ধর্ষণ : ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য পাপ
মাহমুদ আহমদ
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামে ধর্ষণ একটি জঘন্য পাপ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো ধর্মেই ব্যভিচারের শিক্ষা নেই। ইসলামে ব্যভিচারকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ এবং হারাম আখ্যায়িত করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা প্রকাশ্য অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত মন্দ পথ’ (সূরা বানি ইসরাইল, আয়াত : ৩২)। আর বাইবেলে বলা হয়েছে ‘তোমরা ব্যভিচার করবে না।’
দিনের পর দিন ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের মাত্রা যেন বেড়েই চলেছে। ৫ মে ২০২৬ একটি পত্রিকার সংবাদ হলো ‘কুমিল্লার চান্দিনায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সময় স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ করেছে একদল দুর্বৃত্ত। আরেকটি সংবাদ, ‘ধর্ষণের শিকার ১২ বছরের মাদ্রাসাছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা।’ মানবতার যেন আজ মৃত্যু ঘটেছে। দিনদিন যেন ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গৃহবধূ এমনকি অবুঝ শিশুও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না বরং ধর্ষিতাকে হত্যা, মাথা ন্যাড়া করে দেওয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে। গতকাল আমার এক আলেম বন্ধু বলছিলেন, সারা দেশে ধর্ষণের মতো হারাম কাজ অহরহ হচ্ছে, আমরা এর প্রতিবাদে কী ভূমিকা পালন করছি? আমরা তো প্রায় সময় দেখতে পাই দেশের বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনগুলো নানা বিষয়ে দাবি জানিয়ে আন্দলন করে রাজপথে নামেন। অথচ সারা দেশে ধর্ষণের মতো হারাম কাজ অহরহ ঘটছে, এ বিষয়ে সবাই নিশ্চুপ কেন? যদিও এর উত্তর তাকে আমি সঠিকভাবে দিতে পারিনি।
আমাদের সবার জানা আছে, কয়েক বছর আগে দিল্লিতে চলন্ত বাসে ৬ নরপশুর গণধর্ষণের কবলে পড়ে মেডিকেল ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা শুধু ভারতকেই নয়, বরং কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা উপমহাদেশ ও বিশ্ববাসীকে। জাতিসংঘের মহাসচিব স্বয়ং গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন তার মৃত্যুতে। তার পরিবারসহ গোটা বিশ্বের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি। ভারতে এর জন্য প্রচলিত আইন সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আইনে দণ্ডিত ধর্ষকের ফাঁসি অথবা রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগে খোজা করে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। আমাদের দেশেও এ বিষয়ে আইন রয়েছে। বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে কঠোর আইন আছে তবে এ আইনের কার্যকারিতা তেমন একটা দেখা যায় না, ফলে দিনের পর দিন ধর্ষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সর্বত্র।
যারা এ ধরনের পৈশাচিক কার্যক্রমে লিপ্ত হয় তাদের কোনো ধর্ম নেই, তারা মানুষ নয় অমানুষ। পবিত্র কুরআন এবং হজরত রাসূলে করিম (সা.) আমাদের এ শিক্ষাই দেয় যে, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যাবে না। আমাদের এমনসব কর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে যা নিজেদের মনে কু-প্রভাবের সৃষ্টি করে। হজরত রাসূলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দুচোয়ালের হাড্ডির মাঝখান অর্থাৎ জবানের এবং দুপায়ের মাঝখানের অর্থাৎ লজ্জাস্থানের জামানত আমাকে দেবে, আমি তার জান্নাতের জামিন’ (বুখারি)। হজরত নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে উপার্জন করা ব্যভিচার। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করা চোখের ব্যভিচার। যা শ্রবণ করা নিষিদ্ধ তা শোনা কর্ণের ব্যভিচার, যে কথা বলা নিষেধ তা বলা জিহ্বার ব্যভিচার, নিষিদ্ধ জিনিসে হাত দেওয়া হাতের ব্যভিচার, নিষিদ্ধ স্থানে যাওয়া পায়ের ব্যভিচার’ (বুখারি ও মুসলিম)।
বিবাহ করা স্ত্রী ছাড়া কারও সঙ্গে কোনোরূপ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে ইসলাম কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং এটিকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই পবিত্র কুরআনের সূরা নিসায় যুদ্ধবন্দিনীকেও বিবাহ না করা পর্যন্ত তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি তো দেয়ইনি বরং কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, এ বন্দিনীগণকে স্ত্রীরূপে রাখার পূর্বে স্বাধীন নারীদের মতো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। এই যে, একের পর এক নারী নির্যাতিত হচ্ছে এর কি শেষ হবে না? যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত তারাও তো কোনো না কোনো পিতা-মাতারই সন্তান। প্রত্যেকেই যদি তার পরিবারের প্রতি সব সময় খেয়াল রাখতেন তাহলে হয়তো আপনার আমার সন্তানটি এ ধরনের জঘন্য কাজটি করতে পারত না। আমাদের সন্তানরা কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে সময় কাটায় তা নিয়ে কি আমরা আদৌ চিন্তিত? আমরা যদি আমাদের সন্তানকে ছোট বেলা থেকেই উত্তমভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতাম তাহলে কি আজ এমন পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের সংবাদ পেতাম?
এ জন্যই ইসলাম সন্তান জন্ম দেওয়ার পরই তাকে উত্তম শিক্ষায় গড়ে তোলার আদেশ প্রদান করেছে। সন্তান যেন উত্তম গুণের অধিকারী হয় সেজন্য পিতা-মাতাকে সব সময় দোয়াও করতে হয়।
যেভাবে পবিত্র কুরআনে সন্তানদের জন্য দোয়ার উল্লেখ রয়েছে ‘হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! তুমি আমাদের জীবনসঙ্গী ও সন্তানসন্ততি হতে আমাদের চোখ জুড়ানোর উপকরণ দান কর এবং আমাদের প্রত্যেককে মুত্তাকিদের ইমাম বানাও’ (সূরা আল ফুরকান, আয়াত : ৭৪)।
তাই সর্বদা আমাদের সন্তানদের জন্য দোয়া করতে হবে, তবে তার আগে আমাদের পবিত্র হতে হবে। আমি নিজেই যদি খারাপ কাজে লিপ্ত থাকি আর সন্তানকে ভালো কাজের উপদেশ দেই তাহলে তা কোনো কাজে লাগবে না। আমার সন্তান একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করবে বা আরেক মায়ের বুক খালি করবে আর আমি সেই সন্তানকে আবার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব এটা কোনো ধর্মের শিক্ষা নয়। ইসলাম সবার সঙ্গে ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। তাই সমাজ থেকে ধর্ষণ বলুন আর যে কোনো মন্দ কাজ বলুন তা দূর করতে প্রথমে প্রত্যেক পরিবারকে সোচ্চার হতে হবে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন তাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
masumon83@yahoo.com
