আহমদুল হাসান আসিক, কক্সবাজার থেকে    |    
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৪:১০:০৭ প্রিন্ট
চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা
স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই
প্রতিদিন ঢুকছে নতুন রোহিঙ্গা পরিবার। বুধবার কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপ থেকে তোলা ছবি -যুগান্তর

মিয়ানমার থেকে আসা চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। তবে তাদের জন্য এখন পর্যন্ত ন্যূনতম স্যানিটেশন ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা রয়েছেন চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। এরই মধ্যে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ২০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) হিসাব বলছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই শিশু। এসব শিশু বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বাইরে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাবার স্যালাইনেরও তীব্র সংকট রয়েছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুততম সময়ে স্যানিটেশন নিশ্চিত করা না হলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যু মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি শিশুদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় মংদুতে রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘরে ফের আগুন দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেখান থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
রেড ক্রিসেন্টের কক্সবাজার এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একরাম এলাহী চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ দরকার। আমরা চেষ্টা করছি এ সমস্যা সমাধান করার জন্য। প্রাথমিকভাবে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালি ক্যাম্পের সম্প্রসারিত অংশে এক হাজার পরিবারের জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে ২০টি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বসানো হচ্ছে।

বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন তারা অভুক্ত নন। পেটপুরে খেতে না পারলেও তিন বেলা খাবার পাচ্ছেন। তবে তারা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এখন খাবার নয়, তাদের মূল সমস্যা স্যানিটেশন। কুতুপালং ক্যাম্পে গিয়ে কথা হয় আশ্রয় নেয়া হালিমা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বামী আকবর আলী ও চার সন্তান নিয়ে ৪ দিন আগে ছোট্ট একটি তাঁবু টানিয়ে বসবাস শুরু করেন। তাঁবুর পাশেই ছোট্ট গর্ত করে বাঁশ পুঁতে চারপাশে পলিথিন দিয়ে আড়াল করেছেন। ৭-৮টি পরিবারের নারী ও শিশু এ গর্তে মলত্যাগ করছেন। সেখান থেকে খুবই গন্ধ আসছিল। হালিমা বেগমের পাশে থাকা আমেনা খাতুন ও রহিমা বেগমও বলছিলেন, ক্যাম্পে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমেনা বেগমের কোলে ৫ বছরের শিশু সালমান দু’দিন ধরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে খাবার স্যালাইন এনে তাকে খাওয়ানো হচ্ছে। রহিমা বেগম বলছিলেন, ৫ দিনে তারা চার শিশুর মৃত্যুর খবর শুনেছেন। এসব শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। ক্যাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি তাঁবু পরপর ছোট্ট গর্ত তৈরি করে অস্থায়ী টয়লেট বানানো হয়েছে। ওই টয়লেটের পাশে রান্না হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা অস্থায়ী টয়লেটের পাশে বসে খাচ্ছেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা চেষ্টা করছি আশ্রয়ের পাশাপাশি স্যানিটেশন নিশ্চিত করার জন্য। কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের ইনচার্জ রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন, দেয়া হচ্ছে পরিচয়পত্র : বুধবার কুতুপালং রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকশ’ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। পাশেই  নিবন্ধনকৃতদের দেয়া হচ্ছে লেমিনেটিং করা আইডি কার্ড। পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছে পাসপোর্ট অধিদফতর।
এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরের ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর (এমআরপি অ্যান্ড এমআরভি) লে. কর্নেল ফয়সাল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, কুতুপালংয়ে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রম ৬টি বুথে করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত (বুধবার দুপুর ২টা) চার শতাধিক রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় ৮-১০ জন রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা সম্ভব হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে টেকনাফের নয়াপাড়ায় আরও একটি ক্যাম্প স্থাপন করে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছে ১৬০ রোহিঙ্গা হিন্দু পরিবার : কুতুপালংয়ে বাবা লোকনাথ মন্দির এলাকায় মিয়ানমার থেকে আসা ১৬০ রোহিঙ্গা হিন্দু শরণার্থী পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, মন্দিরের পাশের বিভিন্ন বাড়ি এবং একটি পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় নিয়েছে তারা। পরিবারের সদস্যরা জানান, ২৫ আগস্ট মংডুর ফকিরাবাজার ও চিকনছড়ি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা নারী-পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ কারণে তারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। উখিয়া উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক স্বপন শর্মা রনি যুগান্তরকে বলেন, এখানে আশ্রয় নিয়েছে ১৬০ পরিবারের ৫৩৭ সদস্য।
নাফ নদীতে ভেসে আসছে লাশ : আমাদের টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, নাফ নদীতে ভেসে উঠছে একের পর এক রোহিঙ্গার লাশ। মিয়ানমার সরকারের তাণ্ডবের মুখে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসার পথে না খেয়ে, নৌকাডুবিতে এবং সে দেশের বিজিপির গুলিতে রোহিঙ্গাদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজার, টেকনাফ ও বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে ১০২ রোহিঙ্গার লাশ পাওয়া গেছে। যাদের লাশ বাংলাদেশ সীমান্তে ভেসে আসছে, তাদের তথ্য জানা গেলেও মিয়ানমার সীমান্তে আরও কত রোহিঙ্গার লাশ ভাসছে- সে খবর এপার থেকে জানা সম্ভব হচ্ছে না।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় নাফ নদী থেকে আরও সাত রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সকালে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয় বলে জানান টেকনাফ থানার ওসি মো. মাইনউদ্দিন খান। তিনি বলেন, সাতজনের মধ্যে তিনজন নারী, বাকিরা শিশু। স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ পয়েন্ট থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে। মৃত তিন নারীর পরনে রয়েছে বার্মিজ থামি ও ব্লাউজ। বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের সময় কোনো নৌকাডুবির ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। এর আগে মঙ্গলবার রাতে নাফ নদীর একই পয়েন্টে আরও দুই রোহিঙ্গা শিশুর লাশ পাওয়া যায়।
মিয়ানমারের রাখাইনে কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়ি ও একটি সেনা ক্যাম্পে ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর সেখানে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়। তখন থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্রোত চলছে। রাখাইনে পুড়িয়ে দেয়া গ্রামগুলো থেকে হেঁটে যারা বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে পারছেন, তারা মংডু থেকে মাছ ধরার নৌকায় নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফে পৌঁছার চেষ্টা করছেন। কারও কারও শরীরে গুলির চিহ্ন ছাড়াও শরীরে কোপানের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে।
চোখের সামনে মা-ভাইকে পুড়িয়ে হত্যা : রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ওই পরিবারের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা শুনেছেন আমাদের টেকনাফ প্রতিনিধি। তারা জানিয়েছেন, রাখাইনের গ্রামে গ্রামে নৃশংস বর্বরতা চালিয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ। অভিযানের প্রথম দিনেই তারা শোয়াপ্রাং গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে, পুড়িয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে। গ্রামের দুই শতাধিক বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। বাড়িঘরে আগুন লাগানোর পর পলায়নরত  অসহায় মানুষের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়েছে। এমনকি নিহতদের জানাজা ও দাফন পর্যন্ত করতে দেয়নি বর্বর সেনাবাহিনী। রাখাইনের শোয়াপ্রাং গ্রামের কৃষক ইউনুছ, সৈয়দুল আমিন, শামসুল আলম, বশির আহমদসহ অনেকের কথায় সে দিনের নৃশংস হামলার বর্ণনা ফুটে উঠে। ইউনুছ জানান, স্থানীয় মগ যুবক, সেনা ও বিজিপির যৌথ হামলায় চোখের সামনেই তার পরিবারের ৪ জন নিহত হয়। তিনি বলেন, বাড়িতে আগুন দিয়ে সেই আগুনে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয় আমার মাকে। গুলি করে হত্যা করা হয় ভাই আবদুল জলিল, ভাতিজা সরোয়ার কামাল ও রেজোয়ানকে।
মংডুর দোরাবিলে রোহিঙ্গা গ্রামে ফের আগুন : রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘরে ফের আগুন দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় মংডুর উত্তর পাশে দোরাবিল এলাকায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। টেকনাফে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা জানান, মংডুর উত্তর পাশে দোরাবিল এলাকার বাড়ি-ঘরে আগুন জ্বলছিল সন্ধ্যা ৬টার দিকে। মাগরিব নামাজের আগে পূর্বপাড়া পুরোটা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পরে পুড়েছে পশ্চিমপাড়া।
রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়ার পর প্রাণ বাঁচাতে বুধবার সন্ধ্যার পর মোহাম্মদ জোহার ও আবদুল মোতালেব পালিয়ে এসেছেন। তারা গণমাধ্যমকে বলেন, বাড়িঘর ফেলে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছি। পূর্বপাড়া পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। পশ্চিমপাড়াও জ্বলছে।
মঙ্গলবার শেষবারের মতো মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এরপরই ছোট ছোট গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশে সীমান্ত ঘেঁষে থাকা গ্রাম দোরাবিল গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। স্থানীয়রা বাড়িঘর ফেলে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by