আল্লাহ অন্ধভাবে ধর্ম পালন পছন্দ করেন না

  ফয়জুল্লাহ আমান ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২২:২০:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

বায়তুল মোকারর জাতীয় মসজিদের বারান্দা থেকে তোলা সুন্দর একটি দৃশ্য। ছবি: যুগান্তর

স্বভাবগতভাবেই মানুষের ভেতর হয়ত স্বার্থপরতা রয়েছে। তবু সব মানুষের কল্যাণ চিন্তার মানসিকতা অর্জন করে নিতে হয় একজন মুসলিমকে।

আমাদের ঘরে এখনও করোনা প্রবেশ করেনি, তাই এখনও কোনো চিন্তাভাবনা আমাদের ভেতর তৈরি হচ্ছে না। একেকদিন ইউরোপ-আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। আমাদের দেশেও শংকা আছে চরম বিপদের।

তারপরও আমরা সাবধান হতে পারছি না। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিংয়ের প্রতি কোনো গুরুত্বারোপ করছি না। এক কথায় খুব স্বাভাবিক আমাদের চলাফেরা।

সারা বিশ্বের চিকিৎসকদের ঐকমত্যের বিষয় আমরা জানি, এ মহামারী থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সব ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। মুসলমানদের জনসমাগম হয় দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মসজিদ ঘরে। এ ছাড়া বাজার ঘাটেও কিছু মানুষ একত্র হয়।

কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রশাসনের কড়াকড়ির ভেতর বাজারেও খুব বেশি ভিড় হতে পারছে না। মসজিদেই সবচেয়ে বেশি এবং নিয়মিত লোকসমাগম হতে দেখা যাচ্ছে। মসজিদ বন্ধ করার মতো সাহস সরকার বা এলাকার লোকজন কেউ সঞ্চয় করতে পারছেন না।

মসজিদ বন্ধ করা তো দূরে থাক। আমরা দেখতে পাচ্ছি মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতি ওয়াক্তেই ভিড় করছেন সাধারণ মুসল্লিরা। প্রতিদিনই মসজিদে জুমার দিনের মত ভিড় হচ্ছে।

যে লোকটা আগে জুমার নামাজও পড়তে যেত না, সে-ও দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজেই নিয়ম করে মসজিদে যাচ্ছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সরকার জুমার নামাজ সীমিত পরিসরে আদায়ের নোটিশ দিয়েছে। সে হিসেবে জুমার নামাজের সময় এগিয়ে আনা হয়েছে অধিকাংশ মসজিদে। তাতে কোনো ফায়দা হয়নি। মুসল্লিরা আজানের অনেক আগে থেকে মসজিদ ভরে রেখেছে।

আমি একজন খতিব হিসেবে আমার মুসল্লিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি একজন মুফতি। সে হিসেবে আমাকে ঘাটতে হয়েছে ফতোয়ার কিতাবাদি।

জুমা ও জামাতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ফতোয়ার কিতাব কি বলে? কুরআন-হাদীস ও ফতোয়ার কিতাবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এমন দুর্যোগ মুহূর্তে মসজিদে জুমা বা জামাতের উদ্দেশে না যাওয়াই উত্তম।

একই ফতোয়া বিশ্বের সব বড় মুফতি দিয়েছেন। মুফতিরা যতই ফতোয়া দিন না কেন, আমি আমার মুসল্লিদের কোনোভাবেই বোঝাতে পারব না।

ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই আমরা করোনা নিয়ে আলোচনা করছি। সাহাবিদের যুগ থেকে নিয়ে বিভিন্ন যুগের ইতিহাস তুলে ধরে খুব হিকমতের সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করছি। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।

মানুষের ভেতর একটিই চিন্তা ঢুকে আছে। এই করোনা আল্লাহর গজব। এতে মুসলমানদের কিছু হবে না। করোনা থেকে বাঁচতে হলে বেশি বেশি মসজিদে আসতে হবে। এ তরল আবেগ আর অপরিণামদর্শী প্রেরণা থেকে ফেরানোর মতো কোনো কৌশলই আমাদের জানা নেই।

প্রতিদিন ইউরোপ বা আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুমুখে নিপতিত হচ্ছে। এতে বরং আমাদের সাধারণ মুসল্লি খুশিই হচ্ছেন। অমুসলিম মরছে। আরও বেশি মরুক। মরে সাফ হয়ে যাক। মুসলমান মরলে তারা কষ্ট পেত। অমুসলিমের মৃত্যুতে কোনো বিকার নেই। অথচ মুসলিমের মৃত্যুতে উল্টো আনন্দ হওয়া উচিত ছিল।

কারণ মহামারীতে কোনো মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে বলে সহি হাদীসে রয়েছে। আর একজন অমুসলিম ইমান ছাড়া যদি মৃত্যুবরণ করে তাহলে চিরকালের জাহান্নামে যেতে হবে তাকে। এর জন্য বরং একজন মুসলিমের ব্যথিত হওয়া উচিত।

কোনো মানুষের মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে নেয়া কি ইসলামী মিজায হবে? আমার স্বাভাবিক বোধে তো মনে হয় মুসলিম জনসাধারণের বর্তমান ভাবনাগুলোয় বেশ অস্বাভাবিকত্ব রয়েছে।

একজন মুসলিম যদি এই দুর্যোগের সময়ে এই মনে করে আনন্দিত হয় যে, আমার ঘরে এখনও দুর্যোগ আসেনি; সব অমুসলিমরাই আক্রান্ত হচ্ছে, তাহলে বলতে হয় ইসলামের আসল শিক্ষা থেকে এরা আজও বঞ্চিত। মুসলিম নামের খোলসটাই আছে; ইসলামের শিক্ষা থেকে আজকের মুসলমান অনেক দূরে সরে এসেছে।

এক তরুণ ঘনিষ্ঠ মুসল্লিকে বিশেষভাবে বোঝালাম, ঘরে নামাজ পড়ার কথা। সে আমাকে বলেই ফেলল, হুজুর, আপনি জুমা পড়াতে আসেন কেন? আপনি কেন ঘরে নামাজ পড়েন না? বোঝা-ই যায় আমার বক্তব্য সে পছন্দ করছে না। সহজভাবে নিতে পারছে না মসজিদ ছাড়ার কথা। তাকে বোঝানো উপলব্ধি করলাম বৃথা শ্রম।

তবু বললাম, আমরা তো আমাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচতে পারি না। আপনারা এভাবে ভিড় জমালে আমাদের আসতেই হবে। আপনারা মরলে আমরাও মরব। আপনাদের মৃত্যুর পর একা বেঁচে থাকার চিন্তা নেই। তা ছাড়া আপনাদের সতর্ক করতে তো আমাদের আসতে হবে। কিন্তু আপনি তো না এসেও পারতেন।

আমার কথার উত্তর দেয়া তার দ্বারা সম্ভব নয়। সে ভদ্রতার খাতিরে চুপ হয়ে যায় কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়ত ঠিকই খতিব সাহেবের দ্বীনদারীর অভাবের জন্য আফসোস করতে থাকে। আমাদের চেয়ে আমাদের মুসল্লিরা আরও বেশি দ্বীনদার হয়ে যাচ্ছে, খুব ভালো কথা। আমাদের এ জন্য আনন্দিত হওয়া উচিত।

করোনার বিপদ যদি ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ থেকে সরে যায় তাহলে হয়ত তাদের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস বহু গুণ বেড়ে যাবে। যদিও অন্ধ বিশ্বাসের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।

আল্লাহ চান বসিরত বা দূরদর্শিতা। সমঝদারির সঙ্গে ধর্মের অনুশাসন পালন। আল্লাহ কখনও অন্ধভাবে ধর্ম পালন পছন্দ করেন না।

মুমিনদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, আর যখন তারা কুরআনের কোনো বাণী শোনে, অন্ধের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। [সূরা ফুরকান]

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে রাসূল, আপনি বলুন, এটাই আমার পথ, আমি আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকি বসিরতের সঙ্গে সঙ্গে বুঝে-শুনে। আমি ও আমাকে যারা অনুসরণ করে তারা। [সূরা ইউসুফ]

আল্লাহর কাছে দোয়া করি আমাদের হাজার অসতর্কতা সত্ত্বেও আমরা যেন রক্ষা পেয়ে যাই করোনা থেকে। কিন্তু যদি এ মহামারীর ভয়াল রূপ আমাদের দেখতে হয়। আর মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে যায় তাহলে আল্লাহ যদি আমাদের বাঁচিয়ে রাখেন বাকি জীবন মনে হয় নিজেদের ক্ষমা করতে পারব না।

আমরা খতিবরা আমাদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে না পারার একটা অপরাধবোধ থাকবে। বিশেষত যে সব আলেম চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন তারা কী করবেন? কাল কেয়ামতে কী জবাব দিবেন? সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে যারা মানুষকে মিসগাইড করছেন তারা কি জবাব দিবেন আল্লাহকে আমি বলতে পারি না।

আবু দাউদ শরীফের বর্ণনা। একবার নবীজী সাহাবিদের একটি বাহিনী পাঠালেন কোনো যুদ্ধে। ফেরার পথে আহত এক সাহাবীর গোসল ফরজ হল। তিনি অন্যদের জিজ্ঞেস করলেন, আমি তো আহত, এ অবস্থায় কি আমাকে গোসল করতে হবে?

দু'জন তাকে ফতোয়া দিলেন, অবশ্যই তোমাকে গোসল করতে হবে। সেই সাহাবী গোসল করে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।

নবীজী সব শুনে ভীষণ রাগান্বিত হন। যারা ফতোয়া দিয়েছিল তাদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এরা ভুল ফতোয়া দিয়ে লোকটাকে হত্যা করেছে, আল্লাহ এদের নাশ করুক। তোমরা না জানলে কেন জিজ্ঞেস কর না? অজ্ঞতার চিকিৎসা জিজ্ঞাসা। [সুনানু আবি দাউদ]

আমাদের ভেতর যারা করোনা থেকে বাঁচতে বেশি বেশি মসজিদে আসতে মানুষকে উৎসাহিত করছ আমার ভয় হয় এই হাদীসের ভাষ্য অনুসারে তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে না হয়। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত