হিজরি বর্ষ মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্য
jugantor
হিজরি বর্ষ মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্য

  এহসান বিন মুজাহির  

১০ আগস্ট ২০২১, ১৮:৩০:৫১  |  অনলাইন সংস্করণ

হিজরি বর্ষ মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্য

স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৩। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে আরবি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম শুরু হবে।

ইসলামে হিজরি সন ও তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ হিজরি সন এমন একটি সন, যার সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর তাহজিব-তামাদ্দুন ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত।

মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, শবেবরাত, শবেকদর, শবেমেরাজসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ হিজরি সনের অনুসারী।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হিজরি সনের পহেলা মাস মহররম একের পর এক আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয় ঠিক; কিন্তু হিজরি সনের শুভ আগমন উপলক্ষে হৈচৈ নেই, নেই কোনো প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার বিশেষ কোনো আয়োজন।

যেমনভাবে বিশেষ আয়োজন পরিলক্ষিত হয় ইংরেজি নববর্ষের আগমনে। বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উদযাপন করা হয়, তাতে মনে হয় হিজরি নববর্ষ যেন আমাদের কোনো প্রয়োজনই নেই!

অথচ হিজরি নববর্ষকে গুরুত্বসহকারে পালন করাই ছিল আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কাম্য। হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্মরণীয় ঘটনাকে উপলক্ষ করে।

রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথিদের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই আরবি মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস ধরে সাল গণনা শুরু হয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় রাসুলের (সা.) হিজরত থেকেই হিজরি সনের সূচনা।

খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকালে মদিনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন হলে অফিসিয়াল তথ্যাদির নথি ও দিনক্ষণের হিসাব রাখতে গিয়ে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা বিপাকে ও অসুবিধায় পড়েন। যেহেতু তখন ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ষপঞ্জি বা একক সন চালু ছিল না।

রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল কার্যাদি নির্বিঘ্নে ও যথানিয়মে সম্পন্ন করার প্রয়োজনে নতুন সন প্রবর্তন তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর ফারুকের (রা.) শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একদা হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) খলিফা উমরের (রা.) খেদমতে এ মর্মে পত্র লেখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে, তাতে দিন, মাস, সাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের, তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে।

হজরত আবু মুসা আশআরির চিঠি পেয়ে হজরত উমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করেন, এখন থেকে একটি ইসলামী তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলীসহ (রা.) শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে এ সভায় উমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের।

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত হিজরি সনের মাসগুলো মুসলমানদের জীবনধারার সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে মিশে আছে।

ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহপাক এরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসেবে মাস হলো ১২টি (মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ)।

যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানিত (সুরা তাওবাহ : ৩৬)। আর হারাম বা সম্মানিত চারটি মাস হলো- মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ (তাফসিরে বাগাভি, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৪৪)।

হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। মহররম একটি তাৎপর্যমণ্ডিত এবং বরকতময় মাস। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কোরআনে এ মাসটিকে 'শাহরুল্লাহ' তথা আল্লাহর মাস বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, 'চারটি মাস রয়েছে, যেগুলো সম্মানিত মাস। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মহররম।'

কোরআনে আরও এরশাদ হয়েছে, লোকেরা তোমাকে নতুন চাঁদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বলো, তা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক (সুরা বাকারা :১৮৯)। মুসলিম উম্মাহর কাছে হিজরি সনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে হিজরি সনের সম্পর্ক চাঁদের সঙ্গে থাকার কারণে এই সনের তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক। এই চাঁদের হিসাবে মুসলমানদের অনেক ইবাদত-বন্দেগি, আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। কাজেই হিজরি তারিখকে গুরুত্ব দেওয়া একান্ত জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক
ahsanbinmujahir@gmail.com

হিজরি বর্ষ মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্য

 এহসান বিন মুজাহির 
১০ আগস্ট ২০২১, ০৬:৩০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
হিজরি বর্ষ মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্য
ছবি: সংগৃহীত

স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৩। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে আরবি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম শুরু হবে। 

ইসলামে হিজরি সন ও তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ হিজরি সন এমন একটি সন, যার সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর তাহজিব-তামাদ্দুন ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত। 

মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, শবেবরাত, শবেকদর, শবেমেরাজসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ হিজরি সনের অনুসারী। 

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হিজরি সনের পহেলা মাস মহররম একের পর এক আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয় ঠিক; কিন্তু হিজরি সনের শুভ আগমন উপলক্ষে হৈচৈ নেই, নেই কোনো প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার বিশেষ কোনো আয়োজন। 

যেমনভাবে বিশেষ আয়োজন পরিলক্ষিত হয় ইংরেজি নববর্ষের আগমনে। বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উদযাপন করা হয়, তাতে মনে হয় হিজরি নববর্ষ যেন আমাদের কোনো প্রয়োজনই নেই! 

অথচ হিজরি নববর্ষকে গুরুত্বসহকারে পালন করাই ছিল আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কাম্য। হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্মরণীয় ঘটনাকে উপলক্ষ করে। 

রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথিদের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই আরবি মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস ধরে সাল গণনা শুরু হয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় রাসুলের (সা.) হিজরত থেকেই হিজরি সনের সূচনা।

খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকালে মদিনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন হলে অফিসিয়াল তথ্যাদির নথি ও দিনক্ষণের হিসাব রাখতে গিয়ে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা বিপাকে ও অসুবিধায় পড়েন। যেহেতু তখন ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ষপঞ্জি বা একক সন চালু ছিল না। 

রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল কার্যাদি নির্বিঘ্নে ও যথানিয়মে সম্পন্ন করার প্রয়োজনে নতুন সন প্রবর্তন তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর ফারুকের (রা.) শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

একদা হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) খলিফা উমরের (রা.) খেদমতে এ মর্মে পত্র লেখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে, তাতে দিন, মাস, সাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের, তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে। 

হজরত আবু মুসা আশআরির চিঠি পেয়ে হজরত উমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করেন, এখন থেকে একটি ইসলামী তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলীসহ (রা.) শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে এ সভায় উমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের। 

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত হিজরি সনের মাসগুলো মুসলমানদের জীবনধারার সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে মিশে আছে।

ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহপাক এরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসেবে মাস হলো ১২টি (মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ)। 

যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানিত (সুরা তাওবাহ : ৩৬)। আর হারাম বা সম্মানিত চারটি মাস হলো- মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ (তাফসিরে বাগাভি, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৪৪)।

হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। মহররম একটি তাৎপর্যমণ্ডিত এবং বরকতময় মাস। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কোরআনে এ মাসটিকে 'শাহরুল্লাহ' তথা আল্লাহর মাস বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, 'চারটি মাস রয়েছে, যেগুলো সম্মানিত মাস। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মহররম।' 

কোরআনে আরও এরশাদ হয়েছে, লোকেরা তোমাকে নতুন চাঁদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বলো, তা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক (সুরা বাকারা :১৮৯)। মুসলিম উম্মাহর কাছে হিজরি সনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে হিজরি সনের সম্পর্ক চাঁদের সঙ্গে থাকার কারণে এই সনের তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক। এই চাঁদের হিসাবে মুসলমানদের অনেক ইবাদত-বন্দেগি, আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। কাজেই হিজরি তারিখকে গুরুত্ব দেওয়া একান্ত জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক
ahsanbinmujahir@gmail.com
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন