কোয়ারেন্টিনের সময়টুকু হতে পারে ইসলাম সম্পর্কে জানার উপযুক্ত সময়

  ফয়জুল্লাহ আমান ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২০:৪৩:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

করোনার দিনগুলোতে আমাদের প্রখর হচ্ছে ধর্মানুভূতি। ধর্মের দিকে ফিরে আসার এ চেতনা প্রশংসার দাবি রাখে। দিন শেষে একজন মুসলিমকে ইসলামী অনুশাসনের দিকে প্রত্যাবর্তন করতেই হয়।

এ সময় ইসলামের বিভিন্ন তাফসিরের প্রচারকরাও থেমে নেই। রাজনৈতিক ও মানবিক ইসলামের দ্বন্দ্ব এ সময় কোয়ারেন্টিনে থাকা আপনার চোখে হয়ত আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ছে।

হ্যাঁ, গভীরভাবে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। অগ্রসর হওয়া উচিত কোনো একটি ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে ভাবনায় কিছুক্ষণ ডুবে থাকা যাক করোনার দুশ্চিন্তা ও বাধ্যতামূলক অবসরে।

ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ। স্রষ্টা সমীপে নিজেকে পূর্ণরূপে সপে দেয়া হচ্ছে ইসলাম। সৃষ্টিকর্তা যেভাবে জীবনযাপন পছন্দ করেন সেভাবে চলার চেষ্টা করতে হবে একজন মুসলিমকে। সৃষ্টিকর্তা কী চান আর কী চান না- এ নিয়েই যখন দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তখনই হয় সমস্যা।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নির্দেশাবলী পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট রয়েছে। তারপরও কুরআন যেহেতু মানুষের সঙ্গে কথা বলে না এ জন্য এর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন মত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোরআনের ব্যাখ্যায় শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিচিত্র মতবাদ হাজির হয়েছে পৃথিবীতে।

কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রত্যেকেই নিজের মতকে প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছে। আজও কত মতামত কুরআনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সব বিষয়েই কি মতভেদ হওয়া সম্ভব?

কুরআনের সবকিছুই বাদ-বিবাদের উপযোগী? মোটেও নয়। কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে কোনো বিবাদ হওয়া একপ্রকার অসম্ভব।

যেমন সত্য কথা বলা, মা-বাবার কথা মান্য করা, অসহায়কে সাহায্য করা, সব মানুষকে ভালোবাসা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা, দান-সদকা করা, সততার সঙ্গে চলা, দুর্নীতি না করা, সুদ-ঘুষ না খাওয়া, কাউকে কষ্ট না দেয়া, প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখা, গরিব এতিম মিসকিন দুস্থদের সাহায্য করা, আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করা, সমাজসেবার চেষ্টা করা, অন্যকে সদুপদেশ দেয়া ইত্যাদি।

এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো নিয়ে কোনো বিবাদের সুযোগ নেই। মানবিক ইসলাম বলতে আমরা বোঝাতে চাচ্ছি এটাকেই।

মানুষের ভেতর হৃদয়বৃত্তির যত দিক রয়েছে সেগুলো বিকশিত করা যার লক্ষ্য। প্রেম, ভালোবাসা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, ধৈর্য, স্থৈর্য, অল্পেতুষ্টি, কৃতজ্ঞতা, সদালাপ, সদাচার, পরিচ্ছন্নতা, সংবেদনশীলতা, অন্যকে আনন্দ দেয়া, নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা, মহৎ সব ভাবনা ও উন্নত মন-মননের সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।

মানবিক ইসলামের পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক ইসলামের ধারণা। রাজনৈতিক ইসলাম বলতে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা। সবাইকে জোরপূর্বক নামাজ পড়ানো, রাষ্ট্রীয়ভাবে সবাইকে পর্দার বিধান মানতে বাধ্য করা, রাষ্ট্রীয়ভাবে মদ নিষিদ্ধ করা, চোরের হাত কাটানোর ব্যবস্থা করা, ব্যাভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যার আইন করা ইত্যাদি।

এ সব বিষয়ে পৃথিবীতে নানা মতামত রয়েছে। ইসলামী চিন্তাবিদদের এ সব বিষয় নিয়ে মতামতের কোনো শেষ নেই। এগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও আছে বিভিন্ন চিন্তা। এ সব বিষয়ের কোনো কোনোটি নিয়ে এমনও মত রয়েছে যে, এগুলো ইসলামের মৌল শিক্ষা নয়।

এর বিপরীত মত হচ্ছে- এ ছাড়া ইসলামই সম্ভব নয়। এমন বিতর্ক যে সব বিষয় নিয়ে, সাধারণ মানুষের জন্য তা খুব সমস্যা তৈরি করছে প্রতিদিনের ইসলাম চর্চায়।

ইসলামের শাস্তি বিধান নিয়ে সৃষ্টি করা হয় অমূলক বিভ্রান্তি। যে রাষ্ট্রে এ সব বিধান নেই সে রাষ্ট্রে মূলত ইসলামই নেই, এমন ধারণার প্রচার করেন রাজনৈতিক ইসলামের প্রচারকগণ।

অথচ দু-তিনটি ক্ষেত্র বাদে অন্য সব স্থানে সমসাময়িক পরিবেশ বুঝে যে কোনো উপযোগী শাস্তি বিধান প্রণয়নের অধিকার সরকার ও রাষ্ট্রকে ইসলাম দিয়ে রেখেছে।

যে দু-তিনটি শাস্তির কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে তা অনেকটাই আলঙ্কারিক। এ বিধান না থাকার কারণে যে ইসলামের উপর চলা অসম্ভব হয়ে পড়ে বিষয়টি আদৌ এমন নয়।

সাধারণ মুসলিমরা বর্তমান সময়ে ধর্মের দিকে ফিরতে চায়। পছন্দ করে না কোনো অনর্থক বিতর্ক। মানবিক ইসলামের চর্চা করে তারা নিজেদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু সমাজে এ সব বিতর্ক জিঁইয়ে রেখে মানুষের আত্মশুদ্ধির পথ রুদ্ধ রাখায় হয়ত অনেকের ফায়দাও রয়েছে।

বিষয়গুলো মোটেও সহজ কিছু নয়। কোনো সরলীকরণ করে সাধারণ মানুষকে কেউ ধোঁকায় ফেলবে এমন ধারণাও ঠিক নয়। সারা বিশ্বেই ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা আছে। আছে এ নিয়ে নানা বিতর্ক।

সাধারণ মুসলিমরা অবশ্যই সবখানে ইসলামের বিজয় দেখতে চায়। কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক হয়ত এখন অসহ্য হয়ে গেছে মানুষের কাছে। যারা রাজনৈতিক বিভিন্ন ব্যাখ্যা করছেন তাদের প্রতি সহানুভূতি আছে মানুষের। কিন্তু আর কতদিন এমন দ্বন্দ্বমুখর হয়ে থাকতে হবে ইসলামের বিষয়াদি নিয়ে।

বিচিত্রভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সব দেখে-শুনে মানুষ চায় নির্বিবাদে কুরআন-সুন্নাহর সাধারণ কথাগুলো অনুযায়ী নিজেদের পরিচালিত করতে। পরকালের চিন্তা প্রতিটি মুসলিমেরই আছে। কিন্তু এ সব বিবাদে জড়িয়ে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে কোনো সহজতা তো দেখা যায় না।

ইসলাম একদিন সারা বিশ্বে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। এ স্বপ্ন প্রতিটি মুসলিমের আছে। এর জন্য একটি ধারণা হচ্ছে ইসলামের নামে রাজনীতি করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে ইসলামকে বিজয়ী করা। এটা একশ্রেণির মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয়।

আরেক পদ্ধতি হচ্ছে ইসলামের মহান মূল্যবোধগুলোমুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামকে উপস্থাপন করা। নিজেকে সত্যিকারে মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা। সমগ্র বিশ্বে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ইসলামী সদাচার ও কৃষ্টিগুলো প্রাত্যহিক আচার-আচরণ ও অন্যান্য মাধ্যমে তুলে ধরা।

ব্যবহারিক জীবনে বিকশিত হতে দেয়া ইসলামের সব সুন্দর দিক। এক সময় সারা বিশ্বের সব মানুষ মহান ইসলামের সত্যতা বুঝতে পারবে। কত দিন পর? এ প্রশ্ন নয়। যতদিন পর এবং যেভাবেই হোক এ হবেই। কবে কিভাবে হবে তা ভেবে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই।

অটুট বিশ্বাস রয়েছে ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী মানুষের। মূলত একজন তো আছেন, যিনি পৃথিবীর অবস্থার পরিবর্তন ঘটান। আমরা আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটালে বিশ্ব প্রকৃতিতে তিনি অবশ্যই পরিবর্তন এনে দিবেন। আমরা বিশ্ব ব্যবস্থা পরিবর্তনের চিন্তা না করে নিজেদের পরিবর্তন করলে এক সময় বদলে যাবে সবকিছু।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না যতদিন না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে। (সূরা রাদ, আয়াত: ১১)

পৃথিবীর সব অনাচার আমি হয়ত রোধ করতে পারব না কিন্তু আমি অবশ্যই আমার নিজের জীবন শোধরানোর চেষ্টা করতে পারি। এই মানসিকতা থেকেই মানবিক ইসলামের যাত্রা আরম্ভ হয়।

বিশ্ব মুসলিম বিভিন্ন চিন্তা-চেতনার দ্বন্দ্বে শ্রান্ত হয়ে এখন হয়ত ভাবছে কুরআন-সুন্নার রঙে নিজেদের রাঙানোর সাধনাটুকু শুরু করবে।

সব ইসলামী স্কলারের প্রতি ভক্তি বা শ্রদ্ধা থাকলেও সবার কথা বুঝে গ্রহণের একটা চেতনা তৈরি হচ্ছে মানুষের ভেতর। যত বড় স্কলার হোক, এখন সেই সাহাবিদের যুগ নেই।

মানুষ মাত্রই ভুল আছে, যাচাই করে নেয়ার যোগ্যতাটুকু অর্জন করতেই হবে আজকের মুসলিমকে সত্যিকার মুসলিম হতে হলে।

আল্লাহ আমাদের ইমান ও ইসলামের পথে অটল-অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত