করোনা ও বন্যার মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে হাজির কোরবানির ঈদ

  আদিল মাহমুদ ০১ আগস্ট ২০২০, ১৩:২৯:০১ | অনলাইন সংস্করণ

ছবি: যুগান্তর

‘ইব্রাহিমের মতো পুত্রেরে আল্লার রাহে দাও/ নৈলে কখনো মুসলিম নও মিছে শাফায়াত চাও/ নির্যাতিতের লাগি পুত্রেরে দাও না শহীদ হতে/চাকুরীতে দিয়া মিছে কথা কও ‘যাও আল্লার পথে’?/ বকরীদি চাঁদ করে ফরিয়াদ দাও দাও কোরবানি/ আল্লারে পাওয়া যায়না করিয়া তাহার না-ফরমানী।’

কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘বকরীদ’ কবিতায় এভাবেই বলেছেন ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদের কথা।

ক’দিন আগেই প্রাণঘাতি মহামারী করোনাভাইরাসে কাহিল বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ পালন করেছে এক অসহায় নিরানন্দ ঈদুল ফিতর। এরপরই আমাদের সামনে এসেছে ঈদুল আজহা।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বন্যার কারণে ঈদ আনন্দ অনেকটাই ম্লান।

ঈদুল আজহা মুসলিম জাতির অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। এ ঈদ যেমন আনন্দের, তেমন ইবাদতের। এ ঈদের সবচেয়ে বড় ইবাদত আল্লাহ রাহে পশু কোরবানি করা।

কোরবানি আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ হলো ত্যাগ, উৎসর্গ, নিকটবর্তী হওয়া ইত্যাদি।

পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ পশুকে জবাই করা। হজরত আদম (আ.) হতে প্রত্যেক নবীর যুগে কোরবানি করার ব্যবস্থা ছিল। যেহেতু প্রত্যেক নবীর যুগে এর বিধান ছিল সেহেতু এর গুরুত্ব অত্যধিক।

পবিত্র কুরআনে আছে, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। [সূরা আল-হাজ্জ, ৩৪]

‘আর তুমি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা কর, যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করল। অতঃপর একজন থেকে গ্রহণ করা হলো, অপরজনের থেকে গ্রহণ করা হলো না।’ [সূরা আল-মায়িদাহ, ৩৪]

আল্লাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন এবং ইবরাহিম (আ.) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন ইবরাহিমকে তার রবের কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর সে তা পূর্ণ করল। তিনি বললেন, আমি তোমাকে নেতা বানাবো’। [সূরা আল-বাকারাহ, ১২৪] নিজ পুত্র জবেহ করার মত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন ইবরাহিম (আ.)।

ঈদুল আজহা একটু ভিন্নতর ঈদ ও খুশির দিন। এ দিনটি হলো আত্ম উৎসর্গের খুশি উদযাপন করার দিন।

মূলত কোরবানির পশু জবাই করা একটি প্রতীকি ব্যাপার। কোরবানির প্রকৃত স্বার্থকতা হলো কোরবানি দাতার কুপ্রবৃত্তি বিসর্জন দেয়ার মধ্যে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যে কোন ধরনের ত্যাগ স্বীকার করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখার মধ্যে।

আল্লাহ তায়ালা যে বান্দাকে বেশি পছন্দ করেন, তাকে বেশি বেশি করে পরীক্ষায় ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কয়েকটি বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করব। ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্য্যশীলদের।’ [সূরা বাকারা, ১৫৫]

মুমিন বান্দা পৃথিবীর যাবতীয় ঘটনাবলীকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করবে। কোন কাজকর্মের মধ্যে লোক দেখানো থাকতে পারবে না।

যেমন কোরবানির মাসে আমাদের মাঝে অনেকেই বেশি বেশি দামে গরু ক্রয় করে এক প্রকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। অহংবোধ নিয়ে তৃপ্তি পায়। ফলে মানুষ পশু কোরবানি দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার ভেতরের হাইওয়ানি বা পশুত্বমূলক স্বভাব পরিবর্তন হচ্ছে না।

আল্লাহ দেখেন কোরবানিদাতার নিয়তের মধ্যে কতটুকু বিশুদ্ধতা রয়েছে। কোরবানিদাতা কোরবানির পশু জবাই করার সময় কোরআনের একটি আয়াত পাঠ করে থাকেন।

আল্লাহ বলেন, ‘আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার জন্য নিবেদিত।’ [সূরা আনআম, ১৬৩]

কোরবানির পশুর মাংস আল্লাহর কাছে কোন প্রয়োজন নেই, বরং তাকে তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের এবং অন্য ভাগ গরিবদের জন্য দান করতে হয়।

আল্লাহ বলেন, ‘কখনও কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহতায়ালা গ্রহণ করেন না, নিঃসন্দেহে তিনি এর মাঝে বান্দার তাকওয়া দেখেন।’ [সূরা হজ, ৩২]

ঈদুল আজহার কোরবানির পশু জবাই দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভের অন্যতম মাধ্যম। এ পশুটি কোরবানিদাতার জন্য পুলসিরাত পার হওয়ার বাহন হবে।

হজরত যায়েদ বিন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) বলেছেন, কোরবানিকৃত পশুর প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে নেকী রয়েছে। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, পশমেরও? তিনি বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে নেকী রয়েছে। [মিশকাত]

এ ঈদে শুধু পশু নয়, নিজের পশুত্ব কুরবানি করাও অন্যতম উদ্দেশ্য। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার সাথে ভেতরের পশুত্বকেও কোরবানি করতে হবে।

পশু কোরবানির মাধ্যমে ঈমানের সাক্ষ্য প্রদান এবং পশুত্ব কোরবানির মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়াই কোরবানির দাবি।

কোরবানির মাধ্যমে ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, শত্রুতা ইত্যাদি পশুত্বকে দমন করে মানুষের সুকুমারবৃত্তিগুলোকে জাগিয়ে তুলতে পারলেই কোরবানির ঈদ সার্থক হবে, সমাজে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে পড়বে। ঈদুল আজহায় এই প্রত্যাশা করি।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত