নিরপেক্ষ ও সৎভাবে আলোচনার সংস্কৃতিটাই আর নেই

  ফারুক মঈনউদ্দীন ২৬ জুন ২০২০, ০০:৪০:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

ফারুক মঈনউদ্দীন বাংলাভাষার অত্যন্ত পরিশীলিত একজন গল্পকার। তিনি কাব্যময় ভাষায় জীবন-ঘনিষ্ঠ গল্প লিখে থাকেন।

সংখ্যায় কম হলেও শিল্পমানের দিক থেকে তার গল্পের তুলনা হতে পারে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় অথবা প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পের সঙ্গে। যদিও ভ্রমণ-লেখক ও অনুবাদক হিসেবেই ফারুক মঈনউদ্দীন পাঠকের কাছে বেশি পরিচিত। এ ছাড়া ব্যংকিং বিষয়েও তার মূল্যবান একাধিক বই রয়েছে।

ফারুক মঈনউদ্দীন ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কুমিল্লা বোর্ডের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন ১৯৭৬ সালে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮৪ সালে এবি ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৮৭ সালের ব্যাংকিং ডিপ্লোমা পরীক্ষায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অধুনালুপ্ত বিসিসিআই ব্যাংক স্বর্ণপদক লাভ করেন। পেশাগত জীবনে বিভিন্ন ব্যাংকের উচ্চ পদের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োজিত আছেন।

সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

যুগান্তর: করোনায় ঘরবন্দি সময়ে কী লিখছেন কী পড়ছেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: করোনাকালের গৃহবন্দিত্বের মধ্যে পড়ার চেয়ে লেখার পরিমাণটা বেশি ছিল। গত প্রায় আড়াই মাসে লেখা হয়েছে গোটাতিনেক গল্প, কয়েকটা ভ্রমণ, গোটাচারেক অনুবাদ এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবন ও সাহিত্যে নারীদের প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে কয়েক পর্বের দীর্ঘ প্রবন্ধ।

পঠনের মধ্যে রয়েছে মিসরীয় কথাসাহিত্যিক ইউসুফ ইদ্রিসের ঔপন্যাসিকা দ্য সিনার্স, এলিস সকোলফের দ্য ফার্স্ট মিসেস হেমিংওয়ে। এ ছাড়া পড়া হয়েছে হেমিংওয়েবিষয়ক বিভিন্ন লেখকের বেশ কিছু বইয়ের অংশবিশেষ।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালোমানের পাঠকের অভাব?

ফারুক মঈনউদ্দীন: ভালোমানের বহু পাঠক লুকিয়ে আছেন আমাদের, এঁদের যেহেতু আত্মপ্রচার করার কোনো সুযোগ ও প্রয়োজন নেই, আমরা তাদের সুলুক পেতে পারি সিরিয়াস বইয়ের প্রকাশনা ও বিক্রির হিসাব থেকে।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো শস্তা জনপ্রিয় বইয়ের পাশাপাশি এসব গুরুগম্ভীর বইও যেহেতু করে, সেখান থেকে একটা অতিসরলীকরণ করা যায় যে আমাদের ভালোমানের পাঠকেরও অভাব নেই। ভালো লেখকের অভাব যে একেবারেই নেই সে কথা হয়তো অস্বীকার করা যাবে না।

জানি লেখকদের অনেকেই এ বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হবেন না, তবে জনসংখ্যার তুলনায় অন্তত পরিসংখ্যান বিচারে ভালো লেখকের অভাবই বলা যায়। সাধারণ পাঠকদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে না দিলেও বোদ্ধা পাঠকের পাঠাভ্যাস থেকেও বোঝা যায় ভালো লেখা পাঠের তৃষ্ণা মেটাতে তাদের বহির্বিশ্বের দিকেও হাত বাড়াতে হয়।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

ফারুক মঈনউদ্দীন: গোলাম মুরশিদ, যতীন সরকার, হাসান আজিজুল হক- আপাতত এ তিনটা নাম বলা যায়।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই- এমন তিনজন লেখকের নাম

ফারুক মঈনউদ্দীন: প্রশ্নটার জবাব দেয়া এককথায় কঠিন। ‘বহুল আলোচিত’ বিষয়টার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে, কারণ বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনাটা কারা কোথায় করছেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল নানা সোশ্যাল মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে ‘আলোচিত’ বিষয়টার মাত্রা বদলে গেছে। খুব নিরপেক্ষ ও সৎভাবে আলোচনার সংস্কৃতিটাই তো আজকাল আর নেই।

কেউ যদি নিজ উদ্যোগে ফরমায়েশি প্রচারকদের দিয়ে আলোচিত হন, কিংবা কেউ যদি বিশেষ উদ্দেশে কাউকে আলোচিত করে তোলেন, সেক্ষেত্রে সেসব লেখকদের ‘বহুল আলোচিত’ বলা যাবে কি না, প্রশ্ন থেকে যায়। এখনকার পত্রপত্রিকা এবং সেসবের পেছনের মানুষদের ভূমিকাও এখানে এসে যায়। সুতরাং ‘আলোচিত’ এবং সেটা ‘বহুল’ কি না, কারা কী কারণে করছেন, তার মীমাংসা না করে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া সমীচীন নয়।

যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা।

ফারুক মঈনউদ্দীন: বাংলাভাষায় যদি বলি, তাহলে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি,’ আর বিদেশীভাষায় ‘দ্য গ্রেপস অভ র‌্যাথ।’

যুগান্তর: কার অভিনয় ভালো লাগে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: একজনের অভিনয় সবসময় যে ভালো লাগে তেমন লয়্যালটি আমার নেই। বিভিন্ন কারণে বিভিন্নজনকে ভালো লাগে। তা ছাড়া আমি প্রাচীন যুগের মানুষ, এখনকার সিনেমাও যে খুব দেখি তা নয়। তবু কয়েকজনের নাম বলতে পারি, গ্রেগরি পেক, ওমর শরীফ, জুলিয়া রবার্টস, টম হ্যাংকস আর কঙ্কনা সেন।

যুগান্তর: এমন একজন নায়িকার কথা বলুন যার প্রেমে পড়তে চান।

ফারুক মঈনউদ্দীন: মাত্র একজনের নাম! হতাশ করলেন আমাকে। একজনই যদি বলতে হয় তাহলে বলব কেট উইন্সলেটের নাম।

যুগান্তর: জীবিত একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের নাম বলুন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: বর্তমান রাজনীতির সংস্কৃতিতে বিশেষণটি খুব বেশি আর প্রযোজ্য নেই। তবু আমাদের জীবিত আদর্শ রাজনীতিবিদদের মধ্যে বেগম মতিয়া চৌধুরীর নামটি চলে আসবে সবার আগে।

যুগান্তর: দুই বাংলার সাহিত্যে তুলনা করলে বর্তমানে আমরা কোন বিভাগে এগিয়ে কোন বিভাগে পিছিয়ে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা নিয়েও ভিন্নমত থাকবে, জানি। কথাসাহিত্যে ওপার বাংলা থেকে যে আমরা পিছিয়ে আছি এটা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই, তার অর্থ এই নয় যে আমাদের এখানে ভালো কিছুই লেখা হচ্ছে না, যা হচ্ছে তার পরিমাণ আশানুরূপ নয়।

তবে আশার কথা যে আমাদের এখানে তরুণদের মধ্যে অনেকেই উঠে আসছেন, তাদের সবাই যদি কমিটমেন্ট নিয়ে লেগে থাকেন, তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। কলকাতাকেন্দ্রিক কথাসাহিত্যেও যে আজকাল খুব ভালো কিছু কাজ হচ্ছে তা নয়।

এটা সাংবৎসরিকভাবে বোঝার একটা মাপকাঠি আমরা ব্যবহার করতে পারি ওদের শারদীয় সংখ্যাগুলো দিয়ে। আগে বহু লেখকের উপস্থিতিসমৃদ্ধ সংখ্যাগুলো যেভাবে আকর্ষণ করত, আজকাল তেমনটা করে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হতাশ হতে হয়। তবু সেগুলোও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে এবং কাহিনীর বুনটে আমাদের অনেক লেখার চেয়ে উৎকৃষ্ট। জানি, শারদীয় সংখ্যার ফরমায়েশি লেখা দিয়ে গুণগত মান যাচাই করা ঠিক নয়, যেমন নয় আমাদের দেশের ঈদ সংখ্যাগুলো দিয়ে।

তবে শারদীয় সংখ্যা ছাড়াও কলকাতায় বছরজুড়ে যে রকম বই প্রকাশিত হতে থাকে এবং তার মধ্যে অনেক ভালো গবেষণাধর্মী সিরিয়াস লেখা বের হয়ে আসে, আমাদের এখানে ব্যতিক্রমী গুটিকয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবাই সেটা করে না। আমাদের সাধারণ পাঠকদের একটা ধারণা হয়েই গেছে যে, বই প্রকাশনা মানেই একুশের বইমেলা।

তাই আমাদের প্রকাশনা এখন আটকে পড়েছে ঈদ সংখ্যা ও একুশে বইমেলার বৃত্তের মধ্যে। অথচ এ দুটির মধ্যেই রয়েছে একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে লেখা শেষ করার তাগাদা, যা লেখকের ক্ষমতা ও সৃষ্টিশীলতাকে খর্ব করতে বাধ্য।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ এবং একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলা সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফারুক মঈনউদ্দীন: সংখ্যা সীমিত করে দিয়ে কাজটা কঠিন করে তুলেছেন। অগ্রজের মধ্যে অবশ্যই গোলাম মুরশিদ, অনুজদের মধ্যে ইমতিয়ার শামীমের নাম বলা যায়। আরও নাম আছে, কিন্তু একজনের নাম জানতে চাইলেন বলেই মুশকিল।

যুগান্তর: এমন দুটি বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: এমন করে সংখ্যা বেঁধে দিলে তো সমস্যা। তা ছাড়া আমার বিবেচনায় যেটাকে ‘উচিত’ বলব, অন্যের দৃষ্টিতে সেটা হয়তো কিছুই নয়। যখন পুতুল নাচের ইতিকথা পড়েছি তখন মনে হয়েছে এটাই, কিংবা কাঁদো নদী কাঁদো, অথবা খোয়াবনামা। আবার যখন আনা কারেনিনা, তারাস বুলবা অথবা লাভ ইন দ্য টাইম অভ কলেরা কিংবা ক্রনিকল অভ অ্যা ডেথ ফোরটোল্ড পড়েছি তখন মনে হয়েছে এটা অবশ্যই পড়া উচিত। এখন যেমন অমিতাভ ঘোষের হাংরি টাইড পড়ছি, তখন মনে হচ্ছে এটাই। এভাবে একটা দুটির মধ্যে অবশ্যপাঠ্য বই নির্ধারণ করে দেয়া কঠিন ও বিপজ্জনক।

যুগান্তর: গানে আছে প্রেম একবার এসেছিল জীবনে। আপনার জীবনে কয়বার এসেছিল?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আপনি বেশ ঝামেলাপূর্ণ প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছেন বারবার। একতরফা দোতরফা মিলে কয়েকবারই হবে, এখন সেসবের হিসাব দেয়া নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণও বটে।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার সবচেয়ে ভালো লাগে যখন কোনো কিছু পড়ার পর আগে জানা ছিল না এমন বিষয়ে নতুন জ্ঞান লাভ করি এবং অন্তর্চক্ষু খুলে যায়। এ রকম হলে এক ধরনের অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি জাগে আমার মধ্যে। সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন দেখি আমাদের অসহায় চোখের সামনে কিছু মানুষ দুর্নীতি, শঠতা ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে এবং স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ীভাবে সফল হয়। আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে, পেশা ও বৃত্তিতে এ রকম লোকের অভাব নেই, যার কিছু আমাদের নজরে আসে, বেশিরভাগই আড়ালে থেকে যায়।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত