কাশির সিরাপে কেন এত আসক্তি?

প্রকাশ : ০৫ মে ২০১৮, ০১:১১ | অনলাইন সংস্করণ

  যোবায়ের মাহমুদ, শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।

যাদের কাশি হয়, আমরা কি জানি, তারা আসলে কি খায়? ট্যাবলেট নাকি সিরাপ? নাকি অন্য কিছু? অনেক বাচ্চারাও কাশি হলে মা বাবার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে। যখনই বলা হয়, ‘আচ্ছা বাবা, তোমাকে একটা মিষ্টি সিরাপ এনে দিই’? তখনই তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। প্রবলবেগে মাথা উপর-নিচ করে জানায়, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এক্ষুনি’! এমন চিত্র আফ্রিকার নাইজেরিয়াতে। 

ছোটবেলায় কাশি হলে একটা কথা ভেবে আনন্দ লাগতো, আব্বু নিশ্চয়ই একটু পরে ফার্মেসি থেকে মিষ্টি একটা সিরাপ এনে দেবে! এমনিতে চিনি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খেতে চাইলে তো ভয় দেখায়, ‘সবগুলো দাঁতে কালো কালো পোকা হবে। একদিন কোন দাঁতই থাকবে না’!  কিন্তু কাশি হলে সব মাফ! এতদিন পরে সেইসব মিষ্টি সিরাপের নামতো এখন আর মনে নেই, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো কিভাবে ভুলি?

কিন্তু, সমস্যার কথা হচ্ছে, কিছু কিছু মিষ্টি সিরাপ খেলে মানুষের আনন্দ অনুভূতি হয়।

মেডিকেল সাইন্সে এই জিনিসটাকেই বলা হয় ‘ইউফোরিয়া’। ফলশ্রুতিতে সে এই সিরাপ আরও বেশি করে খেতে চায়। এমনকি যখন তার আর দরকার নেই, তখনও!  প্রয়োজনের অনেক বেশি বেশি খেতে থাকলে, তার আনন্দানুভূতি আরো প্রবল হয়, আরো তীব্র হয়।

একটা পর্যায়ে গিয়ে এটা নেশার মত হয়ে যায়, তখন চাইলেও এই চোরাবালি থেকে আর সরে আসা যায় না। এই মানুষগুলো পরবর্তীতে লিভার ড্যামেজ, কিডনি ড্যামেজ, খিচুনি এবং বিভিন্ন সাইকোলজিকাল সমস্যা যেমন, ডিল্যুশন, হ্যালুসিনেশন, এমনকি সিজোফ্রেনিয়াতেও ভোগে।

নাইজেরিয়ার রাস্তায়-রাস্তায়, স্কুলে, কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে মুড়ি-মুড়কির মত পাওয়া যাচ্ছে কোডেইন সমৃদ্ধ কাশির সিরাপ।

সম্প্রতি মাত্র একটি লরিতে অভিযান চালিয়েই পুলিশ ২৪০০০ বোতল কোডেইন সিরাপ উদ্ধার করেছে। নেশার এই কালো থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ কেউই। ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল নারী-পুরুষও আছেন এই কাতারে! 

সম্প্রতি বিবিসির এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে আসে এই কালো জগতের হালচাল। নাইজেরিয়ার সবচাইতে বড় ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Emzor এবং Bioraj এর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এইসব ওষুধ চলে আসে কালোবাজারীদের হাতে। তারপর হাতে হাতে পৌঁছে যায় গ্রাহকদের কাছে। নাইজেরিয়ার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা কোনভাবেই কালোবাজারীদের থামাতে পারছেন না। বরং কোথাও কোথাও তারা সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।

বেশ কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই মাদকাসক্তির রাহুগ্রাস নিয়ে কথা বলাবলি হলেও সরকার তেমন কড়া কোন পদক্ষেপ নেয়নি।

বিবিসির আন্ডারকাভার রিপোর্টার রুনা মেয়েরের ভাই এই সিরাপে আসক্ত হয়ে পড়ার পরেই মূলত তিনি খোঁজ নিতে শুরু করেছিলেন, কীভাবে এই সিরাপগুলো এত বেশি সহজলভ্য হয়ে পড়ছে।

‘Sweet Sweet Codeine’ নামের ডকুমেন্টারিতে তিনি সিরাপের অবৈধ সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ার অনুসন্ধানী ভিডিও প্রকাশ করার পরেই নড়েচড়ে বসে সরকার।

নাইজেরিয়ার ভেতরেই ২০টির মত কোম্পানি নিজেরা কাশির সিরাপ তৈরি করে, তবে কোডেইন বাইরে থেকে আমদানি করা হত। কোডেইনের আমদানি এবং কোডেইন সমৃদ্ধ কাশির সিরাপের উৎপাদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

দেশের ফার্স্ট লেডী আইশা বুহারি তার ইন্সটাগ্রামে বিবিসির রিপোর্টটি শেয়ার করে বলেন, ‘আমি খুব উদ্বেগের সাথে দেশের উত্তরাংশে ছড়িয়ে পড়া এই ড্রাগ অ্যাবিউজের ব্যাপারটি খেয়াল করছি। আমার সন্তানের অভিভাবক হিসেবে আমিও উদ্বিগ্ন। এই অস্থিরতার লাগাম আমাদেরকেই টেনে ধরতে হবে। আমাদের সন্তান যেন মাদকাসক্ত হয়ে না পড়ে, সেটা আমাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে’।

নাইজেরিয়ার পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোতে প্রতিনিয়তই অসংখ্য মাদকাসক্তকে ভর্তি করা হচ্ছে। পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব থাকলেও রোগীর চাপ বাড়ছেই। এবং তারা যেন নিজেদেরকে অথবা অন্যদেরকে আঘাত না করতে পারে, এই কারণে অধিকাংশক্ষেত্রে তাদের পা বা হাত শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে!

কনটেন্ট ক্রেডিট: মেডিভয়েস