জেরুজালেমের রাজনীতি ও মসজিদে আল আকসার ইতিহাস

  শায়লা সিমি ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১৮:০০ | অনলাইন সংস্করণ

আল আকসা

জেরুজালেমের ওপর বিভিন্ন ক্ষমতার করায়ত্ত এবং অত্যাচারের পেছনে বিবিধ রাজনৈতিক কারণের অন্যতম হলো, এখানে পৃথিবীর প্রাচীনতম ইবাদাত গৃহসমূহ স্থাপিত। এবং দুটি প্রধানতম ধর্মীয়গোষ্ঠীর অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। অপশক্তির নানা কুদৃষ্টিতে বিভিন্ন সময়ে এ স্থানের বাসিন্দা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ অত্যাচারিত হয়ে আসছে; ইতিহাস তার সাক্ষী।

হজরত মরিয়ম (র.) তিনি পৃথিবীর প্রাচীনতম ইবাদত গৃহ বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদে আকসার সহিত সুনিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। ইসরা বা মেরাজ, যা নবী করিম (সা.)-এর রাত্রিকালীন যাত্রা হিসেবে পরিচিত। যে যাত্রায় তিনি মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ পান। সে সাক্ষাতের জন্য তিনি রওনা হন যে স্থান থেকে তা জেরুজালেমে অবস্থিত, মসজিদ এ আল আকসা। সুতারং উক্ত মসজিদে আকসার সৃষ্টির ইতিহাস জানলে জানা যাবে জেরুজালেমের রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস।

মসজিদ এ আল আকসা

নবী দাউদ (আ.) তখন জীবিত ছিলেন তিনি আল্লাহর নবী ও বাদশা ছিলেন। ৩০ বছর বয়সে তার নবুয়াতপ্রাপ্তির পর ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি আল্লাহর ধর্ম প্রচারে নিমগ্ন ছিলেন। এবং শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। জীবন সায়াহ্নে উপস্থিত হয়ে তিনি রাজ্যের প্রধান ব্যক্তিদের বললেন, আমার জীবনের একটি প্রধান বাসনা ছিল, আমি আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য একখানা পবিত্র গৃহনির্মাণ করব এবং এর জন্য আমি প্রয়োজনীয় স্বর্ণ, রুপা, তামা, পিতল, লোহা , কাঠ, পাথর ইত্যাদি সংগ্রহ করে রেখেছি। তারপর তিনি পুত্র সোলাইমানকে (রা.) এই পবিত্র গৃহনির্মাণ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দান করলেন এবং এই কার্যের গুরুত্বের বিষয় অবহিত করলেন। তিনি হজরত সোলায়মানকে বারবার বললেন- স্মরণ রেখো, এটা বাসগৃহ নয়; এটা আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত গৃহ।

২৭ একর জমির ওপর অবস্থিত মসজিদ এ আকসা। পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন মসজিদের সমন্বয়ে গঠিত পুরো কম্পাউন্ডটি। মসজিদ এ কিবলি, মসজিদে মারোয়ানি, মাসজিদুল করিম , মাসজিদুল বোরাক, তুব্বাতুর সাকরাম এই পাঁচটি মসজিদের সমন্বয়ে এই পুরো কম্পাউন্ড। আরজুল মাসার ওয়া মনসার.... অর্থাৎ এটা জামাত হওয়া ও প্রস্থান করার স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.) । নবী করিম (সা.)-এর আগমনের পর হুজুরের বাহন বোরাক যেখানে দাঁড়ায়; সেখানে যে মসজিদ স্থাপন করা হয় তার নাম বোরাক। যে স্থান থেকে মিরাজ সংঘটিত হয় সেই স্থানকে বলে মেহরাব উব্বাতুন নবী।

সোলায়মান (আ.) এমন কারামাত

আল্লাহর অসীম রহমতে নবী সোলায়মান (আ.) এমন কারামাত লাভ করেছিলেন, যা দুনিয়ার সব পশু-পাখি , জিন এবং বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত তার পরম অনুগত ও বাধ্য ছিল। একান্ত আজ্ঞাবহরূপে এরা সবাই তার হুকুম তামিল করত। নবী সোলায়মান (আ.) পিতার মনের বাসনা পূর্ণ করতে বদ্ধপরিকর হলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সুযোগ্য প্রস্তরশিল্প এবং বিভিন্ন শ্রেণির প্রখ্যাত কারিগরদের এনে বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করলেন। নানাবিধ উপকরণ দিয়ে সুসজ্জিত করা হলো।

প্রাচীর গাত্রে এবং উপরিভাগে গাছ ও ফেরেশতাদের চিত্রাঙ্কন করা হলো। ছাদে সোনা, রুপা , মোতি, হীরা পান্না , ইয়াকুত , ফিরোজা প্রভৃতি ধাতু ও প্রস্তরগুলো খচিত হয়ে সুরম্য মসজিদ গৃহের শোভা শতগুন বৃদ্ধি পেল। বনি ইসরাইল কওমের ধার্মিক লোকজন এই বায়তুল মুকাদ্দাস বা পবিত্র ইবাদত গৃহে আল্লাহ তায়ালার উপাসনায় মগ্ন হলো।

খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শত আটানব্বই সাল পর্যন্ত

খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শত আটানব্বই সাল পর্যন্ত হজরত দাউদ (আ.)-এর বংশধরদের ১৯ জন শাসক শাসন করেন এদের মধ্যে অনেকেই ইমানদার ও ধর্মভীরু ছিলেন কিন্তু আরো কিছু ছিল মুশরিক ও শিরককারী। ক্রমান্বয়ে মসজিদে মুকাদ্দাস-এর মধ্যে ও আশপাশে গুরুতর শিরককার্য সংঘটিত হতে লাগল। সুতারং এসব বংশধররা আল্লাহর অভিশাপের শিকার হলো।

খ্রিস্টপূর্ব ছয় শত দশ সালে

খ্রিস্টপূর্ব ছয় শত দশ সালে হজরত দাউদ (আ.)-এর বংশের সর্বশেষ বাদশার আমলে ; বাদশা বখতেননছর বাদশা ও তার আমিরদের বন্দি করে রাজ্য দখল করে , এবং সিদ্দিকিয়া নামক এক ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেন, কিছু দিন পর সিদ্দিকিয়া বাদশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সুতরাং এক স্মরণাতীত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জেরুজালেম নগরী প্রায় শ্মশানে পরিণত হয়। বায়তুল মুকাদ্দাসে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয় ! এর শরীরে খচিত নানা দামি মনি , হীরা , স্বর্ণ ও রুপা লুটপাট করে নেয়া হয়। এমনকি তৈজসপত্র যা বিদেশাগত মুসাফিরদের সম্পদ তও লুণ্ঠন করা হয়। এর পরবর্তী সময়ে বাদশা বখতেননছর- এর পুত্র ক্ষমতা লাভ করলে , এক আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন হয় এবং উক্ত তৈজসপত্রে মদ পরিবেশন করা হয়। হঠাৎ সেখানে একটি আশ্চর্য ঘটনা সংঘটিত হলো গায়েবি একটি হাত উপস্থিত হয়ে অতিথিশালার দেয়ালে কিছু লেখে রেখে গেল। এই ঘটনায় সবাই আতঙ্কিত হলো। লিখিত বাক্যের পাঠোদ্ধারের জন্য সুবিজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তিদের ডাকা হলো এবং কেউ এ বাক্যের মর্ম উদ্ধার করতে সক্ষম হলো না।

এমতাবস্থায় আল্লাহর নবী হজরত দানিয়েল (আ.) যিনি বন্দি অবস্থায় কালযাপন করছিলেন; তাকে ডাকা হলো এবং তিনি পাঠোদ্ধারে সক্ষম হলেন। বাক্য ছিল- মীনী তাইকল আফরাছিনি। অর্থ- তোমাদের বাদশাহীর শেষ মুহূর্ত ঘনায়মান হয়েছে, তার নির্দেশরেখা বলীয়মান প্রায়। তোমাকে পাল্লায় পরিমাপ করা হয়েছে, তাতে তুমি ওজনহীন প্রমাণিত হয়েছো। তোমার রাজত্ব ধূলিসাৎপ্রায়। তা ইরানিদের ভাগ্যাকাশে উদয় হচ্ছে। সেই রাতেই ইরানি বাহিনী ফেরত যদি পার হয়ে বাবেল নগরী আক্রমণ করে এবং বাদশা ও আমিরদের হত্যা করে রাজ্য দখল করে। উক্ত গায়েবি ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়।

ইরানি বাদশা বন্দি ইসরাইলিদের ওপর কোমল ব্যবহার করতেন। তার নির্দেশে ৪০ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়। এবং যেসব ধনসম্পদ লুণ্ঠন করা হয়, তা তিনি ফেরত দেন। স্বদেশ ফিরে ইহুডুরে সর্বপ্রথম একটি কোরবানি গাহ তৈরি করল এবং তারপর তারা বায়তুল মুকাদ্দস পুনর্নির্মাণে মনোনিবেশ করেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter