লেখক পাঠক উভয়েরই সংখ্যা বেড়েছে: আনোয়ারুল হক
ফরিদুল ইসলাম নির্জন
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর শিক্ষকতা করেছেন। সক্রিয় আছেন গবেষণা ও গল্প-কবিতা লেখায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ঢাকাকেন্দ্রিক গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। কুমিল্লায় ‘জনানন্তিক নাট্য সম্প্রদায়ের’ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নাট্যকার। জন্ম : ১৯ জানুয়ারি ১৯৫২। লেখাপড়া-কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং ঢাকায়। চাকরি জীবনের শুরু ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল ও কলেজে ১৯৭৮ সালে, এরপর সিলেট ক্যাডেট কলেজ, পিএসসির মাধ্যমে সরকারি কলেজ, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, সিলেট সরকারি কলেজসহ চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, সাতকানিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীসগরে। অবসর নিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে। নজরুল গবেষণার জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি থেকে ‘নজরুল গবেষণা পুরস্কার ২০২৫’। প্রকাশিত গ্রন্থ ১৬টি। ১৯ জানুয়ারি লেখকের জন্মদিন সামনে রেখে তার সাহিত্য এবং দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবন নিয়ে কথা বলেন কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন। সেই আলাপচারিতার অংশবিশষে পত্রস্থ হলো: বি.স.
সৃষ্টিশীল এবং মননশীল উভয় শাখায়ই আপনি কাজ করেছেন। সাহিত্যের কোনদিকে নিজেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য মনে করেছেন?
: লেখক জীবনে অনেকের মতো আমার শুরুটা হয়েছে কবিতা লিখে। এখন আর তা নয়। ১৯৬৯-১৯৭১ সাল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে পড়ি। এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে তরল অনল উত্তাল সময়। মুক্তিযুদ্ধসহ পরবর্তী সময়ের অভিঘাত, আলোড়নে-মোচড়ে নিজের ভেতরে যে বোধ গড়ে উঠেছে সেই মন-মনন আমাকে সৃজনশীল লেখক বানিয়েছে। কবিতায় আমি যতটুকু আনন্দ পাই, তার সবটুকু উপভোগ করতে পারি না অতৃপ্তির কারণে। নিজের কবিতার মান নিয়ে আমি কখনোই সন্তুষ্ট ছিলাম না। আজও নই। আরেকটি কারণ আছে, তা হলো, যখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি কলেজে শিক্ষকতা জীবনে প্রবেশ করেছি। পাঠক এবং লেখক হিসাবে সংশ্লিষ্টতার কারণেই অনার্স ও এম এ ক্লাসে আধুনিক কবিতা বিষয়ে পাঠদান করতে গিয়ে অনুধাবন করেছি, সত্যিকার অর্থে কবিতা লেখা খুব সহজ নয়। তার চেয়ে অনেক ভালো, পাঠক হওয়া। এরপর থেকে ভেতরে টান পড়লে কবিতা লিখি বটে, ছাপাও হয়, তবে ১৯৯০ সাল থেকে আমি মঞ্চনাটক, গল্প লেখা এবং গবেষণার কাজে সরে এসেছি। আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি, গদ্যের এ পরিমণ্ডলে আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যে কারণে আমার গল্পগ্রন্থ এবং গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যাই বেশি।
গল্প-উপন্যাসের পাঠক বাড়লেও, মননশীল পাঠক কমে যাচ্ছে। এতে মননশীল মানুষ তৈরিতে সমাজে কী ধরনের প্রভাব লক্ষ করছেন?
: প্রাতিষ্ঠানিক পাশ-বিদ্যার চেয়ে মনন চর্চার দিকে আমাদের মনোযোগ কম। এখনকার সমাজে সবদিক থেকে হিসাবি মানুষের সংখ্যা অধিক। জনসংখ্যা হিসাবে তরুণ যুবক শ্রেণির সংখ্যা বেশি, তাদের মধ্যে মনন চর্চার বিকাশে পারিবারিক, সমাজ এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে বিভেদ সৃষ্টিকারী মন ও মানসিকতা, হতাশা, হীনমন্যতা বাড়ছে। নিজের প্রতি আস্থা, উদ্যম কমছে। বাস্তবতা এমন। গল্প উপন্যাসের পাঠক দিয়ে একে বিচার করা যাবে না।
পাঠক কমা-বাড়া কতটা পাঠকের ওপর নির্ভর করে, আর কতটা লেখকের ওপর নির্ভর করে?
: দুপক্ষের উপরই দায় বর্তায়। তবে আমাদের অতীতের তুলনায় পাঠক কমছে এটা বলাটা অবৈজ্ঞানিক অদর্শন। মনে করি, লেখক পাঠক উভয়ই বেড়েছে। না হলে বইমেলায় এত এত প্রকাশক আসে কোথা থেকে? আমি এখানে মানের কথাটা আনছি না। এজন্য যে, সব মিলিয়েই পাঠক এবং লেখককে ধরে এগোতে হবে। আর শুধু প্রকাশিত বইয়ের পাঠকই পাঠক, এ প্রযুক্তির যুগে এটা নির্ণয় সোজা হিসাব। ফেসবুক পাঠক-লেখক, ইন্টারনেটের পিডিএফ পাঠক যার সংখ্যা কম নয়, আছে ভ্রমণপিপাসু প্রকৃতি পাঠক ইত্যাদি ধরলে তো পাঠক কমেনি কোনো কালে। আর লেখকের দায় কম নয়! হৃদয়সংবেদী আগ্রহী পাঠকের রসনা তৃপ্তিতে লেখককে যোগ্য হতে হবে। সময়কে ধরে রেখে সময়কে ডিঙিয়ে যাওয়ার মান থাকা জরুরি। না থাকলে পাঠকের প্রতি লেখকের দায়িত্ব পালন হয় না। প্রতারণা হয়। আমি জানি, যে পাঠক, সে হাতের কাছে কোনো লেখা না পেলে বাজারের ঠোঙাও হাতে নিয়ে পড়ে। জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়া নয়, আনন্দের জন্য পড়া। তাই পাঠককে নিজের কাছে টেনে নেওয়ার দায় লেখক কখনোই এড়িয়ে যেতে পারে না।
দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে এ দেশের মানুষের জ্ঞানার্জনের ধরনটা সম্পর্কে বলুন
: অগোছাল। অপ্রয়োজনীয় পাঠ তারা করে না। শিক্ষক, পারিবারিক দিক থেকে নিজের সন্তানদের অনুশীলন, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, বই পাঠে আগ্রহী, মনোযোগী করে তোলার চেষ্টা বা চর্চা এখন নেই। যেটা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি। জ্ঞানচর্চা, জ্ঞানলাভ তো প্রাতিষ্ঠানিক বই পড়ে হয় না। এর বাইরে যে বিরাট ভুবন-স্বরূপ লাইব্রেরি, প্রকৃতি তা থেকে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা নেই। পরীক্ষা পাশের জন্য এখন গোটা কতক বই পড়লেই অর্জন সম্পূর্ণ হলো বলে মনে করছি। যা ঠিক নয়।
প্রায় ৫০ বছর ধরে লেখালেখির সঙ্গে আছেন। এ দীর্ঘ জার্নিতে নিজেকে কী দিতে পেরেছেন? কী দিতে পারেননি?
: আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকার রসদ, লেখকের জীবন। তবে এখানে আমার শিক্ষকতা জীবনের কথাও বলি, দুটিই সমান্তরালে চলেছে। তারুণ্য আর যৌবনের সান্নিধ্য আমি উপভোগ করেছি চুটিয়ে। উভয় ক্ষেত্রে আমার পাওয়ার ভাগে আত্মতৃপ্তি আছে। আর যেটা একজন লেখকের জীবনের নিয়তি, ভালো লেখাটা এখনো লিখতে পারিনি।
