কাসিদায়ে আফরিঁ : সুস্থির দৈব আলাপ

  কাউসার মাহমুদ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৫:২০ | অনলাইন সংস্করণ

কবি তানভীর এনায়েতের কাসিদায়ে আফরিঁ
কবি তানভীর এনায়েতের কাসিদায়ে আফরিঁ

একটা ঘোর অথবা চরম প্রেম উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তানভীর এনায়েতের প্রথম কবিতার বই ‘কাসিদায়ে আফরিঁ’পড়ে শেষ করলাম। যদি বলি দীর্ঘকাল, এক যুগেরও অধিক সময় সমস্ত আয়োজন, স্তুতি, আলোচনা ও কবিখ্যাতিকে মিথ্যে করে তিনি কবিতাকে যাপন করে গেছেন শুধু। তাহলে কোনোভাবেই মিথ্যে হবে না বোধকরি।

তানভীর এনায়েত একজন আপাদমস্তক কবি এই সত্যটি এতকাল পরে উদঘাটিত হলো তার কাসিদায়ে আফরিঁর মাধ্যমে, যা কোনোরূপ সংশয় ছাড়াই জানান দেয় তার প্রতিটা কবিতা। আলোচনায় যাবার আগে এইরকম একটা পূর্বাভাস দিয়েই শুরু করতে চাই—‘এতটুকু প্রেম নিলে দিয়ে দেবো সবটুকু দান/সাক্ষী রাতের ডাহুক, ভোরের শিশির প্রমাণ। দিয়ে দেবো তারও বেশি যতটুকু দেয়ার রসম/দিয়ে দেবো খোদার কসম। (কসমের অর্ঘ্য) অথবা ‘কিছু কিছু রাত আছে/নিয়ে আসে দিকভ্রান্ত পথিকের সিদ্ধান্তহীনতা। দেয়ালের খসে যাওয়া আস্তর থেকে/নিষ্প্রভ বালিকার মতো বিরহ।’ (অন্তরদেহ)

এমন ছন্দ ও ভাববোধের চরম শিখরে থেকেই অনুপম সব পঙক্তির আয়োজন করেন তিনি। যার কল্পিতরূপ এতই দৃঢ় ও ব্যঞ্জনাময় যা আমাদের একটা মধুর সুরে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। এরসঙ্গে ভাষার প্রায়োগিক সীমানাকে নিজের মতো উচ্ছন্ন করে তিনি সাজিয়েছেন বিপুল আনন্দের এজলাস। আদতে পুরো বইটিকেই মনে হয় কোনো সুফি কিতাবের ছোট ছোট ব্যঞ্জনামাখা প্রেমের শে'র। এক আদিম মজলিসে বসে যেন শুনছি সেতারার তানে মরমি গজল। এক নাগাড়ে গেয়ে যাচ্ছেন কোনো কবি। আর তার পাশে তবলায় আলোড়িত হচ্ছে প্রেম, বিরহ ও আবেগের মূর্ত মূর্ত ছোট বুদবুদ। কাতরা কাতরা সুর মূর্ছনায় আন্দোলিত হচ্ছে সময়ের স্থিত গতি। যা আমাদের আচ্ছন্ন করে, তাড়িত করে একটি অপ্রস্তুত মারেফাতের গোলকের পথে। এমন অহম ও সত্য চাতুর্যতাতেই কবি তছনছ করে দেন পাঠকের নিমিলিত অক্ষিযুগল। যেমন তিনি রচনা করেছেন—‘মাবুদ/বুকের ভেতর ছড়িয়ে দিলে/প্রেমের আনকাবুত। জড়িয়ে গেছে জয়িফ হৃদয়/আনকাবুতের জালে/এই বিরহের কালে।’ (কাসিদায়ে আনকাবুত)

একজন পরিপূর্ণ কবি যখন তার সমস্ত কিছুকে কেবল সমর্পণ করেন কবিতায়। তার জাগরণ, বিচরণ কিবা ঘুম পর্বের সেই সময়টুকু ছাপিয়ে অনন্ত ঐশর্য নিয়ে এবাদাতের কাল। মনে হয় এইসব যেন প্রবল সমীক্ষার মতো মূর্ত হয়ে ওঠে তার কবিতায়। আগেই বলেছি, তানভীর এনায়েত কবি উপাধিকে তুচ্ছ করে কবিতাকে যাপন করে গেছেন দীর্ঘকাল। সেই যাপনের চিত্রছবি, ঐশ্বর্যে মোড়ানো তার কাব্যভাবনার জগতের আলোকজ্জ¦ল বিভাটিই যেন পরিস্ফুট তার এই কিতাবটিতে। এ যেন এক সুস্থির দৈব আলাপ। কখনো খোদার কাছে বিনীত আর্তনাদ। কখনোবা নিজের কাছে এক অমিমাংসিত প্রশ্নের দ্বৈতালাপ ছেড়ে একছুটে আবার প্রেমিকার কাছে অর্পণের মিনতি। এই যে কবিতা থেকে কবিতায় ছুটে যাওয়া। একসঙ্গে এতকিছুর সংশ্লেষ। তা কেবল কবিতাকে ধ্যান ও যাপনের মাধ্যমেই সম্ভবপর বলে মনে করি।

সবচেয়ে মধুর ও ভয়ের মনে হয়েছে, তার কবিতায় চাতুর্যতা ও বিবিধ ভাষায় শব্দের খেল। বাংলায় তিনি আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষার শব্দ ব্যবহারে এতটা কুশলী হয়ে উঠেছেন যা আমাদের বিস্মিত করে। পুরো বইয়ের বেশ অধিকাংশ কবিতাতেই তিনি এই তিন ভাষার শব্দের প্রয়োগ করেছেন অভিনব আঙ্গিকে। যেখানে ছন্দ ও মাত্রার গুণাগুণ মেনে কবিতাকে মুক্ত করে দিয়েছেন একটি অনাবিল স্নিগ্ধতার আবেশে। সেইসঙ্গে যারা বলে এইসব শব্দ অনাহুত। তাদের অপরিমেয় জ্ঞান কিবা ঈর্ষাকে আরেকটু বাড়িয়েই দিলেন বুঝি। তিনি ভাষাকে অবমুক্ত করে দিয়েছেন। কবিতায় স্বাধীনতার প্রণোদনা দিয়ে সেখানে এনেছেন তার ছন্দের গতি, নতুন ধ্বনিকল্প, অর্থকল্প ও চিত্রকল্পের এক অভিনব যোজনা। যা পাঠককে ছেড়ে দেয় গহীনের ভেতর। যেন তুমিই খুঁজে নাও কোনো নতুন সুর বা ভাবময় দ্যোতনা। যেমন—‘রাত্রি হলেই মৃত্যু মৃত্যু লাগে/মাটির গন্ধে কবর কবর ঘ্রাণ। জীবন ভরাট বৃত্তবন্দি দাগে/ভাঙলে বৃত্ত আমার অবসান।’ (তিরোধানের গান) চিত্রকল্পের কি অপূর্ব আয়োজন এই কবিতায়—‘চোখের ভেতর জল/জলের ভেতর মাছ। মাছের শরীর আলো/আন্ধারে চমকালো।’ (আলোর মাছ) এই কবিতাটিতে চিত্রকল্পের সঙ্গে রূপকতার যে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব। তা আমার কাছে একসঙ্গে কাব্যিকতার বহুরূপতাকে অনায়েসে বসে যাওয়া মনে হয়েছে। কারণ এখানে এই চিত্রকল্প ও রূপকল্পের সঙ্গে কবি ছন্দতেও তার শক্তিকে প্রদর্শন করেছেন। এরপর তার এ চিত্রকল্প ও রূপকল্পকে মনে হয়েছে পরাবাস্তবধর্মী। যেমনটা আমরা স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকা গারসিয়া লোরকার কিছু কবিতায় দেখতে পাই। লোরকার একটি কবিতা এমন—‘সমুদ্র দূরে/হেসে চলে মৃদু মৃদু। ফেনাদের দাঁত/দুই ঠোঁট আকাশের।’ (অনুবাদ : সাজ্জাদ শরীফ)

শুধুই কি এই! তিনি ছোট ছোট দু-তিন লাইনে এঁকেছেন একেকটি আখ্যানকে। যেন তাকে তাড়িত করেছে মিথ্যে মানুষ। আঘাত করেছে সময়, কাল ও রাষ্ট্রের অন্ধকার সময়। মানুষের বিভাজন, একে অন্যকে তুচ্ছ মনোভাব, ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, কে মুমিন কে কাফের এই বিবাদে জড়িয়ে তাচ্ছিল্যতার অস্পষ্ট ঈর্ষাকাতরতাকে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন তার কবিতায়। মানুষের প্রতি গভীর এক আর্তনাদ ধরে তিনি কিভাবে তার পরম শত্রুকে ক্ষমা করে দেন, তাই বুঝি ধ্বনিত করেছেন নিজস্ব সুষমতায়। যেমন—‘তুমি কাফের আমি মোমিন/এই মনোভাব সবচে কমিন।’ কি নির্ভীক তীর্যকতা! কি অসামান্য বাক্যগাঁথা! এমন দুর্দান্ত করেই তিনি ধর্মের বিবাদকে দুই লাইনে নিঃশ্বেষ করে দেন উল্লিখিত তার ‘ধর্মের অহম’ কবিতায়।

তেমনিভাবে পৃথিবীর গা থেকে যখন পুঁজ বের হয়। মানুষ যখন পৃথিবীর আলোজ্বলা প্রাসাদ থেকে বনেই থাকার অভিপ্রায় করে বেশি। মানুষের মাথা ও রক্তের চেয়ে বোমা, অস্ত্র বাণিজ্য, দেশে দেশে যুদ্ধ ও ধ্বংসের নিরবচ্ছিন্ন মাদকতায় মুমূর্ষ যখন কতিপয় অসুস্থরা। তখন তিনি লেখেন চার-চার করে আট লাইনে দুটি স্লোগানধর্মী কবিতা—‘টু-লেট’ ও ‘করপোরেট’। টু-লেটে তিনি বলেছেন- ‘আমার টাকায় বন্দুক কেনো/আমার টাকায় বুলেট। আমার রাষ্ট্র লাশ বানায়া/কবরে ঝুলাও টু-লেট।’ করপোরেট কবিতাটিও এই ধাঁচেরই আত্মপ্রশ্নের সঙ্গে একটি সামগ্রিক প্রশ্নে ভোগা। যেন পৃথিবীর কাছে একটি প্রশ্ন রেখে নিরুত্তাপ ক্লান্ত চোখে ধ্বংসের সবিস্ময় আয়োজন দেখা। ঠিক যেমন হেলাল হাফিজ দুই লাইনে লিখেছিলেন—‘নিউট্রন বোমা বোঝো/মানুষ বোঝো না।’

কিছুটা সবিস্তারে না বললেও একটা বিষয় এখানে অত্যন্ত লক্ষণীয়, কবির সুফিজম যেন এইখানে এসে চরম বিদ্রোহী হয়ে ওঠেছে। অর্থাৎ নিবিড় অধ্যাবসায় শান্ত, স্থিত কবি পৃথিবী, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনাচার দেখে দ্রোহী হয়ে ওঠেছেন। তিনি তার তপস্যা ভেঙে নেমে এসেছেন নিপীড়িতের কাছে, অসহায়ের কাছে। আর ধ্বংসের আয়োজক সকলকে বলছেন তাদের কদর্যতার কথা। অর্থাৎ তার কবিতা শুধু কেবল মনোরঞ্জনই নয়। আত্মপ্রশান্তি কিংবা সুদূরের কোনো সুরের অবগাহনই নয় বরং এই কবি সময়ের। বিভিন্ন অসহযোগ মুহূর্তগুলোয় তিনি তাড়িত হয়েছেন, আক্রান্ত হয়েছেন। যেমন নজরুল। প্রেমের গান, শ্যামা সংগীত ও আনন্দম গজলের সঙ্গে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেছেন। তারই একটা ছায়া বোধকরি ব্যাপ্তিত না হলেও কিছুটা আয়োজিত হয়েছে তানভীর এনায়েতের কবিতায়।

তাই একটি অভূতপূর্ব ঈর্ষা ও বিমল আনন্দ নিয়ে বলতে পারি, তানভীর এনায়েতের দেড়যুগের বেশি কবিতা চর্চার পর ‘কাসিদায়ে আফরিঁ’ সমসময়ের বাংলা কবিতায় এক নতুন সংযোজন। যা নিয়ে বোদ্ধা ও কবি সমাজ নয়া আলোচনার খোরাক পেতে পারেন। তবু কবির এই দীর্ঘকালের নিশীথ যাপন যেন কবির একটি অমোঘ বিস্ময় প্রস্তুতি। ফরাসি লেখক, আনাতোল ফ্রাসের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘সমকালের ঢামাডোলে অনেককেই লেখক, কবি বলে মনে হয়। স্রেফ বারো বছর পরই এদের অনেকেই নাই হয়ে যায়। সুতরাং ক্ল্যাসিকই আমার ভরসা।’ এখানে ফ্রাসের কথা উল্লেখ যুক্তিযুক্ত না হলেও বলি, স্রেফ বারো বছর পর তারাই নাই হয়ে যান, যারা এই টিকে থাকার বা বারো বছরের প্রস্তুতিটা নিয়ে না আসেন। কিন্তু যারা এই বারো বছরের প্রস্তুতিটা নিয়ে আসেন, তাদের হিসেবটা হয় ভিন্ন। কাল ও সময় তাদের ধরে রাখে তাদের অধ্যাবসার সুবাদে। তাই বলতেই পারি, দীর্ঘকালের প্রস্তুতিতে শুভ শক্তিমত্তা নিয়ে এক অত্যুজ্জ্বল আলেয়ার ভেতরই যেন কবি তানভীর এনায়েত উদয় হলেন কাসিদায়ে আফরিঁ নিয়ে। এবং তিনি টিকবেন ও কবিতার যে অনিন্দ্য অহমটা আছে তাই নিয়ে স্বতস্ফূর্ত বিচরণ করবেন তার একান্ত কাব্যভুবনে।

লেখক: তরুণ কবি ও অনুবাদক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×