পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ: একটি শরীয়াহ পর্যালোচনা
jugantor
পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ: একটি শরীয়াহ পর্যালোচনা

  মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী  

০৩ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৫১:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ: একটি শরীয়াহ পর্যালোচনা

সুন্দর, শালীন, মার্জিত এবং ইসলামি চিন্তা-দর্শন ও জীবন-বিধান সমর্থিত কাব্যচর্চার সীমিত পরিসরে অনুমতি থাকলেও সামগ্রিক বিবেচনায়শরীয়তে কাব্যচর্চার প্রতি খুব উৎসাহিত করা হয়নি।

কুরআনের অপার্থিব ছন্দময়তার কারণে কুরআনুল কারীমকে কাব্যগ্রন্থ আর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবি মনে করতে লাগলে আল্লাহতায়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘আর এটা কবির কাব্যসমগ্র নয়’। (সুরা আল হাক্কাহ)।

তিনি আরো বলেন, আর আমি নবীকে কাব্যরচনা শেখাইনি, আর তা তার জন্য শোভনীয়ও নয়; বরং এ হচ্ছে উপদেশ বানী এবং সুস্পষ্ট পঠিতব্য গ্রন্থ আল কুরআন (সুরা ইয়াসিন: ৬৭)।

এজন্যই হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারাণত কাব্য রচনা বা আবৃত্তি করতেন না।

তিরমিযি, নাসাঈ ও আবুদাউদ শরিফের সূত্রে ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন, ‘হজরত আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞাসা করা হল, রাসুলুল্লাহ (সা.) কি কখনো কবিতা রচনা করতেন?

তিনি জবাব দিলেন, কবিতা রচনা করা তার নিকট সর্বাপেক্ষা অপছন্দনীয় ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সময় তিনি বনি কায়েস গোত্রের জনৈক ব্যক্তির কবিতা আবৃত্তি করতেন। তবে তাতে তিনি উলটপালট করে ফেলতেন এবং হজরত আবু বকর (রা.) তা সংশোধন করে দিতেন যে, এটা এমন নয়; বরং এমন। তখন রাসুল (সা.) বলতেন, আল্লাহর কসম আমি কবি নই এবং কবিতা রচনা আমার জন্য শোভনীয় নয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসীর:২৯৯/৩, তাওকীফিয়্যাহ,কায়রো,মিসর)

কাব্যচর্চা সম্পর্কে একদা তিনি বলেন, ‘কবিতা দ্বারা তোমাদের কারো পেট ভর্তি হওয়ার পরিবর্তে পুঁজ দ্বারা ভর্তি হওয়া উত্তম’ (মুসলিম: ২২৫৭)।

তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি এশার নামাজের পরে কবিতা রচনা বা আবৃত্তি করবে তার সেই রাত্রের নামাজ আল্লাহতায়ালার দরবারে কবুল হবে না’ (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল)।

পবিত্র কুরআন কোনো কাব্যগ্রন্থ নয়; বরং তা হচ্ছে হিদায়াতের বানী সম্বলিত ঐশীগ্রন্থ। আর কবিরা তো কখনো কখনো তার পদ্য ও পঙতির ছন্দ রক্ষায় উপযুক্ত শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে নিয়ন্ত্রনহীনতা ও উদ্ভ্রান্তির শিকার হয়ে যায়।

পক্ষান্তরে কুরআনে কারিম হিদায়েতের কিতাব হিসেবে এর প্রতিটি শব্দ ও অর্থ উভয়টাই সীমাহীন তাৎপর্যপূর্ণ।

ইমাম কুরতুবী (রহ.) সুরায়ে ইয়াসিনের উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, ‘কাব্যচর্চা শানে নবুয়াতের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় নবীজি (সা.) কখনোই কাবিতা আবৃত্তি বা কাব্যচর্চা করতেন না, প্রাচীন কোন পদ্যের উপমা পেশ করতে হলে ছন্দ ভেঙ্গে মূল বক্তব্য টুকু কেবল তিনি উপস্থাপন করতেন।’(তাফসিরে কুরতুবী)।

কাব্যচর্চাকারীগণ স্বভাবজাত আবেগপ্রবন হওয়ায় এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের বাহ্যিকতায় খুববেশি প্রভাবগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অনুসরন একজন পরকাল বিশ্বাসী মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর উদ্ভ্রান্তরাই কেবল কবিদের অনুগামি হয়।’ (সুরা শু’আরা)

তবে ইসলামি চিন্তা-দর্শন ও আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবনাচারের প্রতি পূর্ণ সঙ্গতি রেখে কাব্যচর্চা করলে সে বিষয়টি ভিন্ন।

আল্লাহতায়ালা পরের আয়াতে বলেন, ‘তবে যারা ঈমান আনয়ন করে সৎকর্ম সম্পাদন করেছে এবং আল্লাহর স্মরনে খুববেশি বিভোর তাদের বিষয়টি ভিন্ন।’ (সুরা শু'আরা)।

হুজুরে পাক (সা.) বলেন, নিশ্চয় কিছু বক্তব্য যাদুময় আর কিছু কবিতা প্রজ্ঞাময়।’ (আল আদাবুল মুফরাদ: ৬৬৯)

এরই ধারাবাহিকতায় মক্কার কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধাচারণমূলক কবিতার সমুচিত ভাষায় জবাব দেওয়ার জন্য ক্ষেত্রবিশেষ বিশিষ্ট সাহাবী হজরত কা’ব ইবনে মালেক, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওআহা, হাসসান ইবনে সাবিতসহ কতিপয় সাহাবিকে রাসুল (সা.) কাব্যচর্চার অনুমতি দিয়েছেন; বরং উৎসাহিত করেছেন।

গযওয়ায়ে আহযাব এবং গযওয়ায়ে হুনাইনের যুদ্ধকালে হুজুরে পাক (সা.) কবিতাবৃত্তির বিচ্ছিন্ন ঘটনা কাব্যচর্চার উদ্দেশ্যে ছিলো না; বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখে উচ্চারিত হয়ে ছন্দময় বাক্য তৈরি হয়েছিলো।

তাফসিরে ইবনে কাসিরের তৃতীয় খণ্ডের ৩০০ পৃষ্ঠায় ইবনে কাসির লিখেছেন, ‘উপরোক্ত উভয়বিধ বক্তব্যের দ্বারা স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, ইসলামি চিন্তা-দর্শন, আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবণাচারের আবেদন অক্ষুণ্ণ রেখে কাব্য রচনা ও কবিতা আবৃতি করার অনুমতি থাকলেও বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশেষ কাম্য ও প্রশংসনীয় নয়।

এতো ছিলো সাধারণ কাব্যরচনা ও কবিতাবৃত্তির কথা। কিন্তু কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণই ভিন্ন। কুরআন ঐশী গ্রন্থ। এর ধারা-ব্যাঞ্জনা ও বর্ণনাশৈলীর অলঙ্করণ স্পর্শ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে।

আরবি ভাষার গভীর ব্যুৎপত্তিছাড়া যা সঠিকভাবে অনুধাবন করা অসম্ভব। তাই ইসলামি ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই ভিন্ন ভাষায় কুরআনে কারিমের অনুবাদ করা যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট মতভিন্নতা ছিলো।

তবে ভিন্ন ভাষাভাষীদের বোঝার স্বার্থে কালামে পাক থেকে যথাযথ যোগ্যতা সম্পন্ন মুফাসসির যে অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করেন, তা অনারবী ভাষায় ব্যাক্ত করা ও লেখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

এজন্য এটাকে ‘তরজমাতুল কুরআন’ না বলে মুহাক্কিক ও গবেষক আলেমগণ ‘তরজমাতু মাআনিল কুরআন’ বলাকেই সঙ্গত মনে করেন।

এখন সেই মর্মবাণীর কাব্যিক রূপ প্রদানের ক্ষেত্রে অন্তমিল, ছন্দ ইত্যাদির প্রয়োজনে সঠিক মর্মের প্রকাশ ব্যাহত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। অথবা প্রকাশ সঠিক হলেও শ্রোতা বা পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারে-এই আশংকার প্রতি লক্ষ্য করে ফুকাহায়ে কেরাম কুরআনের কাব্যানুবাদের প্রতি কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।

ফিকহে হানাফির প্রসিদ্ধ আকর গ্রন্থ মাজমাউল আনহুরে আছে-‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কালামকে তার নিজের কথায় ঠাট্টার ছলে ব্যবহার করে, তাকে কাফের সাব্যস্ত করা হবে। অনুরূপ যে ব্যাক্তি ফার্সি ভাষায় কুরআনের কাব্যানুবাদ করে, তাকেও।’ (মাজমাউল আনহুর: ৬৯৩/১)

বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থ আলমগীরীতে এসেছে-‘যে ব্যক্তি ফার্সি ভাষায় কুরআনের কাব্যিক অনুবাদ করেছে, তাকে হত্যা করা হবে। কেননা সে কাফের।’ (ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ২৬৭/২)। একটু চিন্তা করে দেখুন-কত ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

এজন্য হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর কাছে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে, তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেন।

ইমদাদুল ফাতোয়ার উদ্ধৃতিটি দেখুন- সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, কুরআন শরিফের উর্দুতে কাব্যানুবাদ করার বিধান কী?

উত্তর দেওয়া হয়েছে-‘সম্পূর্ণ না জায়েজ, বরং ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে-যদি কোন ব্যক্তি ফার্সিতে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ করে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, সে কাফের। বলাবাহুল্য ফার্সি কাব্যানুবাদ আর উর্দু কাব্যানুবাদ-এর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

বাহ্যত কুফরির কারণ হচ্ছে-কুরআনের কাব্যানুবাদ করলে কুরআনে কারিমের অবমাননা হয়। সুতরাং যদি কারো কুরআন অবমাননার ইচ্ছা না থাকে তাহলে তাকে কাফের আখ্যায়িত করা হবে না। তবে কুরআনের কাব্যানুবাদ করতে তাকে বাধা দেওয়া হবে। বাধা দেওয়া সত্ত্বেও যদি সে বিরত না থাকে তাহলে সে ফাসেক এবং মারাত্মক গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের কাব্যানুবাদ করা এবং প্রকাশ ও প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষেধ।

সম্প্রতি বিশ্ব বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের জামিয়া ফারুকিয়া বিন্নোরী টাউন করাচির দারুল ইফতা থেকে প্রকাশিত একটি ফতোয়াতে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের প্রতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

ফতোয়াটি তুলে ধরা হলো-একজন প্রশ্ন করেছেন, কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের কী বিধান? এটা কি জায়েজ? অনুগ্রহপূর্বক দলিলসহ বিস্তারিত জানাবেন।

জামিয়া ফারুকিয়া বিন্নোরী টাউন করাচি-এর পক্ষ থেকে উত্তর দেওয়া হয়েছে-কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ করা জায়েজ নেই। এর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি। এতে বহুবিধ সমস্যা ও অসুবিধা রয়েছে, যা হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী (রহ.) সবিস্তার আলোচনা করেছেন। বিস্তারিত জানতে দারুল উলূম করাচী থেকে প্রকাশিত ইমদাদুল ফাতাওয়ার চতুর্থ খণ্ডের ৫১ পৃষ্ঠা দেখুন।

একটি সংশয় নিরসন

সম্প্রতি দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত একটি ফতোয়াতে শর্তসাপেক্ষে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ জায়েজ হওয়ার যে প্রচারনা চালানো হচ্ছে- এব্যাপারে সঠিক কথা হচ্ছে-আলোচ্য ফতোয়াটিতে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের ব্যাপক অনুমতি দেওয়া হয়নি; বরং শর্তসাপেক্ষে জায়েজ আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে, সকল শর্তের ভিত্তিতে জায়েজ বলা হয়েছে সেগুলো খুব সহজলভ্য নয়।

সুতরাং আরবি প্রবাদ ‘ইজা ফাতাশ শারতু ফাতাল মাশরুত’-এর ভিত্তিতে এটা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করার কোন সুযোগ নেই।

এছাড়া হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর ফতোয়ার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় উভয় ফতোয়া ‘রাজেহ-মারজুহ’-এর মূলনীতি অনুযায়ী হাকীমুল উম্মতের ফতোয়াটি অগ্রগণ্য ও কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।

কুরআনের কাব্যানুবাদে তাহরীফে কুরআন বা কুরআন বিকৃত হওয়ার শুধু সম্ভাবনাই নেই; বরং অনেকটা অবশ্যম্ভাবী। তাই যেকোন ভাষায় কুরআনের কাব্যানুবাদকে শরীয়ত অনুমোদন বা উৎসাহিত করে না। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কুরআনের কাব্যানুদের তেমন চর্চা পরিলক্ষিত হয় না।

তাই এধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঈমানী দায়িত্ব। কারণ একবার এটির চর্চা শুরু হলে এ ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে।

লেখক: মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী, প্রধান মুফতি ও প্রিন্সিপাল, মারকাযুদ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ, মিরপুর, ঢাকা। মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামি’আ ইসলামিয়া লালমাটিয়া, মোহাম্মাদপুর ঢাকা।

পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ: একটি শরীয়াহ পর্যালোচনা

 মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী 
০৩ নভেম্বর ২০২১, ০১:৫১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ: একটি শরীয়াহ পর্যালোচনা
ছবি: সংগৃহীত

সুন্দর, শালীন, মার্জিত এবং ইসলামি চিন্তা-দর্শন ও জীবন-বিধান সমর্থিত কাব্যচর্চার সীমিত পরিসরে অনুমতি থাকলেও সামগ্রিক বিবেচনায় শরীয়তে কাব্যচর্চার প্রতি খুব উৎসাহিত করা হয়নি। 

কুরআনের অপার্থিব ছন্দময়তার কারণে কুরআনুল কারীমকে কাব্যগ্রন্থ আর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবি মনে করতে লাগলে আল্লাহতায়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘আর এটা কবির কাব্যসমগ্র নয়’। (সুরা আল হাক্কাহ)।

তিনি আরো বলেন, আর আমি নবীকে কাব্যরচনা শেখাইনি, আর তা তার জন্য শোভনীয়ও নয়; বরং এ হচ্ছে উপদেশ বানী এবং সুস্পষ্ট পঠিতব্য গ্রন্থ আল কুরআন (সুরা ইয়াসিন: ৬৭)। 

এজন্যই হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারাণত কাব্য রচনা বা আবৃত্তি করতেন না।

তিরমিযি, নাসাঈ ও আবুদাউদ শরিফের সূত্রে ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন, ‘হজরত আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞাসা করা হল, রাসুলুল্লাহ (সা.) কি কখনো কবিতা রচনা করতেন? 

তিনি জবাব দিলেন, কবিতা রচনা করা তার নিকট সর্বাপেক্ষা অপছন্দনীয় ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সময় তিনি বনি কায়েস গোত্রের জনৈক ব্যক্তির কবিতা আবৃত্তি করতেন। তবে তাতে তিনি উলটপালট করে ফেলতেন এবং হজরত আবু বকর (রা.) তা সংশোধন করে দিতেন যে, এটা এমন নয়; বরং এমন। তখন রাসুল (সা.) বলতেন, আল্লাহর কসম আমি কবি নই এবং কবিতা রচনা আমার জন্য শোভনীয় নয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসীর:২৯৯/৩, তাওকীফিয়্যাহ,কায়রো,মিসর)

কাব্যচর্চা সম্পর্কে একদা তিনি বলেন, ‘কবিতা দ্বারা তোমাদের কারো পেট ভর্তি হওয়ার পরিবর্তে পুঁজ দ্বারা ভর্তি হওয়া উত্তম’ (মুসলিম: ২২৫৭)। 

তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি এশার নামাজের পরে কবিতা রচনা বা আবৃত্তি করবে তার সেই রাত্রের নামাজ আল্লাহতায়ালার দরবারে কবুল হবে না’ (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল)।

পবিত্র কুরআন কোনো কাব্যগ্রন্থ নয়; বরং তা হচ্ছে হিদায়াতের বানী সম্বলিত ঐশীগ্রন্থ। আর কবিরা তো কখনো কখনো তার পদ্য ও পঙতির ছন্দ রক্ষায় উপযুক্ত শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে নিয়ন্ত্রনহীনতা ও উদ্ভ্রান্তির শিকার হয়ে যায়। 

পক্ষান্তরে কুরআনে কারিম হিদায়েতের কিতাব হিসেবে এর প্রতিটি শব্দ ও অর্থ উভয়টাই সীমাহীন তাৎপর্যপূর্ণ। 

ইমাম কুরতুবী (রহ.) সুরায়ে ইয়াসিনের উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, ‘কাব্যচর্চা শানে নবুয়াতের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় নবীজি (সা.) কখনোই কাবিতা আবৃত্তি বা কাব্যচর্চা করতেন না, প্রাচীন কোন পদ্যের উপমা পেশ করতে হলে ছন্দ ভেঙ্গে মূল বক্তব্য টুকু কেবল তিনি উপস্থাপন করতেন।’(তাফসিরে কুরতুবী)।

কাব্যচর্চাকারীগণ স্বভাবজাত আবেগপ্রবন হওয়ায় এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের বাহ্যিকতায় খুববেশি প্রভাবগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অনুসরন একজন পরকাল বিশ্বাসী মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। 

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর উদ্ভ্রান্তরাই কেবল কবিদের অনুগামি হয়।’ (সুরা শু’আরা)
 
তবে ইসলামি চিন্তা-দর্শন ও আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবনাচারের প্রতি পূর্ণ সঙ্গতি রেখে কাব্যচর্চা করলে সে বিষয়টি ভিন্ন। 

আল্লাহতায়ালা পরের আয়াতে বলেন, ‘তবে যারা ঈমান আনয়ন করে সৎকর্ম সম্পাদন করেছে এবং আল্লাহর স্মরনে খুববেশি বিভোর তাদের বিষয়টি ভিন্ন।’ (সুরা শু'আরা)।

হুজুরে পাক (সা.) বলেন, নিশ্চয় কিছু বক্তব্য যাদুময় আর কিছু কবিতা প্রজ্ঞাময়।’ (আল আদাবুল মুফরাদ: ৬৬৯) 

এরই ধারাবাহিকতায় মক্কার কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধাচারণমূলক কবিতার সমুচিত ভাষায় জবাব দেওয়ার জন্য ক্ষেত্রবিশেষ বিশিষ্ট সাহাবী হজরত কা’ব ইবনে মালেক, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওআহা, হাসসান ইবনে সাবিতসহ কতিপয় সাহাবিকে রাসুল (সা.) কাব্যচর্চার অনুমতি দিয়েছেন; বরং উৎসাহিত করেছেন। 

গযওয়ায়ে আহযাব এবং গযওয়ায়ে হুনাইনের যুদ্ধকালে হুজুরে পাক (সা.) কবিতাবৃত্তির বিচ্ছিন্ন ঘটনা কাব্যচর্চার উদ্দেশ্যে ছিলো না; বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখে উচ্চারিত হয়ে ছন্দময় বাক্য তৈরি হয়েছিলো। 

তাফসিরে ইবনে কাসিরের তৃতীয় খণ্ডের ৩০০ পৃষ্ঠায় ইবনে কাসির লিখেছেন, ‘উপরোক্ত উভয়বিধ বক্তব্যের দ্বারা স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, ইসলামি চিন্তা-দর্শন, আকিদা-বিশ্বাস এবং জীবণাচারের আবেদন অক্ষুণ্ণ রেখে কাব্য রচনা ও কবিতা আবৃতি করার অনুমতি থাকলেও বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশেষ কাম্য ও প্রশংসনীয় নয়।

এতো ছিলো সাধারণ কাব্যরচনা ও কবিতাবৃত্তির কথা। কিন্তু কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণই ভিন্ন। কুরআন ঐশী গ্রন্থ। এর ধারা-ব্যাঞ্জনা ও বর্ণনাশৈলীর অলঙ্করণ স্পর্শ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। 

আরবি ভাষার গভীর ব্যুৎপত্তি ছাড়া যা সঠিকভাবে অনুধাবন করা অসম্ভব। তাই ইসলামি ইতিহাসের সূচনাকাল থেকেই ভিন্ন ভাষায় কুরআনে কারিমের অনুবাদ করা যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট মতভিন্নতা ছিলো।

তবে ভিন্ন ভাষাভাষীদের বোঝার স্বার্থে কালামে পাক থেকে যথাযথ যোগ্যতা সম্পন্ন মুফাসসির যে অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করেন, তা অনারবী ভাষায় ব্যাক্ত করা ও লেখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। 

এজন্য এটাকে ‘তরজমাতুল কুরআন’ না বলে মুহাক্কিক ও গবেষক আলেমগণ ‘তরজমাতু মাআনিল কুরআন’ বলাকেই সঙ্গত মনে করেন। 

এখন সেই মর্মবাণীর কাব্যিক রূপ প্রদানের ক্ষেত্রে অন্তমিল, ছন্দ ইত্যাদির প্রয়োজনে সঠিক মর্মের প্রকাশ ব্যাহত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। অথবা প্রকাশ সঠিক হলেও শ্রোতা বা পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারে-এই আশংকার প্রতি লক্ষ্য করে ফুকাহায়ে কেরাম কুরআনের কাব্যানুবাদের প্রতি কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।

ফিকহে হানাফির প্রসিদ্ধ আকর গ্রন্থ মাজমাউল আনহুরে আছে-‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কালামকে তার নিজের কথায় ঠাট্টার ছলে ব্যবহার করে, তাকে কাফের সাব্যস্ত করা হবে। অনুরূপ যে ব্যাক্তি ফার্সি ভাষায় কুরআনের কাব্যানুবাদ করে, তাকেও।’ (মাজমাউল আনহুর: ৬৯৩/১) 

বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থ আলমগীরীতে এসেছে-‘যে ব্যক্তি ফার্সি ভাষায় কুরআনের কাব্যিক অনুবাদ করেছে, তাকে হত্যা করা হবে। কেননা সে কাফের।’ (ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ২৬৭/২)। একটু চিন্তা করে দেখুন-কত ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

এজন্য হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর কাছে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে, তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেন। 

ইমদাদুল ফাতোয়ার উদ্ধৃতিটি দেখুন- সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, কুরআন শরিফের উর্দুতে কাব্যানুবাদ করার বিধান কী? 

উত্তর দেওয়া হয়েছে-‘সম্পূর্ণ না জায়েজ, বরং ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে-যদি কোন ব্যক্তি ফার্সিতে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ করে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ, সে কাফের। বলাবাহুল্য ফার্সি কাব্যানুবাদ আর উর্দু কাব্যানুবাদ-এর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

বাহ্যত কুফরির কারণ হচ্ছে-কুরআনের কাব্যানুবাদ করলে কুরআনে কারিমের অবমাননা হয়। সুতরাং যদি কারো কুরআন অবমাননার ইচ্ছা না থাকে তাহলে তাকে কাফের আখ্যায়িত করা হবে না। তবে কুরআনের কাব্যানুবাদ করতে তাকে বাধা দেওয়া হবে। বাধা দেওয়া সত্ত্বেও যদি সে বিরত না থাকে তাহলে সে ফাসেক এবং মারাত্মক গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের কাব্যানুবাদ করা এবং প্রকাশ ও প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষেধ।

সম্প্রতি বিশ্ব বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের জামিয়া ফারুকিয়া বিন্নোরী টাউন করাচির দারুল ইফতা থেকে প্রকাশিত একটি ফতোয়াতে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের প্রতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। 

ফতোয়াটি তুলে ধরা হলো-একজন প্রশ্ন করেছেন, কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের কী বিধান? এটা কি জায়েজ? অনুগ্রহপূর্বক দলিলসহ বিস্তারিত জানাবেন।

জামিয়া ফারুকিয়া বিন্নোরী টাউন করাচি-এর পক্ষ থেকে উত্তর দেওয়া হয়েছে-কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ করা জায়েজ নেই। এর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি। এতে বহুবিধ সমস্যা ও অসুবিধা রয়েছে, যা হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী (রহ.) সবিস্তার আলোচনা করেছেন। বিস্তারিত জানতে দারুল উলূম করাচী থেকে প্রকাশিত ইমদাদুল ফাতাওয়ার চতুর্থ খণ্ডের ৫১ পৃষ্ঠা দেখুন।

একটি সংশয় নিরসন

সম্প্রতি দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত একটি ফতোয়াতে শর্তসাপেক্ষে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদ জায়েজ হওয়ার যে প্রচারনা চালানো হচ্ছে- এব্যাপারে সঠিক কথা হচ্ছে-আলোচ্য ফতোয়াটিতে কুরআনে কারিমের কাব্যানুবাদের ব্যাপক অনুমতি দেওয়া হয়নি; বরং শর্তসাপেক্ষে জায়েজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। 

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে, সকল শর্তের ভিত্তিতে জায়েজ বলা হয়েছে সেগুলো খুব সহজলভ্য নয়।

সুতরাং আরবি প্রবাদ ‘ইজা ফাতাশ শারতু ফাতাল মাশরুত’-এর ভিত্তিতে এটা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করার কোন সুযোগ নেই।
 
এছাড়া হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হজরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর ফতোয়ার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় উভয় ফতোয়া ‘রাজেহ-মারজুহ’-এর মূলনীতি অনুযায়ী হাকীমুল উম্মতের ফতোয়াটি অগ্রগণ্য ও কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।

কুরআনের কাব্যানুবাদে তাহরীফে কুরআন বা কুরআন বিকৃত হওয়ার শুধু সম্ভাবনাই নেই; বরং অনেকটা অবশ্যম্ভাবী। তাই যেকোন ভাষায় কুরআনের কাব্যানুবাদকে শরীয়ত অনুমোদন বা উৎসাহিত করে না। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কুরআনের কাব্যানুদের তেমন চর্চা পরিলক্ষিত হয় না।  

তাই এধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঈমানী দায়িত্ব। কারণ একবার এটির চর্চা শুরু হলে এ ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে। 

লেখক: মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী, প্রধান মুফতি ও প্রিন্সিপাল, মারকাযুদ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ, মিরপুর, ঢাকা। মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামি’আ ইসলামিয়া লালমাটিয়া, মোহাম্মাদপুর ঢাকা।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন