হেরেও মাঠ ছাড়ছেন না মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘তরুণ তুর্কি’ দেলাওয়ার
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ১২:১২ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভোটের মাঠে পরাজিত। শুধু পরাজিতই নন, হেভিওয়েট প্রতিপক্ষ তথা দেশের প্রভাবশালী এলজিআরডি মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জোয়ারে একপ্রকার ভেসে গিয়েছেন তিনি।
কিন্তু রাজনীতির ময়দান বড় বিচিত্র জায়গা; এখানে ব্যালট বাক্সের হারই যে শেষ কথা নয়, উত্তর জনপদের সীমান্তঘেঁষা জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পা রাখলে তা এখন পরতে পরতে মালুম হচ্ছে। নির্বাচনের বাদ্য থেমেছে তিন সপ্তাহ আগে, কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন থামেননি। পরাজয়ের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে তিনি এখন চষে বেড়াচ্ছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের গ্রাম থেকে গ্রামান্তর।
সাধারণত ভোটের ফল প্রকাশের পর পরাজিত প্রার্থীদের ‘টিকিটিও’ খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু দেলাওয়ারের ক্ষেত্রে ঠিক উলটো। তিনি কখনো হাজির হচ্ছেন প্রান্তিক জনপদে বিনামূল্যে গবাদি পশু বিলি করে স্বাবলম্বী হওয়ার মন্ত্র নিয়ে, কখনো বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব মেটাতে বসিয়ে দিচ্ছেন নলকূপ। সামনে রমজান মাস, তার আগে ইফতার মাহফিল আর গণসংযোগে তিনি যেভাবে সরব, তাতে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে— তবে কি আগামী যুদ্ধের সলতে এখনই পাকাচ্ছেন এ জামায়াত নেতা।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি স্রেফ সমাজসেবা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী এক রাজনৈতিক বিনিয়োগ। মির্জা ফখরুলের মতো মহীরুহের বিপরীতে দাঁড়িয়ে হার নিশ্চিত জেনেও তিনি যেভাবে মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, তাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়দের অনেকে।
উত্তর হরিহরপুর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সি আইয়ুব আলী বলেন, ভোটের সময় অনেকেই আসে, কিন্তু অসময়ে পাশে থাকা লোকই তো আসল।
শুধু ঠাকুরগাঁও-১ নয়, পাশের আসন ঠাকুরগাঁও-২ আসনেও জামায়াতের তৎপরতা এখন চোখে পড়ার মতো। ঝটিকা গণসংযোগ আর দানশীল অবয়ব নিয়ে জামায়াত আসলে কী চাইছে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তিনটি বিষয়কে সামনে আনছেন, একক শক্তি প্রদর্শন। বিএনপির সঙ্গে জোটের সমীকরণ যাই হোক, তৃণমূলে নিজেদের একক শক্তি যাচাই করা।
ভাবমূর্তি সংকট দূর: তরুণ সমাজ ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের ‘সেবামূলক’ ইমেজ তৈরি করা।
ভবিষ্যত নেতৃত্ব: দেলাওয়ার হোসেনের মতো তরুণ মুখকে সামনে রেখে আগামীর সংসদীয় লড়াইয়ের রাস্তা পরিষ্কার রাখা।
ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা পরিবারের আধিপত্য ও রাজনৈতিক আভিজাত্য অনস্বীকার্য। ক্ষমতায় আসার পর এলজিআরডি মন্ত্রী হিসেবে মির্জা ফখরুলও হাত গুটিয়ে নেই। ঠাকুরগাঁও সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন, বিমানবন্দর পুনরায় চালু ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে জমি যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফখরুল চাইছেন নিজের মেয়াদেই উন্নয়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক আধিপত্য নিষ্কণ্টক করতে।
অন্যদিকে, দেলাওয়ারের কৌশল ভিন্ন। তিনি এবার হানা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের চিরাচরিত ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে। নিজেকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ প্রমাণের চেষ্টায় মরিয়া তিনি। যদিও জগন্নাথপুর ইউনিয়নের রাজকুমারদের মতো অনেকেরই সাফ বক্তব্য, ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও উগ্রবাদ রুখতে ধানের শীষে ভোট দিয়েছি।’
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে জেলা জামায়াত আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানের ৭৪ লাখ টাকাসহ বিমানবন্দরে আটক হওয়ার ঘটনাটি দেলাওয়ারের ভোটে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার প্রাপ্ত ভোট অনেককেই চমকে দিয়েছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।
ফখরুলের দুর্গে দেলাওয়ারের এই নিঃশব্দ বিচরণ কি শুধুই সৌজন্যের রাজনীতি, নাকি ধানের শীষের ঘরে থাবা বসাতে দাঁড়িপাল্লার নতুন কোনো চাল? উত্তর দেবে সময়।
