বইমেলায় রহমান হেনরীর 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'

  হোসাইন এমরান ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৯:৪২ | অনলাইন সংস্করণ

রহমান হেনরী

এই সময়ের শক্তিমান কবি রহমান হেনরী। তার কবিতায় প্রবলভাবে উঠে আসে দেশ মাটি ও মানুষের সংকটের কথা। এবারের বইমেলায় ছোট কবিতা প্রকাশন থেকে এসেছে কবির 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' সংকলন। ১২৮ পৃষ্ঠার এ বইটি পাওয়া যাবে লিটলম্যাগ চত্বরের ৯ নম্বর স্টলে। বইটির মূল্য ২২৫ টাকা, প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর।

মঙ্গলবার বইমেলায় কথা হয় কবির সঙ্গে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চাইতে কবিতার সঙ্গে পাঠকের সখ্য একটু কম বলেই মনে হয়। এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সৃজনশীল রচনাকর্মের মধ্যে, কবিতাই ভিত্তিশিল্প; রচনাকর্মের অন্যান্য যে কোনও প্রকরণকেই কবিতা ইশারা-পদ্ধতিতে ধারণ করতে পারে; তাছাড়া সময় ও শতাব্দীর অগ্রগমনের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা হয়ে উঠেছে বহুরৈখিক। কবিতায়, তাৎক্ষণিক আনন্দ-যন্ত্রণা-উপভোগ্যতার চেয়ে বেশি যে ব্যাপারগুলো ধুত হয়ে থাকে, তা হলো উপলব্ধি ও অনুভব। একুশ শতকের যন্ত্রব্যস্ত দিনগুলোতে, রেডিমেড ইন্টারটেইনমেন্টই অধিকাংশ মানুষের পছন্দীয়; এটাই কবিতার সঙ্গে পাঠকের দূরত্ব বৃদ্ধির প্রথম কারণ।

দ্বিতীয় কারণ হলো, বিগত দু-তিন শতাব্দী ধরেই, এ ভূখণ্ডের পাঠক যাকে কবিতা বলে ভ্রম করে, সেগুলো আদৌ, বিশ্বসাহিত্যের চোখে, কবিতা নয়; এখানে বিষয়ভিত্তিক ও বর্ণনামূলক এবং সংগীতের লালিত্যমাখা রচনাগুলোকেই কবিতা হিসেবে গ্রহণ করে পাঠক। কিন্তু সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে, বিশুদ্ধ কবিতাচর্চায়, কবিকে যে সব বোধানুভূতি ও উপলব্ধি সঞ্চার করতে হয় কবিতায়; পাঠক আসলে, সেগুলো পাঠের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তৃপ্তিতে যেতে পারে না। প্রকৃত কবিতা, পাঠককে, যতটা তৃপ্তি দেয়, তার চেয়ে ভাবনাবিশ্বে অস্বস্তি সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে ইচ্ছাপূরণ-সাহিত্য ছাড়া, অন্যান্য রচনাকর্ম খুব কমই জনপ্রিয় হয়েছে। এসবই কারণ। তারপরও, বইমেলার প্রথম এক-দেড় সপ্তাহে ফুরিয়ে যাচ্ছে; এমন বইয়ের সংখ্যাও তো কম নয়! কবির কাছে জানতে চাওয়া হয় বইমেলায় যত মানুষের আগমন হয় সেই তুলনায় বইয়ের বিক্রি নিয়ে আপনার মন্তব্য কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বইমেলায় প্রতিদিন বই কিনতেই যেতে হবে; এমন ধারণায় আমার বিশ্বাস নেই। বইমেলা প্রায় এক মাস ধরে হয়ে থাকে; এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে, লেখক-পাঠক-প্রকাশকের ভেতর যোগাযোগ ও মতবিনিময়টা গড়ে ওঠে। বইপিপাসু মানুষ মেলায় যায়, দেখেশুনে- বোঝে; তারপর ধীরে-সুস্থে সিদ্ধান্ত নেয়।

বইমেলায় প্রবেশের পর, অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক বই কেনা হয়ে যায়। কিন্তু পাঠকের অন্তরে যা আছে, সেটা ধীরে ধীরে পুরো বছরজুড়ে বাস্তবায়িত হয়। মেলার ঘোষণা, মানুষের মৌখিক আলোচনা এবং পত্রিকান্তরে বইমেলার বইয়ের সংবাদ দেখে, প্রকৃত বইপিপাসুরা একটা খসড়া তালিকা করেন; এবং সেই তালিকা ধরে, পরবর্তীতে অনেক বই সংগ্রহ করেন। এটাই বাস্তবতা। আর যদি, পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখি, যে কোনও বছর বইমেলায় তার আগের বছরের চে' বেশি বই বিক্রি হয়ে থাকে। কাজেই, বই বিক্রির নিরিখে, মেলা নিয়ে হতাশ হওয়ার মতো কিছু দেখতে পাই না। বইমেলায় মানুষ আসুক। যারা কিনবে না, তারাও আসুক; দেখতেই আসুক। কোনও অসুবিধা মনে করছি না।

কবি রহমান হেনরীর কাছে জানতে চাওয়া হয় তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যকর্ম এবং ভার্চুয়াল যুগে বইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্ম কবিতাটায় ভালো কিছু করতে পারছে না। হাতেগোনা কিছু নবীন অসম্ভব ভালো কবিতা উপহার দিচ্ছে, বাকি অধিকাংশই সিরিয়াস নয়। তবে, কথাসাহিত্য, বিশেষত ছোট গল্পে অসামান্য অর্জন আছে আমাদের এবং তা তরুণ প্রজন্মের হাতেই। উপন্যাসেও আংশিক অর্জন আছে। তবে উপন্যাসের ক্ষেত্রে, সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ইংরেজি সাহিত্য প্রায় ২০০ বছর আগে নভেলের যে আঙ্গিক নিয়ে কাজ করত, সেই নভেল-আঙ্গিকই এখনও আমাদের উপন্যাসের আঙ্গিক। অথচ পশ্চিমারা কিন্তু নিজেরাই আর ওই আঙ্গিকে আবদ্ধ থাকেনি। তাদের পরিত্যক্ত আঙ্গিকটাই আমরা চর্চা করছি। বাংলা ভাষার নিজস্ব উপন্যাস-আঙ্গিক সৃজন করতে পারিনি। ফলে, জনপ্রিয় হয়তো হচ্ছে। উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়ারই জিনিস। অবয়ব বড়। দু’চার অধ্যায়ে চরম দুর্বলতা থাকলেও, সম্পূর্ণ উপন্যাস পাঠের ভেতর ভেতর দিয়ে গড়সাপটা একটা মান আছে বলে প্রতীয়মান হয়। কাজেই, উপন্যাস চলছে গতানুগতিক। হামলে পড়ে পাঠ করছি এবং পাঠ শেষে ভুলেও যাচ্ছি। কিন্তু যে কোনও ভাষা ও ভূখণ্ডের সাহিত্য যেহেতু তার নবীন প্রজন্মের উৎকর্ষতার ওপর নির্ভরশীল; কাজেই বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। নাট্যসাহিত্য এবং সমালোচনা সাহিত্যে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। এ ছাড়া, সার্বিক বিচারে, তরুণ-প্রজন্মের কবি লেখকগণকে নিয়ে আমরা গর্বই করতে পারি। সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা যা কিছু এখনও আছে; সেগুলো কেটে যাবে। এটাই বিশ্বাস করি।

তিনি বলেন, ভার্চুয়াল যুগে, বইও ভার্চুয়াল। আগে, যেসব বই পড়ার জন্য ছায়ালিপি করতে হতো; কিংবা বিদেশে থাকেন এমন স্বজন-বন্ধুদের অনুরোধ করে, আনিয়ে নিতে হতো; এখন ততবেশি ঝামেলাটা নেই। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সুবাদে, কোটি কোটি বই আছে, মাউসের একটা ক্লিকের সামনেই। এটা খুবই আশার কথা। কেউ কেউ মনে করছেন, বই যেহেতু পর্দায় ডিজিটালি পড়া যাচ্ছে, কাজেই হার্ডকপির হয়তো দিন ফুরিয়ে যাবে। সেটা অমূলক ভাবনা। বরং যদি মনোযোগে খেয়াল করি, দেখা যাবে: রকমারি বা অ্যামাজন। এ রকম অনলাইন শপিংয়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়াতে, খুব দ্রুত এবং অনায়াসে কাঙ্ক্ষিত বইয়ের হার্ডকপি হাতে চলে আসছে। চাহিদা জানালে, যৌক্তিক একটা খরচা যোগ করে, বই বাড়িতেই পৌঁছে দিচ্ছে। এতে, বই কেনার সংখ্যা ও পরিমাণ কিন্তু দিন দিন বাড়ছেই। অনলাইনে বই কেনার সঙ্গে আরও অনেক সুবিধা যুক্ত আছে। যেমন, কোনও ক্রেতা যদি, কোনও নির্দিষ্ট তারিখে, নিজের কোনও প্রিয়জনকে বই উপহার দেবেন; তথ্যাদি সন্নিবেশ করে চাহিদা জানালে, যথা-তারিখে বইটি/বইগুলো যথাঠিকানায় পৌঁছে যাচ্ছে। এ হলো প্রযুক্তিগত সুবিধা ও অগ্রগতি। এর বাইরেও কথা আছে। অনলাইনে/ ভার্চুয়ালি যতই পড়ি না কেন, কিছু কিছু বই আছে, প্রাণের বই; সেগুলোর হার্ডকপি হাতের কাছে না থাকলে, মন উসখুস করে। যেমন ধরা যাক, রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র; ওটার হার্ডকপি লাগবেই। কাজেই, আমি মনে করি না যে, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বাঁধাই করা বইয়ের কোনও ক্ষতি করবে। কিছু কিছু বই, এমনই কালজয়ী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী। অতএব, ভয় নেই। মা ভৈ...

ঘটনাপ্রবাহ : বইমেলা-২০১৮

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter