বিরহী বাউল উকিল মুন্সি: জানা-অজানার উপাখ্যান

  রুবেল সাইদুল আলম ২৩ জুলাই ২০২০, ১২:১৬:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

বিরহী বাউল উকিল মুন্সিকে নিয়ে লেখা কয়েকটি বই

আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়; পুবালি বাতাসে আমি বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি, আমার নি কেই আসেরে; নিলুয়া বাতাসে প্রাণ না জুড়ায় - এই গানগুলো বাংলাদেশের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। প্রয়াত নাট্যকার ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ তার শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমায় উপরের প্রথম দুটি গান ব্যবহারের পর এর হৃদয় স্পর্শ করা কথা ও সুরের জন্য গানগুলো মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেয়। তাছাড়া আরও একটু গোঁড়ার দিকে লক্ষ্য করলে পাওয়া যায় যে, বন্ধু আমার নির্ধরিয়ার ধন রে..., সুজন বন্ধু রে আরে ও বন্ধু কোনবা দেশে থাকো... এই গানগুলো গ্রামাঞ্চলে মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। নিজের ঘরে কিংবা মোড়ের টং দোকানে বসে চা-বিড়ি খেতে খেতে এই গানগুলো গ্রামীণ জনপদে বহুদিন যাবত মানুষের অন্তরের খোরাক যোগায়। কিন্তু গানগুলোর রচিয়তা কে, কে এর স্রষ্টা বা কে এত সুন্দর সুরে বাঁধলেন এই গান? এই নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা ধারণা নাই।

তারপর প্রয়াত গায়ক, বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও জাতীয় বংশীবাদক বারী সিদ্দিকীর বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে যে এই গানগুলোর রচিয়তা বাউল উকিল মুন্সি। কিন্তু কে এই বাউল উকিল মুন্সি? কোথায় তার জন্ম, বেড়ে উঠা, কী তার পরিচয়, তার জীবন-যৌবন, সংগীত-সাধনা, দর্শন, যাপিত জীবন বোধ, সংসার এসব কিছু অনেকেরই জানা নেই। যদিও তিনি ও তার গান এখন তুমুল জনপ্রিয় বাংলাদেশ তথা বিশ্বের বাউল গান প্রেমী মানুষের কাছে। সেই বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করে বাউল উকিল মুন্সি সম্বন্ধে ক্ষুদ্র পরিসরে মানুষের কাছে তথ্যগুলো পৌঁছে দেয়াই এই লেখার উদ্দেশ্যে।

বাউল উকিল মুন্সিকে সবাই এই নামে চিনলেও তার আসল নাম কিন্তু উকিল মুন্সি নয়। উকিল মুন্সির পিতা ছিলেন একজন ধনাঢ্য তালুকদার। নাম তার গোলাম রসুল আকন্দ। ১৮৮৫ সালে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার (তৎকালীন খালিয়াজুড়ি) বেতাই নদীর তীরে জৈনপুর গ্রামে গোলাম রসুল আকন্দের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার নাম রাখেন আব্দুল হক আকন্দ। শৈশবকাল থেকেই আব্দুল হক আকন্দ বাংলা পড়ালেখার পাশাপাশি ফারসি ও আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত হন। যেহেতু তিনি ছিলেন ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, তাই জন্মের পর থেকেই তার বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে বড় হয়ে একজন উকিল হবে। তাই তারা ছোটবেলা থেকেই আদর করে তাকে 'উকিল' নামে ডাকতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় উকিল নামের এই ব্যক্তি মসজিদে ইমামতি করলে তার নামের শেষে 'মুন্সি' শব্দটি যোগ হয়। আর এভাবেই সবাই আব্দুল হক আকন্দ নাম ভুলে যায়, তার নাম হয়ে যায় 'উকিল মুন্সি'।

উকিল মুন্সির বেড়ে ওঠা

উকিল মুন্সির বয়স যখন ১০ বছর, তখন তার পিতা মারা যান এবং তিনি এতিম হয়ে পড়েন। অতঃপর, উকিল মুন্সির জীবনে আরেকটি নির্মম ঘটনা ঘটে। তার মা পাশের গ্রামের এক লোককে বিয়ে করে চলে যান। একা উকিল মুন্সি বাধ্য হয়েই মায়ের কাছে যান। ওখানেই থাকতেন। পরে তার এক সৎ ভাই জন্মগ্রহণ করেন, যার ফলশ্রুতিতে তার আদর যত্নের অভাব আরও বেড়ে যায়। অবহেলার শিকার হন তিনি। অভিমানে চলে আসেন নিজ বাড়ি বোয়ালীতে। পিতা-মাতাহীন একটি শিশুর জন্য আদর যত্ন তো দূরে থাক, অবহেলা আর অনাহার হয়ে দাঁড়ায় নিত্য সঙ্গী। এই অবস্থায় তার ফুফু তাকে দেখাশোনার জন্য নিজের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু তৎকালীন স্বামীর সংসারে একজন স্ত্রীর কতটুকু স্বচ্ছতা বা স্বাধীনতা ছিল তা সহজেই অনুমেয়। তাই, স্বামীর অনিচ্ছার কারণে তিনি তার ভাইয়ের ছেলে উকিল মুন্সিকে বেশিদিন তার কাছে রাখতে পারেননি।

এরপর পড়াশোনাও আর বেশি দিন করা হয়নি উকিল মুন্সির। তিনি আবার তার নিজ গ্রামে চলে আসেন। অভাব-অনটন, অবহেলা-অনাদরে কাটতে থাকে তার দিন। তার বয়স যখন ১৮/১৯ বছর, তখন তিনি তার পিতার রেখে যাওয়া জমি-জমা ধীরে ধীরে বিক্রি করা শুরু করলেন। তার সাময়িক ও বৈষয়িক অভাব দূর হয়। কিন্তু অন্তরে তার তৈরি হয় ভালোবাসা হীনতার এক প্রবল তৃষ্ণা। এই অতৃপ্তি, না পাওয়ার শূন্যতা তাকে ঘর ছাড়া করে। পিতা-মাতা কেউ না থাকায় তিনি অবাধ স্বাধীন, যা খুশি করতে পারছেন, যেখানে খুশি যেতে পারছেন। অর্থনৈতিক দৈন্যতাও আপাতত নেই। কিন্তু মনের মধ্যে তার গভীর শূন্যতা।

তৎকালীন সময়ে ওই অঞ্চলে ঘাটু গানের খুব প্রচলন ছিল। উকিল মুন্সি নিয়মিত বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে সারারাত ঘাটু গান শুনতেন। গান তার অন্তরকে নাড়া দেয়। তিনি ঠিক করলেন যে তিনি নিজেই ঘাটু গান রচনা করবেন এবং গাইবেন। কিশোর উকিল মুন্সির কণ্ঠ ছিল খুবই মধুর ও দরাজ। তার গানে দর্শক শ্রোতা মুগ্ধ হতো নিমিষেই। উকিল মুন্সির বয়স তখন ১৮-২০ বছর। তিনি তখন থেকেই ঘাটু গানের দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ মূলত ভাটি অঞ্চলে বর্ষা কালে এই ঘাটু গান পরিবেশন করতেন। তার সুমধুর কণ্ঠের কারণে তিনি খুব অল্প সময়েই দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন চারিদিকে। তিনি নিজের মধ্যে সূর বাঁধেন, সূর লালন করেন। সম্ভবত ছোট বেলা থেকে পিতা-মাতা বিহীন উকিল মুন্সি তার মনের অতৃপ্তি, অনাদর-অবহেলা, প্রিয়জনের ভালোবাসা হীনতা, গভীর শূন্যতা থেকেই নিজের মনে বিরহকে লালন করেছিলেন।

যৌবন, প্রেম, বিয়ে ও দাম্পত্য

মোহনগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামে উকিল মুন্সির এক চাচা থাকতেন। তিনি গ্রামের খুব সম্মানিত লোক ছিলেন এবং মানুষ তাকে খুব সমীহ ও সম্মান করতো। উকিল মুন্সির বয়স যখন ২১/২২ বছর, তখন তিনি চলে যান তার এই চাচার কাছে। চাচার সুবাদে ও নিজ গুনের কারণে কিশোর ভাতিজা উকিল মুন্সিকে সবাই খুব আদর করতো। উকিল মুন্সিও মনের আনন্দে গ্রামের এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে ফিরে সময় কাটাতে লাগলেন। তিনি তখন জীবন থেকে শিখেন, প্রকৃতি থেকে শিখেন, ভাবনায় হারিয়ে যান মাঝে মধ্যে। এভাবে কয়েক বছর পার করার পর উকিল মুন্সির তখন টগবগে যুবক। একদিন উকিল মুন্সি গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ে যান। নাম তার হামিদা আক্তার খাতুন। বাবার নাম লবু হোসেন। মনে মনে তিনি এ মেয়েকে বিয়ে করবেন বলে মনস্থির করলেন। হামিদা আক্তারের জন্য তার মনে তৈরি হয় উন্মাদনা, না দেখলে তার পরান ছটফট করে ওঠে। এভাবে গ্রামে এককান দু'কান হতে হতে সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে কথাটি।

স্বাভাবিকভাবে কথাটি তার চাচা কাজী আলিম উদ্দিন সাহেবের কানেও পৌঁছে যায়। যেহেতু লবু হোসেন ছিলেন একজন সাধারণ, দরিদ্র ও সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে অনেক নিচু শ্রেণীর মানুষ, তাই তার চাচা এতে খুব মনঃক্ষুণ্ণ হন এবং এই সম্পর্ক মেনে নেন না। তিনি উকিল মুন্সিকে তার বাড়ি থেকে বের করে দেন। শুধু তাই নয়, তিনি যেন এই গ্রামে আর ঢুকতে না পারেন সেজন্য সবাইকে সতর্ক করে দেন। উকিল মুন্সির অবস্থা তখন পাগলের মতো। তিনি আবার তার নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামের কোন আত্মীয়-স্বজন হামিদা আক্তার খাতুনের সঙ্গে তার বিয়েতে রাজি হয় না এবং কেউ তাকে কোনরকম সহযোগিতাও করেন না। এই অবস্থায় উকিল মুন্সি দিশেহারা হয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরতে থাকেন। এমন সময় ইটনা ঠাকুর বাড়িতে থাকা তার একমাত্র সহোদর আব্দুল মজিদ আকন্দর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তিনি আরও ভেঙে পড়েন। কেউ আর তার রইলো না।

তখন তিনি মোহনগঞ্জের জৈনপুর, পাগলাজোর, শ্যামপুর, আটবাড়ি ইত্যাদি জায়গায় দিন যাপন করতে থাকেন। এই দুর্দিনে কারো সহায়তা না পেয়ে পিতার রেখে যাওয়া সম্পদ তিনি পানির দরে বিক্রি করতে থাকেন। উকিল মুন্সির বয়স যখন ৩০ বছর, তখন তিনি দরছে চলে যান এবং সেখানে তিনি ইমামতি করেন ও ছেলেমেয়েদের আরবি পড়া শিখাতে থাকেন। নির্জনে একা থাকা উকিল মুন্সি নিজেই গজল রচনা করতেন এবং উচ্চস্বরে সুমধুর কণ্ঠে গাইতেন। গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ শেষে তিনি সুমধুর কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত করতেন ও গজল গাইতেন। এভাবেই রাত পার করে দিতেন। অন্তরে অনেক দুঃখ নিয়ে তিনি দিন কাটাতে লাগলেন।

এদিকে ঠিকানাবিহীন উকিল মুন্সির প্রেমে হামিদা আক্তার খাতুনের প্রাণ কেঁদে ওঠে। তিনি দিনরাত উকিল মুন্সির বিরহে ছটফট করতে থাকেন। দিনরাত কান্নাকাটি করেন। মেয়ের এমন পাগল প্রায় অবস্থা দেখে পিতা লবু হোসেন বাধ্য হয়ে উকিল মুন্সির সঙ্গে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লবু হোসেনের কাছে ঠিকানাবিহীন উকিল মুন্সিকে খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। উকিল মুন্সিকে জানানো হয় যে, তিনি যদি রাজি থাকেন তাহলে কোন আত্মীয়-স্বজন ছাড়াই হামিদা আক্তার খাতুনকে তার সঙ্গে বিয়ে দিবেন। তিনি যেন ওখানে দ্রুত পৌঁছেন। অতঃপর, ৩১ বছর বয়সে উকিল মুন্সি হামিদা আক্তারকে বিয়ে করেন এবং শ্বশুরের দেয়া একটি বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। শ্বশুর বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার প্রথম পুত্রসন্তান জন্ম নেয়; নাম রাখেন তার আব্দুস সাত্তার। এই সেই বিখ্যাত বাউল আব্দুস সাত্তার যিনি দেশে-বিদেশে বাউল গান গেয়ে অনেক বিখ্যাত হয়েছিলেন। তারপর উকিল মুন্সির ঘরে আরও এক ছেলে ও দুই মেয়ে জন্ম নেয়।

উকিল মুন্সির সাধনা ও সংগীত

সন্তানদের জন্মের পর উকিল মুন্সি দরছ হিসেবে মদন থানার কুলিয়াটি গ্রামে চলে যান। সেখানে তিনি গান ও গজল রচনা করতেন, গাইতেন। লোকজনের মুখে মুখে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। এক পর্যায়ে তার মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তা ধারার ভাব প্রকাশ পেতে থাকে, চলে যান তিনি হবিগঞ্জের রিচি গ্রামে এবং সেখানে বিখ্যাত পীর মোজাফফর আহমেদের (রহ:) কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পীরের নির্দেশে তিনি শরিয়তপন্থী মতাদর্শ গ্রহণ করেন। তিনি একতারা বাজিয়ে গান গাইতেন কিন্তু কোনদিন কোন ছবি উঠান নাই। কুলিয়াটি গ্রামে উকিল মুন্সিকে কেন্দ্র করে ভাটি বাংলার বিভিন্ন এলাকার বাউল শিল্পীরা একটি আশ্রয় বা আখড়া গড়ে তোলেন। এটা হয়ে যায় তৎকালীন সময়ে বাউলদের ঠিকানা। এই কুলিয়াটি গ্রাম আসলে অনেক বাউলের আঁতুড়ঘর। তাদের মধ্যে হৃদয় সরকার, আব্দুল জলিল, ধনাই খাঁ, আবু চান, নুরুল ইসলাম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তারা উকিল মুন্সির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

উকিল মুন্সি গানের দলে নেতৃত্ব দিতেন। মরমী এই শিল্পী সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, লোকতত্ত্ব প্রভৃতি গানের মাঝে প্রশ্ন, উত্তর ও পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে ওই সময়ের মালজুড়া গানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। উকিল মুন্সি নিজের লেখা গানই বিভিন্ন পালাগানে গাইতেন এবং অন্যান্য সাধকদের গান গাইতেন মালজুড়া গানে। হবিগঞ্জের রিচি গ্রামের তার মুর্শিদ মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে ছিল তার গভীর যোগাযোগ। ভরা বর্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠতো উকিল মুন্সির প্রাণ। তিনি তখন বিরহের গান লিখতেন, দরদ ভরা কণ্ঠে বিভিন্ন আসরে গাইতেন, কাঁদতেন, মানুষকে কাঁদাতেন।

গানের জগতে উকিল মুন্সি ছিলেন এক বিরহী ডাহুক। তিনি নারী-পুরুষের অন্তরের আকুতি, প্রেম-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, বিরহ গাঁথা নিয়ে গান রচনা করতেন এবং সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বিরহের অনুভূতি প্রকাশ করতেন। যদিও তিনি ছিলেন একজন বাউল কিন্তু তিনি বহু প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি মসজিদে ইমামতি করতেন, কোরআন তেলাওয়াত করে তার ব্যাখ্যা দিতে পারতেন, হাদিসের ব্যাখ্যা দিতে পারতেন, দোয়া পরিচালনা করতে পারতেন। ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও জ্ঞান তার বাউল গান ও জীবনে কোনরূপ বিচ্যুতির সৃষ্টি করেনি। যাদের উকিল মুন্সি নামাজ পড়াতেন, তারাই আবার উকিল মুন্সির গানের শ্রোতা হতেন। এই দরদী বাউলের গানের সুরে মানুষ চোখের পানি আটকাতে পারতেন না।

গ্রামের মুরুব্বিরা, মুসুল্লিরা উকিল মুন্সিকে জানাজায় ইমাম হিসেবে পাওয়ার জন্য আকুতি করতেন। এমনকি, এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা তাদের পরিবার পরিজনকে আগে থেকেই বলে রাখতেন যে তার মৃত্যুর পর উকিল মুন্সি যেন জানাজায় ইমামতি করেন। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যে, তিনি গানের আসর করছেন কিন্তু হঠাৎ খবর এসেছে যে জানাজায় যেতে হবে। তিনি গানের আসর ছেড়ে চলে গেছেন জানাজা পড়াতে। উকিল মুন্সির গানে মুগ্ধ হয়েছেন অনেক পীর-দরবেশসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তৎকালীন সময়ে মদনের ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মো. আবুল ফজল। প্রেসিডেন্টের বাড়িতে মিলাদ মাহফিলের শেষ পর্যায়ে উকিল মুন্সি গিয়ে উপস্থিত হন। আবুল ফজল সাহেব হাত ধরে উকিল মুন্সিকে নিয়ে বসান এবং উপস্থিত মওলানাকে অনুরোধ করেন যে, মোনাজাত ধরবেন উকিল মুন্সি। উকিল মুন্সি মোনাজাতে দু'হাত তুলে শুরু করে দিলেন গান, আর অঝোরে কাঁদতে লাগলেন বিরহী এই মুন্সি। ওই মাহফিলের সবাই কাঁদলেন।

একবার ঘটে যায় এক মজার ঘটনা। মসজিদে গান করা নিয়ে উকিল মুন্সির বিরুদ্ধে এক লোক থানায় অভিযোগ করে। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ওই তদন্তকারী পুলিশ অফিসার উকিল মুন্সির ভক্ত হয়ে যায়। উকিল মুন্সি ছিলেন সুঠাম দেহি, লম্বা গড়নের সাদা ফর্সা একজন মানুষ। সব সময়ে তিনি সাদা লুঙ্গি, সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়তেন। সেই সঙ্গে সাদা লম্বা দাঁড়ি, দেখতে অনেকটা রবীন্দ্রনাথের মতো। উকিল মুন্সি একবার কলকাতায় গান রেকর্ড করতে গিয়েছিলেন। তার কণ্ঠ ছিল দরাজ। তিনি যখন গানে টান দেন তখন চড়া কণ্ঠের কারণে গানের রেকর্ড ফেটে গিয়েছিল। ভাটি গাঙের ভরা নদীর ঢেউয়ের মতো তার গলা উঠা নামা করতো।

উকিল মুন্সির অনেক বিরহ গাঁথার মধ্যে একটি বিখ্যাত গান হলো- "আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে.. পুবালি বাতাসে.."। এই গানে একজন অসহায় নারীর নাইওর যাওয়ার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। গানের শেষ দিকে কার্তিক মাসের শেষের দিকে উকিল মুন্সি নিজেই নাইওর যাওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেছেন। এখানে একটা প্রশ্ন এসে যায়, তিনি কেন কার্তিক মাসের শেষে নাইওর যাওয়ার কথা বলেছেন? ধারণা করা হয়, তার পীরের মৃত্যু হয়েছিল কার্তিক মাসের শেষের দিকে। তাই তিনি তার পীরের শেষ যাত্রাকেই গভীর বেদনায় ইঙ্গিতপূর্ণভাবে প্রকাশ করেছেন। তার নিজের সঙ্গে তার পীরের আধ্যাত্মিক যোগাযোগের যে টান ছিল তা থেকে জানা যায় যে, তার পীর যখন শেষবারের মতো অসুস্থ হন, তখন উকিল মুন্সিকে জরুরি খবর পাঠানো হয়। উকিল মুন্সি তার কোলের মধ্যে তার স্বীয় পীরের মাথা রেখে গজল ধরেন এবং সেই গজল শুনতে শুনতে তার পীর শেষবারের মতো চোখ বুঝেন।

আরেক বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গান "সোয়া চান পাখি আমার.. আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি"- গানটি উকিল মুন্সির গান বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু এ পর্যন্ত উকিল মুন্সির সংগৃহীত গান বিশ্লেষণে এই গানটি উকিল মুন্সির গান হিসাবে পাওয়া যায়নি। এটা নিয়ে একটা বিতর্ক আছে। সাধারণত বাউল গানের শেষের দিকে সংশ্লিষ্ট বাউলের নাম যুক্ত থাকে। এই গানটির শেষের দিকে রয়েছে- বাউল রশিদ বলে চলরে উকিল, কী লাভ হবে ডাকি রে পাখি...। এ থেকে বুঝা যায় যে, গানটি উকিল মুন্সির সমসাময়িক প্রখ্যাত বাউল রশিদ উদ্দিনের হতে পারে। উকিল মুন্সির সমসাময়িক বাউল ছিলেন চান মিয়া ফকির, বাউল রশিদ উদ্দিন, বাউল জালাল উদ্দিন খাঁ, বাউল উপেন্দ্র সরকার, বাউল চান খাঁ পাঠান প্রমুখ।

আরেকটি প্রচলিত ও বিখ্যাত গান- "তুই যদি আমার হইতি রে, ও বন্ধু আমি হইতাম তোর..."। এই গানটি ও উকিল মুন্সির লেখা গান কিন্তু খুব কম মানুষই জানে এই গানের স্রষ্টা কে? উকিল মুন্সি হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। উকিল মুন্সি একাধারে মথুরা বৃন্দাবনের রাঁধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ নিয়ে অনেক গান রচনা করেছেন আবার তার গানের মধ্যে মক্কা-মদিনার অনেক বিষয়ও ফুটে উঠেছে। তবে তিনি বিরহ বিচ্ছেদ বেশি রচনা করেছেন, তাই তাকে বলা হয় বিরহী বাউল।

তার লেখা অসংখ্য গানের মধ্যে প্রায় দুই শত গান খুঁজে পাওয়া যায়। কিছু গান মানুষের মুখে মুখে রয়েছে কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে সংগৃহীত নয়। তার বিরহ বিচ্ছেদগুলোর মধ্যে- আমার গায়ে যত দুঃখ সয়/আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে/ নিলুয়া বাতাসে প্রাণ না জুড়ায়/ বন্ধু আমার নির্ধনিয়ার ধন রে/ তুমিনি আমার বন্ধু আমিনি তোমার বন্ধুরে/ কৃষ্ণ প্রেমে পোড়া দেহ কী দিয়া জুড়াই বলো সখী/ আমার মনে মানে না মানা/ সখী রে প্রাণ বন্ধুরে আনিয়া দেখা না/ বন্ধুরে আমি মইলে কী লাভ হবে তোর/ আমায় যে দুঃখ দিয়েছো কলিজায়/ সংবাদে অঙ্গ জুড়ায় না গো সখী/ আমার প্রাণ বন্ধুয়া আসিয়া আমার দুঃখ দেখিয়া/ তোমারে দেখিবার মনে লয় সুজন বন্ধুরে/ পিরিত কইরা আমার সুখ হইলো না/ যার লাগি যার প্রাণ কান্দে দিবা নিশি... প্রভৃতি খুবই জনপ্রিয় গান।

উকিল মুন্সির সময়কালে বাউল গান ও সংগীত সাধনে বাঁধা

উকিল মুন্সি ও তৎকালীন সমসাময়িক বাউলরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মানুষে মানুষে বন্ধন ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণের কথা গানের সুরে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। কিন্তু পথটি খুব মসৃণ ছিল না। কট্টরপন্থীরা তাদের এই সুর ও সংগীত সাধনায় অনেক বিপত্তি ঘটান। এ ঘটনা অবশ্য এ অঞ্চলে নতুন কিছু নয়। বাউলমতের প্রচার-প্রসারের পথ কোনোকালেই সুগম ছিল না। জন্মলগ্ন থেকেই বাউল সম্প্রদায়কে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা-বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সমাজের উঁচুস্তরের লোক ও শাস্রবাহকদের কাছ থেকে তাদের নিত্য লাঞ্ছনা-নিগ্রহ সবসময়েই সহ্য করতে হয়েছে।

বাউল সাধনার মূল কথা

এ অঞ্চলে বাউল সাধক কিংবা বাউল সাধনার একটু গোঁড়ার দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যায় যে, ষোড়শ শতক থেকে একদল মুসলিম কবির সন্ধান পাওয়া যায়, যারা যোগ ও দেহ সাধনা করেন ও কাব্য রচনা করেন। ধারণা করা হয়, বাংলার বাউল মতবাদ বা দর্শন সেখান থেকেই শুরু। কেউ কেউ একে ধর্মবত বলে আখ্যায়িত করতে চান। ড. উপেন্দ্রনাথসহ অন্যান্য পন্ডিতরা মনে করেন, বৌদ্ধ-সহজিয়া বৈষ্ণবদের মতো মুসলিম দেহতত্ত্ব সাধকরাও একই পথের পথিক। তবে কোন কোন পণ্ডিত বলেন, বিশেষ কোন দল বা শ্রেণীর দার্শনিক মতবাদকে বিশেষ কোন ধর্ম বলা যায় না। বাউল মতবাদ ধর্মমত নয়। এটি আসলে একটি বিশেষ দার্শনিক মতবাদ। তবে এ মতের আদিগুরু কে তা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। বাউলরা তাদের গানে রূপকের মাধ্যমে অসীমকে সীমায় আবদ্ধ করেছেন আর সীমার মধ্যে থেকে অসীমের সাধনা করেছেন- এটাই বাউল সাধনার মূল কথা। আমাদের আলোচ্য বাউল উকিল মুন্সি ছিলেন শরীয়তপন্থী বাউল। তিনি কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যাসহ মানুষকে বুঝাতে সক্ষম ছিলেন।

শেষ কথা

উকিল মুন্সির জীবদ্দশায় মানুষজন তাকে মরমি কবি উকিল মুন্সি, বাউল ফকির উকিল মুন্সি, দরদি বাউল উকিল মুন্সি, বাউল কবি উকিল মুন্সি প্রভৃতি নামে ডাকতেন। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন বিরহী বাউল। তার গান ও সুরে বিরহের ব্যাকুলতা প্রাধান্য পেয়েছে। অন্তরজ্বালায় দগ্ধ নারীর কান্নায় বিলাপের যে সুর, বিরহের যে ছাপ তা আমরা উকিল মুন্সির গানে ও সুরে খুঁজে পাই, যে বিরহ নারী-পুরুষ সর্বোপরি সবাইকে ছুঁয়ে যায়। এ জন্যই তিনি বিরহি বাউল। ১৯৭৮ সালে কোন এক গানের আসর থেকে ফেরার পর তার পুত্র বাউল সাত্তার মিয়া প্রচণ্ড জ্বরে পরে। কয়েকদিন সেই জ্বরে ভোগার পর তিনি মারা যান। পুত্রের মৃত্যুতে উকিল মুন্সি পাগলপ্রায় হয়ে যান। তিনি তার পুত্রকে এতোটাই ভালোবাসতেন যে, তিনি শোকে পাথর হয়ে যান।

এই শোকের কাতরাতে তিনি খুবই এলোমেলো আচরণ করতেন তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তারপর মাত্র কয়েকমাস পরে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে তিনিও এ পৃথিবী যেমন আছে তেমনি রেখে এর মায়া ত্যাগ করে ওপারে চলে যান। উকিল মুন্সির পূর্ব ইচ্ছা ও নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে জৈনপুর গ্রামে বেতাই নদীর কোলঘেঁষা বাড়ির উঠানে একই চালের নিচের পুত্রের পাশে দাফন করা হয়। উকিল মুন্সির জীবদ্দশায় তার কোন গানের বই প্রকাশিত হয়নি। এখন প্রতিবছর জৈনপুরে উকিল মুন্সির মাজার প্রান্তরে বাউল গানের আয়োজন করা হয়, যেখানে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলসহ অন্যান্য প্রখ্যাত সব বাউলরা উপস্থিত হন এবং গান পরিবেশন করেন।

তথ্যসূত্র

১) ব্রাত্য লোকায়ত লালন: সুধীর চক্রবর্তী, পুস্তক বিপণি, কলকাতা।
২) বাউল ধ্বংস ফৎওয়া ও অন্যান্য: আবুল আহসান চৌধুরী, লালন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
৩) বাংলাদেশের বাউল: সমাজ, সাহিত্য ও সংগীত, ড: আনোয়ারুল করিম, বর্ণায়ন, ঢাকা, বাংলাদেশ।
৪) বিরহী বাউল উকিল মুন্সির গান ও জীবন, অমলেন্দু কুমার দাশ, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, বাংলাদেশ।

লেখক: রুবেল সাইদুল আলম, ডেপুটি কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত