কাবা শরিফে হজ করতে আসা মানুষের ঢল

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

  মাসুদ করিম, মক্কা থেকে

ছবি- সংগৃহীত

পবিত্র কাবা শরিফে হজ করতে আসা মানুষের ঢল নেমেছে। প্রতিদিনই এহরাম পরে দলে দলে মানুষ আকাশপথে সৌদি আরবে নামছেন। কিছু কিছু মানুষ স্থলপথেও আসছেন। 

আগামী ১৯ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র হজ। ওই দিন আরাফাতের ময়দানে হাজীরা গিয়ে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি দেবেন। মক্কা নগরী থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মিনা নগরী, যেখানে হাজীরা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন; সেখানে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। 

এ বছর ১৫ লাখের বেশি মানুষ হজ পালন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই সৌদি আরব পৌঁছে গেছেন। বিদেশিরা মক্কা নগরীতে গিয়ে পবিত্র কাবা শরিফ ঘিরে তওয়াফ করছেন। সাফা ও মারওয়া পাহাড় প্রদক্ষিণ করছেন। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও মিলাদ পড়ছেন। সবাই পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পাপের জন্য ক্ষমা চাইছেন। 

কেউ কেউ আবার কিছুটা সময় হাতে পেয়ে মদিনা মনোয়ারায় গিয়ে মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় ও মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর রওজা শরিফে দোয়া ও মিলাদ পড়ছেন। 

এদিকে হাজীদের কোরবানির টাকা জমা নেয়ার প্রস্তুতি সম্পাদন করেছে ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। সৌদি আরবে হজের প্রস্তুতি সম্পাদনে দেশটিতে ঈদুল আজহার ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। 

দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান এ ছুটি ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার থেকে ছুটি শুরু হয়েছে। মক্কা নগরীর হোটেলগুলো এখন কানায় কানায় পরিপূর্ণ। বিশেষ করে পবিত্র কাবা শরিফের আশপাশের হোটেলে কোনো তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কেউ কেউ বাড়ি ভাড়া করে কিংবা দূরবর্তী স্থানে থেকে হজ পালন করছেন। 

অনেকে জীবনে একবার হজ পালনের সুযোগ পান। তাই তারা ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে সময় পার করছেন। আরব নিউজ, সৌদি গেজেটের মতো পত্রিকাগুলো হাজীদের মক্কা ও মদিনায় কোথায় কোথায় যাবেন তার তালিকা দিচ্ছে।হজের কার্যক্রমের সুবিধার জন্য রাত-দিন কাজ করছে সৌদি সরকারের বিভিন্ন বিভাগ। 

বিমানবন্দরে অতিরিক্ত বুথ চালু করা হয়েছে। হজ কভার করতে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। 

সৌদি সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয় বিদেশি মিডিয়ার সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত ব্রিফিংয়ের আয়োজন করছেন। হজ করতে আসা বিদেশিদের মধ্যে যারা পবিত্র ওমরাহ সম্পন্ন করেছেন, তারা কাবা শরিফে এবাদতে মশগুল রয়েছেন। 

সৌদি রেডক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, হজ উপলক্ষে অতিরিক্ত লোকবল মোতায়েন রয়েছে। স্থায়ী লোকবলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও উদ্ধারকাজের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। রেডক্রিসেন্ট তাৎক্ষণিক ও জরুরি সেবা প্রদান করে থাকে। প্রতি বছরেই হাজীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে জেদ্দায় অবস্থিত কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করেছে। 

এখন অনেকে মদিনা মনোয়ারায় গিয়ে হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ ঘুরে দেখছেন। মদিনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হল, মসজিদে নববী যেখানে মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক অবস্থিত। মসজিদে নববীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সব পাঁচতারকা হোটেল। সেগুলো এখন লোকে পরিপূর্ণ। 

সৌদি সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আসা সাংবাদিকদের জন্য মদিনায় হোটেল আল ঈমান ইন্টারকন্টিনেন্টালে মিডিয়া সেন্টার খোলা হয়েছে। মসজিদে নববীর কিনারা ঘেঁষে থাকা ওই হোটেলে অন্য সময়ে ২৫০-৫০০ লোকের রাতে খাবারের ব্যবস্থা থাকে। তবে এখন তাদের এক হাজারের বেশি লোক হচ্ছে। সব হোটেলে একই চিত্র। 

সুবিশাল মসজিদে নববীতে আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লোকজন মসজিদের পানে ছুটছেন। মূল মসজিদের ভেতরে জায়গা হচ্ছে না। লোকজন মসজিদের বাইরের চত্বরে নামাজ আদায় করছেন। 
বাইরে দিনের বেলায় তাঁবু টাঙানো থাকে। তার ওপর ফ্যান দিয়ে হালকা পানি ছিটিয়ে পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা চলে। রাতে তাঁবু খোলা হলেও ফ্যান চলতে থাকে। 

মসজিদের গেটগুলো রাত সাড়ে ১০টার পর বন্ধ করা হলেও ‘বাবা সালাম’ খোলা থাকে দিনরাত। বাবা মানে হল দরজা অর্থাৎ ওই গেট দিয়ে প্রবেশ করে নবীজির রওজা মোবারকে সালাম দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। হজ মৌসুমে নবীজির রওজায় ভিড় এতটাই বেশি যে বেশিরভাগ মানুষই রওজা মোবারকের কাছে যেতে পারেন না। তারা দূরে থেকে সালাম দেন, দরুদ ও দোয়া পড়েন। 

মদিনায় হাজীরা কুবা মসজিদে যান। সেখানে নামাজ আদায় করেন। মহানবী (সা.) প্রথম এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। হাজীরা কেবলাতাইন মসজিদেও যান। মুসলমানদের প্রথম কেবলা ছিল জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ। 

ফলে কেবলাতাইন মসজিদে ওই দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করা হতো। তার পর মক্কার কাবা শরিফে কেবলা স্থানান্তরিত হলে এখন তার উল্টো দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হয়। কিন্তু কেবলাতাইন মসজিদের ডিজাইনে আল-আকসার স্মৃতিও রেখে দেয়া হয়েছে। ওহুদ পাহাড়সহ নবীজির স্মৃতিবিজড়িত অন্য স্থানগুলো এখন বিদেশি হাজীদের পদচারণায় গমগম করছে। তবে যারা হজের আগে মদিনায় যেতে পারবেন না, তারা হজের পর মদিনা শরিফ যাবেন।