সারাবছর ইবাদতে লেগে থাকাই রমজানের শিক্ষা

  আহমাদুল্লাহ আল জামি ২৪ মে ২০২০, ১৭:৩৪:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

আল কোরআন

আমাদের ব্যস্ততম জীবনে আমরা অসংখ্য কাজ করি,অসংখ্য স্বপ্ন লালন করি। সবকাজ বা সব স্বপ্নই আমাদের পূরণ হয়না।

এর বড় একটা কারণ হচ্ছে- স্বপ্ন বা কাজের প্রশ্নে কোনো একটা বিন্দুতে আমরা স্থির থাকতে পারিনা। নানাবিধ সংকট ও ঝামেলায় আমাদের স্বপ্ন বা কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমরাও হাল ছেড়ে দেই। স্বপ্নভঙ্গে আশাহত হই।

এই অসম্পূর্ণ স্বপ্ন বা কাজকে এগিয়ে নিতে হলে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি জরুরি, তা হলো-ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতা।

এই ইস্তিকামাত বা দৃঢ়তা আমাদের যেমন জরুরি পার্থিব ও বৈষয়িক সকল ক্ষেত্রে, একইভাবে জরুরি আমাদের অপার্থিব ও ধর্মীয় জীবনের ক্ষেত্রেও। বর্তমান সময়ে পার্থিব সফলতার পেছনে ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতার দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলেও অপার্থিব বা পরকালীন মুক্তির জন্য ধর্মীয় অনুশাসনে দৃঢ়পদতার দৃষ্টান্ত খুব বেশি পাওয়া যায় না।

দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য। অথচ,পরকালীন মুক্তিই আমাদের কামনা,আমাদের ভবিষ্যৎ।

এই ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতা আসলে কী? ইস্তিকামাত হলো- ‘কোনদিকে না ঝুঁকে নিজের লক্ষ্য অর্জনে সোজা পথচলা’
এই কাজটা খুব সহজ না আসলে। কোন লৌহদণ্ড বা পাথরের থাম একজন প্রকৌশলী হয়তো খুব সহজেই এভাবে দাঁড় করাতে পারবে, কিন্তু একজন মানুষের জন্য নিজের লক্ষ্য অর্জনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একদম সহজ নয়।

এরপরও এই ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতাই আমাদের সাফল্যের মন্ত্র বা পথ। যে মানুষ যে কাজে দৃঢ়পদতা দেখাতে পেরেছে, সে সেই কাজে সফল হয়েছে।

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের সবার স্বপ্ন পরকালে মুক্তি পাওয়া। আর পরকালে মুক্তির একমাত্র মন্ত্র হিসেবে আল্লাহ আমাদের জন্য ‘শরিয়ত’ রেখেছেন।

কিন্তু পরকালে মুক্তির এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কতজন শরিয়তের বিধানে দৃঢ়পদ আছি? পুরোপুরি সুন্নাহ অনুসরণের বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমরা কতজন এই লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট আছি?

কোরআনে আল্লাহ তাআলা নবীজির মাধ্যমে আমাদেরকে এই ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতার কথা বলেছেন।

ইরশাদ হয়েছে: ‘সুতরাং তুমি এবং তোমার সঙ্গে যারা তওবা করেছে সবাই (সিরাতে মুস্তাকিমের) পথে দৃঢ়পদ থাকো, যেভাবে তোমাদের আদেশ করা হয়েছে এবং সীমালঙ্ঘন করোনা।’ (সুরা হুদ-১১২)

আয়াতে বর্ণিত ইস্তিকামাত শব্দটি ছোট হলেও এর অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক।

এর অর্থ হচ্ছে- আকিদা,ইবাদাত, লেনদেন,আচার-ব্যবহার,ব্যবসা-বাণিজ্য,অর্থ উপার্জন ও ব্যয় তথা নীতি-নৈতিকতার যাবতীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখায় তাঁর নির্দেশিত পথেই চলা। এরমধ্যে কোনো ক্ষেত্রে, কোনো কাজে গড়িমসি করা, বাড়াবাড়ি করা অথবা এদিক সেদিক করা ইস্তিকামাতের পরিপন্থী।

পৃথিবীতে যত ভ্রষ্টতা ও পাপাচার দেখা যায়, তা সবই এই ইস্তিকামাত থেকে সরে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কেবল আকিদা তথা ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইস্তিকামাত না থাকলে মানুষ বিদআত থেকে শুরু করে কুফর ও শিরক পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

অথচ সে ভাবে-আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথেই আছি। বস্তুত সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে তাঁর বন্ধু বৎসল নয়,বরং বিরাগভাজন হতে থাকে।

তাই পরকালে মুক্তির যে স্বপ্ন মুসলিম হিসেবে আমরা দেখি, শরীয়তের যাবতীয় বিধানে ইস্তিকামাত না থাকলে তা কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

এজন্য আমাদের লেনদেন,আচার-ব্যবহার, বন্ধুতা-শত্রুতা,ক্রোধ-ধৈর্য,মিতব্যয়-দানশীলতা,অর্থ উপার্জন-বৈরাগ্য সাধনা, আল্লাহর উপর নির্ভরতা-সম্ভাব্য চেষ্টা তদবির,আবশ্যকীয় উপায় উপকরণ সংগ্রহ এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর রহমতের আশায় থাকা ইত্যাদি সবক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যমপন্থার যে পথ আমাদের দেখিয়ে গেছেন, তার ওপর থাকাই পরকালে মুক্তির স্বপ্নে আমাদের ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতা।

আর ইস্তিকামাতের এই পথ অবলম্বন করেই একজন মানুষ সত্যিকার মানুষ হতে পারে,এর থেকে বিচ্যুত হলেই তার দ্বারা সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।

মোটকথা, জীবনের সবক্ষেত্রে শরীয়তের অনুশাসন মেনে চলাই হল-ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতা।

একবার হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ সাকাফি (রা.) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবেদন করলেন- ‘ইসলাম সম্পর্কে আপনি আমাকে এমন একটি ব্যাপক শিক্ষা দিন,যেন আপনার পরে আর কারো কাছে আমার কোন কিছু জিজ্ঞাসা করতে না হয়’।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- বলো-আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি অতঃপর ইস্তিকামাত অবলম্বন করো।
(সহীহ মুসলিম,তাফসীরে কুরতুবি)

উসমান ইবনে হাযের আযদি বলেন- একবার আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর কাছে নিবেদন করলাম-আপনি আমাকে একটি উপদেশ দিন।

তিনি বলেছেন- ‘তাকওয়া বা খোদাভীতি ও ইস্তিকামাত অবলম্বন করো, যার পন্থা হচ্ছে- ধর্মীয় ব্যাপারে শরিয়তের অনুশাসন হুবহু মেনে চলো, নিজের পক্ষ থেকে বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ি করো না। (সুনানুদ দারেমি,তাফসীরে কুরতুবী)

পবিত্র কোরআনের আরেকটি আয়াতেও এই কথাই আছে-আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- হে মুমিনগণ!তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। (সুরা বাকারা-২০৮)

তাফসীরবিদগণ পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করার ব্যাখ্যায় ধর্মীয় অনুশাসনে দৃঢ়পদতা অবলম্বনের কথাই বলেছেন।

অর্থাৎ, আকিদা-বিশ্বাস ইবাদাত,আচার-অনুষ্ঠান,সমাজ-রাষ্ট্র,ব্যবসা বাণিজ্য-শিল্প ইত্যাদি সবক্ষেত্রে ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা তোমাদের দিয়েছে,তোমরা তারই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং ইস্তিকামাত তথা দৃঢ়তার সাথে লেগে থাকো।

এছাড়াও বুযুর্গদের কাছে একটি কথা খুবই প্রসিদ্ধ,তা হল- ‘কারামাতের চেয়ে ইস্তিকামাত উত্তম’।

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি সবকাজে ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতা অবলম্বন করে,জীবনভর তার থেকে কোন কারামাত বা অতি মানবীয় কোন ব্যাপার প্রকাশ না পেলেও বুযুর্গদের মধ্যে তার মর্যাদা সবার উপরে। (মাআরিফুল কোরআন)

ইস্তিকামাত বা দৃঢ়পদতা কঠিন হলেও এই বিষয়টি পরকালে মুক্তির জন্য আমাদেরকে অবলম্বন করতেই হবে; এছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

রমজানকে উপলক্ষ্য করে আমাদের মুসলিম কমিউনিটিতে ইসলামের প্রতি যে আবেগ দেখা যায়,এটা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু,এই আবেগকে ধরে রাখতে হবে সারাবছর।

অথচ বাস্তবতায় দেখা যায়, মাহে রমজান আমাদেরকে তাকওয়া ও খোদাভীতির যে শিক্ষা দিয়ে যায় প্রতিবছর,মাস শেষ না হতেই এটাতে ভাটা পড়তে থাকে দুঃখজনকভাবে। মাহে রমজান শেষ না হতেই ধর্মের প্রতি আমাদের সব আবেগ-উৎসাহ উঁবে যায় যেন।

রমজান মাস হচ্ছে অন্য মাসে তাকওয়ার ওপর চলার জন্য ‘পাওয়ার হাউজ’। রমজানে তাকওয়ার ওপর দৃঢ়পদ থেকে অন্য মাসেও তাকওয়ার ওপর থাকতে পারার জন্যই রমজানের নেয়ামত আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।

ঐশী এই নেয়ামতকে আমাদের মূল্যবান ভাবতে হবে,মূল্যায়ন করতে হবে। কাজেই রমজানে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি,তাকে হৃদয় থেকে গ্রহণ করতে হবে এবং সারা বছর এই শিক্ষাকে ইস্তিকামাত তথা দৃঢ়তার সঙ্গে লালন করতে হবে, চর্চা করতে হবে।

এভাবেই মাহে রমজান বা ‘তাকওয়ার মাস’ আমাদের জীবনে অর্থবহ হয়ে উঠবে। আর না হয়,বছরান্তে রমজানকে আমরা কেবল সেহরি-ইফতারের উৎসব হিসেবেই রেখে দিব,তার থেকে শেখার বা নেয়ার কিছুই থাকবেনা আমাদের।

তাই আসুন, এবারের রমজানকে কেন্দ্র করে শরীয়তের অনুশাসন ও সুন্নাহর অনুসরণে আমরা যে আবেগ দেখিয়েছি, এটাকে ধরে রাখতে দৃঢ় সংকল্প করি এবং এর ওপর দৃঢ়পদতার সঙ্গে লেগে থাকি।

পরকালে মুক্তির পথকে মসৃণ করতে আমাদের এই প্রয়াস চালাতেই হবে। ইস্তিকামাত ও দৃঢ়পদতার এই মহৎ গুণ আল্লাহ আমাদের সবাইকে দান করুন। আমিন।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত