হামিদ-উজ-জামান    |    
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে দূতাবাস
সুদহার ৪২ শতাংশ বাড়াচ্ছে জাপান
বিশ্বব্যাংকের পর এবার ঋণে সুদের হার বাড়াচ্ছে দেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপান। বর্তমানে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে সুদ। ফলে সুদের হার এক লাফে বাড়ছে শতকরা ৪২ শতাংশ। এজন্য জাপান দূতাবাস থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই এ বর্ধিত সুদের হার কার্যকর করতে চায় দেশটি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো জবাব দেয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে যখন ১০ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে সংকট, বন্যায় ব্যাপক ফসলহানিসহ বিভিন্ন কারণে দুঃসময় যাচ্ছে তখন উন্নয়ন সহযোগীদের সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি সরকার ভালোভাবে নেয়নি। এর আগে চলতি বছরই চলমান ৩৮তম ঋণ প্যাকেজের আওতায় আরও একবার সুদ হার বাড়ায় দেশটি। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাবে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে চড়া সুদের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সুদহার ২ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ অবস্থার পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। বৃহস্পতিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, অন্যান্য দেশ চড়া সুদে ঋণ নেয়ায় উন্নয়ন সহযোগীদের সুদ বাড়াতে উৎসাহিত করছে। তাছাড়া দরকষাকষির দুর্বলতা এবং সরকারের অভ্যন্তরে দাতাদের সুবিধাভোগী সমর্থক গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে এরকম হচ্ছে। তবে চড়া সুদে ঋণের বোঝা বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়েই পড়বে। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বোঝার সৃষ্টি করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,গত ১১ অক্টোবর জাপান দূতাবাস থেকে সুদের হার বাড়ানোর চিঠি দেয়া হয়েছে। সেই চিঠিতে বলা হয় ২০১৩ সাল থেকে প্রতিবছর দু’বার অর্থাৎ এপ্রিল এবং অক্টোবর মাসে ঋণের সুদ এবং শর্তসমূহ পর্যালোচনা করে থাকে। এরই অংশ হিসেবে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে অক্টোবর মাসের পর্যালোচনা করে বিস্তারিত পাঠানো হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর ওপর যাতে চাপ সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এই পর্যালোচনার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঋণের সুদ হার শর্ত বাস্তবসম্মত এবং প্রতিযোগিতামূলক করা। এই চিঠির সঙ্গে যুক্ত কাগজপত্রে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঢাকা কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, এটা দূতাবাসের ব্যাপার। আমাদের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা হয়তো জানেন। কিন্তু আমি এখনও জানি না। ঋণ সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, সম্প্রতি দু’দফা বন্যার কারণে দেশে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। সেই সঙ্গে অতিবৃষ্টির ফলে সারা দেশেই অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলোর সংস্কারে বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন। এছাড়া যেখানে বাংলাদেশ চাল রফতানি শুরু করেছিল, সেখানে এখন মিয়ানমারের মতো দেশ থেকেও চাল আমদানি করতে হচ্ছে। গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। আগামী ১৫ বছর পর স্থায়ীভাবে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করতে হবে, তার ওপর বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার বাড়তি চাপসহ এখন চলছে দুঃসময়। ঠিক এ মুহূর্তে জাপানের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। কেননা ১৯৭০ সালে জাপানের তখনকার সংসদ সদস্য তাকাসি হারাকাওয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। সে সময় থেকে বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ আচরণে সবসময়ই এগিয়ে ছিল জাপান। কিন্তু এ সময় সুদের হার বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ায় অর্থনীতির জন্য চাপ বাড়তে পারে।
সূত্র জানায়, গত এপ্রিলে শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সুদের হার করা হয় দশমিক ৭০ শতাংশ। সেই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সময় ৪০ বছর থেকে ১০ বছর কমিয়ে ৩০ বছর করা হয়েছিল। আবার নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে সুদের হার।
তবে বিষয়টি স্বাভাবিক বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি বলেন, সব সময় যে জাপান কম সুদে ঋণ দেবে এমনটা আশা করা যায় না। যেটুকু বাড়াচ্ছে তা অন্যান্য দেশের কাছ থেকে যে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট নেয়া হচ্ছে তার চেয়ে ১ শতাংশ অনেক সহনীয়। তবে মনে রাখতে হবে এ অর্থে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে সেগুলো যেন কার্যকর হয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানায়, চলমান ৩৮তম ঋণ প্যাকেজের আওতায় মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বাংলাদেশের ৬ প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৭৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ইয়েন দিচ্ছে জাপান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। এজন্য জাইকার সঙ্গে গত জুলাইয়ে ইআরডির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ঋণের অর্থে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে সেগুলো হচ্ছে,হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৭৬ দশমিক ৮২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন ব্যয় করা হবে। এছাড়া মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ারড পাওয়ার প্লান্ট প্রজেক্টে ১০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ইয়েন। কাঁচপুর-মেঘনা এবং গোমতি দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতুর সংস্কার প্রকল্প-(দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫২ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ইয়েন ব্যয় হবে। ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট (মেট্রোরেল) প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ইয়েন, ঢাকা আন্ডারগ্রাউন্ড সাবস্টেশন কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ২০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইয়েন এবং স্মল স্কেল ওয়াটার রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ-২) বাস্তবায়নে ১১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ইয়েন ব্যয় করা হবে। জাইকা কার্যালয় জানায়, চুক্তি সই হলেও এখনও অর্থছাড় শুরু হয়নি। সাধারণত এক বছরের জন্য ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করে জাইকা। এর আগে ৩৭তম ঋণ প্যাকেজের আওতায় ৬টি বড় প্রকল্পে মোট ১৭৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৮১৯ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে সংস্থাটি। গত বছরের জুনে এ বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল।
সূত্র জানায়, জানায়, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপান-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক উত্তরোত্তর শক্তিশালী হয়েছে। জাপান এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ১ লাখ কোটি ইয়েন (স্থানীয় মুদ্রায় প্রতি ইয়েন ৭৪ পয়সা হিসাবে ৭৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ, ৫০ হাজার কোটি ইয়েন অনুদান এবং সাড়ে ৬ হাজার কোটি ইয়েন কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত