প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চা

এম মিরাজ এইচ এর ‘কী আর হবে একটি দোষে’ পাওয়া যাচ্ছে বই মেলায়

  যুগান্তর ডেস্ক    ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২০:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

M_Miraz_Hossain

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এম মিরাজ এইচ রচিত ‘কী আর হবে একটি দোষে ! ’ বইটি একটি নতুন সংযোজন । মূলত ছোটগল্প ও অনুপন্যাসের সমন্বয়ে নির্মিত এটি একটি ভিন্নধারার গ্রন্থ । চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার ফ্রেন্ডস বুক কর্নার থেকে প্রকাশিত হয়েছে বইটি । এতে মোট ১১টি লেখা সন্নিবেশিত হয়েছে । প্রেক্ষিত ঘটনা পরম্পরাগুলো প্রথাগত ছোটগল্পের সংজ্ঞা তথা প্রচলিত ধারা গণ্ডিয়ে লেখকের স্বকীয় ধারায় রচিত । শুরুতে ‘সমালোচনার পূর্বপ্রসঙ্গ’ নামক লেখককথায় আলোচ্য গ্রন্থ রচনার প্রেক্ষাপট আলোচিত হয়েছে । একটু সচেতনভাবে মনোসংযোগ ঘটালেই তার লেখনীর মধ্যে জীবনবোধের চমৎকার বার্তা খুঁজে পাওয়া যায় ।

বইটি প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির প্রাক্তন মহাপরিচালক প্রফেসর ডক্টর মাহমুদ শাহ্‌ কোরেশী বলেন – ‘পাণ্ডুলিপিটা পড়ে আমার মনে হলো, গল্পের তিনটি ভাগের মধ্যে তার গল্পগুলো পড়ে যায় । তাছাড়া নিশ্চিন্ত সহজতায় নিজস্ব বাণীবিন্যাসে তিনি তা প্রকাশ করেছেন এ কথাও বলা যায় । গল্পগুলোতে কিংবদন্তিমূলক কাহিনি, প্রবাদসিদ্ধ মোরাল স্টরি'র ছাপ রয়েছে । এতে যেমন নতুনত্ব আছে তেমনি মানুষের অনন্যকিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে । ... ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি ও কাহিনি নির্মাণে তার নিষ্ঠা উত্তরোত্তর আমাদের কথাসাহিত্যের সমৃদ্ধ পটভূমিতে স্থায়ী আসন লাভ করবে, এমন আশা ব্যক্ত করা যায় ।’ ব্যতিক্রমধর্মী এই গ্রন্থটির প্রণেতা এম মিরাজ এইচ বর্তমানে সৌদি আরবের একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় – ইউনিভার্সিটি অব বিশা’য় ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক পদে কর্মরত । লেখালেখি সম্পর্কে লেখকের ভাষ্যে তার সহজাত সরলতার ইঙ্গিত মেলে – যে লেখাগুলো আজ বই আকারে প্রকাশিত হলো সেগুলো গ্রন্থাকারে হাজির করে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার কথা চিন্তাও করিনি কখনো; ভাবিনি এখান থেকে রয়্যালটির কথা । মূলত, বিভিন্নভাবে মস্তিষ্কে জড়ো হওয়া বিক্ষিপ্ত গল্পগুলোই একত্রে গ্রন্থিবদ্ধ করা মাত্র।

প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমার সব গল্পের অনুপ্রেরণার মূল উৎস আমার আম্মা – এই পৃথিবীতে আমার নিকট সবচাইতে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মানুষ । গল্পগুলো যে পাঠকের ভালো লাগবে তিনি সহৃদয় দৃষ্টি দিয়ে পড়বেন, যার ভালো লাগবে না তিনি হয়তো সময় ব্যয় করে পড়ে দেখবেন না । আবার পড়তে গিয়ে লেখাগুলোর সাহিত্যমূল্য তথা যেকোনো ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক হলে তার প্রতি সবিনয় অনুরোধ থাকবে। বইয়ের প্রারম্ভে উল্লেখিত ‘সমালোচনার পূর্বপ্রসঙ্গ’ অংশটুকু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগসহকারে পড়লেই মনের মাঝে উঁকি দেয়া প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন ।

সামগ্রিকভাবে ব্যতিক্রমী এমন গ্রন্থ রচনার প্রেক্ষাপট বর্ণনার পাশাপাশি আধুনিক ছোটগল্পের স্বরূপ ও সংজ্ঞা নিয়েও একটা প্রাঞ্জল এবং সময়োপযোগী আলোচনা স্থান পেয়েছে বইটিতে । সমহিমায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রতিটি গল্প নির্মাণ করেছেন এম মিরাজ এইচ । তার গল্প সংগ্রহের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালকের যে মূল্যায়ন সেদিকে একটু আলোকপাত করা যাক ।

বইয়ের প্রথম গল্প ‘রক্তদানের পুণ্য’ তন্ময় নামের এক আদর্শবাদী তরুণের বড় হয়ে ওঠার গল্প । শিক্ষণীয় বিষয় সহজভাবে বলা ।

[মানবতার জয়গানে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধকরণের নিমিত্তে নির্মিত এই গল্পটির শিরোনাম এসেছে কিশোর বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর কবিতা ‘আঠারো বছর বয়স’ থেকে; গল্পের কাহিনি ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ এবং দায়িত্ব-কর্তব্যের একটা যুগান্তকারী বার্তা পৌঁছানোর প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় । স্বেচ্ছায় রক্তদানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপদানকারী বাংলাদেশের অন্যতম মানবতাবাদী সংগঠন বাঁধন-এর যে স্লোগান – ‘একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন’ – সেটাকে আরও বেশি মহিমান্বিত করার মাধ্যমে অধিকতর জনগোষ্ঠীর নিকট আরও বেশি ফলপ্রসূ করার চমৎকার পদক্ষেপ লক্ষণীয় ।]

‘ভার তো অইলো’ গল্পে একটু বোকা প্রকৃতির মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনি । বিপরীত দিক থেকে নির্মম মানসিকতার আব্বাসের মনে ‘মনুষ্যবোধের’ উদয় আকস্মিকতার সঞ্চার করে । কিংবদন্তিমূলক কাহিনি ‘কী আর হবে একটি দোষে’ – এ আমরা মানুষ বিক্রির হাটের সন্ধান পাই । বেশি দাম দিয়ে যে চৌকষ ভৃত্য সেখান থেকে কিনলেন রাজা মশাই তার ৯৯ ভাগ ভালো গুণ থাকা সত্ত্বেও সবশেষে একটি দোষের জন্য তার সর্বনাশ ঘটে গেল । অবিশ্বাস্য এক ঘটনায় আমরা দেখি নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা ।

‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’-ও একই ধরনের কাহিনি যা চলতি নাগরিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে সংকলিত । গল্পের ভেতর গল্প তৈরি করে লেখক এখানে কাহিনির নবতর বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করেছেন ।

‘ডাক্তারের বদলে লাশ’ গল্পে আমরা যাপিত জীবনের এক ট্র্যাজিক বাস্তবতার সম্মুখীন হই । ‘ইচ্ছা থাকিলেই উপায় হয় (না)’ গল্পের নায়ক মানিকসহ আট ভাইবোনের সংসারের জটিল চিত্র তুলে ধরা হয়েছে – বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা নিয়ে । প্রায় এক উপন্যাসের ব্যাপ্তিতে গড়া গল্পটিতে মানসিক প্রশান্তি লাভের উপায় নির্দেশ করা হয়েছে ।

‘কী হয়ে গেলো’-তে সাম্প্রতিক জনজীবনে মোবাইল ব্যবহারের যে সমস্যা তার সমাধানের একটা উপায় নির্ধারণের চেষ্টা রয়েছে ।

‘মাতব্বরি সমাচার’-এ সমকালীন সমাজকাঠামোয় পুরুষদের একটি সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত রয়েছে । পারবারিক সম্প্রীতি, বিশেষ করে ভ্রাতৃস্নেহের একটি অনবদ্য চিত্র এখানে আমরা পাই । তাছাড়া মাতব্বরি চিত্রের প্রহসনও তুলে ধরা হয়েছে গল্পটিতে ।

‘রুমমেট’-এ আমরা আবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতি উদ্ঘাটিত হতে দেখি । একই মুদ্রার দু’পীঠ – অকৃতজ্ঞ বনাম স্বার্থপর মানব চরিত্রের বিষয়ে সারগর্ভ বক্তব্য প্রকাশ করে জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য বিষয়ে লেখক সারকথা প্রকাশ করেন । ‘অকর্মণ্য উপদেশের পরিণতি’ প্রবাদসিদ্ধ বাস্তবতার স্বরূপ প্রকাশ করে । ‘ঈদের জুতা’ এক কৈশোরিক কাহিনি । তবে মানবিক ভাবনাসমৃদ্ধ ।

পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে মানব-মনের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা তিনি করেননি । এখানে জীবন জেগেছে অনবদ্য বাকভঙ্গির মধ্যে । এখানকার চরম সত্য যাচঞা ও ব্যর্থতার কাহিনি নয়, কিন্তু নিশ্চিন্ত সহজতায় সব কিছুকে প্রকাশ করবার বাণী-বিন্যাস ।

পাঠকসমীপে লেখকের নিবেদনও তাৎপর্যবহ – পঠনসত্ত্বাকে উজ্জীবিতকরণ প্রচেষ্টার প্রতিধ্বনি; শুধু বিশেষ কোন একজন জনপ্রিয় লেখকের বইপাঠে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন-পুরাতন সব শ্রেণীর লেখকের বই পড়ুন, শিল্প-সাহিত্যের উদ্দেশ্যসাধনে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন – সৃজনশীলতায় নিজেকে সম্প্রসারিত করার মাধ্যমে এগিয়ে চলুন সম্মুখপানে ।

কেবল নির্দিষ্ট কোনো পাঠক শ্রেণির জন্য নয়, সর্বজনীনভাবে সব বইপ্রেমীর জন্য এ গ্রন্থটি হয়ে উঠতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনের খোরাক । বইটা হাতে নিলেই এ কথার সত্যতা প্রতীয়মান হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস ।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮ এ অন্যরকম প্রকাশনীর স্টলে [স্টল নং ৪৫৭]। এছাড়াও ফ্রেন্ডস বুক কর্নার, ১৬ রাফিন প্লাজা (৩তলা), ৩/বি মিরপুর রোড, ঢাকা-১২০৫ থেকেও সংগ্রহ করা যাবে ব্যতিক্রমী এই সাহিত্যকর্মখানা ।

ঘটনাপ্রবাহ : বইমেলা-২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter