সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে জাকাতের ভূমিকা
jugantor
সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে জাকাতের ভূমিকা

  আ.স.ম আল আমীন  

২৫ জুলাই ২০২১, ২০:৩৯:১৮  |  অনলাইন সংস্করণ

সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে জাকাতের ভূমিকা

আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতে অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রতিটি প্রাণীকে নানান রকমের বৈশিষ্ট্য, আকৃতি ও গুণাবলির ওপর সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহতায়ালার সকল সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ, যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন- নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠন প্রকৃতিতে (সুরা ত্বীন ৪)

মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব হওয়ায় আল্লাহ মানুষের ওপর বিশেষ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। যে দায়িত্ব মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র এক সৃষ্টি হিসেবে পরিচিত করেছে।

আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের অর্পিত দায়িত্বের মধ্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো জাকাত সম্পাদন করা।

পবিত্র কোরআনে মোট ৩২ বার জাকাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, তোমরা সালাত কায়েম কর, জাকাত আদায় কর এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর। (সুরা বাকারা ৪৩)

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমাদের সমাজে অনেক মানুষই জাকাত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না। জাকাত এটি আরবি শব্দ, এর অর্থ পবিত্র হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়তের নির্দেশ মতে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে সেই সম্পদ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ মুসলমানদের দান করাকে জাকাত বলে।

এ পরিভাষা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, জাকাত সবার ওপর ফরজ নয়। জাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। নিসাব বলতে বুঝায় ন্যূনতম ৭.৫ তোলা স্বর্ণ কিংবা ৫২.৫ তোলা রৌপ্য অথবা সমপরিমাণ অর্থ।

যদি এ পরিমাণ সম্পদ কারও মালিকানায় পূর্ণ এক বছর থাকে তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ। জাকাত কাদের মাঝে বণ্টন করা হবে কিংবা কত শ্রেণীর মানুষ এই সম্পদের হকদার হবে, তা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

জাকাত না আদায় করলে এর ভয়াবহ পরিণতি কী হতে পারে সে সম্পর্কে ও কোরআন হাদিসে অনেক আলোচনা রয়েছে। এতবার আল্লাহর আদেশ এবং রাসূলের (সা.) এর বাণী সত্যিই কি আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে?

আসলেই কি আমরা মহান আল্লাহতায়ালার বাণী মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পেরেছি। যদি গ্রহণ করেই থাকি তবে কেন অধিকাংশ মানুষ জাকাত সম্পর্কে অজ্ঞ। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন মতে, বিশ্বে ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

একই বছরে আরেকটি কলামের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ধনীদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি একই হারে হতদরিদ্র লোকদের সংখ্যা ও বাড়ছে। এক স্তরের মানুষ যেমন ক্রমান্বয়ে ধনী হচ্ছে তদ্রুপ আরেক স্তরের মানুষ ক্রমান্বয়ে গরিব হচ্ছে। এরকম বৈষম্যপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টির হওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ধনী কর্তৃক গরিবদের জাকাত না দেয়া।

ইসলামের পঞ্চম খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের শাসনামলে মানুষ জাকাতের সম্পদ নিয়ে ঘুরত গরিবদের দেওয়ার জন্য, কিন্তু যাকাত দেওয়ার মতো কাউকে না পেয়ে অবশেষে বায়তুলমালে গিয়ে জমা দিতেন।

আর এখন আমরা জাকাত দিতে কার্পণ্য করে থাকি সম্পদ কমে যাওয়ার ভয়ে। অথচ জাকাত দিলে সম্পদ বাড়ে তা আমাদের অনেকের অজানা। অনেকে জাকাত দেয় কিন্তু তা অপরিকল্পিতভাবে বণ্টন করে, ফলে জাকাতের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না।

জাকাতের উদ্দেশ্য হলো সমাজ থেকে দারিদ্র্যতা নির্মূল করা, এজন্য এমন মানুষকে জাকাত দেয়া যাতে সে আর কারো কাছে হাত পাততে না হয়। যদি প্রতি বছর এভাবে কিছু লোককে নির্দিষ্ট করে তাদের জাকাতের অর্থ দেয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে কয়েক বছরের মধ্যেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে আসবে।

এজন্য আলেম সমাজকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ধনীদের কাছে জাকাতের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, মা'হাদুল ইকতিসাদ ওয়াল ফিকহীল ইসলামী, ঢাকা

সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে জাকাতের ভূমিকা

 আ.স.ম আল আমীন 
২৫ জুলাই ২০২১, ০৮:৩৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে জাকাতের ভূমিকা
ফাইল ছবি

আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতে অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রতিটি প্রাণীকে নানান রকমের বৈশিষ্ট্য, আকৃতি ও গুণাবলির ওপর সৃষ্টি করেছেন।  

আল্লাহতায়ালার সকল সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ, যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন- নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠন প্রকৃতিতে (সুরা ত্বীন ৪) 

মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব হওয়ায় আল্লাহ মানুষের ওপর বিশেষ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। যে দায়িত্ব মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র এক সৃষ্টি হিসেবে পরিচিত করেছে।  

আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের অর্পিত দায়িত্বের মধ্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো জাকাত সম্পাদন করা।  

পবিত্র কোরআনে মোট ৩২ বার জাকাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।  আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, তোমরা সালাত কায়েম কর, জাকাত আদায় কর এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর। (সুরা বাকারা ৪৩) 

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমাদের সমাজে অনেক মানুষই জাকাত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না। জাকাত এটি আরবি শব্দ, এর অর্থ পবিত্র হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়তের নির্দেশ মতে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে সেই সম্পদ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ মুসলমানদের দান করাকে জাকাত বলে।  

এ পরিভাষা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, জাকাত সবার ওপর ফরজ নয়। জাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। নিসাব বলতে বুঝায় ন্যূনতম ৭.৫ তোলা স্বর্ণ কিংবা ৫২.৫ তোলা রৌপ্য অথবা সমপরিমাণ অর্থ।  

যদি এ পরিমাণ সম্পদ কারও মালিকানায় পূর্ণ এক বছর থাকে তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ। জাকাত কাদের মাঝে বণ্টন করা হবে কিংবা কত শ্রেণীর মানুষ এই সম্পদের হকদার হবে, তা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। 

জাকাত না আদায় করলে এর ভয়াবহ পরিণতি কী হতে পারে সে সম্পর্কে ও কোরআন হাদিসে অনেক আলোচনা রয়েছে। এতবার আল্লাহর আদেশ এবং রাসূলের (সা.) এর বাণী সত্যিই কি আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে? 

আসলেই কি আমরা মহান আল্লাহতায়ালার বাণী মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পেরেছি। যদি গ্রহণ করেই থাকি তবে কেন অধিকাংশ মানুষ জাকাত সম্পর্কে অজ্ঞ। ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন মতে, বিশ্বে ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। 

একই বছরে আরেকটি কলামের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ধনীদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি একই হারে হতদরিদ্র লোকদের সংখ্যা ও বাড়ছে। এক স্তরের মানুষ যেমন ক্রমান্বয়ে ধনী হচ্ছে তদ্রুপ আরেক স্তরের মানুষ ক্রমান্বয়ে গরিব হচ্ছে। এরকম বৈষম্যপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টির হওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ধনী কর্তৃক গরিবদের জাকাত না দেয়া। 

ইসলামের পঞ্চম খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের শাসনামলে মানুষ জাকাতের সম্পদ নিয়ে ঘুরত গরিবদের দেওয়ার জন্য, কিন্তু যাকাত দেওয়ার মতো কাউকে না পেয়ে অবশেষে বায়তুলমালে গিয়ে জমা দিতেন। 

আর এখন আমরা জাকাত দিতে কার্পণ্য করে থাকি সম্পদ কমে যাওয়ার ভয়ে। অথচ জাকাত দিলে সম্পদ বাড়ে তা আমাদের অনেকের অজানা। অনেকে জাকাত দেয় কিন্তু তা অপরিকল্পিতভাবে বণ্টন করে, ফলে জাকাতের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না।

জাকাতের উদ্দেশ্য হলো সমাজ থেকে দারিদ্র্যতা নির্মূল করা, এজন্য এমন মানুষকে জাকাত দেয়া যাতে সে আর কারো কাছে হাত পাততে না হয়। যদি প্রতি বছর এভাবে কিছু লোককে নির্দিষ্ট করে তাদের জাকাতের অর্থ দেয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে কয়েক বছরের মধ্যেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে আসবে। 

এজন্য আলেম সমাজকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ধনীদের কাছে জাকাতের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। 

লেখক: শিক্ষার্থী, মা'হাদুল ইকতিসাদ ওয়াল ফিকহীল ইসলামী,  ঢাকা
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন