|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রশ্ন: আজকাল আমাদের দেশে কিছু আধুনিক সংস্থা বা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ‘কুরবানি প্যাকেজ’ নামক একটি নতুন সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। যেখানে একজন ব্যক্তি অনলাইনে বা সরাসরি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা (মূল্য ও সার্ভিস চার্জ) সংস্থাকে বুঝিয়ে দেন।
সংস্থাটি তার পক্ষ থেকে পশু ক্রয়, জবাই এবং মাংস তৈরি করে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ মাংস বা মাংসের নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ প্যাকেটজাত অবস্থায় কুরবানিদাতার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। অথবা তারা সম্পূর্ণ মাংস বা মাংসের নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিতরণ করে দেয়।
কুরবানিদাতাকে পশু কেনা, জবাই করা বা মাংস বিতরণের কোনো প্রক্রিয়াতেই সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয় না।
ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এভাবে কুরবানি করার হুকুম কী? এর দ্বারা কি কুরবানির ওয়াজিব আদায় হবে? এবং একটি ইবাদত হিসেবে এর সুন্নাহসম্মত ও সর্বোত্তম পদ্ধতি কোনটি? বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর: ইসলামি শরীয়তে কুরবানির ক্ষেত্রে উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা জায়েজ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি নিজে উপস্থিত থাকতে না পেরে অন্য কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা সংস্থাকে পশু ক্রয় ও জবাই করার জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করে তবে তার পক্ষ থেকে ওয়াজিব কুরবানি আদায় হয়ে যাবে।
বিদায় হজের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে ৬৩টি উট কুরবানি করেছিলেন এবং অবশিষ্ট (৩৭টি উট) জবাই করার জন্য হযরত আলিকে (রা.) প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিলেন।
তবে ইসলামিক স্কলারদের মতে, কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া এই প্রচলিত ‘প্যাকেজ কালচার’ বা ‘অনলাইন কুরবানি’ সুন্নাতের পরিপন্থী এবং ইবাদতের মূল আধ্যাত্মিকতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কুরবানির সর্বোত্তম ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো- পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে, নিজ ব্যবস্থাপনায় পশুর হাটে গিয়ে পশু পছন্দ করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সেটিকে লালন-পালন করা, নিজের উপস্থিতিতে আল্লাহর নামে জবাই করা এবং নিজ দায়িত্বে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-পড়শির মাঝে মাংস বণ্টন করা।
তবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজের ওয়াজিব কুরবানিটি নিজ বাড়িতে সুন্নাত মতো সম্পন্ন করে এবং অতিরিক্ত কিছু নফল কুরবানি কোনো বিশ্বস্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য করতে চান, তবে তা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত সওয়াবের ও প্রশংসনীয় কাজ।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা প্রয়োজন। পশ্চিমা বা অমুসলিম প্রধান দেশগুলোতে আইনি বাধ্যবাধকতা, পরিবেশগত নিয়ম ও লাইসেন্সের জটিলতার কারণে মুসলমানরা খোলামেলা কুরবানি করতে পারেন না। সেখানে বাধ্য হয়ে সংস্থাকে টাকা দেওয়া বা কসাইখানা থেকে মাংস সংগ্রহ করা একটি ‘জরুরত’ বা ওজর।
কিন্তু বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। এখানে আবহমান কাল ধরে পাড়া-মহল্লায় যে কুরবানির আনন্দ, ত্যাগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মাংস বণ্টনের সুন্দর সংস্কৃতি চালু আছে, কোনো ঠুনকো অজুহাতে তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া মুসলমানদের জন্য কোনোভাবেই উচিত নয়।
কোনো আইনি বা শারীরিক জটিলতা ছাড়া এদেশের সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানিকে ‘ঝামেলামুক্ত’ করার নামে অলসতা উস্কে দেওয়া এবং এই ইবাদতকে একটি বাণিজ্যিক প্যাকেজে রূপান্তর করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইবাদতের বাহ্যিক কাঠামোর পাশাপাশি এর প্রাণ, মর্ম ও সুন্নাহর মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আল-আলমগিরী) ৫/৩০০, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৭৫২৫, সুনানে বায়হাকি: ৯/২৮৩, সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৫৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২, আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩২৯


