বোকা বানাল আরবের মরুভূমি
jugantor
বোকা বানাল আরবের মরুভূমি

  সুফিয়ান ফারাবী  

০৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:৩৮:১০  |  অনলাইন সংস্করণ

বোকা বানাল আরবের মরুভূমি

আছি আরব ভূখণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরবে। কিছুক্ষণ পূর্বে আমাদের নিয়ে উড়তে থাকা বিমানটি জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণ করল।

বিমানের চাকা থেমেছে। এবার আমাদের নামার পালা। সিটবেল্ট খুলতে খুলতে যাত্রীদের সবার মাঝে তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করলাম আমি। কে কার আগে রাসূল সা.-এর জন্মভূমিতে পা রাখবেন- সেই প্রতিযোগিতা তাদের মাঝে।

যারা এই প্রথম এসেছেন নবীর দেশে, তাদের মাঝে একপ্রকার অস্থিরতা কাজ করছে। আমিও এই প্রথমবার মরুর দেশে পা রাখব।

বিমান থেকে নেমে ছুটে চলছি ইমিগ্রেশনের দিকে। ইমিগ্রেশন অফিসারের মুখোমুখি আমি; এর আগে বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কয়েকবার। তাই ইমিগ্রেশন অফিসার কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন, আমার অজানা নয়।

তিনি আমার পাসপোর্ট দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমার পেশা কী? আমি বললাম, আমি একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী। এছাড়া বাংলাদেশের বাজারে আমার একটি বই আছে। নাম ‘আরাকানের আব্দুল্লাহ’।

দীর্ঘ পাঁচ মিনিট আমাকে জেরা করলেন। আমিও স্পষ্ঠভাবে তার প্রতিটি কথার উত্তর দিলাম আরবি ভাষায়।
ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম। চেপে বসলাম বাসে। জানালার পাশে একটি সিটে। আমাদের গন্তব্য পৃথিবীর ব্যস্ততম শহর মক্কার দিকে। যেতে যেতে জানালা দিয়ে প্রাণভরে দেখছি এ শহরের সৌন্দর্য।

গাড়ি চলছিল তার আপন গতিতে। কিন্তু হঠাৎই গাড়িটি মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির চাকা চলছে না। আমাদের চালক কয়েকবার স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। বুঝতে বাকি রইল না কোনো একটা সমস্যা হয়েছে।

পাঠকদের উদ্দেশে বলে রাখি, সৌদিতে জ্বালানি সংকট নেই। তেলের ওপর ভাসমান একটি দেশ। এর উপর ভর করে আজ বিশ্বের অন্যতম ধনীরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে সৌদি আরব।

এখানকার গাড়িগুলোর কন্ডিশনও খুব ভালো। উন্নত দেশগুলো থেকে সম্পূর্ণ নতুন গাড়ি আমদানি করা হয় এ দেশে। তারপরও কেন হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে গাড়িটি দাঁড়িয়ে পড়ল?

এটা দেখার জন্য গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। দেখলাম, অতিরিক্ত গতিতে চলার কারণে গাড়ির দু‘টো টায়ার ব্রাস্ট হয়েছে। গাড়ির ড্রাইভার চাকা খুলছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভাই গাড়ি সচল হতে কতক্ষণ লাগতে পারে? তিনি বললেন, আধঘণ্টা সময় লাগবে। আপনারা কিছুক্ষণ গাড়ি থেকে নেমে হাঁটাচলা করতে পারেন। ঠিক হয়ে গেলে আমি আপনাদের ডাকব।

মুসিবত কখনও কখনও সৌভাগ্যেরও কারণ হয়। কখনও কখনও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। আমি এ সুযোগটা কাজে লাগাব বলে মনস্থির করলাম। অনেক হাদিসে মরুভূমির ঘটনা পড়েছি। বিখ্যাত লেখক “পাওলো কয়েলহোর” বই পড়ে জেনেছি- মরুভূমির অজানা অনেক রহস্য।

তিনি বলেছিলেন, অনেক কিছু শেখার আছে মরুভূমিতে। একটা বইয়ের স্তূপ মুসাফিরকে যা শেখায়, এর চেয়ে বেশি শেখায় বিস্তৃত মরুভূমি।

তার সেই কথায় আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল। ইচ্ছে হয়েছিল কোনো একদিন বৈচিত্র্যময় মরুভূমির বিচিত্রতা দেখব। আমার আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে- আজ সেই দিনটি আমার জীবনে এসেছে।

পা বাড়ালাম মরুপ্রান্তরের দিকে। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে গাড়ি থেকে বেশ দূরে চলে এলাম। একা একা মরুদ্যান দেখতে বেরিয়ে এসেছি। শুধু মরুদ্যান নয়, জীবনে যা কিছু দেখেছি, যেসব সৌন্দর্য উপভোগ করেছি সবই একা করেছি। আর এতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

কিছুদূর আসার পর দেখলাম, মরুভূমিতে একপ্রকার প্রাণী আছে। দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো কিন্তু আকৃতিতে ছোট; অনেক ছোট। বড়জোড় পাঁচ থেকে সাত ইঞ্চি।

মরুভূমির এই প্রাণীটি অ্যারাবিয়ানরা খায়। খুব আয়েশ করেই খায়। ইসলামী শরিয়তেও এটা খাওয়া বৈধ। আসহাবে রাসূলিল্লাহ খেয়েছেন। রাসূল (সা.) খাননি, তবে কাউকে খেতেও নিষেধ করে যাননি।

এ প্রাণীর বসবাস মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে। কিন্তু শরীরে বালি লেগে থাকে না। এরা ছোট ছোট গর্ত করে। সেখান থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই শরীর থেকে বালি ঝরে যায়।

মরুভূমিতে বসবাস হওয়ার কারণে সাধারণত মানুষ এ প্রাণীটি দেখে না। যখনই দেখে- সঙ্গে সঙ্গে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। প্রণীটির নাম “দাব্ব”। অ্যারাবিয়ানরা এরকম উচ্চারণই করেন।

এ জাতীয় আরও যত মরু-প্রাণী আছে সবগুলো বের হয় রাতের বেলায়। দিনে তেমন একটা দেখা যায় না। সৌভাগ্যবসত আমি দেখেছি।

শুধু বিষাক্ত সাপগুলো দিনেও বের হয়। এ সাপগুলো এতটাই বিষাক্ত, দংশনের পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যেই দংশিত প্রাণীর মৃত্যু হয় এবং মুখ দিয়ে অনবরত ফেনা বের হতে থাকে।

পৃথিবীতে কয়েক ধরনের মরুভূমি আছে। বালুময় মরুভূমি, পাথর মরুভূমি, পাহাড়ি মরুভূমি ও উপকূলীয় মরুভূমি।

বালুময় মরুভূমি ও উপকূলীয় মরুভূমির মাঝে উদ্ভিদ থাকে। প্রাণীর সংখ্যাও অনেক। তবে পাথর ও পাহাড়ি মরুভূমিতে উদ্ভিদ, ঘাস-গাছের সংখ্যা নেই বললেই যথাযথ হবে বলে মনে করি।

আমি এখন যেই মরুভূমিতে আছি এটা উপকূলীয় মরুভূমি। তার মানে এখনও জেদ্দাতে। জেদ্দা শহরের শেষপ্রান্তে।

এতক্ষণে প্রায় এক কিলোমিটার চলে এসেছি। যারা চরে গিয়েছেন তারা জানবেন, বালিতে হাঁটা কতটা কষ্টকর। “এক কদম সামনে গেলে দুই কদম পিছিয়ে যাই” অবস্থা। ক্লান্ত শরীর আর সামনে যেতে চাচ্ছে না। গাড়িও বোধহয় ঠিক হয়ে গেছে।

এমন সময় সামনে এমন একটা সৌন্দর্য দেখলাম যা আগে কখনও দেখিনি। যেন পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য তার কাছে ম্লান। দেখলাম বালির উপর পানি থৈ থৈ করছে। সোনালি বালিতে পানি দেখে মনে হচ্ছিল হাজারও মণি-মুক্তা ঝলমল করে জ্বলছে।

আবার ওপর থেকে পানি বাষ্প হয়ে আকাশে চলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক এ সৌন্দর্য দেখে মনে হচ্ছিল, স্বর্গ বলতে কিছু নেই। এটাই স্বর্গ। আমি সেই সৌন্দর্যকে হাতে স্পর্শ করার জন্য সামনে অগ্রসর হলাম। এই স্বর্গ আর আমার মাঝে দূরত্ব খুব বেশি হলে একশ’ গজ হবে। তার মানে স্বর্গে পৌঁছতে আমার সময় লাগবে দু‘মিনিট।

কিন্তু আমি প্রায় পাঁচ মিনিট হেঁটেছি। তবুও মনে হচ্ছে আরও একশ’ গজ হাঁটতে হবে। আমি আরও তিন-চার মিনিট হাঁটলাম। তবুও মনে হচ্ছে আরো একশ’ গজ দূরে।

ঠিক এমন সময় বুঝলাম সামনে স্বর্গ তো দূরের কথা পানিও নেই; যা দেখছি তা মরীচীকা। প্রচণ্ড উত্তাপে বালি দেখতে পানি মনে হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি কিছু না। নিজেকে এক অর্থে চরম বোকা মনে হল।

ধুর, কত বড় ধোঁকা খেলাম। আবার এটাও মনে হল- আমি কি হাতের সামনে স্বর্গ পেয়েও ছেড়ে দিলাম! আরবি সাহিত্যের কবি ইমরাউল কায়েস বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ধাঁধা হল মরুভূমি; যার রহস্য মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আমি বিরস মনে গাড়ির কাছে ফিরে এলাম। গাড়ি সচল হয়েছে। আমরা সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। আমার এ সফরে সঙ্গী ছিলেন বন্ধু যোবায়ের আহমেদ।

আমার মন খারাপ দেখে সে জিজ্ঞেস করল, ফারাবী, তোমার মন খারাপ কেন? আমি বললাম, বোকা বানাল আরবের মরুভূমি।


বোকা বানাল আরবের মরুভূমি

 সুফিয়ান ফারাবী 
০৩ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বোকা বানাল আরবের মরুভূমি
ছবি: আল আরাবিয়া

আছি আরব ভূখণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরবে। কিছুক্ষণ পূর্বে আমাদের নিয়ে উড়তে থাকা বিমানটি জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণ করল। 

বিমানের চাকা থেমেছে। এবার আমাদের নামার পালা। সিটবেল্ট খুলতে খুলতে যাত্রীদের সবার মাঝে তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করলাম আমি। কে কার আগে রাসূল সা.-এর জন্মভূমিতে পা রাখবেন- সেই প্রতিযোগিতা তাদের মাঝে। 

যারা এই প্রথম এসেছেন নবীর দেশে, তাদের মাঝে একপ্রকার অস্থিরতা কাজ করছে। আমিও এই প্রথমবার মরুর দেশে পা রাখব।

বিমান থেকে নেমে ছুটে চলছি ইমিগ্রেশনের দিকে। ইমিগ্রেশন অফিসারের মুখোমুখি আমি; এর আগে বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কয়েকবার। তাই ইমিগ্রেশন অফিসার কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন, আমার অজানা নয়।

তিনি আমার পাসপোর্ট দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমার পেশা কী? আমি বললাম, আমি একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী। এছাড়া বাংলাদেশের বাজারে আমার একটি বই আছে। নাম ‘আরাকানের আব্দুল্লাহ’। 

দীর্ঘ পাঁচ মিনিট আমাকে জেরা করলেন। আমিও স্পষ্ঠভাবে তার প্রতিটি কথার উত্তর দিলাম আরবি ভাষায়।
ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম। চেপে বসলাম বাসে। জানালার পাশে একটি সিটে। আমাদের গন্তব্য পৃথিবীর ব্যস্ততম শহর মক্কার দিকে। যেতে যেতে জানালা দিয়ে প্রাণভরে দেখছি এ শহরের সৌন্দর্য।   

গাড়ি চলছিল তার আপন গতিতে। কিন্তু হঠাৎই গাড়িটি মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির চাকা চলছে না। আমাদের চালক কয়েকবার স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। বুঝতে বাকি রইল না কোনো একটা সমস্যা হয়েছে।

পাঠকদের উদ্দেশে বলে রাখি, সৌদিতে জ্বালানি সংকট নেই। তেলের ওপর ভাসমান একটি দেশ। এর উপর ভর করে আজ  বিশ্বের অন্যতম ধনীরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে সৌদি আরব।

এখানকার গাড়িগুলোর কন্ডিশনও খুব ভালো। উন্নত দেশগুলো থেকে সম্পূর্ণ নতুন গাড়ি আমদানি করা হয় এ দেশে। তারপরও কেন হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে গাড়িটি দাঁড়িয়ে পড়ল?

এটা দেখার জন্য গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। দেখলাম, অতিরিক্ত গতিতে চলার কারণে গাড়ির দু‘টো টায়ার ব্রাস্ট হয়েছে। গাড়ির ড্রাইভার চাকা খুলছেন। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভাই গাড়ি সচল হতে কতক্ষণ লাগতে পারে? তিনি বললেন, আধঘণ্টা সময় লাগবে। আপনারা কিছুক্ষণ গাড়ি থেকে নেমে হাঁটাচলা করতে পারেন। ঠিক হয়ে গেলে আমি আপনাদের ডাকব।
 
মুসিবত কখনও কখনও সৌভাগ্যেরও কারণ হয়। কখনও কখনও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। আমি এ সুযোগটা কাজে লাগাব বলে মনস্থির করলাম। অনেক হাদিসে মরুভূমির ঘটনা পড়েছি। বিখ্যাত লেখক “পাওলো কয়েলহোর” বই পড়ে জেনেছি- মরুভূমির অজানা অনেক রহস্য। 

তিনি বলেছিলেন, অনেক কিছু শেখার আছে মরুভূমিতে। একটা বইয়ের স্তূপ মুসাফিরকে যা শেখায়, এর চেয়ে বেশি শেখায় বিস্তৃত মরুভূমি। 

তার সেই কথায় আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল। ইচ্ছে হয়েছিল কোনো একদিন বৈচিত্র্যময় মরুভূমির বিচিত্রতা দেখব। আমার আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে- আজ সেই দিনটি আমার জীবনে এসেছে।

পা বাড়ালাম মরুপ্রান্তরের দিকে। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে গাড়ি থেকে বেশ দূরে চলে এলাম। একা একা মরুদ্যান দেখতে বেরিয়ে এসেছি। শুধু মরুদ্যান নয়, জীবনে যা কিছু দেখেছি, যেসব সৌন্দর্য উপভোগ করেছি সবই একা করেছি। আর এতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। 

কিছুদূর আসার পর দেখলাম, মরুভূমিতে একপ্রকার প্রাণী আছে। দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো কিন্তু আকৃতিতে ছোট; অনেক ছোট। বড়জোড় পাঁচ থেকে সাত ইঞ্চি।

মরুভূমির এই প্রাণীটি অ্যারাবিয়ানরা খায়। খুব আয়েশ করেই খায়। ইসলামী শরিয়তেও এটা খাওয়া বৈধ। আসহাবে রাসূলিল্লাহ খেয়েছেন। রাসূল (সা.) খাননি, তবে কাউকে খেতেও নিষেধ করে যাননি। 

এ প্রাণীর বসবাস মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে। কিন্তু শরীরে বালি লেগে থাকে না। এরা ছোট ছোট গর্ত করে। সেখান থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই শরীর থেকে বালি ঝরে যায়। 

মরুভূমিতে বসবাস হওয়ার কারণে সাধারণত মানুষ এ প্রাণীটি দেখে না। যখনই দেখে- সঙ্গে সঙ্গে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। প্রণীটির নাম “দাব্ব”। অ্যারাবিয়ানরা এরকম উচ্চারণই করেন।

এ জাতীয় আরও যত মরু-প্রাণী আছে সবগুলো বের হয় রাতের বেলায়। দিনে তেমন একটা দেখা যায় না। সৌভাগ্যবসত আমি দেখেছি।
 
শুধু বিষাক্ত সাপগুলো দিনেও বের হয়। এ সাপগুলো এতটাই বিষাক্ত, দংশনের পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যেই দংশিত প্রাণীর মৃত্যু হয় এবং মুখ দিয়ে অনবরত ফেনা বের হতে থাকে। 

পৃথিবীতে কয়েক ধরনের মরুভূমি আছে। বালুময় মরুভূমি, পাথর মরুভূমি, পাহাড়ি মরুভূমি ও উপকূলীয় মরুভূমি। 

বালুময় মরুভূমি ও উপকূলীয় মরুভূমির মাঝে উদ্ভিদ থাকে। প্রাণীর সংখ্যাও অনেক। তবে পাথর ও পাহাড়ি মরুভূমিতে উদ্ভিদ, ঘাস-গাছের সংখ্যা নেই বললেই যথাযথ হবে বলে মনে করি। 

আমি এখন যেই মরুভূমিতে আছি এটা উপকূলীয় মরুভূমি। তার মানে এখনও জেদ্দাতে। জেদ্দা শহরের শেষপ্রান্তে।

এতক্ষণে প্রায় এক কিলোমিটার চলে এসেছি। যারা চরে গিয়েছেন তারা জানবেন, বালিতে হাঁটা কতটা কষ্টকর। “এক কদম সামনে গেলে দুই কদম পিছিয়ে যাই” অবস্থা। ক্লান্ত শরীর আর সামনে যেতে চাচ্ছে না। গাড়িও বোধহয় ঠিক হয়ে গেছে।
 
এমন সময় সামনে এমন একটা সৌন্দর্য দেখলাম যা আগে কখনও দেখিনি। যেন পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য তার কাছে ম্লান। দেখলাম বালির উপর পানি থৈ থৈ করছে। সোনালি বালিতে পানি দেখে মনে হচ্ছিল হাজারও মণি-মুক্তা ঝলমল করে জ্বলছে। 

আবার ওপর থেকে পানি বাষ্প হয়ে আকাশে চলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক এ সৌন্দর্য দেখে মনে হচ্ছিল, স্বর্গ বলতে কিছু নেই। এটাই স্বর্গ। আমি সেই সৌন্দর্যকে হাতে স্পর্শ করার জন্য সামনে অগ্রসর হলাম। এই স্বর্গ আর আমার মাঝে দূরত্ব খুব বেশি হলে একশ’ গজ হবে। তার মানে স্বর্গে পৌঁছতে আমার সময় লাগবে দু‘মিনিট। 

কিন্তু আমি প্রায় পাঁচ মিনিট হেঁটেছি। তবুও মনে হচ্ছে আরও একশ’ গজ হাঁটতে হবে। আমি আরও তিন-চার মিনিট হাঁটলাম। তবুও মনে হচ্ছে আরো একশ’ গজ দূরে। 

ঠিক এমন সময় বুঝলাম সামনে স্বর্গ তো দূরের কথা পানিও নেই; যা দেখছি তা মরীচীকা। প্রচণ্ড উত্তাপে বালি দেখতে পানি মনে হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি কিছু না। নিজেকে এক অর্থে চরম বোকা মনে হল।

ধুর, কত বড় ধোঁকা খেলাম। আবার এটাও মনে হল- আমি কি হাতের সামনে স্বর্গ পেয়েও ছেড়ে দিলাম! আরবি সাহিত্যের কবি ইমরাউল কায়েস বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ধাঁধা হল মরুভূমি; যার রহস্য মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

আমি বিরস মনে গাড়ির কাছে ফিরে এলাম। গাড়ি সচল হয়েছে। আমরা সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। আমার এ সফরে সঙ্গী ছিলেন বন্ধু যোবায়ের আহমেদ। 

আমার মন খারাপ দেখে সে জিজ্ঞেস করল, ফারাবী, তোমার মন খারাপ কেন? আমি বললাম, বোকা বানাল আরবের মরুভূমি।