হৃদয়ের ও কূল

  এম এ কামাল বিল্লাহ্ ২৪ মে ২০২০, ২৩:৩৩:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

প্রতীকী ছবি

শাহীন হাতের কাছের কাজগুলো শেষ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিচ্ছিল। খানিক বাদে তার সেল ফোনটা দুই বার বেজে উঠে আবার কেটে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল সে। মহসিন ভাইয়ের মিসড্ কল। সে বড় হিসাবী মানুষ। বাহুল্য খরচ মোটেও করতে চায় না। করবেইবা কেমন করে?

বিআইডব্লিওটিসিতে অফিস সহকারীর চাকুরি। যে কয় টাকা বেতন পায়, তার বেশিরভাগই দেশের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানের ভরণ-পোষণেই চলে যায়। মাঝে মাঝেই আক্ষেপ করে বলে, ‘এই সব ছা-পোষা চাকুরি করার চেয়ে পান দোকানদারী করা ঢের ভাল, বুঝলা?’

শাহীন ল্যান্ড ফোন থেকে রিং ব্যাক করলো, ‘হ্যালো মহসিন ভাই। কেমন আছেন?’
‘ভালো। শোন, ঐযে ব্যাংকার হুমায়ুন সাহেবের মেয়ে দেখলাম না? সে আজ সকালে জানাল, তারা মেয়েকে আরো পড়াবে। এখন বিয়ে দেবে না। বুঝলা না? ইনিয়ে বিনিয়ে রিজেক্ট করা আর কি।’

‘অ আচ্ছা।’ শাহীনের নির্লিপ্ত জবাব।

‘আর শোন, মেসে তোমার সিটটা এই মাস রাখবা, নাকি কাউকে দিয়া দিব? লোক আসতেছে।’

শাহীন খানিকটা ভেবে বলল, ‘পরে জানাব আপনাকে।’
‘ও দিকে ইসমাইলেরও তো বিয়ে ঠিক হয়েছে। মেস ছেড়ে চলে গেছে। মিরপুরের দিকে বাসা নিয়েছে। জান বোধ হয়।’
‘জ্বী, জানি। তার তো কালকেই বিয়ে। আমি আসব ইনশাল্লাহ। দেখা হবে।’

শাহীন ফোন ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে গা টা আবারো এলিয়ে দিলো। আজকাল মাঝে মাঝেই তার মনের ভেতর কেমন যেন একটা অস্থিরতা, একটা চাঞ্চল্য কাজ করে। শুধুই কি আজকাল? এরকম অস্থিরতা কিংবা চাঞ্চল্য আগেও কি ছিল না? আগে, মানে একেবারে সেই শৈশব অব্দি? সেই শালুককুড়ার জ্যৈষ্ঠ মাসের পুষ্প-মঞ্জুরী ঢাকা বরুন, হিজল আর গাবের শ্যামলিমার পাশে বৈচি-ভাট-মটখোলার ঝোপ, সেই ছোট্ট নদী দুধনালী, যার দু’পাশে ধান ক্ষেতের সবুজ ঘাগড়া পড়ানো লিকলিকে নালা, যার নিকষ কালো জলে শুভ্র মেঘমালা শোভিত আকাশের ছবি স্থির চিত্রপট হয়ে থাকে- সেখানকার আকাশ-বাতাস মনটাকে উদাস করে দিত নাকি নিত্যই? সেই উদাস করা অস্থিরতাটা মনের ভেতর ভুর ভুর করতো, আর কানে বাজতো, এখানে নয়, আরো আরো দূরে কোথাও। শৈশবের খেলা পর্ব শেষে কৈশোরের আরেক নতুন অস্থিরতা, এগিয়ে যেতে হবে, সামনে, আরো সামনে। বগল ভর্তি পুস্তকের বোঝা বয়ে স্কুলে যাওয়া, দিনরাত সেগুলোর উপর ভূত হয়ে থাকা। কানের মাঝে নিত্যই বেজে যায়, পড়ো পড়ো, আরো পড়ো, শালুককুড়াকে পেছনে ফেলে যেতে হবে বহুদূর। সেই বহুদূরের গন্তব্য ধরার জন্য হাড়ভাঙ্গা শ্রম, রাত-দিন গাইড-পত্রিকা নিয়ে পড়ে থাকা। টেস্টের পর টেস্ট দিয়ে যাওয়া। শেষ মেষ পাবলিক সার্ভিস কমিশন ফেইস করে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের এই চাকুরি। তাও তো সোনার হরিণ পাওয়ার মতো ব্যাপার।

সেখানেই সেই অস্থিরতার অবসান হলো কি? তাতো নয়। নিজের ভেতর বাহির সবখান জুড়ে সেই গুঞ্জন, আরো কি যেন আছে, কি যেন পাওয়া হলো না এখনো।
চাকুরি পাবার পর বাউশমারার খালাকে সংবাদটা জানাতে গিয়েছিল শাহীন। খালা খুশি হয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। তার চোখ দুটো অশ্রু-সজল হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, ‘আজ তোর মা বাইচা থাকলে কি যে খুশি হইত।’

একথা সেকথার পর পাশে বসিয়ে বলল, ‘ভাল চাকরি পাইছস, এবার একটা বিয়া কর। ফর্সা টুকটুকে দেইখা একটা বউ নিয়া আয় ঘরে।’
শাহীন আহলাদের সুরে বলেছিল, ‘আমার আর কে আছে? আপনাকেইতো দেখতে হবে এসব।’

খালা মৃদু হেসে বলেছিল, ‘আমরাতো দেখতে পারমু গ্রামে। তুইতো আর গ্রামে বিয়া করবি না।’ খানিকটা থেমে খালা আবার বলল, ‘তবে বাবারে, দেখবি দুনিয়া জুইড়া মেয়ের অভাব নাই। কিন্তু যখন বউ খুঁজতে যাবি, দেখবি পছন্দের মতো বউ পাওয়া যাইতেছে না, বেশীর ভাগই টউ।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘একেবারে মনের মতো বউ পাওয়া বড়ো কডিন। এর মধ্য থাইকাই বাইছা নিতে হইব।’

সেই আরেক অস্থিরতা, আরেক চাঞ্চল্য। এবার পেতে হবে বউ। সেও আবার ফর্সা, টুকটুকে। নিজের মনের মাধুরি মেশানো কল্পনা সে হয়তো নয়। তবে গুঞ্জনটা টের পাওয়া যায়, ফর্সা টুকটুকে বউ।

শুরু হলো পাত্রী খঁজাখুঁজি। সে রকম পাত্রী পাওয়াও কি সহজ? মোটেও না। এরি মধ্যে হাড়ে হাড়ে বুঝেছে সে। ইতোমধ্যে পাত্রী খোাঁজার কাজে বেশ ক’জন বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন এগিয়ে এসেছে। কিন্তু কেউই কেমন যেন সুবিধা করতে পারছে না। তার দীর্ঘ দিনের মেস মেট মহসিন ভাই এসব কাজে ইতোমধ্যেই মোটামুটি দক্ষতা অর্জন করেছে বলে মনে হয়েছে তার কাছে। সেও সুযোগমতো পাত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে ইতোমধ্যেই শাহীনের মধ্যে সেই অস্থিরতাটা আঁচ করতে পেরে কথায় কথায় একদিন বলছিল, ‘তোমাকে আরো ধৈর্য্য ধরতে হবে শাহীন। একটু সময় লাগবে।’

শাহীন চুপচাপ তার দিকে তাকিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর মহসিন বলল, ‘তোমার শর্ত টর্ত একটু বেশীতো। মেয়েকে ফর্সা, সুন্দরী হতে হবে, ছাত্রী ভাল হতে হবে, বাবা ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এতসব মিলিয়ে পাত্রী জোগাড় করা কঠিন, বুঝলা? কিছু কিছু শর্ত তোমাকে ছাড় দিতে হবে।’
খানিক্ষণ নিরবতা। শাহীন পাল্টা কোন প্রতিক্রিয়া করতে উৎসাহ পায় না। মহসিন বলে চলে, ‘আমি তোমাকে জামালপুরের একটা মেয়ে দেখালাম না, ঢাকায় হোস্টেলে থেকে ইডেনে পড়ে। মেয়েটা কিন্তু ভাল ছিল। তুমিতো পছন্দ করলা না।’

শাহীন আনমনে বলল, ‘ঠিকই ছিল। কিন্তু মেয়ের বাবা জামালপুরে সেটেল্ড, আবার দেখতেও শ্যামলা। শ্যামলা মেয়ে আবার আমার পছন্দ না।’
মহসিন মুচকি হেসে বলল, ‘কথাতো এইটাই। এইটা মিলাতে গেলে তোমাকে ঐটাতে ছাড় দিতে হবে, বুঝলা না?’

শেষে খোঁজাখুজি করে সেই মেয়েটার সন্ধান পাওয়া গেল। জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাসে অনার্সে পড়ে। ফর্সা। দেখতে শুনতে বেশ, যদিও খুব একটা লম্বা নয়। তার বাবা সোনালী ব্যাংকে চাকুরি করে জুনিয়র অফিসার পদে। মিরপুরে নিজের বাসা। শাহীনের পছন্দ হয়েছিল সম্বন্ধটা। কিন্তু সেটাও তো হলো না।
‘কাম ইন স্যার? সালাম দিয়েছিলেন স্যার?’

শাহীন চোখ তোলে তাকাল। এটিইও এনামুল হক হাসি মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সোজা হয়ে বসতে বসতে শাহীন বলল, ‘এনাম সাহেব আসেন আসেন, বসেন।’
এনাম এসে সামনের চেয়ারে বসলো। শাহীন বলল, ‘স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাথে প্যারেন্টস্ টিচার্স এসোসিয়েশনের সমন্বয় করে কিছু স্কুলে পাইলট ব্যাসিসে কাজ করব আমরা।
আমার মনে হয় কমিউনিটি এনগেজমেন্টটা বাড়াতে পারলে এটেনডেন্স প্লাস কোয়ালিটি এনসিউরেন্সের কাজটা সহজ হবে। এর জন্য উপর থেকেও একটা ডিরেকশন আছে।’
এনাম মাথা ঝাাঁকিয়ে বলল, ‘সে কাজটা আগে থেকেই চলছে স্যার। তবে এতটা জোরে সোরে নয়। এসব ক্ষেত্রে হেড টিচাররা আন্তরিক না হলে ভাল ফল পাওয়া যায় না। বেশীর ভাগ হেড টিচারই এসএমসি আর পিটিএ কে সেভাবে একটিভেট করতে চায় না।’

শাহীন খানিকটা ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমরা পাইলট ব্যাসিসে কিছু হেড টিচারকে মোটিভেট করে প্রসিড করতে পারি।’
খানিক থেমে শাহীন আবার বলল, ‘হ্যাঁ, আরেকটা কথা। বলছিলাম না আপনাকে? আমাকে আগামীকাল একটু ঢাকা যেতে হবে। একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে। ডিপিইও স্যারের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছি। সোমবারে ফিরব। উইকেন্ডের পর এক দিনেরই ব্যাপারতো? একটু সামলে নিয়েন।’
এনাম হাসি মুখে বলল, ‘কোন টেনসন করবেন না স্যার। আমি সব দেখব ইনশাল্লাহ্। কার বিয়ে স্যার?’

শাহীন মুচকি হেসে বলল, ‘দুই পক্ষই নিজের লোক বলতে পারেন। পাত্রী আমার দূর সম্পর্কের চাচাত বোন, আর পাত্র আমার ক্লাশ মেট, আবার মেস-মেটও।’
এনাম মাথা ঝাকিয়ে বলল, ‘পাত্র করে কি স্যার?’
‘একটা এনজিও তে চাকুরি করছে। বেশ ভাল বেতন।’ শাহীন জবাব দিল।

এনাম হেসে বলল, ‘স্যার, এবার আপনিও দেখে শোনে একটা বিয়ে করে ফেলেন। বিয়ে শাদীর কাজ আসলে দেরী করা উচিত না। শেষে দেখা যায় চাকরিই হয়তো শেষ হয়ে গেল, কিন্তু ছেলে মেয়েদের লেখা পড়াই শেষ হলো না। আমার যেমন অবস্থা।’
শাহীন বলল, ‘আপনার চাকরি আর কয় বছর আছে যেন?’
‘পাঁচ বছর।’

‘পাঁচ বছর তো কম সময় না। আপনার বাচ্চারা কে কি করে?’

একটা ছোট নিঃশ্বাস ছেড়ে হেসে হেসে এনাম বলল, ‘আমার সবার বড়তো মেয়ে, সে এইবার এসএসসি দিবে মাত্র। পরে দুইটা ছেলে, একটা এইটে, সবার ছোটটা ফাইভে।’
শাহীন খানিকটা হেসে বলল, ‘অ, আচ্ছা।’

এনামুল হক এই অফিসে সিনিয়রমোস্ট এটিইও। লোকটাকে শাহীনের বেশ পছন্দ। কথা একটু বেশী বলে, কিন্তু যাই বলে বেশ আন্তরিকতার সাথেই বলে। তার জীবনবোধও বেশ গভীর। তার সাথে কথা বলতে তাই বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করে সে। কিন্তু আজ আর কথা বাড়ানোর ইচ্ছা হলো না শাহীনের। সপ্তাহের শেষ দিন হওয়ায় বহুকাজ পেন্ডিং পড়ে আছে। তাকে বিদায় দিয়ে সেসব কাজে মনোযোগ দিল সে।

অফিস শেষে শাহীন রেস্ট হাউসে এসে গোসল করে বিছানায় গাটা ছেড়ে দিল। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটায় একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, কেমন যেন একটা মন খারাপ করা অনুভুতি। অথচ মন খারাপ হওয়ার মতো তেমন কিছুতো ঘটে নাই। ব্যাংকারের মেয়ের সাথে বিয়ের সম্বন্ধটা ভেঙ্গে গেছে, সেটা কিঞ্চিৎ মন খারাপ হবার মতো ঘটনা বটে। শুরুর দিকে এভাবে কেউ প্রত্যাখ্যান করলে ইগুতে লাগতো খুব। এখন সেগুলো বেশ সয়েই গেছে।

পরক্ষণেই মনের কোন এক গহীন কোণে একটা অজানা কষ্ট যেন মাথা চাড়া দিতে চাইল। শেষ পর্যন্ত রোকসানার বিয়েটা হয়েই যাচ্ছে তাহলে? শাহীন মনে মনে অবাক হয়। রোকসানার বিয়ে হবার কথা ছিল, হচ্ছে। তাতে তারতো মন খারাপ হবার কথা নয়। রোকসানার সাথে ইসমাইলের বিয়েতে সে-ইতো বরং উপযাচক হয়ে অনেকটা মধ্যস্থতা করে দিয়েছে। মেয়েটার একটা ভাল গতি হলো বলে আত্মতৃপ্তিও বোধ করেছে মনে মনে। তাহলে এনিয়ে এখন মন খারাপ হবে কেন? একটা বিদ্রুপ, তাচ্ছিল্য ভরা পরিহাস তার মনের সেই ভাবনাটার উপর ছড়িয়ে দিল সে।

কিন্তু তাও ভাবনাটা অবদমিত থাকছে না, ফিরে ফিরে আসছে সেটা। রোকসানার বিয়েটা তাহলে হয়েই যাচ্ছে? যতবারই ভাবছে, ততবারই হৃদয়ে চিন চিন করে উঠছে। রোকসানার সাথে আগের সেই সহজ, স্বচ্ছন্দ আর দ্বিধাহীন সম্পর্কটা শেষ হতে চলল? সে চিরতরে দূরে সরে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর কোনভাবেই পূর্বের স্বাচ্ছন্দের জায়গায় ফিরিয়ে আনা যাবে না তাকে?

রোকসানার প্রতি দরদ আর মায়ায় মোড়ানো একটা টান যেন অনুভব করছে সে। শাহীন বুঝার চেষ্টা করছে, হঠাৎ করেই কি এই টানটা সে অনুভব করছে, নাকি আগে থেকেই সেটা ছিল। হ্যাঁ, তাতো ছিলই। সেই আত্মীয়তার টান। হোক দূর সম্পর্কের, কিন্তু চাচার মেয়েতো। জ্ঞাতিত্বের একটা টানতো ছিলই, যা আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তাহলে? এখন এনিয়ে এতটা ভাবনা আসছে কেন?

নাকি সে টানটা নেহায়েত আন্তরিকতার পর্যায় থেকে অন্য কোন পর্যায়ে উঠে এসেছিল যেটা কিনা প্রেম-ভালবাসার মতো কোন বিষয়? শাহীন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ব্যাপারটা। শাহীনের চিন্তায় রোকসানা কেমন যেন ঘুরা ফেরা করতেই থাকল। কিছুতেই তাকে মাথা থেকে সরাতে পারছে না সে। তাকে ক্রমেই এলোমেলো স্মৃতির আবেশে বারবার নিয়ে যেতে থাকলো অতীতে।

রোকসানার সাথে প্রথম যেন কোথায় দেখা? মনে পড়ে না শাহীনের। বছরে তিন চারবার করে তারা দেশের বাড়ী যেতো। তখন দেখা হতো। তবে সেই দেখা হবার ব্যাপারটা খুব একটা স্মৃতিময় হয়ে উঠেনি। কারণ রোকসানারা কেউই সেভাবে গ্রামের ছেলে মেয়েদের সাথে খেলাধুলা, দৌড় ঝাঁপ করতে পারতো না। শাহীনের সাথে তাদের পরিবারের সত্যিকারের যোগাযোগটা শুরু হয় সে যখন জগন্নাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হলো, তখন থেকে। যোগাযোগ সুবিধার কারণে রামপুরায় রুম ভাড়া নিল সে। দুই একটা টিউশনিও সেখানে পাওয়া যেতো।

সেখান থেকে রোকসানাদের বাসা মালিবাগ চৌধুরী পাড়া খুব একটা দূরে নয়। মাঝে মাঝেই সময় সুযোগ পেলে সেখানে যেতো। সময় সময় রোকসানাকে ইংরেজী গ্রামারের কিছু এক্সারসাইজ দেখে দিতো। তার বড়ো বোন আফসানা আপার সাথেই বরং বেশী আন্তরিকতা গড়ে উঠে তার। আফসানা আপার মধ্যে অপরকে আপন করে নেবার একটা ক্ষমতা আছে। তার চেহারায় কেমন যেন একটা মায়া, আশ্রয় আর হৃদ্যতার টান।

ঘন ঘন আসা যাওয়ার সুবাদে রোকসানার সাথেও একটা সহজ-স্বচ্ছন্দ ভাই বোন সুলভ সম্পর্ক তার গড়ে উঠে। রোকসানার মধ্যে অপরের উপর কর্তৃত্ব ফলানো, দুষ্টুমির ছলে এটা সেটা শেখানোর একটা সহজাত প্রবণতা আছে। সে প্রবণতার ধাক্কা প্রায়শই শাহীনের উপরও পড়েছে। এই কারণে শাহীন প্রথম দিকে কোন না কোন ভাবে তাকে পাশ কাটানোর তালে থাকতো। পরে অবশ্য রোকসানাকে বেশ সহজভাবেই নিতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে।

রোকসানার সাথে শাহীনের দেখা সাক্ষাৎ আর মিথস্ক্রিয়ার ঘটনা খুব বেশী নয়। কিন্তু যে কয়বার তার সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, সেসব তার স্মৃতিতে কেমন যেন জাজ¦্যল্যমান হয়ে আছে।

বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির ইন্টারভিউ দিতে এলাকার ছেলেদের সাথে দল বেঁধে ঢাকা আসে শাহীন। পল্টনের এক হোটেলে উঠে। ভর্তি পরীক্ষা শেষে ভাবল একবার ছাত্তার কাকার বাসা হয়ে যাই। তার পিতা জব্বার মওলা বেঁচে থাকতে তার সাথে দুয়েকবার সেই বাসায় গিয়েছে সে। মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় বাসা। লোকেশনটা এখনো মনে আছে। ছোট্ট এক গলি রাস্তার ডান কোণে বাসা, সামনে একটা জাম্বুরা আর একটা বেল গাছ পাশাপাশি। চিনতে কষ্ট হলো না তার।

বাহির থেকে গেইটের ফাঁক দিয়ে কৌতুহল বশত দেখে নিল বাসাটা। হ্যাঁ, সেই জাম্বুরা আর বেল গাছ দুটো এখনো আছে। তবে সেগুলো লিকলিকে আর বিবর্ণ হয়ে গেছে। টিনের গেইটে ঠক ঠক ধাক্কা দিয়ে আবারো ফাঁক দিয়ে দেখছিল সে। এক সময় শ্যামলা মতো পনের ষোল বছর বয়সের এক মেয়ে এসে দরজা খোলল। মেয়েটাকে সে আবছা চিনতে পারল। সাত্তার কাকার ছোট মেয়ে। নামটা যদিও মনে পড়ছে না। ছাত্তার কাকার সন্তানদের মধ্যে আফসানা আপার নামটাই তাদের ছোট বেলা থেকে বেশী জানাশোনা। তিনি দেশের বাড়ী গেলে মওলা বাড়ীর সকলের সাথেই দেখা সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করতেন।

মেয়েটি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে নিঃসংকোচে সোজাসুজি তাকিয়ে থাকল। পরক্ষণেই মৃদু হেসে বলল, ‘আসুন।’
ভেতরে বামপাশের একটি কক্ষে সোফায় তাকে বসতে দিল। কিছুক্ষণ পর আফসানা আপা এলো। সাথে তার আট নয় বছরের ছেলে। ছেলেটি মায়ের আঁচল ধরে টানা টানি করছিল।

আফসানা আপা বসতে বসতে বললো, ‘কিরে তুই জব্বার চাচার ছেলে না? তোর নাম যেন কি?’
শাহীন আফসানা আপার আন্তরিক সম্বোধনে শুরুতেই বেশ সহজ হয়ে উঠলো। মুখে সহজ হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘জী, আমার নাম মোহাম্মদ শাহীন।’
আফসানা আপা তার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘সাম্য, বসো গিয়ে, যাও। আর একে সালাম দেও। তোমার মামা হয়।’

ছেলেটি শাহীনের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসলো। আফসানা আপা সাম্যের দিক থেকে দৃষ্টি শাহীনের দিকে ফিরালো। বলল, ‘তা শাহীন, কি মনে করে ঢাকা এলে?’
‘ভার্সিটিতে ভর্তির ইন্টারভিউ দিলাম।’

আফসানা আপার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘আচ্ছা? কেমন হলো পরীক্ষা?’
‘মোটামুটি।’
‘কোথায় উঠেছিস?’
‘এলাকার অনেকেই আসছেতো, সবাই পল্টনে এক হোটেলে উঠেছি। আজ সন্ধ্যার ট্রেনে চলে যাব।’
‘দেশে সবাই ভাল?’
‘জি¦, ভাল।’

এর মধ্যে সেই শ্যামলা মেয়েটি ট্রেতে করে চা-বিস্কুট নিয়ে এলো। আফসানা আপার পাশে হাসিমুখে বসলো সে। আফসানা আপা পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘ও হচ্ছে রোকসানা। আমাদের সবার ছোট। আর রোকসানা, এই হচ্ছে শাহীন, জব্বার চাচার ছেলে।’
রোকসানা হাসতে হাসতে বলল, ‘ওনাকে দেখেই চিনতে পেরেছি।’
আফসানা আপা চোখ প্রসারিত করে বলল, ‘কিভাবে চিনলি?’
‘ছোট বেলা দুয়েকবার দেখেছি। তাছাড়া ওনাকে দেখেই মনে হয়েছিল, কর্তা বাড়ীর কেউ হবে।’ রোকসানার মুখে মৃদু হাসি।

সেদিন বিশেষ করে আফসানা আপার সাথে দেশের বাড়ীর নানান বিষয় নিয়ে কথা হলো। আফসানা আপা খুটিয়ে খুটিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলো। কথা বলতে বলতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। শাহীনকে এখনি কমলাপুরে ছুটতে হবে। উঠতে যাবে, এমন সময় রোকসানা বেশ সহজ ভাবে বলল, ‘শাহীন ভাই, শুনেন। কারো বাড়ী গেলে, বাইরে থেকে উঁকি ঝুকি দিয়ে দেখবেন না। এটা অভদ্রতা। প্রয়োজনে গেইটে নক করবেন। বুঝলেন?’

শাহীন বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সে কথায়। লজ্জায় তার মুখটা লাল হয়ে গেল। অসহায়ের মতো তাকালো রোকসানার দিকে। আফসানা আপা ভরসা দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘এটা তেমন কিছু না। তুই হয়তো বাসা চিনতে পারছিলি না, তাই না? ঠিক আছে, সাবধানে যাইস।’

সেবার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে তার চান্স হলো না। ভর্তি হলো জগন্নাথে, পলিটিক্যাল সাইন্স নিয়ে অনার্সে। এর পর মাঝে মাঝে যাওয়া হয় সাত্তার চাচার বাসায়। বেশীর ভাগই চাচী আর আফসানা আপার সাথে কথা হয়। শাহীনের কাছ থেকে তারা দেশের বিষয় সম্পত্তির খোঁজ খবর নেয়। দেশের সাথে তাদের যোগাযোগের ভাল একটা যোগসূত্র হয়ে উঠে শাহীন। ফাঁকে ফাঁকে রোকসানার সাথেও হালকা কুশল বিনিময় হয়।

একদিন সন্ধ্যার আগে আগে মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় বাস থেকে নেমে হাটতে হাটতে সাত্তার চাচার বাসায় যাচ্ছিল শাহীন। এমন সময় পেছন থেকে পাশে একটি রিক্সা এসে দাঁড়ালো। শাহীন খেয়াল করার আগেই এক মেয়ে কণ্ঠ পাশ থেকে ভেসে এলো, ‘শাহীন ভাই, উঠেন।’

শাহীন হকচকিয়ে গেল। ডানে মাথা ঘুরিয়ে দেখে রিক্সায় রোকসানা বসে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসছে। শাহীন ইতস্তত করছে দেখে রোকসানা আবারো বলল, ‘আমাদের বাসায় যাচ্ছেন না? উঠেন।’

শাহীন সংকোচের সাথে জড়সড় হয়ে রিক্সায় রোকসানার পাশে বসলো।
বাসায় এসে এটা সেটা নিয়ে কথা হচ্ছিল রোকসানার সাথে। ইংরেজী গ্রামারের কিছু এক্সারসাইজও দেখিয়ে দিল তাকে। শেষে শাহীন বলল, ‘আমি কিন্তু বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম আজ। আচ্ছা তুমি যে এভাবে আমার পাশে এসে রিক্সা নিয়ে দাঁড়ালে, তোমার ভয় হলো না?’

রোকসানা সহজ ভাবে বলল, ‘কিসের ভয়?’
‘আমি না হয়ে অন্য কেউ হতো যদি?’
‘আমি কনফার্ম হয়েই দাঁড়িয়েছি।’
‘পেছন থেকে কিভাবে কনফার্ম হলে?’

রোকসানা এবার দুষ্টুমির হাসি হাসল খানিকটা। রহস্য করে বলল, ‘শালুককুড়া কর্তা বাড়ীর মানুষ জনকে পেছন থেকেও চেনা যায়।’
শাহীন হা করে তাকিয়ে থাকল রোকসানার দিকে। রোকসানা আবারো হাসলো। বলল, ‘শুনেন, কর্তা বাড়ীর মানুষের হাটার একটা ভঙ্গি আছে। শহরে এলেও গ্রামের সেই ভঙ্গিটা থেকেই যায়।’

শাহীন কিছুক্ষণ আনমনে তাকিয়ে থাকল রোকসানার দিকে। আসলেইতো, এতবড় এই শহরে এসেছে সে, কিন্তু তার শালুককুড়ার সেই শৈশব, মাঠে ঘাটে সেই ছুটে চলা, কাঁদা মাটির গন্ধ, সেসবতো তাকে ঘিরে আছেই। ধুয়ে মোছে, শান দিয়েও কি একেবারে এই শহরের মতোটি হতে পেরেছে? আর পারবেও কি কোন দিন?
ক্রমেই রোকসানার সাথে তার সম্পর্কটা আরো সহজ হয়ে উঠেছে।

যেমন সেদিন দুপুরের আগে আগে শাহীন রোকসানাদের বাসায় গেল আফসানা আপার সাথে দেখা করতে। আফসানা আপা একটা বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে কথা বলছে। জরুরী তাকে দেখা করতে বলেছে। তাদের লিভিং রুমে সোফায় বসে রোকসানা তখন নিবিষ্ট চিত্তে কাপড়ে এমব্রয়ডারির কাজ করে যাচ্ছে। শাহীনকে আসতে দেখে মুচকি হাসল সে। কোন কথা বলল না। ভাবটা এমন যে, শাহীন যে এখন আসবে, তা তার আগে থেকেই জানা।
‘রোকসানা, কেমন আছ? আজ কলেজ নাই?’ সোফায় বসতে বসতে শাহীন জিজ্ঞেস করলো।
রোকসানা এমব্রয়ডারি ফ্রেম থেকে চোখ তোলে তাকিয়ে আবারো মিষ্টি করে হাসল। পরক্ষণেই নিজ কাজে পুনরায় মনোযোগ দিয়ে বলল, ‘থার্ড ইয়ারের সেমিস্টার ফাইনাল চলছেতো, সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাশ অফ। আপনি কেমন আছেন?’
সামনের সোফায় বসতে বসতে শাহীন বলল, ‘ভাল।’
‘ভাল একটা চাকরি পাইছেন, এখন সুন্দর দেইখা একটা বিয়া করতে হবে, তাই না?’
শাহীন তার কথা শুনতে পায় নাই এমন একটা ভাব করে বলল, ‘কি করতেছ?’
‘আমি কি করতেছি, সেটাতো দেখতেই পাচ্ছেন।’ নকশার কাজে মনোযোগ অক্ষুন্ন রেখেই রোকসানা আবার বলল, ‘অনেক অর্ডার জমে গেছে, বুঝলেন? সময় পাচ্ছি না।’
গুন গুন করতে করতে রোকসানা কাপড়ে সুইয়ের ফোঁড় তোলতে তোলতে বলল, ‘আমার আজকাল ভাল ইনকাম, বুঝলেন শাহীন ভাই? চিন্তা করতেছি, লেখাপড়া শেষ করে একটা এমব্রয়ডারি ফার্ম দিব। চাকরি বাকরির পেছনে ছুটব না।’
‘লজ্জা পাইলেন?’ খানিক পর আনমনে প্রশ্ন করলো রোকসানা।
শাহীন পাশ থেকে হঠাৎ মুখ তোলে তাকাল। রোকসানার প্রশ্নটি বুঝতে পারে নাই এমন একটা ভাব করল সে।
‘ওই যে বিয়ের কথা বললাম?’
‘ও আচ্ছা, সেই কথা। সেটা লজ্জা পাবার কি আছে?’
‘তাতো অবশ্যই। লজ্জা পেলেতো আর বিয়া করা যাবে না। আর ঘটকও ভালই ধরেছেন।’ বলে হাতের কাজটায় খানিক বিরতি দিয়ে শাহীনের দিকে চোখ তোলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘ঘটক নাতো? মহিলা ঘটক। আচ্ছা ঘটকের স্ত্রী লিঙ্গ যেন কি, ঘটকী নাকি ঘটকিনী?’
শাহীন জানে, রোকসানার দুষ্টুমির খুব বেশী রিঅ্যাক্ট করা যাবে না। তার সাথে এইসব ক্ষেত্রে কথা যত কম বলা যায়, ততই নিরাপদ। শাহীন মুখে হাসি হাসি ভাবটা ধরে রেখে তাই চুপ করে বসে রইল। রোকসানা নিজের কাজে পুনরায় মনোযোগ দিয়ে বললো, ‘এসব বিষয়তো আপনাকে এখন জানতে হবে, তাই না?’
প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে শাহীন বলল, ‘আফসানা আপা বাসায় নাই?’
‘নাহ্। সাম্যদের স্কুলে গেছে। সেখানে অভিভাবকদের একটা মিটিং আছে।’ খানিক বাদে আবার বলল, ‘একটু বসেন। হাতের কাজটা প্রায় শেষ। টি টেবিলে পত্রিকা আছে, চোখ বুলান একটু।’
শাহীন পত্রিকাটা নিয়ে আনমনে উল্টাতে লাগল। খানিক পর রোকসানা নকশার ফ্রেমটা পাশে রেখে দিয়ে আঙ্গুল থেকে ফিঙ্গার প্রটেক্টর খোলে সুই সুতাসহ ছোট্ট প্লাস্টিকের বক্সে গুছিয়ে রাখল। অতপর সোফায় নড়ে চড়ে আরাম করে বসল। মুখে গাম্ভীর্যের ভাব নিয়ে বলল, ‘শুনেন, আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আছে। সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। কর্তা বাড়ীর মান ইজ্জতের প্রশ্ন। আমাদের পূর্ব পুরুষরা কি ছিল, জানেন তো?’

শাহীনের মুখে গোবেচারার ভাবটা আরো স্পষ্ট হলো। বলল, ‘কিছু কিছু জানি।’
‘পুরোটা জানেন না। এক সময় আম্মার কাছ থেকে শোনে নিয়েন। আম্মা পুরোটা জানে। আমাদের শিরায় শিরায় নীল রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, বুঝলেন? এখন কথা হচ্ছে, মওলা বাড়ীর প্রেস্টিজের ব্যাপার। আমরা যেখানে প্রস্তাব নিয়া যাব, সেখান থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরবো না। আফসানা আপা একটা বেশ ভাল সম্বন্ধ এনেছে। মেয়ে বেশ ফর্সা।’ বলে খানিকটা থামল সে। এক ঝলক শাহীনের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, ‘আপনার তো ফর্সা মেয়েই পছন্দ, তাই না?’

শাহীন বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। রোকসানার দিক থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে চুপ করে থাকলো।
রোকসানা এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই বলে চলল, ‘মেয়ে তিতুমির কলেজে পড়ে। বাবা ব্যবসা করে, রড সিমেন্টের ব্যবসা। চাকুরিজীবী পাত্র চায়। তাদের দেশের বাড়ী মুন্সীগঞ্জ। মগবাজারে বাসা। আজ সন্ধ্যায় আপনাকে নিয়ে যাবে। মেসে গিয়ে ফ্রেশ টেশ হয়ে পাঁচটার মধ্যে চলে আসবেন। খুব ট্রাফিকতো? একটু আগে ভাগে যাওয়াই ভাল।’
শাহীন মুখে একটা উদাসীনতার ভাব নিয়ে রোকসানার দিকে তাকিয়ে থাকলো। রোকসানা তার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে মুখ টান টান করে বললো, ‘আর শাহীন ভাই শুনেন। আপনার পা নাচানোর বদঅভ্যাস আছে। সেটা কিন্তু খুবই বাজে দেখায়। পাত্রীপক্ষের সামনে সোজা হয়ে স্মার্টলি বসবেন।’
শাহীন তৎক্ষণাৎ নিজের দিকে তাকালো। নড়ে চড়ে সোজা হয়ে বসে হাসতে হাসতে হাসতে বলল ,‘অ, আচ্ছা।’
‘এসময় যত্ত রকমের মুদ্রা দোষ আছে, এই যেমন নাক খোটানো, কান চুলকানো, ভর ভর শব্দ করে চা খাওয়া, এর সবই দূর করতে হবে। পাত্রী পক্ষ যেন কোন ছুতা খোঁজে না পায়। আর ভাল দেখে শার্ট-প্যান্ট পড়ে যাবেন। জেসচার পোসচারের একটা দাম আছে। মওলা বাড়ীর মান ইজ্জতের ব্যাপার। সব সময় খেয়াল রাখবেন।’

শাহীন উঠতে যাবে এমন সময় রোকসানা বলল, ‘দুপুরতো প্রায় হয়েই গেছে। লাঞ্চ করে যান।’
শাহীন একটু হাসল। বলল, ‘তার কি দরকার? মেসে মিল দেয়া আছে, পরে নষ্ট হবে।’
রোকসানার মুখটা গম্ভীর হলো। এমব্রয়ডারি ফ্রেমটা গুছাতে গুছাতে বলল, ‘না। খেয়েই যান। আপনার মেছে যে বিশ^বিখ্যাত খাদ্য রান্না হয়। আপনার খাবারটা গিয়ে বিড়ালকে দিয়ে দেবেন। সেই বিড়ালটা আছে না এখনো?’
শাহীন শব্দ করে হেসে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ, আছে। তোমার মনে আছে সেটার কথা? এখন আরো দুইটা কোথায় থেকে যেন জুটেছে।’
রোকসানাও খানিকটা হাসলো। বলল, ‘তাই? তাহলেতো সেগুলোকে দেখতে আবার যেতে হয় ।’
‘হ্যাঁ অবশ্যই যাবে। তবে আমাকে আগে ভাগে একটু জানিয়ে যেও। হঠাৎ করে তুমি মেয়ে মানুষ যাবে, ব্যাচেলর মেস, অনেকেই ক্যাজুয়াল ড্রেসে থাকে, বুঝনা?’
মুখে পুনরায় বিজ্ঞতার ভাব নিয়ে সে বলল, ‘ও, আচ্ছা। তাতো বটেই।’
পরে একদিন দুপুরের আগে হঠাৎ করে রোকসানা তার এক বান্ধবীকে নিয়ে শাহীনের মেসে গিয়ে হাজির। স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে লুঙ্গি পড়ে শাহীন তার নতুন রুমমেট ইসমাইলের সাথে যার যার চৌকিতে বসে খোশ গল্প করছিল। রোকসানা দরজায় নক করে তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘শাহীন ভাই কেমন আছেন? আপনার এখানে মেহমান হয়ে এসে পড়লাম। একা আসি নাই। সঙ্গে আমার এক বান্ধবীকেও নিয়ে এসেছি।’

শাহীন থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। ইসমাইল বিস্ময়ে হতবাক।
‘আরে রোকসানা, তুমি?’ শাহীন আর ইসমাইল দুজনেই ব্যস্ত হয়ে একপাশের চৌকিতে গিয়ে বসে অন্য চৌকিতে তাদের দুজনের বসার জায়গা করে দিল। দ্রুত দড়িতে ঝুলানো টাওয়াল গায়ে জড়ালো দুজনেই।

শাহীন হাসতে হাসতে বলল, ‘দেখোতো দেখি কি অবস্থা। একটু জানিয়ে আসবানা? এই অবস্থায়।’ শাহীন তাদের বেশ ভুষার দিকে ইঙ্গিত করল।
রোকসানা তার বান্ধবী তৃষাকে নিয়ে সামনের চৌকিতে তাদের মুখোমুখি বসল। মুখে গাম্ভীর্য এনে রোকসানা বলল, ‘আমার বান্ধবী তৃষা সাইকোলজিতে পড়ে। আপনার আগের রুম মেট জুবায়ের সাহেব চলে গেছেন? উনি বোধহয় নতুন আসছেন।’ বলে ইসমাইলের দিকে ইঙ্গিত করলো।

শাহীন বলল, ‘জুবায়ের সাহেবের স্কুলে চাকুরি হয়েছে নারায়নগঞ্জে। গত মাসে চলে গেছে। আর ও হচ্ছে ইসমাইল। আমার ক্লাশ মেট। আগে অন্য মেসে থাকতো। এখন খালি হওয়ায় আমার সাথে চলে এসেছে।’
ইসমাইল হেসে হেসে শাহীনের কথায় সায় দিচ্ছে। রোকসানা ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অ, আচ্ছা। ভাল আছেন?’
‘জি¦, ভাল।’ ইসমাইলের সমস্ত মুখ মন্ডল জুড়ে হাসির ঝলক ছড়িয়ে পড়ল।
রোকসানা মুখটা কঠিন করে বলল, ‘মাই গড, আপনি আমাকে জি¦ জি¦ বলছেন কেন? আমাকে কি মহিলা মহিলা লাগছে নাকি? শাহীন ভাই আমার কত বছরের বড়, জানেন?’
ইসমাইল খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘অ, আচ্ছা। শাহীনের ছোট বোন মানেতো তুমি আমারো ছোট বোনেরই মতো। ত, তোমরা কোন ইয়ারে পড়ছো?’
‘আমরা দুজনেই ইডেনে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। ও সাইকোলজি, আর আমি সোসিওলজি। আমাকে একটা এসাইনমেন্ট দিয়েছে, নগরে মেসের জীবন। আবার মেসের বোয়াদের সাইকোলজির উপর ওরও একটা এসাইনমেন্ট আছে। তাই না তৃষা?’

তৃষা খানিকটা লজ্জা পেয়ে হাসতে লাগলো।

রোকসানা আবার বললো, ‘শুধু থিওরি পড়েতো আর হবে না। তাই আমি তাকে বললাম, চল, ঢাকায় লোকজন মেসে কিভাবে থাকে, প্রাকটিক্যালি দেখে আসি। এই জন্য আসা। আজকে আবার স্টুডেন্ট স্ট্রাইক। তাই ক্লাশও হচ্ছে না। সুযোগ পেয়ে গেলাম। আর না জানিয়ে অতর্কিতে আসলাম কারণ এতে সত্যিকারের পরিবেশটা বুঝা যাবে।’
তৃষা হাসি মুখে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের আনাচে কানাচে দেখতে লাগল। দুই পাশে টানানো দড়িতে যার যার কাপড় ঝুলানো, দুই পাশে দুই চৌকির ফাঁকে দেয়াল ঘেষে দুটো ছোট ছোট টেবিল। টেবিলের সামনেই একটা ছোট্ট জানালা। বেশ আলো আসছে বাইরে থেকে। ওপাশে এখনো কোন বাড়ী ঘর হয়নি। সেই জানালা দিয়ে সোজা রামুপুরার ঝিল দেখা যাচ্ছে। টেবিলের সামনে দুটো চেয়ার। তবে সেগুলোতে বসার অবস্থা নেই। নানান পদের কাপড় চোপড় সেখানো গাদাগাদি করে রাখা। চেয়ারগুলো বসার চেয়ে আলনার কাজেই যে বেশী ব্যবহৃত হয় সেটা বুঝা যাচ্ছে। বিছানার চাদরগুলো অতি সম্প্রতি যে ধোয়া হয় নাই, তা বুঝতে অধিক গবেষণার প্রয়োজন নাই। রোকসানার এসব বিষয়ে তেমন কৌতুহল নাই।

কারণ সে ইতোপূর্বে আফসানা আপার সাথে দুই একবার এখানে এসেছে। কিন্তু তৃষাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে জীবনে প্রথম এরকম পরিবেশে মানুষের বসবাস পরখ করছে।
পরে তারা রান্না ঘরে গিয়ে দুপুরের খাবারের আয়োজন দেখল। বুয়া মরিয়মের সাথে বেশ খানিক্ষণ কথা বলল। শাহীন আর ইসমাইল ইতোমধ্যে তড়িঘড়ি করে প্যান্ট শার্ট পড়ে পিছু পিছু এগিয়ে এলো।
‘তুমি কি নতুন আইলা নি? আগে যে রানতো, হে কই?’ হেসে হেসে রোকসানা জিজ্ঞেস করলো।
মরিয়ম মুখ ছড়িয়ে হাসলো। বলল, ‘ও, মর্জিনার কথা কইতাছুইন? হে আমার জাল। হে দেশে চইলা গেছে। ধান চাইলের মিলে কাজ নিছে। ভাবতাছি আমিও চইলা যামু। এইহানে ফুসায় না আফা।’
‘তোমার স্বামী কি করে?’ তৃষা জিজ্ঞেস করে।
‘কনসটাকশনের জুগালির কাম করে। বড় আইলসা লোক, সবসময় কামে যায় না। তিনডা পুলাপাইন লইয়া বড় কষ্ট কইরা আছিগো আফা।’

রোকসানা এক ফাঁকে তৃষাকে কানে কানে বলল, ‘এইখানকার তরকারীর স্বাদ বিশ^বিখ্যাত। দেখবি? এ দিকে আয়।’
তরকারী চেকে দেখে তৃষা মরিয়মকে বলল, ‘তরকারীর এই অবস্থা ক্যান? মসলা লবণতো কিছু বুঝা যাচ্ছে না।’
মরিয়ম বলে, ‘হুনইন আফা, এই খানে নানান কিসিমের লোক থাহে। এই ধরেন মহসিন স্যারের পেরেসারের সমস্যা, তরকারীতে নুন বেশী দেওন যাইব না, জহির স্যারের আবার গেসটিক, তেল মসলা বারণ। নানান জনের নানান সমস্যা, বুঝলেন আফা। এই জন্যি এই ভাবে রানতে অয়। যার লবণ দরহার হে আলগা লবণ লইয়া লয়, যার ঝাল দরহার, হে কাঁচা মরিচ কামড়াইয়া খায়। এই আর হি।’
রোকসানা হাসে। তৃষা খানিকটা বিস্মিত হয়ে বলে, ‘ইন্টারেস্টিং তো?’
শাহীন পেছন থেকে এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলে, ‘তবে স্বাদ যেমনই হোক, বেশ হেলদি ফুড। পেট খারাপ হবার চান্স নাই।’
তৃষা আবারো হাসতে হাসতে বলে, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং।’

রান্নাঘরের এক কোণে তিনটা বিড়াল গুটিশুটি হয়ে বসে পিট পিট করে এদিক তাকাচ্ছে। রোকসানা তৃষাকে দেখিয়ে বলে, ‘দেখ কি সুন্দর।’
তৃষাও সেগুলোকে দেখে মজা পায় খুব। বলে, ‘এরা কি এখানেই থাকে?’
শাহীন বলে, ‘এখানেই থাকে। আমাদের খাবার হয়ে গেলে কাটা কুটা যা আছে, তা খায়।’
‘ভেরি নাইস।’ হাসতে হাসতে তৃষা বলে।
তারা চলে যাবার পর ইসমাইল বলল, ‘কি সিনসিয়ার দেখছ, সরেজমিনে দেখতে আসছে।’
শাহীন বেশ জোরে হাসল। ইসমাইল অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে।
‘তুমি ওদের সব কথা বিশ^াস করে বসে আছো দেখি।’
‘বলল যে?’ গোবেচারার ভঙ্গিতে বলল ইসমাইল।

শাহীন হাসতে হাসতে বলল, ‘আমার তো বিশ^াস হয় না। আমার তো মনে হয় তারা এমনি এমনি মজা করতে এসছিল।’
ইসমাইল কৌতুহলী দৃষ্টিতে ব্যাপারটা যেন বুঝার চেষ্টা করছে।
পরের বার এক সন্ধ্যায় শাহীন রোকসানাদের বাসায় গেল। চাচীর সাথে এটা সেটা নিয়ে কথা চলছে। এক ফাঁকে রোকসানা এসে বললো, ‘শাহীন ভাই, যাবার সময় আমার সাথে দেখা করে যাবেন। কথা আছে।’

চাচী মৃদু হেসে বলল, ‘রোকসানা তোমার জন্য পাত্রী দেখার বিষয়টা বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছে, বুঝলা।’
শাহীন প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, ‘চাচী, আফসানা আপা বাসায় নাই?’
‘না। সে শ^শুর বাড়ী গেছে। শ^শুর শ^াশুড়ীর বয়স হইছে তো। জামাই বিদেশ থেকে ফোন করে তাদের কথা জিজ্ঞেস করে। তাই দুইদিন পর পরই তাদের দেখে আসে গিয়া। ভাল কথা, তুমি এর মধ্যে দেশে গেছিলা? আমি তো আর খোঁজ নিতে পারি না। রাজুর আব্বা বাইচা থাকতে তো কয়েক মাস পর পরই যাইত। এখনতো আর সেভাবে যোগাযোগ নাই।’ বলতে বলতে চাচীর চোখ ভিজে উঠে।
শাহীন বলল, ‘আমি মাস দুয়েক আগে গেছিলাম। ভালই আছে তারা। আর আপনাদের জমিতে ফসলতো ভালই হইছে শুনলাম। বিল্লাল কাকা বলে নাই কিছু?’

একটা দীর্ঘশ^াস ছেড়ে চাচী বলল, ‘বলছে। নিজেরা গিয়া খোজ খবর না করলে কি আর সেই ভাবে দেয় সব? তারা যা বলে, তাই বিশ^াস করতে হয়। গতবার তুমি আর আফসানা গিয়া দেইখা দেওয়াতে ভালই পাইছিলাম। এইবারও তোমার যদি একটু সময় হয় যাইও বাবা। আফসানার সাথেও একটু কথা বইল। মেয়েটার উপর দিয়াও বেশ ঝামেলা যাচ্ছে। সব সময় এ সব ঝামেলায় তাকে ফেলতে আর ইচ্ছা করে না।’

শাহীন বলল, ‘দেখি চাচী, আমি একবার কথা বলবনে।’
চাচী আবারো বলে, ‘ফসলটা ঠিকমতো দিলেওতো একটা ভাল সাপোর্ট পাওয়া যায়। দেশের মানুষ মনে করে শহরে থাকি, কত সুখেই না আছি। অথচ কত কষ্ট করে সংসার চালাইলাম, ছেলে মেয়ে মানুষ করলাম, সেগুলো সবতো তাদের বলা যায় না। রাজুর আব্বার চিকিৎসায়ও কত টাকা চলে গেল। কেউ কি খবর নিল একবার? আড়াই কাঠার এই বাড়ীটা না থাকলে কি যে দশা হইত। এখানেওতো টাকার অভাবে আজ পর্যন্ত ভাল একটা বিল্ডিং করতে পারলাম না। এখন বিদেশ থাইকা রাজু মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠায় বইলাইতো চলতে পারতেছি।’
শাহীন নিবিষ্ট হয়ে তার কথা শোনে যায়।

একটু থেমে আঁচল দিয়ে মুখ মোছতে মোছতে চাচী আবার বলল, ‘সেও তো ঐভাবে দিতে পারে না। তারওতো সংসার আছে, দুইটা বাচ্চা। সেইসব দেশেতো খরচও অনেক বেশী। সেইবা কদ্দুর করতে পারে বলো? এসব কষ্টের কথা কাকেই বা বলি।’
চাচীর সাথে কথা শেষ করে লিভিং রুমে গিয়ে বসল সে। একটু পর রোকসানা এলো। তার মুখে বিরক্তির ছাপ। সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘শাহীন ভাই শুনেন। এই সব ব্যবসায়ী টেবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করার দরকার নাই। কত বড় অভদ্র দেখেন। পাত্রকে বাসায় যাইতে বইলা মেয়েকে তার মামার বাসায় পাঠিয়ে দিল। তার মানে আগে পাত্রকে দেখে নিল। ব্যাপারটা কেমন উল্টা হয়ে গেল না? এখন এরা রাজি হলেও আপনার এখানে বিয়া করা উচিত হবে না। এইটা হচ্ছে আমার মত।’
শাহীন হাসতে হাসতে বলল, ‘আফসানা আপা পরে কি বলল? তারাতো দুলা ভাইদের কিভাবে যেন আত্মীয় হয়, তাই না?’

রোকসানা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘ওদের আত্মীয়দের মধ্যে বেশীর ভাগই ব্যবসায়ী বুঝলেন? লেখাপড়ায় এরা ঢিলা। দুলা ভাই হচ্ছে এদের মধ্যে ব্যতিক্রম।’ পরে ফিস ফিস করে বলল, ‘এদের টাকা পয়সার গর্ব খুব। আপনাকে পছন্দ না করাতে আপনার ভালই হইছে। আল্লাহ যা করে ভালর জন্যই করে।’
শাহীন খানিকটা দমে গিয়ে বলল, ‘ও আচ্ছা। তারা এরি মধ্যে না করে দিয়েছে?’
রোকসানা মাথা ঝাঁকায়।

কয়েক মুহূর্ত দুজনই কোন কথা বলল না। পরে রোকসানা শাহীনের দিকে মনমরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘শাহীন ভাই, শুনেন। আজকাল মানুষ ভেতরটা দেখে না। দেখে বাহিরটা। ঐদিন আমি বললাম না? পোষাক আষাক, জেসচার পোসচারের কথা? আপনি আপনার ড্রেসআপ চেঞ্জ করেন। চেহারা আচার ব্যবহারের মধ্যে সরলতা থাকাটা মন্দ নয়, কিন্তু গ্রাম্যতা থাকাটা খারাপ। মানুষ আন্ডার ইস্টিমেট করে।’
শাহীন কৌতুহলী দৃষ্টিতে এক পলক রোকসানার দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। রোকসানা আবার বলতে শুরু করল, ‘কথাগুলো আমার না। আব্বার। সংগ্রাম করে মানুুষ হয়েছেনতো? জীবন দিয়ে সেটা অনুভব করেছেন।’ একটু থেকে আবারো মৃদু স্বরে বলল, ‘আমি তার নেওটা ছিলাম তো। সারাক্ষণই তার কাছে কাছে থাকতাম। ফাঁকে ফাঁকে এসব ভারী ভারী কথা তিনি আমাকে বলতেন।’

শাহীন এবার চেহারাটা গম্ভীর করে রোকসানার কথাগুলো বুঝতে চাইল। ভাবনার ভাজ ফোটে উঠল তার কপালে। রোকসানা সোফায় গাটা এলিয়ে দিয়ে আবারো বলতে লাগল, ‘ফার্স্ট জেনারেশন গ্রাম থেকে শহরে এসে এর ফেব্রিকের ভেতরে ঢুকা সহজ নয়। বহু স্ট্রাগলের ব্যাপার। আব্বাকে সেটা করতে হয়েছে। যেটা এখন আপনাকেও করতে হচ্ছে। এখন সোসিওলজি পড়তে গিয়ে ব্যাপারটা আরো ভাল করে পারসিভ করতে পারছি।’

শাহীন শান্ত সুরে বলল, ‘এইসব ব্যাপার নিয়ে তাড়াহুড়া করারতো বিষয় নাই। আমি চাকুরিতে জয়েন করি, সেটেল্ড হই। আস্তে ধীরে পরে দেখা যাবে। আফসানা আপার সাথে আজ আর দেখা হবে না, না?’
‘আসতে আসতে রাত হবে। তাদের এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি এক সাথে থাকেতো। সকলের সাথে কয়েক মিনিট করে কথা বলতে গেলেও কয়েক ঘন্টা লেগে যায়। ’ বলে রোকসানা হেসে দিল।
শাহীন বলল, ‘আফসানা আপার সাথে তোমাদের দেশের জমিজমার ফসল টসল নিয়ে কিছু কথা বলতাম আর কি। চাচীর মনটা দেখলাম বেশ খারাপ। সেবারতো আমি আফসানা আপাকে নিয়ে দেশে গেলাম। এইবারও হয়তো একবার যেতে হবে। সবার বড় সন্তানতো। তাই আফসানা আপাকে বিল্লাল কাকা ওরা বেশ মূল্যায়ণ করে। সেবারের মতোই সকালে গিয়ে বিকেলে চলে আসা যাবে। আমি আজ যাই। কাল পরশু আবার আসব।’

এদিকে ইসমাইল রোকসানাকে সেদিন দেখার পর তার ব্যাপারে মাঝে মাঝেই এটা সেটা জিজ্ঞেস করে। এক সন্ধ্যায় সে শাহীনকে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলো, ‘শাহীন, রোকসানা নামে যে বিচ্ছু মেয়েটা আসলো না সেদিন, কোন ইয়ারে যেন পড়ে বলল?’
শাহীন অন্যমনস্কভাবে ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এইবার থার্ড ইয়ারে বোধ হয়।’
‘ওদের ফ্যামিলিতে আর কে কে আছে?’
‘তারা দুই বোন এক ভাই। সবার বড়জন বোন, ওনার হাসবেন্ড ট্রাভেল এজেন্সির বিজনেস করে। প্রায়ই মালয়েশিয়ায় থাকে। মেঝজন ভাই, ওনি সপরিবারে কানাডা থাকেন। রোকসানা সবার ছোট।’

‘মেয়েটা দেখতে কিন্তু বেশ।’ চৌকি-ঘেষা ওয়ালে হেলান দিতে দিতে মৃদু হেসে ইসমাইল বলল।
শাহীন এবার তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকাল ইসমাইলের দিকে। বলল, ‘তাই নাকি?’
‘একটু দুষ্টু দুষ্টু। নাইস।’ ইসমাইলের চেহারাটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
শাহীন ইসমাইলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে পা দুটো চৌকিতে তোলে দিয়ে সুখাসনে বসলো। খানিক পর আস্তে করে বলল, ‘একটু শ্যামলা না?’
‘ঐ গায়ের রংটাই শুধু ময়লা। তা না হলে সে কিন্তু আপ টু দ্য মার্ক।’
শাহীন ফোঁড়ন কেটে বলে, ‘তোর পছন্দ হয়?’
‘হলে পরে জানাব তোকে।’ মিটি মিটি হাসে ইসমাইল।
এরি মধ্যে শাহীনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারী হয়। তার প্রথম পোস্টিং হয় রংপুরে। পনের দিন পর জয়েন করতে হবে। সংবাদটা দিতে রোকসানাদের বাসায় যায়। আফসানা আপা হাসতে হাসতে বলল, ‘একটু দূরে হয়ে গেল আর কি।’
শাহীন বলে, ‘ফার্স্ট পোস্টিংতো? একটু দূরে দূরেই দেয় মনে হয়।’
রোকসানা গাম্ভীর্যের সাথে বলল, ‘দূরেই ভাল। নিরিবিলি পরিবেশ। তাছাড়া রংপুরের মানুষজনও খুব ভাল।’

দুজনই কৌতুহলী দৃষ্টিতে রোকসানার দিকে তাকাল। রোকসানা বলল, ‘আমার দুইটা ক্লাশমেট আছে, গ্রেটার রংপুরে বাড়ী। বেশ ভাল। জটিলতা কুটিলতা কম। আমার বেশ ভাল লাগে তাদের। ডুন্ট ওরি শাহীন ভাই। ইউ উইল এনজয়।’

আফসানা আপা উঠতে উঠতে বলল, ‘শাহীন, তোরা গল্প কর। আমি একটু আসছি।’
কিছুক্ষণ তারা দুজনই চুপচাপ বসে রইল। রোকসানা খানিক পর বলল, ‘এখনতো অফিসার হইছেন। সমাজে আপনার অবস্থান দেখবেন আস্তে আস্তে চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে বেশ বড় বড় মনে হচ্ছে।’
শাহীনও হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার মাথায় সারাক্ষণ সোসিওলজি গিজ গিজ করছে দেখছি।’
‘সেটা বুঝার জন্য সোসিওলজি পড়ার দরকার পড়ে না। পজিশনই মানুষের মধ্যে কনফিডেন্সটা বাড়িয়ে দেয়। এবার দেখবেন বউ পেতে আর বেগ পেতে হবে না।’ শেষের কথাটা বলার সময় রোকসানা মৃদু হাসলো।
শাহীন সে হাসিতে তাল মিলিয়ে বলল, ‘তোমার কি ধারণা আমি সারাক্ষণই বউ বউ করে বেড়াচ্ছি?’
রোকসানা আবারো দুষ্টুমি করে হাসল। বলল, ‘নেক্সট এ ছাড়া আর কাজ কি আপনার?’
সেদিন চলে আসবে, এমন সময় আফসানা আপা তাকে ডেকে তার রুমে নিয়ে বসাল। দেশের বাড়ীর জমি ফসল, এইসব নিয়ে খানিক্ষণ কথা হলো। শেষে অন্যমনস্কতার ভঙ্গিতে আফসানা আপা আলতো করে বলল, ‘হ্যারে শাহীন, আমাদের রোকসানাকে কি তোর পছন্দ হয়?’
প্রশ্নটা বুঝতেই শাহীনের খানিক্ষণ সময় লেগে গেল। পরে অস্ফুটে তার মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই যেন বের হয়ে এলো, ‘নাহ্।’
আফসানা আপা সে বিষয়ে আর প্রশ্ন না করে হেসে বলল, ‘রংপুর যাবার আগে পারলে আবার দেখা করে যাইস। দোয়া করি তোর জন্য।’
এরপর আর ছাত্তার চাচার বাসায় যাওয়া হয়নি। কেন যেন আর ইচ্ছা করেনি যেতে। একটা সংকোচ, একটা দ্বিধা তার মধ্যে কাজ করছিল। এরি মধ্যে ইসমাইলের সাথে রোকসানার বিয়ের বিষয়টাও হালকা আলোচনায় আসছিল। সেজন্যই আফসানা আপা শাহীনের মনের কথাটা চুড়ান্তভাবে জেনে নিতে চাচ্ছিলেন হয়তো। শেষ মেষ আসার সময় আফসানা আপার চেহারাটা বার বার মনে পড়ছিলো তার। সেদিন এমনভাবে তার মুখের উপর ‘নাহ্’ বলায় তিনি কি হতাশ হয়েছিলেন? তাই বা হবেন কেন? শাহীনতো কখনোই রোকসানার প্রতি কোন রকম আগ্রহ দেখায় নি। বরং ইসমাইলের সাথে সম্বন্ধের কথাবার্তাতো সে-ই বেশ অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে। এতসব নানাবিধ এলোমেলো চিন্তা আর এক ধরণের দ্বিধা থেকে সে বাসায় সে সময় আর যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি। সে ভেবেছে, ইসমাইলের সাথে রোকসানার বিয়ে পাকাপাকি হয়ে গেলে পরে একবার যাবে।
শেষ মেষ বেশ কয়েক মাস পর কাল তাদের সবার সাথে দেখা হতে যাচ্ছে শাহীনের।

পরদিন সকাল দশটায় বাস। শাহীন তার ব্যাগ থেকে প্যান্ট শার্ট বের করে বিছানায় রাখল। সাদার উপর নীল কালো স্ট্রাইপ করা শার্টটার দিকে দৃষ্টি পড়লো তার। এই শার্টটা মৌচাক
মার্কেট থেকে রোকসানা পছন্দ করে দিয়েছিল। সেটাতে আলতো করে হাত বুলিয়ে মুখ উজ্জ্বল করে সে বলেছিল, ‘আপনি ফর্সা মানুষতো, এসব শার্টে আপনাকে স্মার্ট লাগবে।’
শাহীন শার্টটার দিকে আনমনা হয়ে খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকল। মনটা আবারো কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুট ঠেকতে লাগলো। সে যতই রোকসানার চিন্তাটা মন থেকে মুছে ফেলতে চাইছে, ততই সেটা ঘুরে ফিরে আসছে। একটা নিঃশ^াস ছেড়ে মাথা নাড়ে সে। নিজেকেই নিজে তাচ্ছিল্য করে বলে, ‘অদ্ভুত মানুষের মন। সে কখন যে কী চায়?’
সকাল দশটার একটু পর পর বাস ছাড়লো। বাম দিকে জানালার পাশের সিট। জানালার গ্লাস অল্প করে খোলে দিল সে। কার্তিক মাসের শেষে রংপুর অঞ্চলের নাতিশীতোঞ্চ পাতলা ফুরফুরে হাওয়াটা বেশ লাগছে। গত রাতের নানান এলোমেলো ভাবনায় ঘুমটা ভাল হয়নি তার। মাথাটা ঝিম ধরে আছে। চোখের উপর দিয়ে পশ্চাৎ পানে ধাবমান সবুজ বৃক্ষরাজি, কখনো খোলা ফসলের মাঠ, কখনোবা গাছপালা বেস্টিত টিনের আর শনের ঘরবাড়ীর মাঝখানে সাজানো উঠোন- সবই যেন দূর অজানার হাতছানি দিতে থাকলো। শাহীনকে গতির এক স্বপ্নময় আবেশ আচ্ছন্ন করল।

এক সময় তার তন্দ্রা এসে যায়। তন্দ্রার মাঝেও অবিরাম অশ্রান্ত গতির আচ্ছন্নতায় ফোঁসতে থাকে সে। নিজ গন্ডির মাঠ-ঘাট-প্রান্তর পেরিয়ে সে যেন চলছেই চলছে দুর্দম, অজানা কোন কাল থেকে কোন এক রূপকথার গন্তব্যে।

সেই শৈশবে শালিকমারা নানার বাড়ী থেকে জহির মামা শালুককুড়ায় তাদের বাড়ী আসতো হালকা পাতলা এক ঘোড়ায় চড়ে। এবড়ো থেবড়ো উঁচু নিচু খানা খন্দক ভরা সেই দুর্গম পথে দ্রুত চলাচলের সেটাই একমাত্র বাহন তখন। সেই ঘোড়া দেখে কি যে উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনা শাহীনের। বার বার মায়ের কাছে বায়না, ‘মা আমি ঘোড়ায় উঠুম, মামুরে বলে দেও আমারে ঘোড়ায় চড়াইতে। না, পরে না, এক্ষুনি কও।’ মা বার বার আশংকার কথা শোনায়, ‘নারে বাবা, পইড়া গিয়া ব্যথা পাইবি। অচিনা মাইষ্যেরে ঘোড়া সহ্য করে না। পিঠ থাইকা ফালাইয়া দেয়।’ শাহীন সেকথায় দমে যাওয়ার পাত্র নয়। পরে জহির মামার কাছে গিয়ে বায়না ধরে। ‘না মামু, আমারে ঘোড়ায় চড়াইতেই অইব।’ পীড়াপীড়িতে জহির মামা তাকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে। বলে, ‘ভাইগনা, তুমি আমার হাতে শক্ত কইরা ধইরা রাখ। নড়বা না কিন্তু।’ জহির মামা শাহীনকে তার সামনে বসিয়ে বাম হাতে ধরে রাখে। ঘোড়া ধীরে ধীরে চলতে থাকে। এই ধীর গতি শাহীনের মনমতো হয় না। বলে, ‘মামা, আরো জোরে চালান, আরো জোরে।’ গতিময়তার এক বাঁধন-ছেড়া চঞ্চলতা পেয়ে বসে তাকে। এইভাবে না, আরো জোরে, শালকুকুড়ার মাঠ-প্রান্তর পেরিয়ে অন্য কোন খানে।

ঘোড়ার গতি ক্রমেই বেড়ে চলে। কিয়ৎক্ষণের মধ্যেই কোথায় যেন উধাও হয়ে যায় সেই পরিচিত শালুককুড়া। অন্য এক নতুন ভুবনের তেপান্তর পেরিয়ে ছুটে চলে সে। এক সময় সেই ঘোড়া যেন আর মর্ত্যের সেই ঘোড়া থাকে না। তার পিঠে গজিয়ে উঠে ঈগল পাখির সুবিশাল পাখা। বক্ষরাজি, বন-বনানী, ফসলের মাঠ, নদী, প্রান্তর পেরিয়ে ছুটে চলে সে। সেই গতির উদ্দামতায় সময়ও যেন কোথায় তার গন্ডি হারিয়ে ফেলে। কখন যে তার শৈশব-কৈশোরের উচ্ছলতা পেরিয়ে যৌবনের চাঞ্চল্য তাকে আবিষ্ট করে ফেলে। উদ্দাম গতির সেই ঘোড়া ছুটে কোন এক স্বপ্নরাজ্য পানে। এক সময় সেই ঘোড়াও কোথায় যেন হারিয়ে যায়। শাহীন যেন ভেসে চলে বাতাসের তোড়ে স্থান আর সময়ের গন্ডি পেরিয়ে। এক সময় বাঁশ ঝাড়-হিজল-বরুন-শিরিষ বেস্টিত এক কুঞ্জবনে তুলতুলে ঘাসের উপর ঝাপটে পড়ে সে। গতিময়তার ক্লান্তিতে অবসন্ন দেহ তার মিশে যায় ঘাস-লতার সেই প্রশান্তির শয্যায়। কোন এক সময় তার ললাটে পেলব হস্তের শিরশিরে স্পর্শে চোখ খোলে সবুজ-নীল-লাল আলোর বর্ণালীর ভেতর স্মিত হাস্যরতা এক তন্বীকে দেখে সে। বিস্ময়ে তার সমস্ত শরীরে শিহরণ জাগে। একি, কাকে দেখছে সে! পরিচিত সেই শ্যামল চিকন মসৃণ মুখের নীল দীপ্তি ভেদ করে তার সেই সুডৌল কপোলের ভাঁজে রহস্যময় দুষ্টুমির রেখা ফোটে উঠে। ঘন কৃঞ্চ পল্লব পরিব্যাপ্ত টানা টানা আঁখির তারা মুক্তোর মতো জ¦লমল করে উঠে।

তার কণ্ঠ নিঃসৃত এক প্রশান্তিময় নির্ভরতার ধ্বনি যেন কানে ভেসে এলো, ‘কত দিন পরে এলেন! ইস, ক্লান্ত হয়ে আছেন খুব।’ সেই তন্বী হাত বাড়িয়ে তার কাধে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘এই শাহীন ভাই, ঘুমাচ্ছেন নাকি?’ সেই স্পর্শে তার সমস্ত অঙ্গে যেন এক অব্যক্ত পুলকের শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। চোখ মেলল সে। দেখল বাসের সুপার ভাইজার তার দিকে হাসি মুখে চেয়ে আছে।
‘স্যার, দেখি টিকেটটা?’
শাহীন কম্পিত হস্তে পকেট থেকে টিকিট বের করে তার হাতে দিল। সুপারভাইজার সেটার অর্ধেকটা ছিড়ে রেখে দিয়ে বলল, ‘কোথায় নামবেন?’
‘কলা বাগান।’ তড়িঘড়ি জবাব দিল সে।

শাহীনের মনটা বেশ ভারী হয়ে উঠলো আবারো। কিছুক্ষণ আনমনে বাইরে তাকিয়ে থাকল সে। বিকেল হয়ে এসেছে। নীল আকাশটাকে একটা শুভ্র ধূয়াশা কেমন যেন মলিন করে রেখেছে। খানিকটা গরমও অনুভব করছে সে। সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তিকর গুমোট গুমোট ভাব। শাহীন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে, সে কি অবচেতন মনে রোকসানাকে সত্যিই ভালবেসে ফেলেছিল? এমন কি হতে পারে যে তার মনের কোন এক গহীন কোণে রোকসানা ক্রমেই একটা দৃঢ় আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে তাকে এক মায়াময় আবেশে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সেই আবেশটাকে প্রেম-ভালবাসা বলে গণ্যে আনেনি সে?

রামপুরার মেসে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে। তার রুমের তালা খোলে প্রবেশ করলো সে। বামপাশের ছোট্ট জানালাটা খোলে দিল। তার চৌকিতে বসে থাকল কিছুক্ষণ। কক্ষটার চতুর্দিকটা একবার দেখে নিল। সামনে ইসমাইলের চৌকিটি উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে। সেটি থেকে থেকে তাকে যেন ভেংচি কেটে যাচ্ছে। ইসমাইলের সেই আত্মবিশ^াসের দৃঢ়তা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল, ‘শাহীন, যা আছে কপালে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রোকসানাকেই বিয়ে করব। তুমি আমার পক্ষ থেকে কথা বল।’

শাহীন হতবিহ্বল হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়েছিল ইসমাইলের দিকে। হৃদয়ের কোন এক অজানা কোণে একটা উদাস করা শূণ্যতাও ক্ষণিকের জন্য নড়ে চড়ে উঠেছিল। ঐপর্যন্তই। পরক্ষণেই গৌর লাবণ্যের দীপ্তি নিয়ে তার জন্য অপেক্ষমান কোন এক অজানা উর্বশীর ঘোরে সে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আজ সেই আচ্ছন্নতার ধূয়াশাটা মন থেকে কোথায় যেন উবে গেল। যেন দিনে দিনে একটা মধুর প্রেমময় সম্পর্কের লতা-গুল্ম একটা খুঁটিকে ভরসা করে লিকলিকে বেড়ে উঠছিল, সংসারের অমোঘ নিয়মে সেই খুঁটিটি এখন সরিয়ে নেয়ায় সেগুলো অবলম্বন হারিয়ে ভূলুণ্ঠিত হয়ে নিঃসহায় হাহাকার করতে লাগল। হৃদয়ের অতলতন্ত্রী থেকে সে হাহাকার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অবিরাম- রোকসানা, তোমাকেই ভালবেসেছি আমি। কল্পনায় দিনের পর দিন যে প্রেয়সী আমার হৃদয়ের অধিষ্ঠান নিয়েছে, সে তুমি-ই। তোমাকেই চেয়েছি আমি। তোমাকে ছাড়া আমি যে আর কিছুই ভাবতে পারছি না।
কিন্তু কোথায় রোকসানা? সেতো এখন যোজন যোজন দূরে। তার আর রোকসানার মাঝে এক অভেদ্য দেয়াল পর্বত প্রমাণ বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরতো তাকে এই মর্ত্যে নিজের করে পাওয়ার কোনই অবকাশ নেই। কি করবে সে এখন? সে এখন বাঁচবে কেমন করে?

এভাবে কতক্ষণ গেল, তা বুঝতে পারে নাই শাহীন। এক সময় নিজেকে তার ধূলিময় বিছানায় বালিশে মুখ গোজানো অবস্থায় আবিষ্কার করে সে। অশ্রু ধারায় সেই বালিশের অনেকটাই ভিজে উঠেছে। আস্তে করে উঠে বসে সে। তখন রাত সাড়ে আটটা। বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নেয় সে।
খিলগাঁওয়ের সেই কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেল। ইতোমধ্যে খাওয়া দাওয়া প্রায় শেষ। শাহীন আফসানার জন্য একটা লাল বেনারশি শাড়ী কিনেছিল রংপুর থেকে। সেটি রিসিপশনে বুঝিয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। তাকে দেখে আফসানা আপা প্রায় ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, ‘এই শাহীন তুই এত দেরী করলি যে? জামাই বার বার তোর খোঁজ করছিল। কোন সমস্যা হয়েছিল? আচ্ছা, এসব বিষয় পরে কথা হবে। যা, ঐ কোণায় বসে পড়। খেয়ে নে। এখানকার কাজ প্রায় শেষ। যা, তাড়াতাড়ি বসে পড়।’ বলেই আফসানা আপা আবার অন্য দিকে ছুটে গেলো।

এক কোণে খেতে বসলো সে। পেটে যথেষ্ট খিধে থাকলেও খাবার কেমন যেন মুখ দিয়ে সরছে না। আনমনে প্লেটে নাড়া ছাড়া করলো খানিক্ষণ। সেখান থেকে মঞ্চে বর কনেকে দেখা যাচ্ছে। একটু দূরে দূরে দুই পাশে বসা দুজন। দুজনকেই নিজ নিজ পক্ষের বন্ধু-বান্ধব-স্বজন ঘিরে আছে। সেখান থেকে তাদের হাসাহাসি খুনসুটির সোরগোল ভেসে আসছে। রোকসানার পরনে লাল টুকটুকে সোনালী পাড়ওয়ালা শাড়ী। তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। সেদিকে কিছুক্ষণ উদভ্রান্তের মতো তাকিয়ে থাকল সে। কিছুক্ষণ পরেই ইসমাইল রোকসানার উপর সমস্ত অধিকার করায়ত্ত করে এখান থেকে তাকে হাত ধরে নিয়ে বের হয়ে যাবে। শাহীন সেই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। সেটা কোনভাবেই মানতে পারছে না তার বিক্ষিপ্ত মন। মনের ভেতরে সেই মর্মভেদী যন্ত্রণা তাকে ইতোমধ্যেই কাবু করে ফেলেছে। তার হাত পা যেন থর থর করে কাঁপতে থাকল। সেই টেবিলেই উদভ্রান্তের মতো বসে রইল সে।
এরি মধ্যে সকলের খাওয়া শেষ হয়েছে। শাহীন প্রায় ঢুলতে ঢুলতে বেসিনে গিয়ে হাত মুখ ধোয়ে নিল। আস্তে আস্তে সে বিয়ের মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। ইসমাইল তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

শাহীন ইশারায় তাকে শুভকামনা জানালো। খানিকটা দূরেই রোকসানা বসে আছে। তার আশে পাশে দশ বারোজনের মতো বান্ধবী; তাদের কেউ বা বসে, কেউ বা দাঁড়িয়ে নানামত ভঙ্গি করে এক অপরের সাথে ফিস ফিস করে কথা বলে চলেছে। রোকসানার মুখে ঘোমটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো কনেকে নিয়ে বরের পাশে বসানো হবে। আশে পাশের সকলে সেই আনুষ্ঠানিকতার ব্যস্ততা আর উত্তেজনায় মশগুল। শাহীন মঞ্চের নীচে দন্ডায়মান আরো কয়েকজন কৌতুহলী দর্শকের ভিড় ঠেলে রোকসানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

খানিক পর ঘোমটার ফাঁক গলে রোকসানার দৃষ্টি পড়লো তার দিকে। চোখ তোলে তাকালো সে। শাহীন দেখল, লাল আর সোনালী আভার ভেতর শ্যামল মসৃণ চেহারার এক অপরূপ উর্বশী যেন পলকহীন চেয়ে আছে তার দিকে। তার সেই ঘন কৃঞ্চ পল্লব পরিব্যাপ্ত টানা টানা আঁখির মাঝখানে মুক্তোর মতো উজ্জ্বল তারা দীপ্তিমান হয়ে আছে। সেই আনন্দঘন হট্টগোলের মধ্যে শাহীন এক দৃষ্টে চেয়ে আছে রোকসানার মুখ পানে। এক ফাঁকে রোকসানার ঠোট দুটো যেন কেঁপে উঠল। শাহীন মৃদু হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু বিমর্ষতার ঘন ছায়ার ভেতর নিমিষেই সে হাসি কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে মনে হলো রোকসানার দুই চোখে অশ্রু বিন্দু টলমল করছে। সে কি কাঁদছে? হতে পারে। বিবাহের নববধূ, সেতো কাঁদবেই। কিন্তু এ কান্না কি নেহায়েতই নববধূর কান্না? শাহীন দেখলো, রোকসানার অপলক দৃষ্টি শাহীনের মুখ পানে স্থির হয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে কিসের যেন এক অব্যক্ত বেদনা নিজেকে প্রকাশের ভাষা খুঁজছে। সেকি শাহীনকে হারানোর বেদনা? এতটাই প্রেম তার জন্য কি রোকসানার বুকেও লুকিয়ে ছিল? পরক্ষণেই তার মনের কোণে কে যেন বলে উঠল, ভ্রান্ত ধারণা তোমার। যাকে তুমি ঠেলে দিলে দূরে নিতান্ত অবহেলায়, তার হৃদয়ে তোমার প্রতি প্রেমের কোন অবশেষ থাকার কথা তো নয়? এক্ষণে যা তোমার বোধ, সবই কল্পিত, সবই ভ্রান্ত।
কিন্তু শাহীনতো সে কথা ভেবে রোকসানাকে তার মন থেকে মুহূর্তের তরেও সরিয়ে দিতে পারছে না? রোকসানার চোখ পানে তার দৃষ্টি এমন স্থির হয়ে গেল কেন? শাহীনের শিরা উপশিরায় একটা হিম শীতল শিহরণ বয়ে গেল। সে দেখল তার হাত পা কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তার অবুঝ মনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করলো সে।

নিজেকে নিজে প্রবোধ দিল, বিধির অমোঘ লিপি খণ্ডানোর সাধ্য কার? যে যাওয়ার, সে যাবেই। মনের এই ক্ষণিকের আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে কি লাভ।
আলতো করে দৃষ্টি নত করে ঘুরে দাঁড়ালো শাহীন। অতঃপর পকেট থেকে দ্রুত রুমাল বের করে চোখ মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে উৎসব স্থল থেকে বের হয়ে গেল।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত