বর্ষায় বাংলার মোহনীয় রূপ

  হাসান মাহমুদ রিপন ১১ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৫:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

এসো হে সজল ঘন বাদল বরিষণে

বিপুল তব শ্যামল স্নেহে এসো হে এ জীবনে ॥

এসো হে গিরি শিখর চুমি ছায়ায় ঘেরা কানন ভূমি,

জীবন ছেয়ে এসো হে তুমি গভীর গরজনে ॥

অবিরাম বৃষ্টি মাঝে বর্ষার মন মোহনী রূপটি বাংলার প্রকৃতিকে সৌন্দর্যের মেলা বসায়। বর্ষার রূপবৈচিত্র্য দোলা দেয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এ বর্ষার কবিতায়।

এসেছে বর্ষাকাল। বর্ষা আসে নূপুর পায়ে ঝমঝমিয়ে। বর্ষার গুণগান গেয়ে কবিরা লেখেন কবিতা। ভাবুক মন হয় উতলা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান/মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে, এই যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান/ আজ এনে দিলে হয়তো দেবে না কাল, রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল/ এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতি স্রোতের প্লাবনে, ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান’। রবিঠাকুর বর্ষার রূপ গন্ধের সঙ্গে নিজেকে একাকার রেখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা ও গান। রবীন্দ্রনাথের উপস্থাপিত বর্ষা আজও আমাদের মধ্যে অনুরণন সৃষ্টি করে।

বর্ষাই তো বাংলার চিরায়ত রূপ। কখনও রিমঝিম গান গেয়ে বৃষ্টি নামের মিষ্টি মেয়েটি সুরে সুরে ভরিয়ে তোলে প্রকৃতি। আবার ঝুমঝুম নূপুর বাজিয়ে মুগ্ধ করে দেয় আমাদের মন। বর্ষায় খাল-বিল-পুকুর-নদী-ডোবা পানিতে থইথই করে। সবুজ সজীবতায় গাছপালা, বন-বনানী প্রাণ ফিরে পায়। আর কত ধরনের ফুল ফোটে এ বর্ষায়। খাল-বিলে বাংলার জাতীয় ফুল শাপলার অপরূপ দৃশ্য তো আছেই। শাপলা ও পদ্মও রূপ ছড়াতে কম যায় না।

কেয়া, কামিনী, হিজল, বকুল, জারুল, করবী ও সোনালু এসবও বর্ষা ঋতুতে ফুটে থাকতে দেখা যায়। আর জুঁই-চামেলিকে বাদ দেব কী করে। তবে বর্ষার প্রধান ফুল হল কদম। বৃষ্টিভেজা কদমের মনকাড়া সৌরভ ভিজে বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়ে সারা প্রকৃতিতে। অবশ্য এ দৃশ্য গ্রাম বাংলাতেই বেশি চোখে পড়ে।

বর্ষা মৌসুমে যখন চারদিক ভিজে ওঠে তখন আমাদের মনও হয় সিক্ত। মৌন নীলের ইশারায় আমাদেরও প্রাণে জেগে ওঠে অজানা কামনা। আমরা হয়ে উঠি মনে-মননে বর্ষামুখর। এ ঋতুর বিচিত্র রূপ শহর ও গ্রামে ভিন্ন ধরনের। সাধারণত গ্রামে বর্ষার শোভা অতুলনীয়। কারণ এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ মাঠঘাট প্রান্তর এক সবুজ শ্যামল গাছপালা ও ঝোঁপঝাড়। যেন ফিরে পায় তরতাজা নতুন জীবন। বর্ষাকে ঘিরে নানা ধরনের খেলাধুলা দেখা যায় গ্রামে।

যেমন কাবাডি খেলার মূল সময় কিন্তু বর্ষাকালেই। বর্ষার সময়টাতে মাটি থাকে ভেজা কর্দমাক্ত। আজ হয়তো কৃত্রিম উপায়ে অ্যাস্টোটার্ব মাঠে কাবাডি খেলা হয়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আমাদের গ্রামগঞ্জে বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই তরুণ যুবক ও বৃদ্ধরাও লুঙ্গি কাছা দিয়ে নেমে গেছে কাবাডি খেলায়। বর্ষাকে ঘিরে আবার বেশ কিছু পেশা সজীব হয়ে উঠে। যেসব নিচু ভূমিতে শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না সেসব ভূমি বর্ষা এলেই পানিতে ভরে ওঠে।

এটিই আমাদের প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। পায়ে হাঁটা পথগুলো সব বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। ফলে এসব ভূমি দিয়ে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের সঙ্গে নিকটতম হাট-বাজারের যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় পানিবাহন নৌকা। তাই মৌসুমি মাঝিদের দেখা পাওয়া যায়। যারা অন্য মৌসুমে হয়তো কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

বর্ষার মনোহর সৌন্দর্য দর্শন থেকে শহুরে মানুষরা অনেকখানি বঞ্চিত। ইট-কাঠ-পাথুরে জীবনে বর্ষার আগমন তাদের কাছে তেমন আনন্দের নয় বরং বর্ষা তাদের কাছে এক ধরনের উৎপাত ও বিরক্তিকর। তবে যারা ভাবুক মনের বর্ষার সৌন্দর্য তাদের কাছে অপূর্বভাবেই ধরা দেয়। তাই কবির লেখনীর স্পর্শে বর্ষা পায় নতুন রূপ। বর্ষা দরিদ্রের দুয়ারে নিয়ে আসে হতাশা। তাদের ক্ষুদ্র গৃহস্থালি বর্ষার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মাথা গোছার ঠাঁই নেই যাদের তাদের কষ্টটাই বেশি। পলিথিন মোড়া সংসার নিয়ে তারা যাযাবরের মতো কেবলই আশ্রয় খুঁজে ফিরে।

বর্ষাকাল মানেই আকাশ কালো করা ঘন মেঘের আনাগোনা, যখন-তখন ঝমঝমিয়ে পড়ে বৃষ্টি। পথেঘাটে কাঁদা পানি। ঘরে স্যাঁতসেঁতে ভাব। তাই তো কবি শামসুর রহমান বর্ষার বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন- ‘হঠাৎ আকাশ সাদা মুখটি কালো করে, কালো মেঘে বুকটি ফুঁড়ে পানি পড়ে/ ঝর ঝর ঝর একটানা বৃষ্টি ঝরে, বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি ঝরে’।

বর্ষার বৃষ্টি তো অন্যতম। বর্ষার আকাশে রহস্যঘেরা অন্ধকারে নিবিড় হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। কখনও পুরো আকাশ ঘন মেঘে ছেঁয়ে গেলেও বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় না। আবার কখনও বিনা মেঘেই শুরু হয়ে যায় তুমুল বৃষ্টি। নাগরিক যান্ত্রিক জীবনে বৃষ্টি প্রায়ই বেমানান। কিছুটা বিরক্তিকরও মনে হতে পারে। অরণ্য প্রকৃতির মাঝেই বৃষ্টি যেন বেশি মানানসই।

তাই তো কবিগুরু রবীঠাকুর তার নৌকাডুবি উপন্যাসে বলেছেন, ‘বর্ষা ঋতুটা মোটেই উপরে শহুরে মনুষ্য সমাজের পক্ষে তেমন সুখকর না, ওটা অরণ্য প্রকৃতির বিশেষ উপযোগী’। শহুরে জীবনযাপনে বেশির ভাগের কাছে বৃষ্টিটা বিড়ম্বনারই নামান্তর। আবার কখনও কখনও কাঠফাটা রোদ্দুরে ভ্যাপসা গরমে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত’ এ বৃষ্টিটিই তখন সবার কাছে হয়ে ওঠে চরম আরাধ্য বা পরম পাওয়া।

এ বৃষ্টিতে তপ্ত ধরণী মুহূর্তেই হয়ে ওঠে শীতল সজীব। সহসাই মন নেচে ওঠে ময়ুরের মতো করে। উচাটন মন তখন কিছুতেই ঘরে থাকতে চায় না। প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মনের অজান্তেই গেয়ে ওঠে কেউ- ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন/ কাছে যাবো, কবে পাবো/ ওগো তোমার নিমন্ত্রণ’।

বৃষ্টির দিনে কাক্সিক্ষত সেই প্রিয়জনকে কাছে পেলে বলে দেয়া যায় হৃদয়ের কোণে জমিয়ে রাখা সব কথা। বৃষ্টি হলে সোহাগিনী বর্ষাকে আমরা ছন্নছাড়া বৃষ্টিবনে রাগ করি। ঠিক ওই পর্যন্তই। কিন্তু আজ নগরায়নের ফলে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার পরিণতিতে বর্ষা দেখা দিচ্ছে নতুন রূপে বা নতুন চরিত্রে। তার ওপর আছে নগরজীবনে অপরিকল্পিত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা। এদেশের মানুষের জীবনাচারের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে অনেক। যে লোকটি এখন গ্রামে থাকেন তিনি আর তার গ্রামের ওপরই নির্ভরশীল নন।

নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন নগরজীবনের ওপর। অধিকাংশ মানুষের প্রিয় ফলটি পর্যন্ত এখন শহর থেকে কিনে নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়। তাই নগরজীবনের দুঃসহ জলাবদ্ধতা দেশবাসীকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নদীর নাব্যতা হারানোর ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশকে। বর্ষার সুবিধা-অসুবিধা থাকলেও বর্ষা অনেকেরই প্রিয় ঋতু। ধূলিমলিন প্রকৃতির চারদিক ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় বর্ষার পানি। ঝলমল করে ওঠে চারদিক। বর্ষার প্রত্যাশায় সবাই থাকে উন্মুখ।

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-[email protected]-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত