বর্ষায় কেন বাড়ে পেটের সমস্যা? জেনে নিন কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্ষাকাল অনেকের কাছেই আনন্দের। তবে যাদের ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম’ (আইবিএস) বা পেটের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই ঋতুটি বেশ কষ্টের কারণ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ও পরিবর্তনশীল আবহাওয়া এবং আর্দ্রতা পেটের এই জটিল সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
আইবিএস হলো মূলত পরিপাকতন্ত্রের এমন একটি সমস্যা যেখানে অন্ত্র এবং মস্তিষ্কের মধ্যকার সমন্বয় বা যোগাযোগ ঠিকঠাক কাজ করে না। এর ফলে পেট ফাঁপা বা ফুলে থাকা, ঘন ঘন মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন হওয়া এবং পেটে তীব্র ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস’-এর তথ্যমতে, আবহাওয়া যখন অনিয়মিত বা পরিবর্তনশীল হয়, তখন আইবিএস রোগীদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
ভারতের গুরগাঁওয়ের সিকে বিড়লা হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের ডিরেক্টর ড. অনুক্লপ প্রকাশ বলেন, ‘বর্ষাকাল সরাসরি আইবিএস-এর জন্ম না দিলেও, এই ঋতুর কিছু চেনা বৈশিষ্ট্য সংবেদনশীল পরিপাকতন্ত্রের অবস্থাকে আরও নাজুক করে তোলে। ফলে পেট ফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা হঠাৎ টয়লেটের বেগ পাওয়ার মতো সমস্যা অনেক বেড়ে যায়।’
বর্ষায় আইবিএস বা পেটের সমস্যা বাড়ার প্রধান ৪টি কারণ
১. পানিশূন্যতা: বর্ষাকালে তাপমাত্রা কিছুটা কমে যাওয়ায় অনেকেই পানি কম পান করেন। ‘ইউরোপীয় জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, পানি কম খাওয়ার ফলে হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এর ফলে মল শক্ত হওয়া, তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
২. খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন: বর্ষার দিনে ভাজাপোড়া, খিচুড়ি বা রাস্তার ধারের স্ট্রিট ফুড খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চা-কফি পানের অভ্যাস এবং ফলমূল কম খাওয়া পেটের ভেতরের পরিবেশকে নষ্ট করে দেয়। এছাড়া অনিয়মিত সময়ে খাওয়ার অভ্যাস আইবিএস-এর সমস্যাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
৩. বর্ষাকালীন সংক্রমণ: বর্ষায় জ্যামিতিক হারে বাড়ে ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলাইটিস, ফুড পয়জনিং বা দূষিত পানির মাধ্যমে হওয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। এই সংক্রমণগুলো আইবিএস রোগীদের ক্ষেত্রে তীব্র ডায়রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদী পেট ব্যথার সৃষ্টি করে।
৪. মানসিক চাপ ও ঘুমের ব্যাঘাত: বর্ষার মেঘলা আবহাওয়া অনেকের মেজাজ বা মুডের ওপর প্রভাব ফেলে, যা পরোক্ষভাবে ঘুমের চক্রকে ব্যাহত করে। পরিপাকতন্ত্রের নিজস্ব একটি ঘড়ি বা শিডিউল থাকে।
ঘুম ও খাওয়ার সময় ওলটপালট হলে শরীর থেকে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, যা অন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
আপনার পেটের সমস্যাটি আইবিএস কিনা বুঝবেন যেভাবে:
- অ্যান্টাসিড খাওয়ার পরও যদি বারবার পেটে ব্যথা হতে থাকে।
- মলত্যাগের পর যদি পেটের অস্বস্তি বা ব্যথা কমে যায়।
- প্রায়ই পেট ফুলে বা ফেঁপে থাকে।
- কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য আবার কখনো ডায়রিয়ার সমস্যা পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে।
- মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা বাড়লে যদি পেটের সমস্যাও বেড়ে যায়।
বর্ষায় আইবিএস নিয়ন্ত্রণে রাখার ৭টি সোনালী নিয়ম
আইবিএস পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন এনে বর্ষাকালেও সুস্থ থাকা সম্ভব:
১. পর্যাপ্ত পানি পান: তৃষ্ণা না লাগলেও সারাদিনে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
২. নিরাপদ খাবার ও পানি: বাইরের খোলা খাবার এবং অনিরাপদ পানি সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।
৩. ভাজাপোড়া বর্জন: অতিরিক্ত তেল ও ছাঁকা তেলে ভাজা স্ন্যাক্স খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৪. নির্দিষ্ট সময়ে আহার: প্রতিদিনের খাবার একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা রুটিন মেনে খাওয়ার অভ্যাস করুন।
৫. পর্যাপ্ত ঘুম: পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো অত্যন্ত জরুরি।
৬. মানসিক চাপ মুক্ত থাকা: দুশ্চিন্তা কমাতে নিয়মিত ইয়োগা, ধ্যান বা হালকা ব্যায়াম করতে পারেন।
৭. ফুড ডায়েরি রাখা: কোন খাবারগুলো খেলে পেটের সমস্যা বাড়ছে, তা একটি ডায়েরিতে লিখে রাখুন এবং সেই খাবারগুলো এড়িয়ে চলুন।
কখন জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি আইবিএস-এর উপসর্গের পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের (পেটের রোগ বিশেষজ্ঞ) পরামর্শ নিতে হবে:
- মলের সঙ্গে রক্ত গেলে।
- কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে।
- অনবরত বমি হলে।
- শরীর অতিরিক্ত পানিশূন্য হয়ে পড়লে।
- ডায়রিয়ার সঙ্গে তীব্র জ্বর থাকলে।
- ৫০ বছর বয়সের পর প্রথমবার এই ধরনের পেটের সমস্যা দেখা দিলে।
সবশেষে বর্ষার দিনগুলোতে নিজের খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি একটু বাড়তি নজর দিলেই আইবিএস-এর অস্বস্তি থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
সূত্র: এনডিটিভি

