• বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৭
শাহ আলম খান    |    
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ভিশন-২১ রূপকল্প বাস্তবায়ন
উচ্চমধ্যম আয়ের পথে বড় দুই ঝুঁকি
আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা * রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ, সঙ্কুচিত হবে মাথাপিছু আয়
উচ্চমধ্যম আয়ের লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় দুই ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। একটি হল ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা এবং অন্যটি হল সোয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার বাড়তি চাপ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দাবি করা হয়, নির্বাচনী বছরগুলোতে সাধারণত জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যায়। এই শঙ্কা সব সরকারকেই তাড়া করে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ২.৬ শতাংশ থেকে সর্বনিন্ম ০.৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। অন্যদিকে প্রতিবেশী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতায় সেখান থেকে আসা সোয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা ও তাদের আগামী প্রজন্ম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করতে পারে। এতে বিশেষ করে ভোগব্যয়, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা এবং মানব উন্নয়ন সূচকের প্রত্যাশিত উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের দারিদ্র্য ও শ্রেণীবৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলবে। এটি দেশের কাক্সিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরতে বাধ্য। এতে সংকুচিত হবে মাথাপিছু আয়ও। উচ্চমধ্যম আয়ের পথে বাংলাদেশের ঝুঁকি অনুসন্ধান এবং ভিশন-২১ এর রূপকল্প অর্জনের বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
উচ্চমধ্যম আয়ের লক্ষ্য অর্জনে পথচলা শুরু করেছে বাংলাদেশ। লক্ষ্য হল ২০২১ সালের মধ্যে এ সীমারেখায় পৌঁছানো। বর্তমানে নিন্মমধ্যম আয়ের কাতারে থাকা বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৬০২ মার্কিন ডলার। এই সময়ের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের স্তরে দেশকে নিয়ে যেতে হলে বর্তমান মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে আরও যোগ করতে হবে ২৫২৪ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে বাড়াতে হবে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও। এখন পর্যন্ত (২০১৬-১৭ অর্থবছর) ৭.২ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। উচ্চমধ্যম আয়ের জন্য এই প্রবৃদ্ধির হার ২.৮ শতাংশ বাড়াতে হবে। আবার প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেই উচ্চমধ্যম আয়ের স্তরটি নিশ্চিত হবে না। এর পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৈষম্য দূরসহ আনুষঙ্গিক অন্য সূচকেও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখানোর প্রয়োজন হবে। তবে সরকারের এই রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য হাতে রয়েছে মাত্র সাড়ে চার বছর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাংকের ক্যাটাগরিতে মধ্যম আয় বলতে কিছু নেই। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বের হওয়ার পর ওই দেশকে নিন্মমধ্যম আয়ের দেশ অথবা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় রেখে দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয় ১০৪৬ ডলার থেকে ৪১২৫ ডলারের মধ্যে থাকলে দেশটিকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ এবং ৪১২৬ ডলার থেকে ১২,৭৩৬ ডলারের মধ্যে থাকলে দেশটিকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ বলে বিবেচনা করা হয়। জাতিসংঘের স্বীকৃতি না পাওয়া গেলেও বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয় ১৬০২ ডলার অর্জনের মাধ্যমে নিন্মমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখন লক্ষ্য উচ্চমধ্যম আয়ে পৌঁছানোর। সরকারের দাবি ২০২১ সালের মধ্যে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সম্পদ বাড়ে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটে। এতে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার উন্নতি হয়। কিন্তু বাস্তবতা হল নির্বাচনের বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে যায়। মানুষের আয়-উপার্জনও কমে যায়। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল রাজনৈতিক অস্থিরতা। মতভেদ সৃষ্টি হলে অথবা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সহিংস কর্মসূচি পালন করা হলে সম্পদের অপচয় হয়। মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। উৎপাদন বন্ধ থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যায়। তিনি আরও বলেন, আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার সার্বিক প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত জীবনযাত্রা ছোট অর্থনীতির বাংলাদেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার হিসাব-নিকাশকে পাল্টে দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অর্থনীতির একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরে পৌঁছাতে হলে কিছু অনুমান ভিত্তি ও প্রক্ষেপণ ধরার প্রয়োজন হয়। তবে সবই যে স্বতঃসিদ্ধ ও অর্জনযোগ্য হবে- এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। সেটি নির্ভর করে দেশীয় অর্থনীতির বৈশ্বিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ নীতি কৌশলের বাস্তবসম্মত প্রয়োগের ওপর। বর্তমানে অর্থনীতিতে পরিকল্পনা অনেক হলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা কম। সেটা আর্থিক ও দক্ষতা উভয় দিক থেকেই। ফলে ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই অনুমান ভিত্তি কতটা বাস্তবভিত্তিক থাকবে এবং প্রক্ষেপণগুলোও কতটা অর্জনযোগ্য হবে সেটি জোর দিয়ে বলা যায় না।
অর্থনীতিবিদরা হিসাব করে বলেছেন, ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে কমপক্ষে ৪১২৬ ডলারে স্পর্শ করতে হবে। অর্থাৎ আগামী সাড়ে চার বছরে মাথাপিছু আয় আরও ২৫২৪ ডলার বাড়াতে হবে। প্রতি বছর প্রায় ৫৬১ ডলার বাড়তি আয় যোগ করতে হবে। অথচ দেশে দুই অর্থবছর মিলে মাথাপিছু আয় বেড়েছে মাত্র ২৮৬ ডলার। ফলে এই অল্প সময়ে কাক্সিক্ষত মাথাপিছু আয় অর্জন প্রায় অসম্ভব। একইভাবে এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেভাবে এগোচ্ছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের পক্ষে ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন। কারণ কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছতে হলে প্রতি বছর গড়ে ০.৭ শতাংশ হারে অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ হিসেবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল ৭.৯ শতাংশ। একইভাবে ২০১৮-১৯ এ ৮.৬ শতাংশ, ২০১৯-২০২০ এ ৯.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দরকার। তাহলে রূপকল্প অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ও সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করে অনেক দেশকে পেছনে ফেলে অনেক আগেই আমরা নিন্মমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে গেছি। এ কারণে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা আমাদের আরও বেশি। সরকার সে অনুযায়ীই অর্থনৈতিক সংস্কারসহ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তবে অস্বীকারের উপায় নেই- উচ্চমধ্যম আয়ের এ স্তরটি অতিক্রম করা খুব কঠিন। অনেক শক্তিধর অর্থনীতির দেশগুলোরও এক দশক থেকে দুই দশক সময় লেগেছে। তবে আমাদের হয়তো অতটা সময় লাগবে না। প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় ভিশন-২১ এর মধ্যেই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে পারব। তবে এই স্তরে পৌঁছতে যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় সেটা অর্থনীতিতে টেকসই রূপ দিতে হয়তো ২০৩০ সাল পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, নিঃসন্দেহে এ দুটি ঝুঁকি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মোকাবেলা করতে হবে। তবে রাজনীতি দায়িত্বশীল হলে নির্বাচনের বছরও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। এখন রাজনীতি কতটা দায়িত্বশীল থাকবে সেটাই প্রশ্ন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম যুগান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। এটা স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল পুষতে হবে। তাদের সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করতে হবে। এতে বিশেষ করে ভোগব্যয়, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা এবং মানব উন্নয়ন সূচকের প্রত্যাশিত উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের দারিদ্র্য ও শ্রেণীবৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলবে। এতে দেশের কাক্সিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরতে বাধ্য। সংকুচিত করবে মাথাপিছু আয়ও।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত