লাওয়ারিশ; কবিতায় ধর্মীয় চেতনার অনন্য দৃষ্টান্ত

  রেজাউল কারীম আবরার ২৭ জুন ২০২০, ১৮:৪৬:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত

লাওয়ারিশ। একটি কাব্যগ্রন্থের নাম। লিখেছেন আদিল মাহমুদ নামে এক তরুণ। এই কাব্যগ্রন্থের বিষয়বৈচিত্র্য ইতিমধ্যে পাঠককে ভাল কবিতা পাঠের আনন্দ দিয়েছে।

কেবল আনন্দ নয় পাঠককে চিন্তার জগতে পরিভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থের বেশ কিছু কবিতা ধমীয় চেতনার অনন্য দৃষ্টান্ত।

কবিতাগুলো পড়ে মনে হয়েছে কবির ধর্মীয়চেতনা নিঃসন্দেহে সার্বজনীন চেতনা দ্বারা পরিশুদ্ধ। বিশ্বাসগুলো পৃথিবীর মানুষের জন্য মঙ্গলকর। কবিতার ধর্মভাবনায় দেখেছি মানবতার জন্য কাতারতা।

আপনি জানেন, আপনি একদিন মারা যাবেন, এটাইতো সত্যি! মৃত্যুকে আমরা কেউ ঠেকাতে পারবো? একদিন না একদিন আমাদের সবাইকেই মরতে হবে। জীবন খুব ছোট। মৃত্যু অনিবার্য।

এজন্য আদিল মাহমুদ তার কাব্যগ্রন্থের সূচনা করেছেন মৃত্যুর কথা বলে। আচমকা মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড় করিয়ে তিনি লিখেছেন— ‘আমাদের সকাল—ঘুম না ভাঙলেই পরকাল/ প্রতিরাত শেষে আসবে সকাল/ এমন কিন্তু নয়/ অনেক সময় সূর্য হাসলেও/ কারোর সকাল রাত্রিময়।’

আদিল মাহমুদের কবিতায় ধর্মীয়চেতনার নানা ব্যঞ্জনা দেখে মনে হয়েছে তিনি সুফীধারাসহ অন্যান্য মরমিয়াদের মতো অধ্যাত্মসাধনায় নিমগ্নও একজন কবি।

তার সমগ্র চেতনার মধ্যে ধর্মের একটা নিগূঢ় অধ্যাত্ম-অনুভূতি আছে। সেই অনুভূতিই তার শিল্পচেতনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কাব্যরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

গণমানুষের প্রতি তার দরদ ও তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ কবির ধর্মীয় চেতনার অন্যতম অংশ। এই মানবতাবোধে জড়িত হয়েছে কবির ধমীয় চেতনা।

আমি দেখেছি তার লিখিত পঙক্তির ভেতর ধর্ম আছে নানা মাত্রায়। কয়েকটি দৃষ্টান্ত—

১. আমাদের সকাল—ঘুম না ভাঙলেই পরকাল (সকাল)
২. বহুদিন পর আজিমপুর গোরস্থানে/ আবারও একজন গোরখোদককে দেখে আসলাম (গোরখোদক)

৩. শুক্রবারের মৃত্যু চাওয়া শেখাবে কে/ কে বলবে, ‘ভালো মন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’ (আপনি তো চলে গেলেন কবি)
৪. বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা/ শারাবান তাহুরার চেয়েও দামি। (বৃষ্টিপ্রেম)

৫. লালসা মুক্ত সফেদ হৃদয়ের মানুষগুলো অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করবে শোভা। চল, গড়ি একটি নতুন পৃথিবী। (লাওয়ারিশ)
৬. সুখ আছে ইবাদতে/ নিরীহ আকুল আকুতিতে। (সুখ)

৭. প্রেমিকাহীন শরীরে নতুন শুদ্ধতা—মুগ্ধ ভালোবাসা। (অভিশাপ)
৮. আমি মানুষের ভালোবাসা দেখি/ কখনো আবার কুঞ্চিত ঘৃণায় মানুষের নীচুতা দেখি! (মানুষ দেখি)

৯. শত ভাগ্যে নারী হয়ে জন্মেছিস/ মাতৃত্বের মুখ নিয়ে থাকিস। দুর্গা হয়ে নয় (নারী)
১০. কোলের বুভুক্ষ শিশুটা আর্তনাদ করেই চলছে/ গাল নাড়ছে—জিভ চাটছে/ এদিকে একবিংশ শতাব্দীর গায়ে কলঙ্ক লাগছে। (কলঙ্ক)

পাঠক! সুখী হতে কে না চায়? সুখের খোঁজে কত কিনা করে মানুষ! সুখের আকাঙ্ক্ষা সর্বজনীন। কিন্তু সত্যিকারভাবে কজনই বা পায় এর দেখা!

মানুষ তো সুখ খুঁজে নীল পদ্মে, রোদেলা আঙ্গিনায়, বউয়ের খোপায়, অচেনা ললনায়, কাব্যে, সাহিত্যে, গল্পে, উপন্যাসে, কিংবা টাকা-পয়সা ও বিলাসিতায়। এতে কি প্রকৃত সুখ পায়! না পায় না।

সুখের দেখা না পেয়ে অবশেষে বলে, ওরে সুখ, তুই মরিচিকা নাকি। ধরা দিয়ে পালাস আবার। গুণীজনরা বলেছেন, কেউ যদি প্রকৃত সুখের সন্ধান পায়, তাহলে সত্যিকারের সুখের ছটা সবসময় ঝলমল করে ওঠে তার চেহারা, অভিব্যক্তি ও আচরণে।

আদিল মাহমুদ তার ‘সুখ’ শিরোনামের কবিতায় প্রকৃত সুখের সন্ধান দিয়েছেন মানুষকে। চলুন, জেনে নেই সুখ কি! পাবো কোথায়!

পড়ি ‘সুখ’ কবিতার কিছু অংশ— ‘প্রকৃত সুখ পাই/ সুবেহ সাদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনিতে/ ঠান্ডা পানিতে ওজু করাতে/ স্রষ্টার আনুগত্যে দেয়া সিজদাতে/ চোখে আসা কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে/ মালিক কাছে আর্তনাদ-ফরিয়াদে/ আরশ থেকে নাজিল হওয়া কিতাব/ কুরআন তেলাওয়াতে/ খওফে এলাহীর তাড়নায় প্রকম্পিত হওয়াতে। সুখ আছে ইবাদতে/ নিরীহ আকুল আকুতিতে।’

মোটকথা, ধর্ম পালনে মানুষের নৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ হয় এবং ধর্ম কর্ম আনে সুখ শান্তিময়তা তা এই কবিতায় দেখিয়েছেন কবি।

লাওয়ারিশ কাব্যগ্রন্থে ধর্মীয় অনুষঙ্গবাহিত কবিতাগুলোতে পরকালের জীবনের সুখ শান্তি অন্বেষণ মুখ্য হয়ে ওঠেছে। কিভাবে পৃথিবীর মানুষের জীবনে অশান্তি-অকল্যাণ দূর হবে, কিভাবে বিভিন্ন মত ও পথের দ্বন্দ্ব দূর হবে, তার কথাও ঘুরে ফিরে এসেছে কবির কবিতায়।

অবশেষে তিনি তার কাব্যগ্রন্থে শেষ করেছেন আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করে।

তিনি লিখেছেন— ‘আয়ু শেষ প্রায়/ কিয়ামুল লাইলের দাঁড়িয়ে করা হলো না/ প্রিয় বান্দার মত যুঁতসই প্রার্থনা/ তবুও নবীজীর উম্মতের তকমা লাগিয়ে/ ক্ষমা করো—বদলে দাও জীবনের রঙ/ ঘনিষ্ঠ করো তাড়াহুড়োই করে/ সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে— আসআলুকাল জান্নাহ, ওয়া আউযু বিকা মিনান্নার।’

লেখক: তরুণ আলেম ও প্রাবন্ধিক


সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত