ (স.) রিসার্চ সেন্টার (এমআরসি)

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : রমজান ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×