যে ব্যাধি জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়
jugantor
যে ব্যাধি জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়

  মাহমুদ আহমদ  

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:১৭:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন যাদেরকে আল্লাহতায়ালা ধন-সম্পদ বা জ্ঞানের অধিকারী করেছেন কিন্তু নিজেদের অর্থের বা জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করিনা।

অনেকের ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় সাধারণ লোকদের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে যেন সে লজ্জাবোধ করে।

শুধু তাই নয় নিজ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করতে দ্বিধা করে না। নিজেদেরকে অনেক বড় মনে করে।

আসলে সে বুঝে না যে, এমনটি করতে করতে মূলত সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্রে পরিণত হয় আর সে শয়তানের আশ্রয়ে চলে যায়। এসব মূলত একটি কঠিন ব্যাধি আর এটি অহংকারের ব্যাধি। এই ব্যাধি মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর (অহংকারবশে) মানুষকে অবজ্ঞা কর না এবং ঔদ্ধত্যের সাথে পৃথিবীতে চলাফেরা কর না। আল্লাহ কোনো অহংকারী ও দাম্ভিককে পছন্দ করেন না’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৮)।

এ বিষয়ে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে এক কণা পরিমাণ অহংকার আছে সে কখনও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’

একজন সাহাবী বললো, যদি কেউ সুন্দর পোশাক ও জুতা পছন্দ করে? তিনি (সা.) বললেন, অহংকার বলতে আত্মাভিমানে সত্যকে অস্বীকার করা এবং অন্যকে হেয় চক্ষে দেখা বুঝায়’ (মুসলিম)।

পবিত্র কোরআন এবং হাদিস থেকে বিষয়টি স্পষ্ট যে, কোনো অহংকারীকে আল্লাহপাক পছন্দ করেন না। আসলে অহংকার প্রদর্শনের পর থেকে শয়তান সূচনাকালেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে, আমি এই অহংকারীকে বক্রতার পথে নিয়ে যাব, আর এতে শয়তান জোড় প্রচেষ্টা চালানো শুরু করে আর মানুষকে আল্লাহর বান্দায় পরিণত হতে বাধা দিতে থাকে।

শয়তান ভাবে এই অহংকারীকে আমি বিভিন্ন পদ্ধতিতে এমনভাবে ফাঁসাবো যে, মানুষ যদি সৎকর্ম সম্পাদন করতেও পারে তবুও নিজ প্রকৃতিগত অহংকারের কারণে আত্মম্ভরিতা তাকে ধীরে ধীরে ঔদ্ধ্যত করে তুলে। এই ঔদ্ধ্যত্ব শেষ পর্যন্ত তাকে সেই কৃত সৎকর্মের পুণ্য থেকে বঞ্চিত করে দেয়।

কেননা শয়তান প্রথম থেকেই এই সিদ্ধান্ত করে নিয়েছিল, সে মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করবে আর সে নিজেই তো অহংকারের কারণে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অমান্য করেছিল।

এজন্য এটাই সেই যুদ্ধ, যা শয়তান অমূলক বিভিন্ন বাহানায় মানুষের ওপর চেপে বসে তাকে পরীক্ষায় ফেলে। তবে রহমান খোদার বান্দা যারা আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্ত বান্দা, ইবাদতে একনিষ্ঠ হয় এই আক্রমণ থেকে তারা আত্মরক্ষা করে চলে।

তাছাড়া সাধারণ ভাবে অহংকারের এই পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শয়তান মানুষকে নিজ করায়ত্বে আনতে সক্ষম হয়ে যায়, এটা এমন এক বিষয় যাকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়।

কেননা অহংকার এমন একটি ব্যাধি যা একবার কারো ঘারে চেপে বসলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া বড়ই কষ্টকর।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘আর পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না। কেননা তুমি কখনো পৃথিবীকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতার পর্বতসমও হতে পারবে না’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৭)।

হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক পাপের মূলে রয়েছে ৩টি বিষয় তা থেকে আত্মরক্ষা করা উচিত, প্রথমত ঔদ্ধত্য থেকে বাঁচো, কেননা ঔদ্ধত্যই শয়তানকে প্ররোচিত করেছে, যেন সে আদমকে সেজদা না করে দ্বিতীয়ত লোভ সংবরণ করো কেননা এই লোভই আদম (আ.)-কে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেতে উশকিয়ে দিয়েছে।

তৃতীয়ত ঈর্ষা থেকে বাঁচো কেননা এই ঈর্ষার কারণেই আদমের দুই পুত্রের মধ্য থেকে একজন নিজের ভাইকে হত্যা করেছে? (আর রিসালাহ, আল কুশাইরিয়া, বাব আল হামাদি, পৃ: ৭৯)।

অপর একটি হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জাহান্নাম ও জান্নাতের পরস্পরের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা হবে। জাহান্নাম বলবে, আমার ভেতর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অহংকারী লোকেরা প্রবেশ করবে আর জান্নাত বলতে শুরু করবে যে, আমার মাঝে দুর্বল আর গরীবেরা প্রবেশ করবে।

এতে আল্লাহতায়ালা জাহান্নামকে বলেন যে, তুমি আমার শাস্তির প্রকাশকারী যাকে আমি চাই তোমার মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে থাকি এবং জান্নাতকে তিনি (আল্লাহ) বললেন, তুমি আমার কৃপার বিকাশস্থল, আমি যাকে চাই তোমার মাধ্যমে কৃপাবর্ষণ করি। আর তোমাদের যা প্রাপ্য তোমরা উভয়ই তা পুরোপুরি পাবে।’ (সহি মুসলিম)

আল্লাহ করুন, আমরা সবাই যেন বিনয়, নম্রতা আর সৎব্যবহারের উত্তম পথে চলে আল্লাহতায়ালার কৃপাদৃষ্টি লাভকারী হই, আল্লাহতায়ালার জান্নাতে প্রবেশকারী হই আর প্রতিটি গৃহ যেন অহংকারের গুনাহ থেকে পবিত্র থাকে।

হে দয়াময় প্রভূ! আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে আপনার রহমতের বারিধারায় আমাদেরকে সিক্ত করুন, আমিন।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

যে ব্যাধি জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়

 মাহমুদ আহমদ 
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৯:১৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন যাদেরকে আল্লাহতায়ালা ধন-সম্পদ বা জ্ঞানের অধিকারী করেছেন কিন্তু নিজেদের অর্থের বা জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করিনা। 

অনেকের ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় সাধারণ লোকদের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে যেন সে লজ্জাবোধ করে। 

শুধু তাই নয় নিজ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করতে দ্বিধা করে না। নিজেদেরকে অনেক বড় মনে করে। 

আসলে সে বুঝে না যে, এমনটি করতে করতে মূলত সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্রে পরিণত হয় আর সে শয়তানের আশ্রয়ে চলে যায়। এসব মূলত একটি কঠিন ব্যাধি আর এটি অহংকারের ব্যাধি। এই ব্যাধি মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর (অহংকারবশে) মানুষকে অবজ্ঞা কর না এবং ঔদ্ধত্যের সাথে পৃথিবীতে চলাফেরা কর না। আল্লাহ কোনো অহংকারী ও দাম্ভিককে পছন্দ করেন না’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৮)। 

এ বিষয়ে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে এক কণা পরিমাণ অহংকার আছে সে কখনও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ 

একজন সাহাবী বললো, যদি কেউ সুন্দর পোশাক ও জুতা পছন্দ করে? তিনি (সা.) বললেন, অহংকার বলতে আত্মাভিমানে সত্যকে অস্বীকার করা এবং অন্যকে হেয় চক্ষে দেখা বুঝায়’ (মুসলিম)। 

পবিত্র কোরআন এবং হাদিস থেকে বিষয়টি স্পষ্ট যে, কোনো অহংকারীকে আল্লাহপাক পছন্দ করেন না। আসলে অহংকার প্রদর্শনের পর থেকে শয়তান সূচনাকালেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে, আমি এই অহংকারীকে বক্রতার পথে নিয়ে যাব, আর এতে শয়তান জোড় প্রচেষ্টা চালানো শুরু করে আর মানুষকে আল্লাহর বান্দায় পরিণত হতে বাধা দিতে থাকে। 

শয়তান ভাবে এই অহংকারীকে আমি বিভিন্ন পদ্ধতিতে এমনভাবে ফাঁসাবো যে, মানুষ যদি সৎকর্ম সম্পাদন করতেও পারে তবুও নিজ প্রকৃতিগত অহংকারের কারণে আত্মম্ভরিতা তাকে ধীরে ধীরে ঔদ্ধ্যত করে তুলে। এই ঔদ্ধ্যত্ব শেষ পর্যন্ত তাকে সেই কৃত সৎকর্মের পুণ্য থেকে বঞ্চিত করে দেয়। 

কেননা শয়তান প্রথম থেকেই এই সিদ্ধান্ত করে নিয়েছিল, সে মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করবে আর সে নিজেই তো অহংকারের কারণে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অমান্য করেছিল। 

এজন্য এটাই সেই যুদ্ধ, যা শয়তান অমূলক বিভিন্ন বাহানায় মানুষের ওপর চেপে বসে তাকে পরীক্ষায় ফেলে। তবে রহমান খোদার বান্দা যারা আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ প্রাপ্ত বান্দা, ইবাদতে একনিষ্ঠ হয় এই আক্রমণ থেকে তারা আত্মরক্ষা করে চলে। 

তাছাড়া সাধারণ ভাবে অহংকারের এই পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শয়তান মানুষকে নিজ করায়ত্বে আনতে সক্ষম হয়ে যায়, এটা এমন এক বিষয় যাকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। 

কেননা অহংকার এমন একটি ব্যাধি যা একবার কারো ঘারে চেপে বসলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া বড়ই কষ্টকর।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘আর পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না। কেননা তুমি কখনো পৃথিবীকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতার পর্বতসমও হতে পারবে না’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৭)। 

হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক পাপের মূলে রয়েছে ৩টি বিষয় তা থেকে আত্মরক্ষা করা উচিত, প্রথমত ঔদ্ধত্য থেকে বাঁচো, কেননা ঔদ্ধত্যই শয়তানকে প্ররোচিত করেছে, যেন সে আদমকে সেজদা না করে দ্বিতীয়ত লোভ সংবরণ করো কেননা এই লোভই আদম (আ.)-কে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেতে উশকিয়ে দিয়েছে। 

তৃতীয়ত ঈর্ষা থেকে বাঁচো কেননা এই ঈর্ষার কারণেই আদমের দুই পুত্রের মধ্য থেকে একজন নিজের ভাইকে হত্যা করেছে? (আর রিসালাহ, আল কুশাইরিয়া, বাব আল হামাদি, পৃ: ৭৯)। 

অপর একটি হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জাহান্নাম ও জান্নাতের পরস্পরের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা হবে। জাহান্নাম বলবে, আমার ভেতর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অহংকারী লোকেরা প্রবেশ করবে আর জান্নাত বলতে শুরু করবে যে, আমার মাঝে দুর্বল আর গরীবেরা প্রবেশ করবে। 

এতে আল্লাহতায়ালা জাহান্নামকে বলেন যে, তুমি আমার শাস্তির প্রকাশকারী যাকে আমি চাই তোমার মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে থাকি এবং জান্নাতকে তিনি (আল্লাহ) বললেন, তুমি আমার কৃপার বিকাশস্থল, আমি যাকে চাই তোমার মাধ্যমে কৃপাবর্ষণ করি। আর তোমাদের যা প্রাপ্য তোমরা উভয়ই তা পুরোপুরি পাবে।’ (সহি মুসলিম)

আল্লাহ করুন, আমরা সবাই যেন বিনয়, নম্রতা আর সৎব্যবহারের উত্তম পথে চলে আল্লাহতায়ালার কৃপাদৃষ্টি লাভকারী হই, আল্লাহতায়ালার জান্নাতে প্রবেশকারী হই আর প্রতিটি গৃহ যেন অহংকারের গুনাহ থেকে পবিত্র থাকে।

হে দয়াময় প্রভূ! আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে আপনার রহমতের বারিধারায় আমাদেরকে সিক্ত করুন, আমিন।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট