কুষ্টিয়া প্রতিনিধি    |    
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০৫:৫৯:৪৬ প্রিন্ট
শিক্ষকের কটূক্তি ও অপমানে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

কুষ্টিয়ায় শিক্ষকের কটূক্তি আর পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার অভিমানে আত্মহত্যা করেছে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ডালিম খাতুন। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কেএসএম কলেজিয়েট স্কুলের এই শিক্ষার্থী মঙ্গলবার আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তার আত্মহত্যার কারণ জানাজানি হয় বুধবার। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বুধবার দুপুর ১২টার দিকে স্কুল ঘেরাও করে দায়ী শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেছেন। ডালিম মিরপুর উপজেলার কবরবাড়িয়া গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক আকবর আলীর মেয়ে। ৫ ছেলেমেয়ের মধ্যে ডালিম সবার ছোট।

ডালিম খাতুনের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার অষ্টম শ্রেণীর মডেল টেস্ট শুরু। তাই আগের দিন মঙ্গলবার স্কুলে প্রবেশপত্র আনতে যায় ডালিম। স্কুলের সহকারী শিক্ষক মামুনুর রশিদ মাসুদের কাছে প্রবেশপত্র চাইলে তিনি জানান, সে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। কারণ রেজিস্ট্রেশনের জন্য টাকা জমা দেয়া হয়নি। তাই তার প্রবেশপত্র নেই। শিক্ষক মাসুদের এ কথায় হতবাক হয় ডালিম। সে বলে, ‘আপনার (মাসুদ) হাতেই আমি ও আমার ভাই এসে টাকা জমা দিয়েছি। স্যার আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।’ ডালিমের এমন কথায় রাগান্বিত হয়ে শিক্ষক মাসুদ বলেন, ‘তোমার পরীক্ষা দিয়ে কাজ নেই। তোমার তো চেহারা খুব সুন্দর, তুমি মডেল টেস্ট না দিয়ে মডেলিং করো। এতে ভালো করবে।’ শিক্ষক মাসুদের এমন কথা শুনে ডালিম যায় অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল ইসলাম ডাবলুর কাছে। ডাবলুও কোনো সমাধান না দিয়ে উল্টো তাকে স্কুল থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। দুপুর প্রায় ১২টার দিকে হতাশ ডালিম বাড়িতে ফিরে যায়। মাকে ঘটনা খুলে বলে। মামাতো ভাই রোমেল হোসেনকে মোবাইল ফোনে পুরো ঘটনা জানায়। এরপর হতাশ ডালিম বিকালে নিজ ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না প্যাঁচিয়ে ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে।

গত বছর অসুস্থতার কারণে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি ডালিম। এবার পরীক্ষায় অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল- জানিয়ে ডালিমের মা ফুলি বেগম বলেন, বাড়িতে পোষা মুরগির ডিম আর দুধ বিক্রির টাকা জমিয়ে অনেক কষ্টে মেয়ের রেজিস্ট্রেশন করা হয়। প্রায় তিন মাস আগে রেজিস্ট্রেশন শুরু হলে ডালিম মাসুদ স্যারের কাছে টাকা জমা দিয়ে আসে। পরে মঙ্গলবার সে প্রবেশপত্র আনতে যায়। গিয়ে জানতে পারে তার রেজিস্ট্রেশন হয়নি, তাই এবারও পরীক্ষা দিতে পারবে না। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডালিম রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার কারণ জানতে চায় মাসুদের কাছে। এ সময় মাসুদ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। একপর্যায়ে সে ডালিমকে বলে, ‘তোমার লেখাপড়া করার দরকার নেই, তোমার চেহারা তো খুব সুন্দর। তাই মডেলিং করো বা সিনেমায় নেমে পড়।’ এরপর ডালিম বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল ইসলাম ডাবলুর কাছে যায়। তিনিও পাত্তা দেননি ডালিমকে। উল্টো তিনি ডালিমকে বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এ অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসে সে। পরে বিকালে ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না প্যাঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। ফুলি বেগম আরও বলেন, তারা (মাসুদ ও ডাবলু) আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে। আমি তাদের ছাড়ব না, থানায় মামলা করব।

ডালিমের বড় ভাই রুবেল হোসেন জানান, ৩ মাস আগে মডেল টেস্টে অংশ নেয়ার জন্য ছোট বোন ডালিমকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যান। স্কুলের সহকারী শিক্ষক মাসুদের কাছে ফরম পূরণ বাবদ টাকা দেন। ডালিমের মামাতো ভাই রোমেল হোসেন জানান, কেএসএম কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক মামুনুর রশিদ মাসুদ ও অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল ইসলাম দু’জনই ডালিমের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। ফোনে ডালিম তাকে সব বলেছে।

ডালিমের চাচা নুর হোসেন বলেন, আমরা জানতে পারি শিক্ষকের অসদাচরণের কারণে ডালিম আত্মহত্যা করেছে। এলাকার লোকজন মাসুদ ও অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল ইসলাম ডাবলুর কাছে খারাপ ব্যবহারের কারণ জানতে চান। তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অসংলগ্ন কথা বলেছেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে আমরা শিক্ষকদের শাস্তি চাই।

স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কবরবাড়িয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম জানান, ডালিমের আত্মহত্যার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ দায়ী। আমরা অভিভাবক হিসেবে এ মৃত্যুর জন্য অধ্যক্ষ ও সহকারী শিক্ষকের বিচার চাই।

বুধবার দুপুরে অভিযুক্ত শিক্ষক মামুনুর রশিদ মাসুদ প্রথমে রেজিস্ট্রেশনের ফরম পূরণের টাকা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। এর কিছুক্ষণ পর এলাকার কয়েকশ’ মানুষ ওই শিক্ষক ও অধ্যক্ষের শাস্তির দাবিতে বিদ্যালয় ঘেরাও করলে মাসুদ টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে, ডালিমের কাছ থেকে টাকা নিলেও তার নাম আমি খাতায় তুলতে ভুলে গেছি।’ তবে তিনি ডালিমের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন।

অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার কারণ জানতে ডালিম মঙ্গলবার তার কাছে এসেছিল। তবে তিনি তার (ডালিম) সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি বলে দাবি করেন। ডালিমের বাবা আকবর আলী তার মেয়ের আত্মহত্যার জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে শাস্তি দাবি করেছেন।

জগতি পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ আল আমীন জানান, বিষয়টি শুনেছি। তবে ডালিমের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাননি।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত