পর্যটকবিহীন সেন্টমার্টিনে দুই মাস, কেমন আছি আমরা?
jugantor
পর্যটকবিহীন সেন্টমার্টিনে দুই মাস, কেমন আছি আমরা?

  সালেহ রেজা আরিফ, সেন্টমার্টিন (কক্সবাজার) থেকে  

১৫ মে ২০২০, ২০:৫৮:১৯  |  অনলাইন সংস্করণ

সেন্টমার্টিনে দুইমাস হলো পর্যটক হিসেবে শুধুমাত্র এই তিনজন অবস্থান করছেন। খোশগল্পের এক ফাঁকে তোলা ছবি।

সেন্টমার্টিনে মাস হিসেব করলে আজকে দুই মাস আর দিন হিসেব করলে ৬১ দিন হলো। সময়ের দিক থেকে মাস অথবা দিন হিসেব করলে অনেক দিন হবে। কিন্তু স্মৃতির পাতা থেকে খুবই কম সময় মনে হচ্ছে আমার কাছে। মনে হচ্ছে, এইতো সেদিন বুঝি এলাম আর এখনই ২ মাস হয়ে গেল!

এই দুই মাসের অভিজ্ঞতা খুবই অসাধারণ এবং বেচে থাকার শেষদিন পর্যন্ত স্মৃতির পাতায় থাকবে অমলিন। যা কখনো ভোলার নয়। কী নেই এই দুই মাসের স্মৃতির ঝুলিতে? কীভাবে অমাবস্যা থেকে চাঁদটা আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ হয়ে পূর্ণিমার মাধ্যমে আলোকিত করেছে পৃথিবীকে।

আবার একইভাবে পরিপূর্ণ চাঁদ থেকে বিলীন হয়ে অন্ধকার করে দিচ্ছে সবকিছু। কীভাবে জোয়ার-ভাটা তাদের রূপ পরিবর্তন করে অমাবস্যা আর পূর্ণিমার ওপরে নির্ভর করে। কখনো তাদের রূপ থাকে খুবই ভয়ংকর, যেন মনে হয় এখনই সব গ্রাস করে ফেলবে।

আবার কখনো তাদের রূপ খুবই শান্ত, যেন ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট সেই শিশুটি মায়ের কোলে ঘুমোচ্ছে নিশ্চিন্তে। কীভাবে পূর্ণিমা চাঁদের আলোয় সমুদ্রের গর্জন আর সঙ্গে কানে গুজে দেয়া হেডফোনে প্রিয় কোন গান শুনতে শুনতে পর্যটকবিহীন সমুদ্রের পাড় ধরে হাটা যায় নিশ্চিন্তে।

আবার সেই জায়গাটা অমাবস্যায় হয়ে যায় পুরোপুরি অচেনা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কখনো কখনো অন্ধকারে হাটতে গিয়ে পথ ভুল করে সমুদ্রের দিকে নেমে যাওয়া। আবার কখনো পাড়ের দিকে বড় কোন গাছের সংঘাত।

কীভাবে শহুরে যান্ত্রিক জীবনের ট্রাফিক সিগন্যাল, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নিলাম এই নির্জন দ্বীপের সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের মধ্যে। যেখানে নেই কোন যান্ত্রিকতা, ধোঁয়া বা কোন অস্বস্তিকর আওয়াজ। আছে শুধু প্রাণ খুলে নেওয়ার মত মুক্তবাতাস আর সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন।

সেন্টমার্টিনসমুদ্রপাড়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন লেখক সালেহ রেজা আরিফ

যা নিজেকে নিয়ে যায় অন্যরকম ভাল লাগার জায়গায়। কীভাবে মানিয়ে নিলাম সন্ধ্যার পরের টিএসসি অথবা ভিসি চত্বরে বসে চায়ের কাপে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জায়গায় সমুদ্রের পাশে একা একা বসে সমুদ্রের গর্জন শোনা অথবা শান্ত সমুদ্রের পাশে একা একা বসে প্রিয় কোন গান শুনতে শুনতে সময় কাটানো বা কোন স্মৃতিচারণ করা।

কীভাবে শহুরের ভাষার বদলে দ্বীপবাসীকে আরও কাছ থেকে জানার জন্য, বোঝার জন্য তাদের ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা এবং সেই ভাষা তাদের সঙ্গে প্রয়োগের পর তাদের ঠোটের কোনে ছোট হাসিটি বারবার আমার ব্যর্থ চেষ্টার কথা মনে করিয়ে দেয়।

কীভাবে দুপুরে ক্লাসের ফাঁকে হাকিম চত্বর গিয়ে খিচুড়ি অথবা আইবিএ ক্যান্টিনে গিয়ে খাওয়ার অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অথবা বাসায় আম্মাকে বলার সঙ্গে সঙ্গে খাবার আসার জায়গায় নিজেদেরই করতে হয় বাজার এবং নিজেদেরই করা লাগে সব রান্না-বান্না। তারপর প্লেটে আসে কাঙ্ক্ষিত খাবার।

কীভাবে শহুরে জীবনে চার দেয়ালের মধ্যে বসে পরিবার অথবা বন্ধুদের সঙ্গে কোন রেস্টুরেন্টে ঠাণ্ডা এসির নিচে বসে ইফতার করার জায়গায় সাগরের পাশে বসে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন আর নির্মল বাতাসে ইফতার করা।

এরকম আরও অনেক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা যা আসলেই কোন দিনই ভোলার নয় বা চাইলে ও ভুলতে পারবো না। পৃথিবী সুস্থ হয়ে যাবে, আমরাও ফিরে যাব আবার সেই যান্ত্রিক ব্যস্ত জীবনে। হয়ত ক্লাসে স্যারের লেকচারের অমনোযোগিতার সুযোগে অথবা জ্যামে বাইকের স্টার্ট অফ করে সিগন্যাল ছাড়ায় অপেক্ষারত মুহূর্তগুলোয় আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিবে জীবনের এই সোনালী দিনগুলো।

আর বারবার পিছুটান দিতে থাকবে আবারও ফিরে আসার জন্য। জীবনের শেষদিনগুলো হয়ত এই স্মৃতিগুলোকেই পুঁজি করে বেঁচে থাকবো এবং স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসবো এই নারিকেল জিঞ্জিরায়।

১৫.৫.২০২০, সেন্টমার্টিন

লেখক: সালেহ রেজা আরিফ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-[email protected]-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

পর্যটকবিহীন সেন্টমার্টিনে দুই মাস, কেমন আছি আমরা?

 সালেহ রেজা আরিফ, সেন্টমার্টিন (কক্সবাজার) থেকে 
১৫ মে ২০২০, ০৮:৫৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সেন্টমার্টিনে দুইমাস হলো পর্যটক হিসেবে শুধুমাত্র এই তিনজন অবস্থান করছেন। খোশগল্পের এক ফাঁকে তোলা ছবি।
সেন্টমার্টিনে দুইমাস হলো পর্যটক হিসেবে শুধুমাত্র এই তিনজন অবস্থান করছেন। খোশগল্পের এক ফাঁকে তোলা ছবি।

সেন্টমার্টিনে মাস হিসেব করলে আজকে দুই মাস আর দিন হিসেব করলে ৬১ দিন হলো। সময়ের দিক থেকে মাস অথবা দিন হিসেব করলে অনেক দিন হবে। কিন্তু স্মৃতির পাতা থেকে খুবই কম সময় মনে হচ্ছে আমার কাছে। মনে হচ্ছে, এইতো সেদিন বুঝি এলাম আর এখনই ২ মাস হয়ে গেল!

এই দুই মাসের অভিজ্ঞতা খুবই অসাধারণ এবং বেচে থাকার শেষদিন পর্যন্ত স্মৃতির পাতায় থাকবে অমলিন। যা কখনো ভোলার নয়। কী নেই এই দুই মাসের স্মৃতির ঝুলিতে? কীভাবে অমাবস্যা থেকে চাঁদটা আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ হয়ে পূর্ণিমার মাধ্যমে আলোকিত করেছে পৃথিবীকে।

আবার একইভাবে পরিপূর্ণ চাঁদ থেকে বিলীন হয়ে অন্ধকার করে দিচ্ছে সবকিছু। কীভাবে জোয়ার-ভাটা তাদের রূপ পরিবর্তন করে অমাবস্যা আর পূর্ণিমার ওপরে নির্ভর করে। কখনো তাদের রূপ থাকে খুবই ভয়ংকর, যেন মনে হয় এখনই সব গ্রাস করে ফেলবে। 

আবার কখনো তাদের রূপ খুবই শান্ত, যেন ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট সেই শিশুটি মায়ের কোলে ঘুমোচ্ছে নিশ্চিন্তে। কীভাবে পূর্ণিমা চাঁদের আলোয় সমুদ্রের গর্জন আর সঙ্গে কানে গুজে দেয়া হেডফোনে প্রিয় কোন গান শুনতে শুনতে পর্যটকবিহীন সমুদ্রের পাড় ধরে হাটা যায় নিশ্চিন্তে।

আবার সেই জায়গাটা অমাবস্যায় হয়ে যায় পুরোপুরি অচেনা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কখনো কখনো অন্ধকারে হাটতে গিয়ে পথ ভুল করে সমুদ্রের দিকে নেমে যাওয়া। আবার কখনো পাড়ের দিকে বড় কোন গাছের সংঘাত। 

কীভাবে শহুরে যান্ত্রিক জীবনের ট্রাফিক সিগন্যাল, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নিলাম এই নির্জন দ্বীপের সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের মধ্যে। যেখানে নেই কোন যান্ত্রিকতা, ধোঁয়া বা কোন অস্বস্তিকর আওয়াজ। আছে শুধু প্রাণ খুলে নেওয়ার মত মুক্তবাতাস আর সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন। 

সেন্টমার্টিন সমুদ্রপাড়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন লেখক সালেহ রেজা আরিফ

যা নিজেকে নিয়ে যায় অন্যরকম ভাল লাগার জায়গায়। কীভাবে মানিয়ে নিলাম সন্ধ্যার পরের টিএসসি অথবা ভিসি চত্বরে বসে চায়ের কাপে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জায়গায় সমুদ্রের পাশে একা একা বসে সমুদ্রের গর্জন শোনা অথবা শান্ত সমুদ্রের পাশে একা একা বসে প্রিয় কোন গান শুনতে শুনতে সময় কাটানো বা কোন স্মৃতিচারণ করা।

কীভাবে শহুরের ভাষার বদলে দ্বীপবাসীকে আরও কাছ থেকে জানার জন্য, বোঝার জন্য তাদের ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা এবং সেই ভাষা তাদের সঙ্গে প্রয়োগের পর তাদের ঠোটের কোনে ছোট হাসিটি বারবার আমার ব্যর্থ চেষ্টার কথা মনে করিয়ে দেয়।

কীভাবে দুপুরে ক্লাসের ফাঁকে হাকিম চত্বর গিয়ে খিচুড়ি অথবা আইবিএ ক্যান্টিনে গিয়ে খাওয়ার অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অথবা বাসায় আম্মাকে বলার সঙ্গে সঙ্গে খাবার আসার জায়গায় নিজেদেরই করতে হয় বাজার এবং নিজেদেরই করা লাগে সব রান্না-বান্না। তারপর প্লেটে আসে কাঙ্ক্ষিত খাবার। 

কীভাবে শহুরে জীবনে চার দেয়ালের মধ্যে বসে পরিবার অথবা বন্ধুদের সঙ্গে কোন রেস্টুরেন্টে ঠাণ্ডা এসির নিচে বসে ইফতার করার জায়গায় সাগরের পাশে বসে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন আর নির্মল বাতাসে ইফতার করা।

এরকম আরও অনেক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা যা আসলেই কোন দিনই ভোলার নয় বা চাইলে ও ভুলতে পারবো না। পৃথিবী সুস্থ হয়ে যাবে, আমরাও ফিরে যাব আবার সেই যান্ত্রিক ব্যস্ত জীবনে। হয়ত ক্লাসে স্যারের লেকচারের অমনোযোগিতার সুযোগে অথবা জ্যামে বাইকের স্টার্ট অফ করে সিগন্যাল ছাড়ায় অপেক্ষারত মুহূর্তগুলোয় আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিবে জীবনের এই সোনালী দিনগুলো।

আর বারবার পিছুটান দিতে থাকবে আবারও ফিরে আসার জন্য। জীবনের শেষদিনগুলো হয়ত এই স্মৃতিগুলোকেই পুঁজি করে বেঁচে থাকবো এবং স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসবো এই নারিকেল জিঞ্জিরায়। 

১৫.৫.২০২০, সেন্টমার্টিন

লেখক: সালেহ রেজা আরিফ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-[email protected]-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]