শমসেরনগর গলফ গ্রাউন্ডে
jugantor
শমসেরনগর গলফ গ্রাউন্ডে

  সুমন্ত গুপ্ত  

১২ জুন ২০২১, ০০:২৫:৫৭  |  অনলাইন সংস্করণ

ফজরের আজানের সুমধুর কণ্ঠ ধ্বনিত হচ্ছে। সূর্যদেব তার নয়ন তখনো মেলেনি। আমরা নিদ্রা ভঙ্গ করে নতুন গন্তব্য পানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম।

আমাদের আজকের গন্তব্য সিলেটের ভানুগাছে। সকাল বেলার ট্রেনে চেপে যেতে হবে গন্তব্য পানে। এরপরও মানে দিবা দ্বিতীয় প্রহরেও ট্রেন আছে কিন্তু যত আগে ভানুগাছ পৌঁছতে পারব তত বেশি সময় পাব ঘুরার জন্য। তাই সেই ভোর ছয়টা পঁয়ত্রিশের পারাবত ট্রেনই আমরা বেছে নিলাম।

আমরা বের হলাম আমাদের অস্থায়ী ডেরা থেকে। রাস্তায় জনমানবের পদচারণা নেই বললেই চলে। কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলো ত্রি-চক্রযানের জন্য। ত্রি-চক্রযানে চেপে এগিয়ে চললাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। প্রথমে ভেবেছিলাম এত সকাল বেলা হয়তো যাত্রী কম হবে কিন্তু আমার ভাবনা ভুল; যাত্রীতে ভরপুর ট্রেনের বগি।

ট্রেন ছুটে চলছে স্নিগ্ধ সকালে। এয়ারপোর্ট স্টেশনে খানিক সময় বিরতি দিয়ে ছুটে চলল ট্রেন। সূর্যদেব নয়ন মেলার পূর্বেই ঘুম থেকে উঠেছি তাই ঘুমের ভাব এখনো কাটেনি। চলতি পথে কখন যে নিদ্রাদেবীর আবেশে চলে গেলাম টেরই পেলাম না। ভ্রমণসঙ্গী সহধর্মিণী সানন্দার ডাকে নিদ্রা ভঙ্গ হলে ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে দেখি সকাল এগারোটা বাজে বাজে। ভ্রমণসঙ্গী সাথে সাথে বলে উঠলেন ভালোই তো ঘুম দিলে।

আমরা পৌঁছলাম ভানুগাছ স্টেশনে। ট্রেন থেকে নেমেই আমরা এগিয়ে চললাম শমসেরনগরে অবস্থিত সুইস ভ্যালি রিসোর্টের দিকে। সূর্যদেবের প্রখরতা সড়কজুড়ে। স্বল্প সময়ের ভেতরে আমরা এসে পৌঁছলাম সুইস ভ্যালির প্রবেশ দ্বারে। অনেক দিনের পরিকল্পনা শেষে আজ পৌঁছলাম সুইস ভ্যালি রিসোর্টে। বেশ ছিমছাম সুন্দরভাবে গোছানো রিসোর্ট। রিসোর্টের কর্মীরা আমাদের রুমে পৌঁছে দিলেন।

কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েই তৈরি হয়ে নিলাম নতুন গন্তব্যে ভ্রমণের জন্য। কিন্তু কোথায় যাব কিছুই তো চিনি না। রিসোর্টের কর্মীদের কাছে জানতে চাইলাম আশপাশে ঘুরতে চাই- কোথায় যাওয়া যায় আর গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য পরিবহন ব্যবস্থা কী? উনারা বললেন কিছু দূরে গেলে পাবেন শমসেরনগর গলফ ক্লাব; যা গুলটিলা নামেও পরিচিত। চা বাগান ঘেরা সবুজের মাঝে গলফ ক্লাবে ঘুরে আসতে পারেন। আমি বললাম যাবো কীভাবে? বললেন আমরা গাড়ি ঠিক করে দিচ্ছি। আমাদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করে দিলেন রিসোর্টের কর্মীরা।

অল্প সময়ের মাঝে আমরা রওনা দিলাম গন্তব্য পানে। আঁকা-বাঁকা পথ, কোথাও মসৃণ আবার কোথাও অমসৃণ। আমরা চলছি শমসেরনগর গলফ গ্রাউন্ডের দিকে। চলতি পথে দেখতে পেলাম চা বাগানের কর্মীরা চা পাতা তুলছেন। আশপাশে চা গাছ নতুন গজিয়েছে। চা বাগানের সবুজ সতেজ দৃশ্য আমাদের ছয় ঘণ্টার ভ্রমণ ক্লান্তি যেন নিমিষে দূর করে দিল। দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছলাম গলফ গ্রাউন্ডে। গলফ গ্রাউন্ডে প্রবেশ পথেই বাধার সম্মুখীন হতে হলো। বড় সাহেব আসবেন খেলতে তাই মাঠে প্রবেশ করা যাবে না। অনুরোধ করার পর প্রবেশ করার অনুমতি পেলাম। দেখে মনে হলো সবুজ ঘাসের গালিচা।

এখানে চারটি মাঠ আছে। মাঠের পাশে বসার জন্য বেঞ্চ করে দেয়া আছে। অসাধারণ পরিবেশ, নেই কোনো নগর জীবনের যন্ত্রণা। পদব্রজে আমরা সম্মুখপানে এগিয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে গাছের ছায়া ক্লান্ত পথিককে প্রশান্তি দিচ্ছে। আমরা এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। বেশ ভালোই লাগছিল। আমরা ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসলাম। আমাদের ভ্রমণে পথ প্রদর্শক রাহাত ভাই আমাদের দুইজনের ছবি তুলে দিলেন।

কিছু দূরে যেতেই দেখা পেলাম লেকের। লেকের জলে ভেসে আছে পদ্ম ফুল। রোদের ঝলকানি আর তার মাঝে পদ্ম ফুলের মিতালী যেন এক অন্যরূপ ফুটে উঠেছে প্রকৃতির মাঝে। আমি একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। বলে রাখা ভালো গলফের উদ্ভব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে।

কোনো ঐতিহাসিকের মতে প্রাচীন রোমান খেলা পাগানিকা, যাতে অংশগ্রহণকারীরা একটি বেঁকানো লাঠি দিয়ে চামড়ার বল মারতে হতো। এটা থেকেই গলফের উদ্ভব। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে রোমানদের সাথে এই খেলা গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে ও আস্তে আস্তে আজকের গলফের চেহারা নেয়। অন্যদের মতে, অষ্টম ও চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে চীনের চুইওয়ান ("চুই" মানে মারা ও "ওয়ান" মানে ছোট বল) খেলাই গলফের পূর্বসূরি।

মধ্যযুগে এই খেলা ইউরোপে আসে। ইংল্যান্ডের ক্যাম্বুকা বা ফ্রান্সের ক্যাম্বট আর একটি প্রাচীন খেলা; যার সাথে গলফের সাযুজ্য আছে। পরে এই খেলা "পেল মেল" নামে ছড়িয়ে পড়ে। কারো মতে, পারস্যের চুঘান থেকে গলফের সৃষ্টি। ওদিকে হল্যান্ডের লোনেনে পঞ্চম ফ্লোরিসের খুনির ধরা পড়ার দিনটি মনে রাখতে কোলভেন নামে বাঁকা লাঠি ও বলের একটি বার্ষিক খেলা প্রচলিত ছিল ১২৯৭ সাল থেকে।

তবে বহুল স্বীকৃত মত অনুযায়ী, আজকের গলফের উদ্ভব দ্বাদশ শতাব্দীর স্কটল্যান্ডে। সেখানে আজকের সেন্ট অ্যান্ড্রুজের পুরনো মাঠে মেষপালকেরা খরগোশের গর্তে পাথর লাঠি দিয়ে মেরে ঢোকাতো।

আমরা পদব্রজে হেঁটে চলছি; সূর্যদেবের প্রখরতায় বেশ ঘামছিলাম। হঠাৎ দেখা পেলাম ক্লান্ত খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি ঘরের। ছনের চাল দেয়া; যার দরুন ঘরের ভেতর যেন শীতল প্রশান্তি। দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় পেরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। আমরা ফিরে চললাম।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের যেকোনো স্থান থেকে ট্রেনে বা সড়কপথে সরাসরি শমসেরনগর আসা যায়। ঢাকা থেকে আন্ত:নগর উপবন ট্রেনে সরাসরি শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে নামা যাবে।

এছাড়া আন্ত:নগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে সাত কিলোমিটার দূরের ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনে নেমেও আসতে পারেন শমসেরনগর। আন্ত:নগর পারাবত ট্রেনে শ্রীমঙ্গল অথবা কুলাউড়া স্টেশনে নেমেও আসা যাবে। সেখান থেকে শমসেরনগর গলফ গ্রাউন্ডে যাব বললেই নিয়ে যাবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-jugantorlifestyle@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

শমসেরনগর গলফ গ্রাউন্ডে

 সুমন্ত গুপ্ত 
১২ জুন ২০২১, ১২:২৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ফজরের আজানের সুমধুর কণ্ঠ ধ্বনিত হচ্ছে। সূর্যদেব তার নয়ন তখনো মেলেনি। আমরা নিদ্রা ভঙ্গ করে নতুন গন্তব্য পানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম।

আমাদের আজকের গন্তব্য সিলেটের ভানুগাছে। সকাল বেলার ট্রেনে চেপে যেতে হবে গন্তব্য পানে। এরপরও মানে দিবা দ্বিতীয় প্রহরেও ট্রেন আছে কিন্তু যত আগে ভানুগাছ পৌঁছতে পারব তত বেশি সময় পাব ঘুরার জন্য। তাই সেই ভোর ছয়টা পঁয়ত্রিশের পারাবত ট্রেনই আমরা বেছে নিলাম।

আমরা বের হলাম আমাদের অস্থায়ী ডেরা থেকে। রাস্তায় জনমানবের পদচারণা নেই বললেই চলে। কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলো ত্রি-চক্রযানের জন্য। ত্রি-চক্রযানে চেপে এগিয়ে চললাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। প্রথমে ভেবেছিলাম এত সকাল বেলা হয়তো যাত্রী কম হবে কিন্তু আমার ভাবনা ভুল; যাত্রীতে ভরপুর ট্রেনের বগি।