বুনো পাহাড়ে রাতের যাত্রী
jugantor
নাফাখুম রোমাঞ্চ: পর্ব-২
বুনো পাহাড়ে রাতের যাত্রী

  শাহনেওয়াজ খান  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:০০:৩০  |  অনলাইন সংস্করণ

অজানা বুনো-পাহাড়ি পথের আতঙ্ক আর বৃষ্টিময় রাতের ভয় নিয়েই শুরু হলো পদ্মঝিরি অভিমুখে যাত্রা। মূল গন্তব্য থুইস্যাপাড়া। গাইডের ভাষায় তিন-চার ঘণ্টার পথ। তখনই শঙ্কা জাগলো, তার মানে অন্তত সাত-আট ঘণ্টার পাহাড়ি ট্রেইল! সঙ্গীরা ঘাবড়ে যাবে ভেবে চুপ থাকলাম। এখনই যে পড়ন্ত বিকাল।

লাইফজ্যাকেট গায়ে দিয়ে ট্রলারে উঠে পড়লাম। সাঙ্গু নদীতে ভেসে চলার শুরু। চারদিকে পাহাড় আর মাঝে মাঝে কিছু সমতল ভূমিতে বাদাম চাষ। সাদা-কালো মেঘের উড়োউড়ি আর নদীতে এর প্রতিচ্ছবি যেন শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। মুখ দিয়ে এমনিতেই বেরিয়ে এলো ‘সুবহান-আল্লাহ্’, মহান আল্লাহর কি অপরূপ সৃষ্টি। যেদিকেই তাকাই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি।

অগভীর ও পাথরময় নদীর উপর দিয়ে আমাদের নিয়ে ছুটে চলছে সরু ট্রলার। অগভীর এই নদীতে লাইফজ্যাকেটের কী দরকার? ট্রলারই বা এত সরু কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে সময় লাগলো না। কিছু দূর যেতেই নদীর নিচের ছোট-বড় নানা আকারের পাথর দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পাথরের উপর দিয়ে ফুটখানেক উচ্চতায় বয়ে চলছে পানি। পাথরে ঠেকে যায় ট্রলার। কোথাও বড় বড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বাঁশ ও হাতের সাহায্যে টেনে নিতে হয় ট্রলার। একটু এদিক-সেদিক হলেই ট্রলারডুবি। ট্রলার থেকে একটু নড়াচড়ারও কায়দা নেই। সবাই এসে বসলাম মাঝের দিকে। এখন স্পষ্ট হলো, ট্রলারগুলো কেন সরু। এক জায়গায় তো মনে হচ্ছিল, ট্রলার আরও সরু হলে ভালো হতো, দুই পাথরের মাঝ দিয়ে আরও সহজে বেরুনো যেত! লাইফজ্যাকেটের মর্মও বুঝা গেল। পানি কম হলেও সাঁতার না জানা পর্যটকদের জন্য এটাই সাহস। নইলে বাঁকে বাঁকে জেঁকে ধরবে ভয়। আর গায়ে আছড়ে পড়া পানি এবং সরু ট্রলারের বাড়ি খেয়ে আসা পানিতে শরীর ভিজে একাকার। লাইফজ্যাকেট থাকায় তাই পরনের কাপড় কিছুটা কম ভিজেছে।

সাদা-কালো নানা আকারের পাথর আর বনে-ঘেরা বিশাল বিশাল পাহাড় দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় কেটে যাচ্ছে টেরই পাচ্ছি না। ক্লান্ত শরীরে পানির ছটাও মন্দ লাগছে না। জামা ভিজে গেলেও কিছুটা প্রশান্তি। অপরূপ নৈসর্গিক প্রকৃতির মাঝে সবই যে আনন্দের! এদিকে বেলা শেষ হয়ে আসছে, ওদিকে রাতের ভয়। সুন্দর এই নৌ-ভ্রমণ শেষ হোক—এটাও মন চাচ্ছে না। কিন্তু সময় কি আর থেকে থাকে? সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে এসে পৌঁছালাম পদ্মঝিরির মুখে। এখান থেকে শুরু হবে ঝিরি আর পাহাড়ি ট্রেইল। যথারীতি গাইডের মুখে মাত্র দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে থুইস্যাপাড়া পৌঁছে যাব বুলি শুনে শুরু হলো যাত্রা।

প্রথমেই ঝিরিপথ ধরে হাটা। প্যান্ট-জুতা সেভাবেই পরে এসেছি, যেন ভিজলে সমস্যা না হয়। ঝিরিপথ ধরে হাঁটতে ভালোই লাগছে। কোথায় টাখনু সমান পানি, কোথাও হাঁটু সমান। হাঁটতে হাঁটতে রাত নেমে আসলো। শরীরে ক্লান্তিভাবও কিছুটা আসা শুরু করেছে। প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা হাঁটার পর, ঝিরিপথের ট্রেইলের প্রায় শেষভাগে এসে এক পাহাড়ি এলাকা খুঁজে পেলাম। সবার মধ্যে চাঙাভাব। ওহ্! দুই ঘণ্টায়ই গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। তবে গাইড ছেলেটা জানালো, এখনও চারভাগের এক ভাগ রাস্তাও পার হইনি! তার মানে স্থানীয় বুলির ২ ঘণ্টা সমান বাস্তবে হাঁটার ৮ ঘণ্টা! দোকান থেকে পাহাড়ি কলা ও সেদ্ধ ডিম খাওয়ার পর চা পান করলাম। দাম নিলো ঢাকার মতোই। অথচ দোকান বাদে দিনে পথে পাহাড়িদের কাছ থেকে অনেক কমমূল্যে কলা, পেঁপে, প্রভৃতি ফল কেনা যায়।

চা-পানের বিরতি শেষে আবারও যাত্রা। এবার প্রায় পুরোটাই পাহাড়ি পথ। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে একের পর এক বড় বড় পাহাড় পাড়ি দিচ্ছি। মনে হচ্ছে, এক পাহাড় আরেক পাহাড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরও বড় হয়ে উঠেছে। জ্যোৎস্নার আলো থাকায় বৃষ্টির আগে-পরে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পথে যে পাহাড়ে আছি, তার চেয়ে আরও বড় বড় পাহাড় দেখা যায়। ঘুরে-ফিরে দেখা যায়, সেই বড় পাহাড়টিই আমাদের রাস্তা। আহা! অভাগা যেদিকে চায়, সাগরও শুকিয়ে যায়।

থানচি আসার পথে জিপে যেভাবে মেঘের ছোঁয়া পেয়েছি, সেভাবে মেঘ উড়ে এলো। এবার পরাবাস্তবতা থেকে বাস্তবতায়। সরাসরি আমাদের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছে মেঘ। একটু আগেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সব। কিন্তু উড়ে আসা সাদা সাদা মেঘ ঢেকে দিচ্ছে চারিদিক। চারপাশ কুয়াশার মতো ঘোলাটে। শরীরে ঠাণ্ডা অনুভূতি। দিনের বেলায় অন্য সময় হলে অনুভব করতাম স্বর্গীয় অনুভূতি। কিন্তু এই রাতে ক্লান্ত শরীরে অনুভূতি কেমন যেন একটু কমে গেছে। মেঘগুলো খানিকবাদে বৃষ্টিও নিয়ে আসে। পাহাড়ি রাস্তা এতে আরও কর্দমাক্ত হয়ে যায়। হাঁটা হয়ে যায় কঠিনতর। এই পথেই হাঁটতে হচ্ছে, উঁচু থেকে নিচুতে; নিচু থেকে উঁচুতে।

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। গাইডের কথায় পাঁচটি টর্চলাইট নিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। রাতে ১১ জনের ওই পাঁচ লাইটে হাঁটাই দায়। মোবাইলের চার্জও শেষ। চাঁদের আলোই ভরসা। আমার হাতে টর্চ নেই। মোবাইলের আলোও নেই। পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী চলছি। পাহাড়ে মানুষের নিয়মিত হাঁটার রাস্তা একটাই থাকে। সেই রাস্তা অনুযায়ী হাঁটলেই চলে যাওয়া যায় গন্তব্যে। অন্য রাস্তা খোঁজার দরকার নেই। সেভাবেই হেঁটে চলছি—আধো আলো, আধো অনুমান। প্রথম দিকে গাইড ছিল আমাদের দলের অগ্রভাগে। কিন্তু পথে দুইজন হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত। এর মধ্যে একজনের প্রথম পাহাড় ট্রেকিং। সে তো একপর্যায়ে শুয়ে পরলো। আর যাবে না। এর বাইরে আরেকজন যিনি ভ্রমণে যাওয়ার আগে টানা কয়েকদিন ব্যায়ামও করেছেন। তারই কি না পায়ের মাংসপেশী টান দিলো! একে একে দুই পা-ই। গাইড আর আল-আমিন তাই আসছে পেছনে। ওই তিনজনকে নিয়ে। পাহাড়ি রাস্তায় অভিজ্ঞতার বিচারে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও দলের মনোবল বজায় রাখতে আমাকেই থাকতে হচ্ছে সামনে। এই দলে প্রথমবারের মতো পাহাড় ট্রেকিংয়ে আসা লোক আছে আরও। মনোবলই তাদের একমাত্র ভরসা।

পিচ্ছিল রাস্তায় পা ফেলাই দায়। তার মধ্যে কখনও উঠছি উঁচুতে, কখনও নিচুতে, আবার কখনো পিচ্ছিল পাথুরে ঝিরি পথ। পিচ্ছিল পথে ভর ঠিক রাখতে গিয়ে পায়ের হাঁটুর উপর প্রচুর চাপ পড়ছে। হাঁটুর জয়েন্টের হাড় ব্যথা হয়ে গেলেও কাউকে কিছু বলতে পারছি না, বাকিদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায়। মাঝে মাঝে বিরতি নিতে হচ্ছে পেছনে পড়া সবাই একসাথে হওয়ার জন্য। এরই মাঝে এক পাহাড়ের ঠিক মধ্যখানে এক মাদকসেবীর সাক্ষাৎ। মাঝরাতে হঠাৎ বনের মাঝে মাদকসেবীকে কাঁদা মাখামাখি করে বসে থাকতে দেখে ভয় ধরে যায়। অবশেষে গাইড এসে তাকে সরালে আমরা আবার এগিয়ে যাই। ক্লান্তির ফলে পথে বেশ কয়েকবার থামতে হয়। কেউ কেউ পুরো রাত পাহাড়ের উপর বসেই কাটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আমার মনের অবস্থাও তেমনি। অন্তত ‘অজানা’ গন্তব্যের লক্ষ্যে কষ্টকর ভ্রমণের খানিক বিরতি হবে। ভাগ্যিস বনের কোনো জন্তু-জানোয়ারের সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু হতে কতক্ষণ। হাঁটার সময় অবশ্য সবাই লাঠি নিয়েছি। মাটি, ঝোঁপঝাড়ে নিয়মিত বাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি উচ্চস্বরে কথাও চলছে। শব্দ পেলে বন্যপ্রাণীরা সেখান থেকে সরে যায়। এজন্য এই কৌশল।

ছনে ঘেরা জুমচাষীদের বিশ্রামের একটি ঘরে খানিক বিরতি নিয়ে আবারও সবাই মিলে থুইস্যাপাড়ারে উদ্দেশ্যে যাত্রা। হাঁটতে হাঁটতে পানি, কাাঁদায় একাকার। এমন অবস্থায় রাত প্রায় দুইটার দিকে দূরের পাহাড়ে মিটি মিটি আলো নজরে এলো। সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। এই তো থুইস্যাপাড়া। উত্তেজনায় জল ঢেলে দিলো গাইড—না, এটা থুইস্যাপাড়া নয়; সেটা আরও দূর।

আরও দু-তিনটা পাহাড় পেরিয়ে অবশেষে ওই আলোর সন্ধান। এলাকাটিতে বেশ কয়েকটি বসতঘর আছে। ঘর দেখে সবার হাঁটার শক্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। আমরা এখানেই থাকব। থুইস্যাপাড়ায় ঘর বুকিং দেওয়া আছে—গাইড তাই প্রথমেরাজি হচ্ছিলো না। আমাদের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত সেখানেই রাতের বাকি অংশ কাটানোর ব্যবস্থা করলো। যে ঘরে উঠলাম সেখানে তৎক্ষণাৎ ভাতের সঙ্গে ডিম আর ডাল রান্নার আয়োজন শুরু হলো। ওদিকে আমরা লাইন ধরলাম গোসল আর টয়লেটের। ফ্রেশ হয়ে নামাজ শেষে সবাই খেতে বসলাম একসাথে। অভুক্ত পেটে মনে হচ্ছে যেন অমৃত গিলছি। শুয়ে রাতের সময়টুকু জেগে পার করার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে চলে এলো রাজ্যের ঘুম। যেন পাহাড়ি রাজ্যে আরামে ঘুমাচ্ছে শ্রান্ত মুসাফির। রাজ্য অপেক্ষায় রয়েছে রোমাঞ্চকর ভোরের। (চলবে…)

লেখক: সাবেক গণমাধ্যমকর্মী

নাফাখুম রোমাঞ্চ: পর্ব-১ :সম্ভব-অসম্ভবের বাঁকে সৌন্দর্যের লুকোচুরি

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-jugantorlifestyle@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
নাফাখুম রোমাঞ্চ: পর্ব-২

বুনো পাহাড়ে রাতের যাত্রী

 শাহনেওয়াজ খান 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:০০ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

অজানা বুনো-পাহাড়ি পথের আতঙ্ক আর বৃষ্টিময় রাতের ভয় নিয়েই শুরু হলো পদ্মঝিরি অভিমুখে যাত্রা। মূল গন্তব্য থুইস্যাপাড়া। গাইডের ভাষায় তিন-চার ঘণ্টার পথ। তখনই শঙ্কা জাগলো, তার মানে অন্তত সাত-আট ঘণ্টার পাহাড়ি ট্রেইল! সঙ্গীরা ঘাবড়ে যাবে ভেবে চুপ থাকলাম। এখনই যে পড়ন্ত বিকাল।

লাইফজ্যাকেট গায়ে দিয়ে ট্রলারে উঠে পড়লাম। সাঙ্গু নদীতে ভেসে চলার শুরু। চারদিকে পাহাড় আর মাঝে মাঝে কিছু সমতল ভূমিতে বাদাম চাষ। সাদা-কালো মেঘের উড়োউড়ি আর নদীতে এর প্রতিচ্ছবি যেন শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। মুখ দিয়ে এমনিতেই বেরিয়ে এলো ‘সুবহান-আল্লাহ্’, মহান আল্লাহর কি অপরূপ সৃষ্টি। যেদিকেই তাকাই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি।

অগভীর ও পাথরময় নদীর উপর দিয়ে আমাদের নিয়ে ছুটে চলছে সরু ট্রলার। অগভীর এই নদীতে লাইফজ্যাকেটের কী দরকার? ট্রলারই বা এত সরু কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে সময় লাগলো না। কিছু দূর যেতেই নদীর নিচের ছোট-বড় নানা আকারের পাথর দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পাথরের উপর দিয়ে ফুটখানেক উচ্চতায় বয়ে চলছে পানি। পাথরে ঠেকে যায় ট্রলার। কোথাও বড় বড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বাঁশ ও হাতের সাহায্যে টেনে নিতে হয় ট্রলার। একটু এদিক-সেদিক হলেই ট্রলারডুবি। ট্রলার থেকে একটু নড়াচড়ারও কায়দা নেই। সবাই এসে বসলাম মাঝের দিকে। এখন স্পষ্ট হলো, ট্রলারগুলো কেন সরু। এক জায়গায় তো মনে হচ্ছিল, ট্রলার আরও সরু হলে ভালো হতো, দুই পাথরের মাঝ দিয়ে আরও সহজে বেরুনো যেত! লাইফজ্যাকেটের মর্মও বুঝা গেল। পানি কম হলেও সাঁতার না জানা পর্যটকদের জন্য এটাই সাহস। নইলে বাঁকে বাঁকে জেঁকে ধরবে ভয়। আর গায়ে আছড়ে পড়া পানি এবং সরু ট্রলারের বাড়ি খেয়ে আসা পানিতে শরীর ভিজে একাকার। লাইফজ্যাকেট থাকায় তাই পরনের কাপড় কিছুটা কম ভিজেছে।

সাদা-কালো নানা আকারের পাথর আর বনে-ঘেরা বিশাল বিশাল পাহাড় দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় কেটে যাচ্ছে টেরই পাচ্ছি না। ক্লান্ত শরীরে পানির ছটাও মন্দ লাগছে না। জামা ভিজে গেলেও কিছুটা প্রশান্তি। অপরূপ নৈসর্গিক প্রকৃতির মাঝে সবই যে আনন্দের! এদিকে বেলা শেষ হয়ে আসছে, ওদিকে রাতের ভয়। সুন্দর এই নৌ-ভ্রমণ শেষ হোক—এটাও মন চাচ্ছে না। কিন্তু সময় কি আর থেকে থাকে? সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে এসে পৌঁছালাম পদ্মঝিরির মুখে। এখান থেকে শুরু হবে ঝিরি আর পাহাড়ি ট্রেইল। যথারীতি গাইডের মুখে মাত্র দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে থুইস্যাপাড়া পৌঁছে যাব বুলি শুনে শুরু হলো যাত্রা।

প্রথমেই ঝিরিপথ ধরে হাটা। প্যান্ট-জুতা সেভাবেই পরে এসেছি, যেন ভিজলে সমস্যা না হয়। ঝিরিপথ ধরে হাঁটতে ভালোই লাগছে। কোথায় টাখনু সমান পানি, কোথাও হাঁটু সমান। হাঁটতে হাঁটতে রাত নেমে আসলো। শরীরে ক্লান্তিভাবও কিছুটা আসা শুরু করেছে। প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা হাঁটার পর, ঝিরিপথের ট্রেইলের প্রায় শেষভাগে এসে এক পাহাড়ি এলাকা খুঁজে পেলাম। সবার মধ্যে চাঙাভাব। ওহ্! দুই ঘণ্টায়ই গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। তবে গাইড ছেলেটা জানালো, এখনও চারভাগের এক ভাগ রাস্তাও পার হইনি! তার মানে স্থানীয় বুলির ২ ঘণ্টা সমান বাস্তবে হাঁটার ৮ ঘণ্টা! দোকান থেকে পাহাড়ি কলা ও সেদ্ধ ডিম খাওয়ার পর চা পান করলাম। দাম নিলো ঢাকার মতোই। অথচ দোকান বাদে দিনে পথে পাহাড়িদের কাছ থেকে অনেক কমমূল্যে কলা, পেঁপে, প্রভৃতি ফল কেনা যায়।

চা-পানের বিরতি শেষে আবারও যাত্রা। এবার প্রায় পুরোটাই পাহাড়ি পথ। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে একের পর এক বড় বড় পাহাড় পাড়ি দিচ্ছি। মনে হচ্ছে, এক পাহাড় আরেক পাহাড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরও বড় হয়ে উঠেছে। জ্যোৎস্নার আলো থাকায় বৃষ্টির আগে-পরে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পথে যে পাহাড়ে আছি, তার চেয়ে আরও বড় বড় পাহাড় দেখা যায়। ঘুরে-ফিরে দেখা যায়, সেই বড় পাহাড়টিই আমাদের রাস্তা। আহা! অভাগা যেদিকে চায়, সাগরও শুকিয়ে যায়।

থানচি আসার পথে জিপে যেভাবে মেঘের ছোঁয়া পেয়েছি, সেভাবে মেঘ উড়ে এলো। এবার পরাবাস্তবতা থেকে বাস্তবতায়। সরাসরি আমাদের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছে মেঘ। একটু আগেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সব। কিন্তু উড়ে আসা সাদা সাদা মেঘ ঢেকে দিচ্ছে চারিদিক। চারপাশ কুয়াশার মতো ঘোলাটে। শরীরে ঠাণ্ডা অনুভূতি। দিনের বেলায় অন্য সময় হলে অনুভব করতাম স্বর্গীয় অনুভূতি। কিন্তু এই রাতে ক্লান্ত শরীরে অনুভূতি কেমন যেন একটু কমে গেছে। মেঘগুলো খানিকবাদে বৃষ্টিও নিয়ে আসে। পাহাড়ি রাস্তা এতে আরও কর্দমাক্ত হয়ে যায়। হাঁটা হয়ে যায় কঠিনতর। এই পথেই হাঁটতে হচ্ছে, উঁচু থেকে নিচুতে; নিচু থেকে উঁচুতে।

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। গাইডের কথায় পাঁচটি টর্চলাইট নিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। রাতে ১১ জনের ওই পাঁচ লাইটে হাঁটাই দায়। মোবাইলের চার্জও শেষ। চাঁদের আলোই ভরসা। আমার হাতে টর্চ নেই। মোবাইলের আলোও নেই। পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী চলছি। পাহাড়ে মানুষের নিয়মিত হাঁটার রাস্তা একটাই থাকে। সেই রাস্তা অনুযায়ী হাঁটলেই চলে যাওয়া যায় গন্তব্যে। অন্য রাস্তা খোঁজার দরকার নেই। সেভাবেই হেঁটে চলছি—আধো আলো, আধো অনুমান। প্রথম দিকে গাইড ছিল আমাদের দলের অগ্রভাগে। কিন্তু পথে দুইজন হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত। এর মধ্যে একজনের প্রথম পাহাড় ট্রেকিং। সে তো একপর্যায়ে শুয়ে পরলো। আর যাবে না। এর বাইরে আরেকজন যিনি ভ্রমণে যাওয়ার আগে টানা কয়েকদিন ব্যায়ামও করেছেন। তারই কি না পায়ের মাংসপেশী টান দিলো! একে একে দুই পা-ই। গাইড আর আল-আমিন তাই আসছে পেছনে। ওই তিনজনকে নিয়ে। পাহাড়ি রাস্তায় অভিজ্ঞতার বিচারে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও দলের মনোবল বজায় রাখতে আমাকেই থাকতে হচ্ছে সামনে। এই দলে প্রথমবারের মতো পাহাড় ট্রেকিংয়ে আসা লোক আছে আরও। মনোবলই তাদের একমাত্র ভরসা।

পিচ্ছিল রাস্তায় পা ফেলাই দায়। তার মধ্যে কখনও উঠছি উঁচুতে, কখনও নিচুতে, আবার কখনো পিচ্ছিল পাথুরে ঝিরি পথ। পিচ্ছিল পথে ভর ঠিক রাখতে গিয়ে পায়ের হাঁটুর উপর প্রচুর চাপ পড়ছে। হাঁটুর জয়েন্টের হাড় ব্যথা হয়ে গেলেও কাউকে কিছু বলতে পারছি না, বাকিদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায়। মাঝে মাঝে বিরতি নিতে হচ্ছে পেছনে পড়া সবাই একসাথে হওয়ার জন্য। এরই মাঝে এক পাহাড়ের ঠিক মধ্যখানে এক মাদকসেবীর সাক্ষাৎ। মাঝরাতে হঠাৎ বনের মাঝে মাদকসেবীকে কাঁদা মাখামাখি করে বসে থাকতে দেখে ভয় ধরে যায়। অবশেষে গাইড এসে তাকে সরালে আমরা আবার এগিয়ে যাই। ক্লান্তির ফলে পথে বেশ কয়েকবার থামতে হয়। কেউ কেউ পুরো রাত পাহাড়ের উপর বসেই কাটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আমার মনের অবস্থাও তেমনি। অন্তত ‘অজানা’ গন্তব্যের লক্ষ্যে কষ্টকর ভ্রমণের খানিক বিরতি হবে। ভাগ্যিস বনের কোনো জন্তু-জানোয়ারের সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু হতে কতক্ষণ। হাঁটার সময় অবশ্য সবাই লাঠি নিয়েছি। মাটি, ঝোঁপঝাড়ে নিয়মিত বাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি উচ্চস্বরে কথাও চলছে। শব্দ পেলে বন্যপ্রাণীরা সেখান থেকে সরে যায়। এজন্য এই কৌশল।

ছনে ঘেরা জুমচাষীদের বিশ্রামের একটি ঘরে খানিক বিরতি নিয়ে আবারও সবাই মিলে থুইস্যাপাড়ারে উদ্দেশ্যে যাত্রা। হাঁটতে হাঁটতে পানি, কাাঁদায় একাকার। এমন অবস্থায় রাত প্রায় দুইটার দিকে দূরের পাহাড়ে মিটি মিটি আলো নজরে এলো। সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। এই তো থুইস্যাপাড়া। উত্তেজনায় জল ঢেলে দিলো গাইড—না, এটা থুইস্যাপাড়া নয়; সেটা আরও দূর।

আরও দু-তিনটা পাহাড় পেরিয়ে অবশেষে ওই আলোর সন্ধান। এলাকাটিতে বেশ কয়েকটি বসতঘর আছে। ঘর দেখে সবার হাঁটার শক্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। আমরা এখানেই থাকব। থুইস্যাপাড়ায় ঘর বুকিং দেওয়া আছে—গাইড তাই প্রথমে রাজি হচ্ছিলো না। আমাদের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত সেখানেই রাতের বাকি অংশ কাটানোর ব্যবস্থা করলো। যে ঘরে উঠলাম সেখানে তৎক্ষণাৎ ভাতের সঙ্গে ডিম আর ডাল রান্নার আয়োজন শুরু হলো। ওদিকে আমরা লাইন ধরলাম গোসল আর টয়লেটের। ফ্রেশ হয়ে নামাজ শেষে সবাই খেতে বসলাম একসাথে। অভুক্ত পেটে মনে হচ্ছে যেন অমৃত গিলছি। শুয়ে রাতের সময়টুকু জেগে পার করার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে চলে এলো রাজ্যের ঘুম। যেন পাহাড়ি রাজ্যে আরামে ঘুমাচ্ছে শ্রান্ত মুসাফির। রাজ্য অপেক্ষায় রয়েছে রোমাঞ্চকর ভোরের। (চলবে…)

লেখক: সাবেক গণমাধ্যমকর্মী

নাফাখুম রোমাঞ্চ: পর্ব-১ : সম্ভব-অসম্ভবের বাঁকে সৌন্দর্যের লুকোচুরি

[প্রিয় পাঠক, আপনিও দৈনিক যুগান্তর অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইলবিষয়ক ফ্যাশন, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, নারী, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, এখন আমি কী করব, খাবার, রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন-jugantorlifestyle@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন