মতপ্রকাশে স্বাধীনতা, ইসলাম যা বলে
jugantor
মতপ্রকাশে স্বাধীনতা, ইসলাম যা বলে

  মূল: মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান, তর্জমা: মওলবি আশরাফ  

০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৩৩:০৩  |  অনলাইন সংস্করণ

মতপ্রকাশে স্বাধীনতা, ইসলাম যা বলে

আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। আদম ছিলেন প্রথম মানব। আল্লাহ যখন মানুষকে এই পৃথিবীর খলিফা বানানোর ঘোষণা করলেন, (খলিফা মানে এই জগতের উত্তরাধিকারী বা প্রতিনিধি, সে হবে স্বাধীন, সে তার নিজের কর্মের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে) ফেরেশতারা তখন এতে আপত্তি জানালো এবং সন্দেহ প্রকাশ করল।

তারা বলল— أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে বসবাস করাতে চান যারা ওখানে বিশৃংখলা করবে আর রক্তপাত ঘটাবে? (সুরা বাকারা, আয়াত ৩০)।

ফেরেশতারা তাদের ভিন্নমত প্রকাশ করল। ভিন্নমত প্রকাশের এটাই প্রথম ঘটনা। তাদের এই মত আল্লাহর পরিকল্পনা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন ছিল। আল্লাহ একথা বলেন নাই যে আমার কাজে তোমরা প্রশ্ন করার কে? আল্লাহ চাইলে তাদের ধ্বংস করে দিতে পারতেন।

আল্লাহর ক্ষমতা তো এমন كُنْ فَيَكُونُ হয়ে যাও— তখনই তা হয়ে যায় (সুরা বাকারা, আয়াত ১১৭)। তিনি যদি বলতেন— ওরে ফেরেশতার দল, সব ধ্বংস হয়ে যা। এক নিমেষে সব ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কী করলেন?

তিনি মানুষ সৃষ্টির কারণ বর্ণনা করলেন। আদমকে তাদের সামনে উপস্থাপন করে তার বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা দেখিয়ে ফেরেশতাদের বোঝালেন। এর মানে কী বোঝায়? মানুষ সৃষ্টির সময়ই আল্লাহ এই উদহারণ পেশ করেন যে মানুষের মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

তাদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার থাকবে। যদি একজন ব্যক্তি অন্যের সাথে একমত না হয় তবে তাকে হত্যা করতে পারবেন না, যে প্রশ্ন করবে তাকে কারণ দর্শাবেন, তাকে মনঃপুত জওয়াব দিয়ে শান্ত করবেন, কিন্তু এরচেয়ে বেশি কিছু করতে পারবেন না।

তারপর আমাদের নবীর জীবন খেয়াল করে দেখুন৷ হজরত মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা শহরে জন্মলাভ করেছিলেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করেন। তো মক্কার সাধারণ মানুষ তাঁর সাথে কেমন আচরণ করেছিল?

তাকে (নাউজু বিল্লাহ) গালমন্দ করা হয়েছিল, পাগল বলেছিল, জাদুকর আখ্যা দিয়েছিল। লোকজন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষের ওপর পাথর নিক্ষেপের মতো ধৃষ্টতা পর্যন্ত দেখিয়েছিল, এমনকি তাঁকে পিতৃভূমি থেকে বের হতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাকে বয়কট করে চাচা আবু তালেবের আঙ্গিনায় বন্দি করে রেখেছিল, যেখানে খাবার ও পানির বন্দোবস্ত পর্যন্ত ছিল না।

অথচ আল্লাহ তাআলা ওইসব লোকদের বাধা দেননি, যা ইচ্ছে তা-ই করতে দিয়েছিলেন। যদি এইসব ব্যাপার আল্লাহর অনিচ্ছায় ঘটতো, তাহলে আল্লাহ ওইখানেই সবাইকে ধ্বংস করে দিতেন, সবার জবান বন্ধ করে দিতেন, হাত-পা ভেঙে দিতেন।

অথচ, আল্লাহর রাসুলের নবুয়তপ্রাপ্তির প্রথম ১৩ বছর সবধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই ঘটেছে— বদনাম করা হয়েছে, পাথর ছোঁড়া হয়েছে, তার দাঁত আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তাকে হরেক কিসিমের মন্দ নাম দেওয়া হয়েছে। তো, রাসুলকে অসম্মান করা যদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতো তাহলে আল্লাহ তাআলা ওইসময়ই সমস্ত মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন, অথবা রসুলের সঙ্গী-সাথীদের হুকুম দিতেন যে এক্ষুণি তলোয়ার নিয়ে এদের ধড় থেকে মস্তক আলাদা করে দাও। অথচ এমন কিছু ঘটেনি।

কেন? কারণ আল্লাহ তায়ালার এক-একজন করে পরীক্ষা নেবার ছিল, এই পরীক্ষা নেওয়া বাকি ছিল যে কোন লোকটি আল্লাহর রসুলের জবানে কুরআন শুনে সত্যানুসন্ধানী হয়, আর কোন লোকটি হয় না। কে এমন আছে যে আল্লাহর রসুলের সর্বোত্তম চারিত্রিক গুণাবলি দেখে তাঁর প্রতি ঈমান আনে, আর কে আনে না।

কে এমন আছে যে আল্লাহর রসুলের পাক জবানে আল্লাহর একত্বের দলিল শুনে তা গ্রহণ করে নেয়, আর কে নেয় না। এটা তো পরীক্ষা ছিল, পরীক্ষা। তো, ওইখানে যদি সবাইকে ধ্বংস করে দিতেন তাহলে পরীক্ষা নিতেন কেমনে?

কোনো লোক যদি আল্লাহর রাসুলকে জেনে-বুঝে তার প্রতি ঈমান আনেন, তাহলে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আর কেউ যদি আল্লাহর রসুলকে অস্বীকার করে, তাকে (নাউজু বিল্লাহ) মন্দ বলে, তাহলে সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলো।

আর আল্লাহ তাআলার দেখার ছিল কে পরীক্ষায় পাশ করে আর কে ফেইল করে। যেন আখেরাতে হতে যাওয়া বিচারে فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ (এক দল জান্নাতে যাবে, আরেকদল যাবে জাহান্নামে) এই ফয়সালা সম্ভব হয়। (সুরা শুরা, আয়াত ৭)

কুরআনে আছে, لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنْ بَيِّنَةٍ وَيَحْيَى مَنْ حَيَّ عَنْ بَيِّنَةٍ (এভাবে যাকে ধ্বংস হতে হবে সে প্রমাণ সহকারে ধ্বংস হবে, আর যার বেঁচে থাকতে হবে তার প্রমাণ সহকারে বাঁচতে হবে।)

এ এক আশ্চর্য আয়াত। (সুরা আনফাল, আয়াত ৪২) যাকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন, ধ্বংস করার অর্থ যাকে জাহান্নামের উপযোগী ঘোষণা দিবেন, সে ইতোমধ্যে প্রমাণ সহকারে নিজেকে জাহান্নামি সবুত করেছে।

এই দুনিয়ায় সে সত্যকে অস্বীকার করে, মন্দকাজ করে, ভ্রান্তপথ অবলম্বন করে একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে সে যেকোনো উপায়েই জাহান্নামে যাওয়ার উপযোগী।

একই ভাবে অপরদল— যারা জান্নাতে যাবেন তারা জীবনযাপনে একথা প্রমাণ করেছেন যে তারা জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এ তো সর্বজ্ঞানী আল্লাহর পরিকল্পনা, মুসলমানেরা মনে কষ্ট পাবে কি পাবে না সেটা ধর্তব্য নয়, সেটা আল্লাহর উদ্বেগের বিষয় নয়।

তো মনে রাখবেন, ইসলামে মতপ্রকাশ ও ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, সম্পূর্ণ অধিকার আছে মানুষের। এই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আপনার যদি ভিন্নমত থাকে, তো আপনি দলিল দিন, আপনি কারণ দর্শান, যুক্তি পেশ করেন।

প্রশ্ন উঠে কেন এই অধিকার দেওয়া হলো? এটা কিন্তু যেন-তেন বিষয় নয়। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এই জন্য যে— সকলেই জানে যে এটা এক পরীক্ষা, যাতে তাদের পরীক্ষা করা যায়… لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا (সূরা মুলক, আয়াত ২)।

কুরআনে বারবার বলা হয়েছে মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো তাকে পরীক্ষা করা। এই জগত আমাদের জন্য পরীক্ষাকেন্দ্র। আপনারা ভালো করেই জানেন পরীক্ষার জন্য স্বাধীনতা আবশ্যক। স্বাধীনতা নেই তো পরীক্ষাও নেই।

আল্লাহর যে সৃষ্টি পরিকল্পনা, সেখানে আবশ্যিকভাবে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার বিষয়টি আছে। স্বাধীনতা যদি ছিনিয়েই নেওয়া হয়, তাহলে পরীক্ষা কিসের? কারো হাত বেঁধে, পা বেঁধে, জবান বন্ধ করে, চিন্তার গতি রুদ্ধ করে তারপর যদি পরীক্ষা নেওয়া হয়, এমন পরীক্ষা নেওয়ার কোনো মানে হয় না।

তো এই জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা, মনোভাব ব্যক্ত করার স্বাধীনতা— প্রশ্নাতীতভাবে নিঃসন্দেহে এসব ইসলাম সম্মত।

প্রত্যেক নারী এবং পুরুষের এই স্বাধীনতা আছে। এর মধ্যে কেবল একটি শর্ত প্রযোজ্য— মতপ্রকাশ বা ভিন্নমত প্রকাশ করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করতে পারবেন না।

মতপ্রকাশে স্বাধীনতা, ইসলাম যা বলে

 মূল: মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান, তর্জমা: মওলবি আশরাফ 
০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
মতপ্রকাশে স্বাধীনতা, ইসলাম যা বলে
প্রতীকি ছবি

আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। আদম ছিলেন প্রথম মানব। আল্লাহ যখন মানুষকে এই পৃথিবীর খলিফা বানানোর ঘোষণা করলেন, (খলিফা মানে এই জগতের উত্তরাধিকারী বা প্রতিনিধি, সে হবে স্বাধীন, সে তার নিজের কর্মের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে) ফেরেশতারা তখন এতে আপত্তি জানালো এবং সন্দেহ প্রকাশ করল। 

তারা বলল— أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে বসবাস করাতে চান যারা ওখানে বিশৃংখলা করবে আর রক্তপাত ঘটাবে? (সুরা বাকারা, আয়াত ৩০)। 

ফেরেশতারা তাদের ভিন্নমত প্রকাশ করল। ভিন্নমত প্রকাশের এটাই প্রথম ঘটনা। তাদের এই মত আল্লাহর পরিকল্পনা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন ছিল। আল্লাহ একথা বলেন নাই যে আমার কাজে তোমরা প্রশ্ন করার কে? আল্লাহ চাইলে তাদের ধ্বংস করে দিতে পারতেন। 

আল্লাহর ক্ষমতা তো এমন كُنْ فَيَكُونُ হয়ে যাও— তখনই তা হয়ে যায় (সুরা বাকারা, আয়াত ১১৭)। তিনি যদি বলতেন— ওরে ফেরেশতার দল, সব ধ্বংস হয়ে যা। এক নিমেষে সব ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কী করলেন? 

তিনি মানুষ সৃষ্টির কারণ বর্ণনা করলেন। আদমকে তাদের সামনে উপস্থাপন করে তার বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা দেখিয়ে ফেরেশতাদের বোঝালেন। এর মানে কী বোঝায়? মানুষ সৃষ্টির সময়ই আল্লাহ এই উদহারণ পেশ করেন যে মানুষের মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। 

তাদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার থাকবে। যদি একজন ব্যক্তি অন্যের সাথে একমত না হয় তবে তাকে হত্যা করতে পারবেন না, যে প্রশ্ন করবে তাকে কারণ দর্শাবেন, তাকে মনঃপুত জওয়াব দিয়ে শান্ত করবেন, কিন্তু এরচেয়ে বেশি কিছু করতে পারবেন না।

তারপর আমাদের নবীর জীবন খেয়াল করে দেখুন৷ হজরত মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা শহরে জন্মলাভ করেছিলেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করেন। তো মক্কার সাধারণ মানুষ তাঁর সাথে কেমন আচরণ করেছিল? 

তাকে (নাউজু বিল্লাহ) গালমন্দ করা হয়েছিল, পাগল বলেছিল, জাদুকর আখ্যা দিয়েছিল। লোকজন  আল্লাহর প্রেরিত পুরুষের ওপর পাথর নিক্ষেপের মতো ধৃষ্টতা পর্যন্ত দেখিয়েছিল, এমনকি তাঁকে পিতৃভূমি থেকে বের হতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাকে বয়কট করে চাচা আবু তালেবের আঙ্গিনায় বন্দি করে রেখেছিল, যেখানে খাবার ও পানির বন্দোবস্ত পর্যন্ত ছিল না। 

অথচ আল্লাহ তাআলা ওইসব লোকদের বাধা দেননি, যা ইচ্ছে তা-ই করতে দিয়েছিলেন। যদি এইসব ব্যাপার আল্লাহর অনিচ্ছায় ঘটতো, তাহলে আল্লাহ ওইখানেই সবাইকে ধ্বংস করে দিতেন, সবার জবান বন্ধ করে দিতেন, হাত-পা ভেঙে দিতেন। 

অথচ, আল্লাহর রাসুলের নবুয়তপ্রাপ্তির প্রথম ১৩ বছর সবধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই ঘটেছে— বদনাম করা হয়েছে, পাথর ছোঁড়া হয়েছে, তার দাঁত আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তাকে হরেক কিসিমের মন্দ নাম দেওয়া হয়েছে। তো, রাসুলকে অসম্মান করা যদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতো তাহলে আল্লাহ তাআলা ওইসময়ই সমস্ত মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন, অথবা রসুলের সঙ্গী-সাথীদের হুকুম দিতেন যে এক্ষুণি তলোয়ার নিয়ে এদের ধড় থেকে মস্তক আলাদা করে দাও। অথচ এমন কিছু ঘটেনি। 

কেন? কারণ আল্লাহ তায়ালার এক-একজন করে পরীক্ষা নেবার ছিল, এই পরীক্ষা নেওয়া বাকি ছিল যে কোন লোকটি আল্লাহর রসুলের জবানে কুরআন শুনে সত্যানুসন্ধানী হয়, আর কোন লোকটি হয় না। কে এমন আছে যে আল্লাহর রসুলের সর্বোত্তম চারিত্রিক গুণাবলি দেখে তাঁর প্রতি ঈমান আনে, আর কে আনে না। 

কে এমন আছে যে আল্লাহর রসুলের পাক জবানে আল্লাহর একত্বের দলিল শুনে তা গ্রহণ করে নেয়, আর কে নেয় না। এটা তো পরীক্ষা ছিল, পরীক্ষা। তো, ওইখানে যদি সবাইকে ধ্বংস করে দিতেন তাহলে পরীক্ষা নিতেন কেমনে? 

কোনো লোক যদি আল্লাহর রাসুলকে জেনে-বুঝে তার প্রতি ঈমান আনেন, তাহলে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আর কেউ যদি আল্লাহর রসুলকে অস্বীকার করে, তাকে (নাউজু বিল্লাহ) মন্দ বলে, তাহলে সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলো। 

আর আল্লাহ তাআলার দেখার ছিল কে পরীক্ষায় পাশ করে আর কে ফেইল করে। যেন আখেরাতে হতে যাওয়া বিচারে فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ (এক দল জান্নাতে যাবে, আরেকদল যাবে জাহান্নামে) এই ফয়সালা সম্ভব হয়। (সুরা শুরা, আয়াত ৭) 

কুরআনে আছে, لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنْ بَيِّنَةٍ وَيَحْيَى مَنْ حَيَّ عَنْ بَيِّنَةٍ (এভাবে যাকে ধ্বংস হতে হবে সে প্রমাণ সহকারে ধ্বংস হবে, আর যার বেঁচে থাকতে হবে তার প্রমাণ সহকারে বাঁচতে হবে।) 

এ এক আশ্চর্য আয়াত। (সুরা আনফাল, আয়াত ৪২) যাকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন, ধ্বংস করার অর্থ যাকে জাহান্নামের উপযোগী ঘোষণা দিবেন, সে ইতোমধ্যে প্রমাণ সহকারে নিজেকে জাহান্নামি সবুত করেছে। 

এই দুনিয়ায় সে সত্যকে অস্বীকার করে, মন্দকাজ করে, ভ্রান্তপথ অবলম্বন করে একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে সে যেকোনো উপায়েই জাহান্নামে যাওয়ার উপযোগী। 

একই ভাবে অপরদল— যারা জান্নাতে যাবেন তারা জীবনযাপনে একথা প্রমাণ করেছেন যে তারা জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এ তো সর্বজ্ঞানী আল্লাহর পরিকল্পনা, মুসলমানেরা মনে কষ্ট পাবে কি পাবে না সেটা ধর্তব্য নয়, সেটা আল্লাহর উদ্বেগের বিষয় নয়।

তো মনে রাখবেন, ইসলামে মতপ্রকাশ ও ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, সম্পূর্ণ অধিকার আছে মানুষের। এই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আপনার যদি ভিন্নমত থাকে, তো আপনি দলিল দিন, আপনি কারণ দর্শান, যুক্তি পেশ করেন।

প্রশ্ন উঠে কেন এই অধিকার দেওয়া হলো? এটা কিন্তু যেন-তেন বিষয় নয়। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এই জন্য যে— সকলেই জানে যে এটা এক পরীক্ষা, যাতে তাদের পরীক্ষা করা যায়… لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا (সূরা মুলক, আয়াত ২)।

কুরআনে বারবার বলা হয়েছে মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো তাকে পরীক্ষা করা। এই জগত আমাদের জন্য পরীক্ষাকেন্দ্র। আপনারা ভালো করেই জানেন পরীক্ষার জন্য স্বাধীনতা আবশ্যক। স্বাধীনতা নেই তো পরীক্ষাও নেই।

আল্লাহর যে সৃষ্টি পরিকল্পনা, সেখানে আবশ্যিকভাবে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার বিষয়টি আছে। স্বাধীনতা যদি ছিনিয়েই নেওয়া হয়, তাহলে পরীক্ষা কিসের? কারো হাত বেঁধে, পা বেঁধে, জবান বন্ধ করে, চিন্তার গতি রুদ্ধ করে তারপর যদি পরীক্ষা নেওয়া হয়, এমন পরীক্ষা নেওয়ার কোনো মানে হয় না। 

তো এই জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা, মনোভাব ব্যক্ত করার স্বাধীনতা— প্রশ্নাতীতভাবে নিঃসন্দেহে এসব ইসলাম সম্মত। 

প্রত্যেক নারী এবং পুরুষের এই স্বাধীনতা আছে। এর মধ্যে কেবল একটি শর্ত প্রযোজ্য— মতপ্রকাশ বা ভিন্নমত প্রকাশ করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করতে পারবেন না।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন