আহমদুল হাসান আসিক, কক্সবাজার থেকে    |    
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
রোহিঙ্গারা ফিরতে চান বাপ-দাদার ভিটায়
‘রাখাইনে জন্ম নিয়ে আমরা তো কোনো পাপ করিনি’
অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীকে বাঁশের দোলায় করে পথ পাড়ি দিচ্ছেন দু’জন। উখিয়ার লাম্বার বিল এলাকা থেকে মঙ্গলবার তোলা ছবি -আনোয়ার হোসেন জয়

‘রাখাইনে জন্ম নিয়ে আমরা তো পাপ করিনি। তারপরও কেন আমরা শাস্তি ভোগ করছি। বাবা ও ছোট তিন ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি জঙ্গলে পালিয়ে বেঁচেছি। নিজের প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছি। আমার মা ও ১২ বছর বয়সী ছোট বোনের কোনো খোঁজ নেই। প্রতিবেশীদের কাছে শুনেছি, আমার ছোট বোনকে তারা (মগ সম্প্রদায়ের লোকজন) তুলে নিয়ে গেছে। কোন অপরাধে এমন শাস্তি পাচ্ছি, আমরা জানি না।’ ২২ বছর বয়সী নুরুল আলম যখন কথাগুলো বলছিলেন, তার চোখ ছলছল করছিল। দু’দিন আগে নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের কাঞ্জরপাড়া সীমান্ত দিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা পরিবারের কারও নাগরিকত্ব নেই, শিক্ষার অধিকার নেই। এমনকি চলাফেরার অধিকার থেকেও বঞ্চিত তারা। সন্তান জন্মদানেও আছে বাধ্যবাধকতা। ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নেই তাদের জন্য। দেশটিতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবাধিকার বলতে এমনিতেই কিছু নেই। তার ওপর এখন সে দেশের সরকার তাদের নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২৪ আগস্টের পর চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এভাবে পালিয়ে এসে শরণার্থী হবে, এমনটি ভাবনায়ও ছিল না। এরপরও তারা এ কঠিন জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে নিজের দেশে ফিরতে চায়। তারা জানে না কতদিন তাদের বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে থাকতে হবে।

নুরুল আলমের সঙ্গে কথা হয় মঙ্গলবার দুপুরে। তিনি বলেন, রাখাইনের মংডুর জামুইন্যা এলাকায় তাদের আধাপাকা বাড়ি ছিল। তার বাবা ওসমান আলী ছিলেন কৃষক। তার ছোট তিন ভাই ফরমান আলী, জমির আলী ও সোলমান। তাদের বয়স ১৬ থেকে ২০ বছর। ঈদের আগের দিন দুপুরের পর সেনাবাহিনী ও মগরা তাদের বাড়িতে আগুন দেয়। তিনি তখন বাড়িতে ছিলেন না। তার বাবা ও তিন ভাইকে গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তার ছোট বোন আনোয়ারা বেগমকে তুলে নিয়ে গেছে মগরা। পরে তিনি জানতে পারেন, তাদের বাড়িতে অবশিষ্ট আর কিছু নেই। মা আছিয়া বেগম কোথায় আছেন, জানা নেই। তিনি সীমান্তে এসে মা-বোনকে খুঁজে পাননি। তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে, তা তিনি জানেন না।

১৭ দিনে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে পাহাড়, জঙ্গল ও নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। আসার পথেও ছিল জীবনের ভয়। অনেক কিশোর, তরুণ এবং যুবক আসার পথেও খুন হচ্ছেন। অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

মঙ্গলবার বালুখালী ক্যাম্পে কথা হয় ইব্রাহীম নামে আরও এক যুবকের সঙ্গে। মংডুতে তার বাড়ি ছিল। বাড়ির পাশেই একটি সেনা ক্যাম্প ছিল। দুই মাস আগে সেনা সদস্যরা টহল দিতে এসে তার স্ত্রী মমতাজকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। দুই সপ্তাহ আগে সেনাবাহিনী তার বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। তার দুই বছর বয়সী শিশুকে হত্যা করে। তার স্ত্রী এখন কোথায়, তিনি জানেন না। তিনি বলছিলেন, সেনাবাহিনী টহলে এসে এমন অনেক নারীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করত। কেউ কিছু বললে তাকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করত। বছরের পর বছর এমন ঘটনা ঘটছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এলে তাকে পেয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা যেন শক্তি ফিরে পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের দুঃখের কথা শুনেছেন। তাদের আশ্বস্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে রোহিঙ্গারা আপ্লুত হয়েছেন। আশ্বস্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করেছেন। তারাও জানিয়েছেন, নিজেদের বাপ-দাদার ভিটায় ফিরতে চান। কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মফিজ মিয়া নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, আমরা নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছে আসায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমরা নিজের বাপ-দাদার ভিটায় ফিরতে চাই। বাংলাদেশ যদি সেটা করে দিতে পারে, আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। আমরা সেখানে নিরাপদে থাকব, সেটার নিশ্চয়তা পেলেই যেন আমাদের মিয়ানমার পাঠানো হয়।

আবদুল মাজেদ চার সন্তান ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বুচিঢং থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। তারা এখন কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। মাজেদ বলছিলেন, আমাদের মিয়ামনারে সব পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে গেলে আমাদের ওপর আবারও নির্যাতন করা হবে। তবে আমরা জীবনের নিশ্চয়তা পেলে মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাই।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশু খাদ্যের সংকট : রোহিঙ্গাদের জন্য দেয়া ত্রাণসামগ্রীতে নেই শিশুদের কোনো খাবার। তাই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা পরিবারের শিশুদের খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। পাহাড়, বন-জঙ্গল ও নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা শিশুদের ধকল কাটছে না কোনোভাবেই। প্রতিটি পরিবারে গড়ে অন্তত ৪-৫টি শিশু রয়েছে। এদের অনেকেই অপুষ্টিসহ নানা রোগে ভুগছে। উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ঢাল, পালংখালী এবং টেকনাফের উনছি প্রাং ও মোছনি পাড়া এলাকার নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বর্তমানে শিশুরা খাদ্য সংকট ও আবাসের অভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কক্সবাজারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক নাসিমা ইয়াসমিন জানান, শরণার্থী নারী ও শিশুরা সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছেন। শিশুদের অবস্থা খুবই খারাপ। বালুখালী ও পুটিবুনিয়ায় দুইটি চিকিৎসা কেন্দ্র খুলা হয়েছে।

১১ মৃত বাচ্চার দাফন : টেকনাফের মোছনি নিবন্ধন ক্যাম্পের প্রবেশমুখে দু’দিনে অবস্থান নিয়েছেন কয়েকশ’ রোহিঙ্গা। পাশেই রয়েছে একটি নার্সারি। ওই নার্সারির মালিক জাহিদ হোসেন জানান, তার জানা মতে গত সপ্তাহে এখানে ১০ থেকে ১১টি বাচ্চার মৃত্যু জয়েছে। স্থানীয়রা এদের দাফনের ব্যবস্থাও করেছেন। খোলা আকাশের নিচে একেকজন মা ৫-৬ জন শিশু নিয়ে সপ্তাহজুড়ে থাকছেন। এতে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বালুখালী, কুতুপালং এলাকায় নিয়মিত ত্রাণ পেলেও এদিকে কম মানুষই ত্রাণ নিয়ে আসেন। শুকনো খাবার শিশুরা খেতে পারে না। সুফিয়া সুলতানা নামে এক রোহিঙ্গা নারী জানান, শনিবার রাতে তার দেড় বছরের বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে। এরপর স্থানীয়রা তাকে কবর দেয়। তার ঠাণ্ডাজনিত রোগ হয়েছিল।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত