হাইকেল হাশমী'র একগুচ্ছ কবিতা

হাইকেল হাশমী বিখ্যাত উর্দু কবি ও ভাষা সৈনিক নওশাদ নূরীর একমাত্র পুত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ইতালির বোকোনি ইউনিভার্সিটি থেকে 'মাস্টার ইন ব্যাংঙ্কিং অ্যান্ড ফিনান্স' ডিগ্রী লাভ করেন ১৯৯১ সালে। পেশায় একজন ব্যাংকার। দেশ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে দেশের একটি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। মূলত কবি হলেও অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর বিশেষ অবদান আছে।

  ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:১৯:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

স্বপনের সন্ধান

ধূসর সকাল দিগন্ত থেকে ধীরগতিতে নামছে
এই শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, বাজারে আর গলিতে
জ্বলন্ত সূর্য মাথার উপর রেখে
ঘুরবো সারা দিন উদ্দেশ্যহীন ভাবে
এই রাজপথে, এই চেনা পথে, হয়ে পথহীন ।
দুপুরের তাপ জীর্ন শরীরে শুষে নিয়ে
জলশূন্য তৃষ্ণার্ত আকাশে চোখ রেখে
ছাইমাখা সন্ধ্যার দিকে হেঁটে যাবো।
ওই সন্ধ্যার সুড়ঙ্গ পার করলেই রাত্রির উপত্যকা
যে করছে অপেক্ষা ক্লান্ত বিনীদ্র চোখের।
রাত্রির কালো অন্ধকারে
চোখ দুটি ঘুরবে ঘুমের দ্বারে দ্বারে
কড়া নাড়বে রুদ্ধ কপাটের
আর অবশেষে হতাশার চিহ্ন চোখে ভরে
ফিরে আসবে নিদ্রার জগতে।
জানি চোখ আজো পাবে না স্বপ্নের সন্ধান
ঘুমের মাটি হয়েছে অনুর্বর
আর ওখানে ফলবে না স্বপ্নের সোনালী ফসল!


স্মৃতির বর্ষা

অকারণে যখন শূন্যতা মনে বাঁধে ঘর
আর চোখ ভরে যায় স্বচ্ছ নোনা জলে,
তোমার তিক্ত বিরহ কালবৈশাখী হয়ে
মনের আঙ্গিনায় ধ্বংসের নাচন নাচে।

বুকে নিঃশ্বাসের দ্রুত আসা যাওয়া
হৃদয়ের ক্ষিপ্রগতি মনের রুদ্ধ দ্বার খোলে,
তোমার স্মৃতির ঝিরি ঝিরি বাতাস
মন নদীতে মৃদু তালে কামনার ঢেউ তোলে।

হৃদয়ের কম্পন হয়ে উঠে তখন এলোমেলো
মাঝে মাঝে ছিড়ে যায় নিঃশ্বাসের অদৃশ্য তার,
মনের আয়নায় জমে থাকা ধূসর ধুলো
স্মৃতির ঝমঝম বৃষ্টিতে একেবারে পরিষ্কার।

তখন বুঝি স্মৃতির রিমিঝিমি বর্ষার কাল এসেছে
ভুলে যাওয়া স্বপ্ন দেখার সেই মধুময় কাল এসেছে ৷


ভাঙ্গা-গড়ার খেলা

আমার মুখমন্ডলে নৃত্যরত সময়ের ছায়া
সময় তার পদচিহ্ন এঁকে গেছে চেহারায়
রেখে গেছে বিগত দিনের আলো-ছায়া।
আমার মুখমন্ডলের সূক্ষ্ম রেখায়
নিহিত কয়েক দশকের ইতিহাস
নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে পেয়ে যেতে পারো
গত শতাব্দীর কিছু গুপ্ত রহস্য।
আমার অনুজ্বল চোখের মণিতে
আছে গোপন কতো যুগের দৃশ্যপট
কতো অজানা কথার পটভূমি আর ইতিকথা।
এই স্থির, আবেগহীন চেহারার গভীরে
আছে লুক্কায়িত শতাব্দীর উন্মত্ত ঢেউ
সেই ঢেউ এখনো উন্মাদ দিশেহারা
আর মনের গভীরে
নীরবে চলছে ভাঙ্গা-গড়ার খেলা।


স্বপ্নের প্রবেশ নিষেধ

যে স্বপ্ন আমি দেখি নি, সেই স্বপ্ন কেন আমার চোখের পাপড়ির দ্বারে শরনার্থীর মতো ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তারা নিদ্রার ভেলায় করে অচেতনের সাগর পাড়ি দিয়ে চেতনার বন্দরে নোঙর ফেলেছে। তাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য এসেছে একদল গাংচিল আর উঁকি দিচ্ছে কিছু ডোল্ফিন স্বপ্নের নীল জল থেকে।

চোখের সাগরে পাহাড়ারত রণতরী আর ডুবোজাহাজ, আর ভাবনার আকাশে মিরাজ আর রাফায়েলের উড়ে বেড়ানোর বিকট শব্দ। চোখের সিমানায় পুতে রাখা ল্যান্ড মাইন আর ট্রেঞ্চের নিচে মাশিনগান নিয়ে প্রস্তুত পদাতিক বাহিনি, মনের মরুভূমিতে চলছে ট্যাংকের মহড়া। অজানা মস্তিস্কের কোন গুপ্ত স্থানে আছে প্রুস্তুত ক্ষেপনাস্ত্র।

নতুন কোন স্বপ্ন যেন প্রবেশ করতে না পারে এই তৃতীয় বিশ্বের নিদ্রাহীন, স্বপ্নহীন চোখে। যে স্বপ্ন আমি এখনো দেখি নি তাকে কেন খুন করা হয় বারেবার। আর তো কিছু চাই নি, কিছুই তো নেই আমার কাছে, একটুকরো স্বপ্ন যদি চোখে সাজিয়ে নিতে পারি তাহলে ওটা কি হয়ে যাবে কোন পারোমানবিক বোমা!


বিভ্রম

তার কথা কি মনে পড়ে?
যার মুখোমন্ডল থেকে হতো ভোরের আবির্ভাব,
তার কথা কি মনে পড়ে?
যে তার কালো কেশ মেলে দিলে হতো তিমির রাত,
যার ঠোঁট ছুঁয়ে গোলাপ হতো গোলাপ
তার কথা কি মনে পড়ে?
যার দৃষ্টিতে মনে জেগে উঠতো বাঁশির সুর
যার হাসিতে বেজে উঠতো
মন মন্দিরে ঘন্টা অতি মধুর,
যাকে ভেবে জ্বলে উঠতো কল্পনায় শত প্রদীপ
আমার উত্তাল ভাবনার জোয়ারে
সে যে হয়ে আছে এক প্রশান্ত দ্বীপ।
হ্যাঁ তার কথা মনে পড়ে
মাঝে মাঝেই মনে পড়ে
কিন্তু পড়ে না মনে
কোথায় দেখেছি তারে
জাগরণে, শয়নে না কি স্বপনে?


কবিতার জন্ম



রাত তার অন্ধকার গর্ভ থেকে প্রতিদিন এক নতুন সূর্য জন্ম দেয়। জন্ম দেয়া কোন খেলা নয়। কেবল বললেই জন্ম দেয়া যায় না। জন্ম দেয়ার ব্যথা প্রচন্ড। জন্ম হয় এক নতুন দিনের তিমির রাত্রির গর্ভ থেকে। জন্ম হয় একটি কবিতার মস্তিষ্কের কানাগলি থেকে। একটি ছোট শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে ভাবনা মাথার বারান্দা পার হয়ে, কল্পনার শিড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে কাগজের সমতল ভূমিতে নামে। এদিক ওদিক হোঁচট খায়। কিছু অক্ষর জখম হয়, কিছু শব্দ আহত হয়, কিছু বাক্যের পতন ঘটে। মাঝে মাঝে জন্ম নেয়ার আগে নবভাবনার খুন হয়, কিছু চিন্তা জন্ম নেয়ার আগে মৃত্যু বরণ করে।
তবুও কবিতার মৃত্যু নেই, কবিতা বেঁচে থাকে একটি চিন্তা হয়ে। মস্তিষ্কের অন্ধকার গলিতে জোনাকি হয়ে, মগজের স্যাঁতসেঁতে পুকুরে রঙ্গিন মাছ হয়ে। ভাবনা প্রজাপতির রঙ্গিন পাখা মেলে মনের উদ্যানে প্রস্ফুটিত চিন্তার ফুলে উড়ে বেড়ায় আর শুষে নেয় কল্পনার নির্জাস। কবিতা কল্পনার আকাশে উড়ে বেড়ায় কখনো গাঙচিল, কখনো ঈগল হয়ে। মনের আকাশে গানের তান ছড়ায় কখনো ময়না আর কখনো কোকিল হয়ে। ছোট চড়ুই পাখী হয়ে তার নীড় বাঁধে হৃদয়ের মাঝে। সময় সুযোগ পেলেই ফুড়ুৎ করে উড়ে এসে বসে মস্তিষ্কের কার্নিশে। আর চুপি চুপি কখন যে নেমে আসে ধবধবে সাদা অস্পৃষ্ট কাগজের উপর একটি নতুন কবিতা হয়ে, কেউ কি জানে?
কবিতার জন্ম বড় জটিল, বড় বেদনাদায়ক, বড় কষ্টকর, বড় ব্যথার, তবুও কবিতা বারেবার জন্ম নেয়, বারেবার ফিরে আসে মস্তিষ্কের অন্ধকার গর্ভ থেকে বেরিয়ে সাদা অস্পর্শিত কাগজে!


অস্থির বিশ্বলোক

তোমার দুঃখ
আমরা সবাই বদলে যাচ্ছি।
স্থিরতা তো নয় জীবনের লক্ষণ
সময় বদলে যাচ্ছে, কাল বদলে যাচ্ছে
দিন আর রাত, মাস ও বছর
সবই তো আছে এক দৌড়ের ভিতর।
এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলা
এই পৃথিবী, আকাশ, চন্দ্র আর তারা
এই গ্রহ, উপগ্রহে, ধুমকেতু আর সূর্য
সবই তো নিমজ্জিত অস্থিরতায়
আছে মগ্ন এক মহাদৌড়ে
সবার লক্ষ্য নিজের উৎসের সাথে মিশে যাওয়া
সবার ইচ্ছে অনন্তের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া।
দুঃখ করো না
অস্থিরতাই জীবন
স্থিরতার অপর নাম মরণ।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত