বিশ্বাসের জাগরণ

 এহসানুল কবীর 
১৭ মার্চ ২০২৩, ০৪:১৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
পবিত্র কুরআন, যার অপর নাম ফুরআন বা আলো
পবিত্র কুরআন, যার অপর নাম ফুরআন বা আলো। ছবি: সংগৃহীত

মহান আল্লাহ্ তা’লা বলেন, ‘ওরা কি স্রষ্টা ব্যতীত সৃষ্টি হয়েছে নাকি ওরা নিজেরাই (নিজেদের) স্রষ্টা?’ (সুরা তুর ৫২:৩৫)। নাস্তিক্যবাদী বা সন্দেহবাদী মানুষের প্রতি মহান আল্লাহ্ তা’লার এই প্রশ্নে বহু মুসলিমের জন্য চিন্তার খোরাক রয়েছে।

একথা সবাই বুঝি, স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি অলীক কল্পনা মাত্র। যার অস্তিত্ব আছে তাকে কেউ না কেউ সৃষ্টি করেছে। আর নিজেকে নিজে সৃষ্টি করা যায় না। কারণ সৃষ্টির পূর্বে তো তার অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে সে কিভাবে নিজেকে অস্তিত্বে আনবে?

এই সমস্যা হতে মুক্তি লাভের জন্য বিবর্তনবাদের আশ্রয় নেয়া হল। এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তন হতে হতে বানরগুলি এক পর্যায়ে মানুষে পরিণত হলো। এ তত্ত্বেও একই সমস্যা। প্রথম এককোষী প্রাণীটা কোথা থেকে এল। আনা হল Big Bang theory. কিন্তু কেন এই বিস্ফোরণ, কে তা ঘটালো? 
এ প্রশ্ন ফের সৃষ্টিকর্তাকে সামনে নিয়ে আসে। তদুপরি বিবর্তনবাদ বা ডারডাইনবাদ কখনো প্রমাণ করা যায়নি। জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। এনার্জি কমিশনের শরীরতত্ত্ববিদ Dr. T.N. Tahmisian বলেন—

‘‘Scientists who go about teaching that evolution is a fact of life are great con-men, and the story they are telling may be the greatest hoax ever. In explaining evolution we do not have one iota of fact” [Lutheran witness Reporter November 1465]

অনুবাদ করলে এমন দাঁড়ায়— ‘বিবর্তনবাদ জীবনের চূড়ান্ত সত্য একথা যেসব বিজ্ঞানী শিক্ষা দিয়ে বেড়ান তারা মহাপ্রতারক। আর তারা যে গল্পখানি বলছে, তাকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ধাপ্পাবাজী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বস্তত: বিবর্তনবাদের ব্যাখ্যায় আমাদের কাছে অনু পরিমাণও সত্যতা নেই।‘ (সূত্র: বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব, মাওলানা আব্দুর রহীম, পৃ. ৩৪)

তবুও বিজ্ঞ (!) মানুষেরা কেন ডারউইনবাদ বা বিবর্তনবাদ মেনে নিল? এর সুন্দর জবাব দিয়েছেন বিবর্তনবাদীরাই। তাদের কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরছি:

If man is created, then this implies he was created for a purpose, which in turn is suggestive of man’s responsibility to his maker.” (Biblical Flood and Ice epoch, by Donald W. Patten-1966, Pg. 267)

অর্থ: মানুষ যদি সৃষ্ট হয়ে থাকে তার অর্থ দাঁড়ায় তাকে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। যার তাৎপর্য হল মানুষের অবশ্যই তাঁর স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। (বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব, পৃ. ১৪৫)। অর্থাৎ স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নয় বলেই তারা বিবর্তনবাদের কথা বলছে। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। স্যার আর্থার কীথও তাই বলেন-

“Evolution is unproved and unprovable, we believe it only because the only alternative, is special creation and that is unthinkable.”

অর্থ: বিবর্তনবাদ অপ্রমাণিত, তা প্রমাণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবু আমরা তা বিশ্বাস করি কেবল এ কারণেই যে, এর একমাত্র বিকল্প হল সৃষ্টিতত্ত্বকে মেনে নেয়া। কিন্তু তা করতে আমরা কোনোভাবেই প্রস্তুত নই। (বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব পৃ. ১৪৫)।

ডারউইনের পর সবচেয়ে বিশিষ্ট বিবর্তনবাদী হিসেবে স্বীকৃত Aldous Huxly-র বক্তব্য আরো সুস্পষ্ট। ১৯৬৬ সনের এক রিপোর্টে Confession of a Professed Atheist শীর্ষক প্রবন্ধে Huxly নিজেই স্বীকার করেছেন:

“I had motives for not wanting the world to have meaning, consequently assumed that that it had none, and was able without any difficulty to find satisfying reasons for this assumption -------- for myself, as no doubt for most of my contemporaries, the philosophy of meaninglessness was essentially an instrument of liberation, the liberation we desired was simultaneously liberation from a certain political and economic system and liberation from a certain system of morality. We object to the morality because it interfered with our sexual freedom.

অর্থ: এই পৃথিবীর কোনো অর্থ নেই এটাই ছিল আমার মূল চিন্তাধারা। ফলশ্রুতিতে আমি অনুমান করে নিলাম যে কার্যতই এর কোনো উদ্দেশ্য নেই এবং কোনোরকম কষ্ট ছাড়াই এর পক্ষে সন্তোষজনক কারণও খুঁজে পেতে আমার কোনো অসুবিধা হল না। -------- আমি ও আমার সমসাময়িকদের কাছে এই অর্থ বা উদ্দেশ্যহীনতার তত্ত্ব ছিল মূলতঃ আমাদের মুক্তির জন্য অতীব জরুরি। এই মুক্তি ছিল একই সাথে বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হতে মুক্তি এবং এক বিশেষ ধরনের নৈতিকতা হতে মুক্তি। আমরা নৈতিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম কারণ তা ছিল আমাদের যৌন স্বাধীনতার পথে অন্তরায়। (ঐ পৃ. ১৪৫-১৪৬)

তাহলে কি দাঁড়াল? কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়। কোনো নিয়মতান্ত্রিক চিন্তা-গবেষণা নয়, কেবলমাত্র যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য সৃষ্টিকর্তা ও ধর্মকে অস্বীকার করা হল। বস্তুত: বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করে দাঁড়ানো তথাকথিত ধর্মহীন সেকুলার সমাজগুলোর যৌনবিকৃতি এ কথার আরো জোরালো প্রমাণ।

মানবদেহ বিবর্তনবাদকে প্রত্যাখ্যান করে

আমার এক সিনিয়র সাথী ও বন্ধু ছিলেন। পেশায় ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ। ‘৬০ ও ৭০’-র দশকে অনেকের মতোই নাস্তিক্যবাদের রোমান্টিকতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, যেদিন মেডিকেলের লাশকাটা ঘরে গেলাম সেদিন “যেন আল্লাহ্কে দেখতে পেলাম।” তার হুবুহু কথাটার উদ্ধৃতি দিলাম। অর্থাৎ মানবদেহের অভ্যন্তরে বিরাজমান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখে তাৎক্ষণিক নাস্তিক্যবাদের সমস্ত চিন্তা মন থেকে উবে গেল। তাঁর (আল্লাহর) সুনিপুণ সৃষ্টিকে যখন দেখতে পেলেন তখন যেন স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করলেন। উপলব্ধি করলেন কি ভুল আর বিভ্রান্তির মধ্যে তাদের চালিত করা হচ্ছিল।

দুটা ছোট্ট উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই।

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, মানুষের প্রতি চোখের অপটিক নার্ভে ৭,৭০,০০০-১.৭ মিলিয়ন এর মতো নার্ভ ফাইবার আছে। যা আমাদের প্রতি মুহূর্তের দৃষ্টিতে আমরা অবচেতনভাবে ব্যবহার করছি। এই লক্ষ লক্ষ নার্ভ ফাইবারগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে দৃশ্যমান বস্তুটির আকার, রং, দূরত্ব ইত্যাদি চিহ্নিত করে মুহূর্তের ক্ষুদ্রতম সময়ের মধ্যে আমাদের মস্তিস্কে পৌঁছে দিতে।

তারা আরো আবিষ্কার করেছেন যে, মানুষের জিহ্বায় ২০০০-১০,০০০ Taste bud বা স্বাদ গ্রন্থি আছে, যা নানা স্বাদের খাদ্য চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। বহু করোনা আক্রান্ত মানুষ স্বাদ ও গন্ধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। একজন তো বলেই ফেললেন ‘জীবন যেন অর্থহীন মনে হচ্ছে।’

অবচেতনভাবে সৃষ্টিকর্তার এই সব অসংখ্য নেয়ামত প্রতি মুহূর্তে আমরা ব্যবহার করছি, এর সুফল ভোগ করছি। আর প্রতিদানে তাঁকে অস্বীকার করছি, তাঁর আনুগত্যকে প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপন করছি। বহু আগে শুনেছিলাম, না পড়েছিলাম বলতে পারছি না। এক ব্যক্তি বলছেন, ‘আমি তো কোনো পাপ করিনি, তাহলে নামাজ পড়বো কেন?’ বুঝুন দেখি, তার ধারণায় পাপী লোকেরাই কেবল নামাজ পড়ে। কথাটা কিন্তু সত্যি। কারণ রসুলুল্লাহ্ও (স)বলেছেন- ‘‘সব আদম সন্তানই পাপী। আর সর্বোত্তম পাপী হল যে তাওবা করে।” (তিরমিযী)

এই বেচারীও পাপী। আল্লাহর সব নেয়ামত ভোগ করছেন, কৃতজ্ঞতা জানানোর প্রয়োজনটুকু বোধ করছেন না। নেয়ামত যিনি দিলেন, তাঁর আদেশ-নিষেধের পড়োয়া না করে জীবনযাপন করছেন। তিনি পাপী নন! আল্লাহ্ দয়া করে যে সম্পদ আমাদের দিয়েছেন তা থেকে আমরা কাউকে বিপদে সাহায্য করলাম। পরিণামে সে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সামান্য ত্রুটিটুকু করলে আমরা কেমন ক্ষুব্ধ হই? খেয়াল করবেন যে সম্পদ আমরা দিলাম তার মূল মালিক কিন্তু আমরা নই। তারপরও কি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধই না হই আমরা! আর সব নেয়ামতের যিনি মালিক তিনি আমাকে দয়া করে যেসব নেয়ামত দিলেন আমি অবলীলায় সেগুলো ভোগ করছি। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার মাথাটুকু নুইয়ে দিতে পারছি না! হায় হতভাগ্য আদম সন্তান! আল্লাহ্ সকলকে বুঝ দিন।

আমাদের সমাজ মৌলিকভাবে অধার্মিক নয়। অধিকাংশই নাময- রোযায় নিয়মিত না হলেও, ধর্মের বিরোধী নন। নিজস্ব বুঝমত ধর্মাচরণ করেন অধিকাংশই। তবে বিশ্বাসে ও গভীরে আমরা আল্লাহকে উপলব্ধি করি না, বা করলেও খুবই সামান্য। আমাদের এই সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে চরমভাবে উদাসীন বরং তাঁর প্রতি বিমুখ করে তৈরী করছে। আল্লাহ্ আমাদের মাফ করুন। বিশ্বাসে গলতি, সন্দেহ ও অপূর্ণতা আনুষ্ঠানিক ইবাদাত-বান্দেগীকে অকার্যকর করে তোলে। ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে  শুদ্ধ ও ভাল মানুষ তখন আর গড়ে উঠে না- যা আমরা চলমান সময়ে দেখতে পাচ্ছি। মুসলিম সমাজে জন্ম নিয়ে আমাদের অধিকাংশ নিজেকে মুসলিম বিবেচনা করি। এতে দোষ ধরছি না। কেউ অমুসলিম কাফের হয়ে গেছি একথাও কেউ বলতে পারবে না।

কিন্তু সত্য সত্যই কি আমরা আল্লাহর উপর যথাযথ বিশ্বাস করছি? বিষয়টি নিয়ে কি চিন্তা করেছি কখনো? যা নিয়ে চিন্তাই করিনি তা বিশ্বাস করি, এটা কি ঠিক? ধারণা বা অনুমান- সেটা ব্যক্তিগত হোক বা সমাজের- তা কিন্তু বিশ্বাস নয়। প্রত্যেকেই চিন্তা করি। আল্লাহ তা’লা বিশ্বাসীদের জন্য ইবাদতের বিধান দিয়েছেন  বিশ্বাসী ব্যক্তিকে মুত্তাকী-পরহেজগার বানানোর জন্য।(সুরা বাকারা-২১)। নামায মানুষকে অন্যায় অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে(আনকাবূত-৪৫)। রোযা বাঁচায় মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে (বুখারী)। যথাযথ বিশ্বাস নিয়ে সওয়াবের আশা ও আত্মসমালোচনা সহকারে রোজা পালন করলেই গুনাহ মাফির আশা করা যায়। 

নতুন শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক চলছিল।দুটি বই প্রত্যাহারে তা কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। প্রকৃত বিষয় সুরাহা না হওয়ায় বিষয়টি বারবার ঘুরে ফিরে আসতে থাকবে। বস্তুবাদ, ভোগবাদ ও অবাধ যৌনাচারের বিকৃতিতে আক্রান্তরাই বিবর্তনবাদের পক্ষ ও প্রচারক। দুএকটি ইসলামী বই বা রচনা অথবা একশ নাম্বারের কোন বিষয় যোগ করে নৈতিকতা ও সমাজের ধ্বংস ঠেকানো যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থার পূর্নাঙ্গ ইসলামীকরণ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরী দাবী। নইলে উন্নয়ন ও রাষ্ট্র মেরামতের সব সুন্দর উদ্দেশ্যই পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণাংগ ইসলামীকরণের জন্য ইসলামী দল, সংগঠন, ব্যক্তিত্ব এবং সকল চিন্তাশীল ব্যক্তিরই সক্রিয় দাবী উত্থাপন করা আজ একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।

সবাই চিন্তা করি। আমরা যারা এই লেখা পড়ছি তারা এখনো এই পৃথিবীতে আছি। বিশ্বাস ও চিন্তা, আত্মা ও আমল সংশোধনের এখনই সময়। হিসাবের দিন ঘনিয়ে আসছে। মৃত্যুর ওপারে কোনো আমল নেই। বিশ্বাসের গলদ সেখানে আমাদের বিপদে ফেলে দেবে। কোনো কিছুই কোনো কাজে আসবে না। হায় আল্লাহ্! আমাদের মাফ করুন! আমাদের ঈমান ও চিন্তাগুলো শুদ্ধ করে দিন। আমাদের আপনার চিরন্তন রহমতে আশ্রয় দান করুন। আরো অধ্যয়নের জন্য নিম্নোক্ত বইগুলি পাঠের অনুরোধ রইল-

১. বিবর্তনবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্ব- মাওলানা আব্দুর রহীম
২. মহাসত্যের সন্ধানে- মাওলানা আব্দুর রহীম
৩. দা ডিভাইন রিয়েলিটি- হামজা জর্জিস
৪. আত্মসমর্পণের দ্বন্দ্ব- ড. জেফরি ল্যাং
৫. হোমো স্যাপিয়েনস্- ডা. রাফান আহমেদ

(উল্লেখ্য হামজা জর্জিস গ্রীক বংশোভূত ব্রিটিশ ইসলামিক এক্টিভিস্ট। তার বইখানি ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ উভয়ই দেশে পাওয়া যায়। আর ড. জেফরি ল্যাং একজন আমেরিকান গণিতজ্ঞ। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Struggling to Surrender, ‘আত্মসমর্পণের দ্বন্দ্ব’নামে বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।)

মহান আল্লাহ্ তা’লা ঈমানী জাগরণ ও বিশ্বাসের পথযাত্রায় সকলের সহায় হোন। আমীন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন