প্রাত্যহিক জীবনে সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ির প্রভাব

  মো. ওসমান গনি শাহেদ ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

দেহঘড়ির
দেহঘড়ির

আপনি বিকালে ঝিরিঝিরি বাতাসে হাঁটছেন আর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে করছে? কিংবা রাতের আকাশে চাঁদ দেখে রোমাঞ্চিত হচ্ছেন? আচ্ছা, এ দুটোর একটিও আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে আপনি নিশ্চয়ই কখনও না কখনও পড়ার টেবিলে বসে ঝিমিয়েছেন!

আপনার মনে কখনও প্রশ্ন জেগেছে কি? এগুলোর পেছনে কি কারণ জড়িত? আমরা সবাই হয়তো এগুলোকে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার মনে করি! কিন্তু আসলে কি তাই?

এসব কিছুর পেছনে খুব মজার একটি ব্যাপার জড়িত। যার নাম "সার্কিডিয়ান রিদম" বা সার্কিডিয়ান ছন্দ। সোজাসাপ্টা বাংলায় এটিকে "দেহঘড়ি" বলা হয়। আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালমাস অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার সুপরাকিউজমেটিক নিউরন নিয়ে এটি গঠিত। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সবার মাঝে যে শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তন হয়ে থাকে তার জন্য দায়ী এই দেহঘড়ি বা সার্কিডিয়ান রিদম। মস্তিষ্কে অবস্থিত নিউরনকে আলোর মাত্রা একধরনের সংকেত প্রেরণ করে থাকে। উক্ত সংকেতের ওপর মানুষের শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা নির্ভর করে। যার ফলে দেখা যায় কেউ নির্দিষ্ট একটি সময়ে সতেজ অনুভব করে আবার কেউ দুর্বল অনুভব করে। এটি হয়ে থাকে সার্কিডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ির পার্থক্যের কারণে। প্রায় অধিকাংশ মানুষের সার্কিডিয়ান রিদম একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন বা কার্যকাঠামো অনুসরণ করে থাকে। সার্কিডিয়ান রিদমের প্রভাবে আমাদের দেহের তাপমাত্রা, ব্যথা অনুভূতি, মানসিক কার্যক্ষমতা, শারীরিক কার্যক্ষমতা, রক্তপ্রবাহ নির্ধারিত হয়ে থাকে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে সার্কিডিয়ান রিদমের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এবার দেখা যাক সার্কিডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি কীভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ভূমিকা পালন করে থাকে :

★সকাল ৬টা-৬:৪৫মিনিট : এ সময় আপনার দেহের রক্ত সঞ্চালন সবচেয়ে দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হয়ে থাকে। যেটি আপনাকে সারা দিনের পরিশ্রম করার জন্য প্রস্তুত করে গড়ে তুলে।

★সকাল ৭টা ৩০ মিনিট : মানবদেহে মেলাটোনিন গ্রন্থের নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে ঘুমের মাত্রা কমে যায়।

★সকাল ৮টা ৩০ মিনিট : মানুষের কার্যক্ষমতা নির্ধারণকারী নিউরনগুলো দিনের ধকল সামলানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।

★সকাল ৯টা : মস্তিষ্কে সর্বোচ্চ মাত্রায় টেস্টস্টোরেন নিঃসৃত হয়ে থাকে। টেস্টস্টোরেন হচ্ছে মানবদেহের কর্মোদ্যম নির্ধারক হরমোন। দৈনন্দিন জীবনে আপনাকে কর্মসচেতন থাকতে টেস্টস্টোরেন সাহায্য করে থাকে। মস্তিষ্কে টেস্টস্টোরেন নিঃসরণ মাত্রা কমতে থাকলে কাজের প্রতি আমাদের মনোযোগ কমতে থাকে।

★সকাল ১০টা থেকে ১১টা : এই এক ঘণ্টা সময়ে মানবদেহ দিনের সবচেয়ে বেশি কর্মোদ্যম থাকে। এ সময় যেকোনো কাজ খুব সহজে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে সম্পাদন করা সম্ভব। শরীরের কর্মোদ্যম টিস্যুগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থেকে আপনার জন্য যেকোনো কাজ বা পড়াশোনাকে খুব সহজ করে দেয়।

★দুপুর ১২টা : আপনার মস্তিষ্কে টেস্টস্টোরেনের নিঃসরণের মাত্রা কমতে থাকে।

★দুপুর ১টা : পাকস্থলী আপনার মস্তিষ্কে অবস্থিত নিউরনকে খাদ্যগ্রহণের জন্য সংকেত প্রেরণ করতে থাকে। কারণ আপনাকে কর্মক্ষম রাখতে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানীর প্রয়োজন হয়। এই সময়ে যেকোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। সঠিক সময়ে খাদ্যগ্রহণ করে না থাকলে টেস্টোরনের প্রবাহ খুব সংকোচিত হয়ে পড়ে এবং আপনার মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে।

★দুপুর ২টা৩০ মিনিট : খাদ্যগ্রহণের পর আপনার মস্তিষ্কে নিসৃত টেস্টস্টোরেনের মাত্রা মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় বিরাজমান থাকে। আবার সার্কিডিয়ান রিদমের পার্থক্যের কারণে কেউ কেউ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তাই চাইলে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন যেটি আপনার মস্তিষ্ক এবং শরীরকে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম দেবে এবং আপনাকে আরও বেশি কর্মোদ্যম করে তুলবে।

★বিকাল ৩টা ৩০ মিনিট : এই সময়ে আপনার শরীর খুব কর্মতৎপর থাকে এবং যেকোনো কাজে দ্রুত সাড়া প্রদান করে।

★বিকাল ৫টা : আপনার কণ্ঠের মাংসপেশি এবং মস্তিষ্কের নিউরনগুলো দিনের সবচেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে। যেটি আপনার হৃৎপিণ্ডের কার্যাবলিকে সুসমন্বিত করে শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই সময়টাতে আপনার কণ্ঠ সবচেয়ে বেশি সুরেলা শোনাবে যেটি গান করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত! আর তাই তো বিকালে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কিংবা ছাদের রেলিংয়ে বসে আপনার অজান্তেই আপনি গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করেন!! এত দিন কি আপনি জানতেন? এর পেছনে আপনার দেহঘড়ি বা সার্কিডিয়ান রিদমই ভূমিকা রাখছে!

★সন্ধ্যা ৬টা : সারা দিনে পরিশ্রান্ত নিউরনগুলোতে স্থিতাবস্থা বিরাজ করে।

★সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট : দেহের রক্তসঞ্চালন সর্বোচ্চ মাত্রায় থাকে। যেটি আপনাকে পুনরায় কর্মসচেতন করে তুলে।

★সন্ধ্যা ৭টা : দেহের তাপমাত্রা দিনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করে। সারা দিনের কর্মতৎপরতা শেষে আপনার দেহকে পুনরায় সজীব করার শেষ প্রক্রিয়া এটি।

★রাত ৯টা : মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ শুরু হয়। মেলাটোনিন হরমোন আপনার মস্তিষ্কে ঘুমানোর জন্য সংকেত প্রেরণ করে থাকে। এ সময়টাতে আপনার দেহে হালকা ধাক্কা লাগে। কারণ মস্তিষ্কের নিউরনগুলো তাদের কার্যক্রমের ধরন পাল্টাতে থাকে। আর তাই আপনি পড়ার টেবিলে ঝিমিয়ে পড়েন! হুমম... ঠিক ৯টায়!

এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারলে আপনার পক্ষে আরও কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকা সম্ভব।

★রাত ১১টা ৩০ মিনিট : নিউরনগুলো আপনার মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাতে থাকে..... সব কাজ গুটিয়ে রাখুন, আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।

★রাত ১২টা : স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার দৈহিক ক্রিয়া শাটডাউন করে। আপনার পক্ষে চাইলেও আর কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব নয়। আপনার দেহের কোষ কিংবা মস্তিষ্কের নিউরনগুলো সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকে।

★রাত ২টা : নিদ্রা গভীর সময়। এই সময়টাতে মানুষের ঘুমের মাত্রা সবচেয়ে গভীর হয়ে থাকে। আবার কেউ মস্তিষ্কের বিপরীতে জোর করে কোনো কাজ করতে গেলে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। কারণ তখন ক্ষয়ে যাওয়া কোষগুলো পুনরায় গঠিত হতে থাকে।

★ভোর ৪টা : আপনার দেহে সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করে।

★সকাল ৬টা : ঘুমের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে উল্লিখিত সার্কিডিয়ান রিদম পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। (অবশ্য কারও কারও ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে।)

পরামর্শ : সর্বোচ্চ ফলাফল পেতে আপনার সার্কিডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি অনুযায়ী দৈনন্দিন কার্যতালিকা প্রণয়ন করুন। দিনের শুরুতে কঠিন কাজগুলো সম্পন্ন করুন বা জটিলতর বিষয়গুলো পড়াশোনা করুন। দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যান।

সার্কিডিয়ান রিদমের বিপরীতে জোর করতে যাবেন না, হিতে বিপরীত হতে পারে। সবার কর্মোদ্যম জীবন এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।।

লেখায় : মো. ওসমান গনি শাহেদ,বিবিএ ম্যানেজমেন্ট,কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন[email protected]এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। ]

 
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

gpstar

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter