আনারস বাগানে
jugantor
আনারস বাগানে

  সুমন্ত গুপ্ত  

০৫ জুলাই ২০২১, ০৩:৩৯:৫১  |  অনলাইন সংস্করণ

ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। লিলু ভাই এসে উপস্থিত; যাবো নতুন গন্তব্যপানে। অনেক দিন হয় প্রায় গৃহবন্দি অবস্থায় আছি করোনার জন্য। তাই আজ বেরিয়েই পড়লাম।

কিছুদিন আগে লিলু ভাই সন্ধান দিয়েছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামে অবস্থিত আনারস বাগানের। আমরা চলছি ঢাকা দক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামেরপানে।

সিলেটে আনারস বলতেই বুঝানো হতো শ্রীমঙ্গল অথবা বিয়ানীবাজারের জলঢুপ। তবে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণের ‘আব্দুল মতিন চান মিয়া চেয়ারম্যান’ আনারস বাগান বদলে দিয়েছে সেই ধারণা। সেই বাগানের সুবাদে গোলাপগঞ্জ এখন আনারসের দেশ। চান মিয়া চেয়ারম্যানের আনারস বাগান ঘিরে চলছে আনারস উৎসব। রসালো আনারসের গন্ধে ম ম করছে চারদিক। বাগান থেকে আনারস সংগ্রহ, বিক্রি এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে বাগান এলাকায় বিরাজ করছে অন্য রকম পরিবেশ। বলছিলেন আমাদের পাইলট লিলু ভাই।

আজ অবশ্য আকাশের মন ভালো নেই তাই কিছু সময় পর পর কান্না করছে। পিচঢালা পথ পেরিয়ে যাচ্ছি আমরা। সময়ের সাথে সাথে আমরা এগিয়ে চলছি আমদের গন্তব্য পথে। পথি মধ্যে আমাদের বহন কারি বাহন থামিয়ে দেয়া হলো। সামনে আর এগিয়ে যাওয়া যাবে না। পথে দীর্ঘ যানজট দেখতে পেলাম সাবাই আনারস বাগান অভিমুখী। আমাদের মতো অনেকেই ঘুরতে যাচ্ছে এ আনারস বাগানে।

আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি সড়ক পথ পেরিয়ে; আমরা গ্রামীণ পথ ধরে এগিয়ে চলছি। এদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তাই দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। চারপাশে উঁচু-নিচু টিলা। মাঝখান দিয়ে বহমান বিএনকে (বারকোট-নিশ্চিত-খর্দাপাড়া) সড়ক। আমরা বাতাসে পাচ্ছি পাকা আনারসের ঘ্রাণ! ডান পাশে ছোট্ট একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়লো, লেখা ‘আব্দুল মতিন চান মিয়া আনারস বাগান।’

আমরা এসে উপস্থিত হলাম প্রবেশ দ্বারে। শত শত মানুষ এগিয়ে চলছে আনারস বাগানের দিকে। উঁচু-নিচু টিলার বুক চিরে সারি সারি সাজানো-গোছানো আনারস বাগান। থোকা থোকা গাড় সবুজের ডানা মেলেছে ছোট-বড় হাজারো কাঁচা-পাকা আনারস। আমরা টিলা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম পথি মধ্যে কথা হল স্থানীয় অধিবাসী মুরাদ ভাইয়ের সাথে। পারিবারিকভাবে এ আনারস বাগানটি গড়ে তুলেছেন ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের দু’বারেরে চয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার সন্তানেরা। বৃহৎ আকারে গোলাপগঞ্জে এটিই একমাত্র আনারসের বাগান।

জলঢুপি জাতের এ আনারসের বাগানটি দত্তরাইল গ্রামে গড়ে উঠে ২০১৯ সালে। শখের বসে গড়ে তুলা বাগানে এখন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার আনারসের চারা গজিয়েছে। কোন ধরনের সায়নিক ছাড়া প্রায় ১৮ মাস পরিচর্যা করে এখন শুরু হয়েছে বিক্রি। প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ হাজার পাকা আনারস বিক্রি হচ্ছে। তবে এ আনারস বিক্রি করে আয়ের সব টাকা জমা হচ্ছে মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার নামে গঠিত ‘আব্দুল মতিন চাঁন মিয়া এডুকেশন ট্রাস্টে’। যে ট্রাস্ট শিক্ষাসহ এলাকার অসহায় মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে যাচ্ছে।

যেদিকে চোখ যায় কেবল আনারস! কাচা, পাকা, আধা পাকা আনারস। আর এসব আনারস সংগ্রহ করছেন অসংখ্য শ্রমিক। সারি সারি আনারস গাছ আর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, একটিলা থেকে অপরটিলার ঢালু বেয়ে আনারস গাছের সারিতে চোখ জুড়িয়ে যায়; তপ্ত রোদেও সেখানে আছেন শত শত দর্শনার্থী। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই আরেক দৃশ্য। সূযের তাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে পড়ন্ত বিকেলে সবুজে ভরপুর বাগানে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীর ভিড়। কেবল বাগানের দৃশ্যই না, চারপাশে অসংখ্য উঁচু-নিচু টিলার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সড়কের উভয় পাশই যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বপ্নের রাজ্য। মেঘলা আকাশ পুরো এলাকা আরও বেশি উপভোগ্য করে তোলে।

এদিকে দীর্ঘ সময় পদব্রজে থাকার পর আমরা নেমে এলাম সমভূমিতে। দেখতে পেলাম আব্দুল মতিন চান মিয়ার বাড়ির সামনে বাগানের প্রবেশ পথের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি জুস কর্নারও একটি বিশ্রামাগার। আর ওই জুস কর্নারে বাগানের আনারস কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। সবুজ প্রকৃতি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। সিলেট জেলার ভেতরে খুব কাছাকাছি এমন দৃশ্য পাওয়া দুষ্কর। তাইতো ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে চান মিয়ার আনারস বাগানসহ আশপাশের এলাকা হতে পারে একটি মোক্ষম স্থান।

যেভাবে যাবেন
সিলেটের কদমতলি থেকে গোলাপগঞ্জ সড়ক হয়ে ঢাকাদক্ষিণে যাওয়ার ১ কিলোমিটার আগে ডান পাশে ব্র্যাক অফিস। এরপাশ দিয়েই প্রবেশ করেছে বিএনকে সড়ক। সিলেট থেকে অটোরিকশায় করে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। আর বাসে গেলে লাগবে ৩০ টাকা। এখানে নেমে হাঁটলে ১০ মিনিট।

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-jugantorlifestyle@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

আনারস বাগানে

 সুমন্ত গুপ্ত 
০৫ জুলাই ২০২১, ০৩:৩৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। লিলু ভাই এসে উপস্থিত; যাবো নতুন গন্তব্যপানে। অনেক দিন হয় প্রায় গৃহবন্দি অবস্থায় আছি করোনার জন্য। তাই আজ বেরিয়েই পড়লাম।

কিছুদিন আগে লিলু ভাই সন্ধান দিয়েছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামে অবস্থিত আনারস বাগানের। আমরা চলছি ঢাকা দক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামেরপানে।

সিলেটে আনারস বলতেই বুঝানো হতো শ্রীমঙ্গল অথবা বিয়ানীবাজারের জলঢুপ। তবে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণের ‘আব্দুল মতিন চান মিয়া চেয়ারম্যান’ আনারস বাগান বদলে দিয়েছে সেই ধারণা। সেই বাগানের সুবাদে গোলাপগঞ্জ এখন আনারসের দেশ। চান মিয়া চেয়ারম্যানের আনারস বাগান ঘিরে চলছে আনারস উৎসব। রসালো আনারসের গন্ধে ম ম করছে চারদিক। বাগান থেকে আনারস সংগ্রহ, বিক্রি এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে বাগান এলাকায় বিরাজ করছে অন্য রকম পরিবেশ। বলছিলেন আমাদের পাইলট লিলু ভাই।

আজ অবশ্য আকাশের মন ভালো নেই তাই কিছু সময় পর পর কান্না করছে। পিচঢালা পথ পেরিয়ে যাচ্ছি আমরা। সময়ের সাথে সাথে আমরা এগিয়ে চলছি আমদের গন্তব্য পথে। পথি মধ্যে আমাদের বহন কারি বাহন থামিয়ে দেয়া হলো। সামনে আর এগিয়ে যাওয়া যাবে না। পথে দীর্ঘ যানজট দেখতে পেলাম সাবাই আনারস বাগান অভিমুখী। আমাদের মতো অনেকেই ঘুরতে যাচ্ছে এ আনারস বাগানে।

আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি সড়ক পথ পেরিয়ে; আমরা গ্রামীণ পথ ধরে এগিয়ে চলছি। এদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তাই দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। চারপাশে উঁচু-নিচু টিলা। মাঝখান দিয়ে বহমান বিএনকে (বারকোট-নিশ্চিত-খর্দাপাড়া) সড়ক। আমরা বাতাসে পাচ্ছি পাকা আনারসের ঘ্রাণ! ডান পাশে ছোট্ট একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়লো, লেখা ‘আব্দুল মতিন চান মিয়া আনারস বাগান।’

আমরা এসে উপস্থিত হলাম প্রবেশ দ্বারে। শত শত মানুষ এগিয়ে চলছে আনারস বাগানের দিকে। উঁচু-নিচু টিলার বুক চিরে সারি সারি সাজানো-গোছানো আনারস বাগান। থোকা থোকা গাড় সবুজের ডানা মেলেছে ছোট-বড় হাজারো কাঁচা-পাকা আনারস। আমরা টিলা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম পথি মধ্যে কথা হল স্থানীয় অধিবাসী মুরাদ ভাইয়ের সাথে। পারিবারিকভাবে এ আনারস বাগানটি গড়ে তুলেছেন ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের দু’বারেরে চয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার সন্তানেরা। বৃহৎ আকারে গোলাপগঞ্জে এটিই একমাত্র আনারসের বাগান।

জলঢুপি জাতের এ আনারসের বাগানটি দত্তরাইল গ্রামে গড়ে উঠে ২০১৯ সালে। শখের বসে গড়ে তুলা বাগানে এখন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার আনারসের চারা গজিয়েছে। কোন ধরনের সায়নিক ছাড়া প্রায় ১৮ মাস পরিচর্যা করে এখন শুরু হয়েছে বিক্রি। প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ হাজার পাকা আনারস বিক্রি হচ্ছে। তবে এ আনারস বিক্রি করে আয়ের সব টাকা জমা হচ্ছে মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার নামে গঠিত ‘আব্দুল মতিন চাঁন মিয়া এডুকেশন ট্রাস্টে’। যে ট্রাস্ট শিক্ষাসহ এলাকার অসহায় মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে যাচ্ছে।

যেদিকে চোখ যায় কেবল আনারস! কাচা, পাকা, আধা পাকা আনারস। আর এসব আনারস সংগ্রহ করছেন অসংখ্য শ্রমিক। সারি সারি আনারস গাছ আর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, একটিলা থেকে অপরটিলার ঢালু বেয়ে আনারস গাছের সারিতে চোখ জুড়িয়ে যায়; তপ্ত রোদেও সেখানে আছেন শত শত দর্শনার্থী। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই আরেক দৃশ্য। সূযের তাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে পড়ন্ত বিকেলে সবুজে ভরপুর বাগানে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীর ভিড়। কেবল বাগানের দৃশ্যই না, চারপাশে অসংখ্য উঁচু-নিচু টিলার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সড়কের উভয় পাশই যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বপ্নের রাজ্য। মেঘলা আকাশ পুরো এলাকা আরও বেশি উপভোগ্য করে তোলে।

এদিকে দীর্ঘ সময় পদব্রজে থাকার পর আমরা নেমে এলাম সমভূমিতে। দেখতে পেলাম  আব্দুল মতিন চান মিয়ার বাড়ির সামনে বাগানের প্রবেশ পথের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি জুস কর্নারও একটি বিশ্রামাগার। আর ওই জুস কর্নারে বাগানের আনারস কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। সবুজ প্রকৃতি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। সিলেট জেলার ভেতরে খুব কাছাকাছি এমন দৃশ্য পাওয়া দুষ্কর। তাইতো ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে চান মিয়ার আনারস বাগানসহ আশপাশের এলাকা হতে পারে একটি মোক্ষম স্থান।

যেভাবে যাবেন
সিলেটের কদমতলি থেকে গোলাপগঞ্জ সড়ক হয়ে ঢাকাদক্ষিণে যাওয়ার ১ কিলোমিটার আগে ডান পাশে ব্র্যাক অফিস। এরপাশ দিয়েই প্রবেশ করেছে বিএনকে সড়ক। সিলেট থেকে অটোরিকশায় করে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। আর বাসে গেলে লাগবে ৩০ টাকা। এখানে নেমে হাঁটলে ১০ মিনিট।

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-jugantorlifestyle@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন