প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
দুই গ্রামে রাতভর পাহারা ভয়ে স্কুলে যায় না শিশুরা

আহমদুল হাসান আসিক, গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) থেকে ফিরে

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীর শিশুরা আতঙ্কে স্কুলে যায় না। এক বছর আগে হামলার ঘটনা শিশুদের মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল তা এখনও কাটেনি। এখানকার শিশুরা আগে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। এখন তারা ওই স্কুলে আর যেতে চায় না। নতুন স্কুল স্থাপন করার পরও তারা আর স্কুলে যেতে চায় না। শিশুরা এখনও সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা মনে রেখেছে। অনেক শিশু ঘুমের মধ্যে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে ওঠে। মঙ্গলবার ‘শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ স্মৃতি বিদ্যানিকেতন’- এর শিক্ষক পাউলুম মুরমু এসব কথা বলেন। এদিকে মাদারপুর-জয়পুর গ্রামের সাঁওতাল-বাঙালি সবাই আতঙ্কে রয়েছেন। সন্ধ্যার পর দুই গ্রামে অপরিচিত লোকের আনাগোনা বেড়ে যায়। শিশুদের মতো বড়দের ভয় ও আতঙ্ক কাটেনি। মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামে পালা করে রাতভর পাহারা দেন বাসিন্দারা।

মাদারপুর গির্জার সামনে বসে পাউলুমের সঙ্গে কথা বলার সময় তার পাশে বসেছিলেন থমাস হেমব্রম ও আবদুল খালেক। তারা দু’জনই পাউলুমের কথায় সায় দিচ্ছিলেন। পাশেই খেলছিল কয়েকজন সাঁওতাল শিশু। তাদের দেখিয়ে থমাস বলেন, এই শিশুরা সবাই বাগদা ফার্ম স্কুলে পড়ত। সাঁওতাল পল্লীতে হামলার পর থেকে ভয়ে তারা আর ওই স্কুলে যায় না। তাদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ স্মৃতি বিদ্যানিকেতন’ তৈরি করা হয়েছে। এ স্কুলেও শিশুরা যেতে চায় না। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। এক বছর আগে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় তিনজন নিহত হন। তাদের নামে স্কুলটি স্থাপন করা হয়েছে।

গত বছর ৬ নভেম্বর সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ, লুটপাট ও তিন সাঁওতালকে হত্যার পর থেকে মাদারপুর-জয়পুর গ্রামের সাঁওতাল-বাঙালি সবাই আতঙ্কে রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের নামে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। দেয়া হচ্ছে নানা হুমকিও। সন্ধ্যার পর দুই গ্রামে অপরিচিত লোকের আনাগোনা বেড়ে যায়। খামারের নিরাপত্তা কর্মীদের আনাগোনাও বাড়ে। এ কারণে শিশুদের মতো বড়দের ভয় ও আতঙ্ক কাটেনি। মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামে প্রতি রাতে ১৫ থেকে ২০ জন করে রাতভর পালা করে পাহারা দিতে হয়।

ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে করা মামলার বাদী থমাস হেমব্রম বলেন, নানাভাবে তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এখন গ্রাম থেকে কম বের হই। একান্ত প্রয়োজনে বের হলেও দল বেঁধে যাই। মামলায় স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদ, সাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আসামি হওয়ায় তাদের ইন্ধনে হামলা হয়েছে। তারা গ্রামে আবারও হামলা করতে পারে এই ভয়ে এখন রাতভর দুই গ্রাম পাহারা দেই।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর মানবেতর জীবন, আহতরা পাচ্ছে না চিকিৎসা : সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের অধিকাংশেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত হয়নি। মাদারপুর গ্রামে অনেক পরিবার বাঁশ ও সিমেন্টের বস্তা দিয়ে তৈরি খুপরি ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন। অনেকে আবার আশ্রয় নিয়েছে অন্যের বাড়িতে। উচ্ছেদ হওয়া অনেকেই জীবিকার তাগিদে অন্য এলাকায় চলে গেছেন। যারা আছেন তারা দুই বেলার খাবারও জোগাড় করতে পারছেন না।

ওই সময় ৩২ জন সাঁওতাল-বাঙালি আহত হন। আহতরা অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেন না। ভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, আহতদের দেখার কেউ নেই। তাদের চিকিৎসা তো দূরের কথা দুই বেলা খাবারও জোটে না। তাদের একজন বিমল কিসকু। তার পায়ে গুলি লেগেছিল। এখন চিকিৎসার অভাবে হয়তো তার পা কেটে ফেলতে হবে। শুধু বিমল নয়, আহতদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রয়োজন।

বিমল কিসকু বলেন, উচ্ছেদের পর পরিবার নিয়ে চলে গেছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে। তার তিন ছেলে-মেয়ে। বড় ছেলে স্বপন কিসকু এরই মধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। ছোট ছেলে শিপন কিসকু সপ্তম শ্রেণীতে ও মেয়ে গেজুলিনা কিসকু তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। স্ত্রী সিসিলিয়াকে স্বামীকে নিয়ে পড়ে থাকতে হয়। স্ত্রী সহায়তা ছাড়া তিনি চলতে পারেন না। মাইকেল মাড্ডি বলেন, হামলার সময় পুলিশের ছোড়া গুলিতে তিনি আহত হন। মাথা ও মুখমণ্ডলসহ তার সারা শরীরে স্পি­ন্টার। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মাদারপুরে। শরীরে গুলি থাকায় তিনি রোদে বের হতে পারেন না। বের হলেই সারা শরীরে ঝিম ধরে যায়। শরীর উত্তপ্ত হতে থাকে। চিকিৎসা করানোর টাকা নেই। আগে মাইকেল দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন স্ত্রীকে তিনি কামলা দিয়ে যা পান তা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে তাদের।

উচ্ছেদ হওয়ার পর পরিবার নিয়ে জয়পুরে আশ্রয় নিয়েছেন আবদুল খালেক ও দ্বিজেন টুডু। দ্বিজেন টুডুর বাম চোখে গুলি লেগেছে। ঢাকায় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে একটি সংস্থার সহায়তায় তার চিকিৎসা হয়েছিল। এখন আর তার কোনো খবর কেউ রাখেন না। ধীরে ধীরে তার চোখটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্বিজেন টুডুর স্ত্রী ওলিবিয়া হেমব্রম বলেন, ভালোই চলছিল সংসার। দ্বিজেন কবিরাজি করতেন। এখন তাদের ঘর নেই। তিন ছেলেকে নিয়ে পড়েছি অথই সাগরে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত