ছোট গল্প: উষ্ণ আকাঙ্ক্ষা
jugantor
ছোট গল্প: উষ্ণ আকাঙ্ক্ষা

  শাহজাদা সেলিম রেজা  

২৩ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৪:১৩  |  অনলাইন সংস্করণ

মাস্টার্স কিছুদিন আগেই শেষ হল। আগে থেকেই চাকরি থাকায় নতুন করে কিছু ভাবছি না। এখন লক্ষ্য নিজ পছন্দের এ পেশাতেই ভালো কিছু করার। পড়াশোনা শেষ হওয়ায় বাড়ি থেকে চাচ্ছে এবার যেন বিয়ে করি। কিন্তু বিয়েতে মোটেও আগ্রহ নেই। চাকরি, ঘোরাঘুরি আর আড্ডায় আরও কিছুদিন সময় কাটানোর ইচ্ছে আমার।

বাড়ির লোকজন সবাই অনেক বুঝালো আমায়। শেষ অবধি রাজিই হলাম। রাজি হয়েছি ঠিকই কিন্তু বিয়ে দেরিতে করার জন্য ছোট্ট একটা চাল খাটালাম মাথায়। যে মেয়েই পাত্রী হিসাবে দেখানো হয় তাকে পছন্দ হয়নি বলে জানিয়ে দেই। এভাবে প্রায় চার মাসে ছয়-সাতটা মেয়ে দেখলাম। আমি বিন্দাস ভালোই দিন কাটাচ্ছি। বিষয়টা আমার মেঝ আপা টের পেল। ছোট দুলাভাইকে সব খুলে বলে তারা উঠে পড়ে লাগল আমার ওপর। সাভারে মেয়ে দেখেছে তারা।

৩ জানুয়ারি মেয়ে দেখার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছি। আব্বা, বড় ভাই, ছোট দুলাভাই ও আমি যাব। বায়না ধরল মেঝ আপার ছেলে আশিক। দুলাভাই প্রাইভেট-কার রিজার্ভ করেছে। হালকা শীতে সকাল বেলার আরামের ঘুম হারাম করে কোথাকার কোন মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। কেউই কথা বলছে না আমার সঙ্গে। খুব রেগে আছে। থাক না রেগে; বিয়ে যত পরে হয় ততই আমার জন্য মঙ্গল। শুনেছি বিয়ের পর পুরুষরা পরাধীন হয়। গড়ে ওঠা নতুন পৃথিবীতে নাকি বউতন্ত্র চলে।

কথা বলা ছাড়া মানুষ কতক্ষণ থাকতে পারে? আমি ভাগ্নে আশিকের সঙ্গে ওর পড়াশোনা নিয়ে কথা বলছি। সূর্য উঠছে। শীতের সকালে সূর্যের হালকা তাপ ভালোই লাগছে। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এটার ইংরেজি কি হবে প্রশ্ন করলাম ভাগ্নেকে। সে আমার মুখপানে চেয়ে হাসছে কিন্তু উত্তর বলতে পারছে না। গাড়িতে থাকা কেউই উত্তর বলে দিল না আশিককে। জানি, ও এর উত্তর পারে কিন্তু এখন হয়তো মনে পড়ছে না। ততক্ষণে আমরা প্রায় সাভার চলে আসছি। আমাকে একা রেখে বাকিরা সবাই কেনা কাটার জন্য বাজারে গেল। পেছন পেছন আমিও গেলাম। তাদের কেনাকাটা দেখে মনে হচ্ছে যেন বিয়ের পর প্রথমবার শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি। বাজার শেষে সবাই গাড়িতে উঠছে এমন সময় আমি, ক্ষুধা লাগছে আমার। বড় ভাই এ কথা শুনেই ধমকের স্বরে, দেড় ঘণ্টাও হয় নাই নাস্তা করলি এখনই ক্ষুধা লাগে কিভাবে? গাড়িতে ওঠ, পনের বিশ মিনিট পর সবাই একসঙ্গে খাব।

গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা আমি। ফলমূলের ব্যাগ কাউকে দেইনি, আমার কাছেই রেখে দিয়েছি। ঠোঙা থেকে খুব সাবধানে একটা আপেল বের করলাম। ধোয়ার উপায় না থাকায় রুমাল দিয়ে মুছে ধীরে ধীরে খাচ্ছি। হঠাৎ পেছন থেকে ভাগ্নে আশিক, ওই মামা তুমি একলা কী খাও? পড়লাম বিপদে, সবকিছু নিয়ে গেল দুলাভাই। ড্রাইভার হাসছে। তিনিও এতক্ষণে বুঝেছেন বিয়েতে কোনো মত নেই আমার। অর্ধেক খাওয়া আপেলটা ভাগ্নেকে বাধ্য হয়ে দিলাম আর বললাম, সন্ধ্যায় কিন্তু ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

মেয়েদের বাসায় পৌঁছলাম। সবাই ফ্রেস হয়ে আসার পর আমাদের আপ্যায়ন শুরু হল। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে নিয়ে আসল, নাম অরিন। সবার অবস্থা দেখে বুঝলাম তারা আগে থেকেই মেয়েকে জানে। এখন শুধু আমাকে দেখানোর জন্য এই আয়োজন। কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না। রেজা কিছু প্রশ্ন করার আছে তোমার, দুলাভাইয়ের প্রশ্ন করার পর আমার হ্যা বা না বলার আগেই ভাগ্নে, আমার একটা প্রশ্ন আছে। ভাগ্নের কথায় সবাই হাসছে। মেয়েও মুচকি হাসছে আর আড়চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তবে সে যে নার্ভাস তা চোখে-মুখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মামার তো খিচুড়ি অনেক পছন্দ, আপনি কি খিচুড়ি রান্না পারেন? ভাগ্নের প্রশ্নে না হেসে পারলাম না। আমার নিজেরই মনে ছিল না বিষয়টা। সব খিচুড়িই রান্না পারে মেয়ে আমার, অরিনের মায়ের উত্তর। বুঝলাম মেয়ে শুধু রূপেই নয়, গুণেরও অধিকারী বটে।

এদিকে প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই ভাগ্নে আবার, সূর্য পূর্ব দিকে উঠে এর ইংরেজি কি হবে? আসার সময় ভাগ্নেকে প্রশ্নটা করেছিলাম। কিন্তু সে এখানে পাল্টা আরেক জনকে প্রশ্ন করছে। এবার আব্বা, ভাই সবাই মুখ বন্ধ রাখতে বলল ভাগ্নেকে। তবে মনে মনে খুব খুশি আমি। হয়তো এটাই হবে মুক্তির নতুন পথ। অরিনকে আমাদের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়া হল। মেয়ে পক্ষের সঙ্গে কথা চলছে। হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখি ভাগ্নে আমাদের মাঝে নেই। মাঝখানে মাথা নিচু করে বসে আমি শুধু দুই পক্ষের কথা শুনছি আর ভাবছি, তাহলে কি শেষ পর্যন্ত অরিনের আঁচলেই বাঁধা পড়তে যাচ্ছি! দুই পরিবার আলোচনা করে দিনক্ষণও ঠিক করল।

অরিনদের বাড়ি থেকে আমরা সকলে বের হচ্ছি। ভাগ্নে আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকছে। গাড়ির দিকে এগিয়ে যাবার সময় চার কোনা ভাজের একটা রঙিন কাগজ দিল ভাগ্নে। কাগজটা কিসের জানতে চাইলাম। মামি তোমায় দিতে বলছে আর এ কথা কাউকে বলতেও না করেছে। ভাগ্নের কথা শুনে হাসছি। হঠাৎ দুলাভাই এগিয়ে এসে, এতদিনে তাহলে মেয়ে পছন্দ হল তোমার? মানে, দুলাভাইকে প্রশ্ন করলাম। সে হাসতে হাসতে, থাক আর মানে মানে করতে হবে না। চালিয়ে যাও।

সবাই গাড়িতে করে বাড়ির দিকে রওনা হল আর আমি বাসে উঠলাম ধানমন্ডির উদ্দেশে। পরদিন থেকে নিয়মিত অফিস করতে হবে। বেশ ক’দিন ছুটি কাটালাম। বাসায় ফেরার পর রাত ১০টার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন। প্রথমে রিসিভ করতে পারলাম না। আবারও ফোন আসল; রিসিভ করে জানতে চাইলাম কে? প্রশ্নটা কি অপরিচিত সবাইকে করেন, অপর প্রান্ত থেকে মিষ্টি কণ্ঠে। আপনি কে জানতে চাইলাম আর এর উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করছেন আমায়; আজব তো। আজ থেকে আপনি শুধু আমাকে জানবেন, চিনবেন; অন্য কাউকে না। ওহ আপনি। অরিনের সঙ্গে এভাবে দু’তিন সপ্তাহ কথা চলতে থাকল। এখন দু’জনেই আপনি থেকে তুমিতে এসেছি। কথায় কথায় গল্পের মতো বাস্তবেও রোমান্টিক হচ্ছি।

রাতে কথা হচ্ছে দু’জনের। এমন সময় হঠাৎ করেই অরিন, ছোট্ট একটা অনুরোধ করব রাখবে? এ ক’দিনে বেশ আবেগি হয়ে পড়েছে মেয়েটা। আচ্ছা অনুরোধটা কি সেটা তো আগে শুনি, সম্ভব হলে অবশ্যই রাখব। আগামীকাল চল দেখা করি আমরা, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াই। সেই বিয়ে ঠিক হওয়ার দিন আড়চোখে দেখা; তারপর থেকে তো শুধু ফোনে ফোনে...।

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বেলা ১১টার দিকে নবীনগর জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছলাম। সেদিন রোববার, সকলের অফিস খোলা থাকায় এমন সময় লোকজনও কম স্মৃতিসৌধে রাস্তায়। আমি ইনফর্মাল পোশাকে মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ফোন দিলাম অরিনকে, কোথায় তুমি? কিছুক্ষণ পর সে হাজির। হালকা হলুদ রঙের শাড়ি আর দিঘল কালো চুলের বেণীতে সাধারণ মেয়েটাকে অসাধারণ লাগছে। চোখ ফেরাতে কষ্ট হলেও চোখ ফেরালাম; শুধু মাত্র পথ চলার জন্য।

আজ তোমাকে এতো ভালো লাগছে কেন বলেই অরিনের বাম হাতে হাত রাখলাম। তুমিই ভালো জানো, অন্যদিকে তাকিয়ে অরিনের উত্তর। দু’জনেই লজ্জা অনুভব করছি। কথা বলতে বলতে আমরা স্মৃতিসৌধের একদম সামনের দিকে গেলাম। স্মৃতি স্তম্ভকে বিনয়ের সঙ্গে সালাম জানালাম। অরিনও আমার সঙ্গে সালাম জানালো। ফের বাইরের দিকে হাঁটছি। এখানে দেখা না করলে জানতামই না তুমি দেশকে কত ভালোবাসো। ওর এ কথার জবাব জানা না থাকার পরও বললাম, কোনো প্রেমিকের ভালোবাসাই লোক দেখানোর নয়। আর দেশকে সবসময় হৃদয় থেকে ভালোবাসতে হয়। শুধু দেশকে ভালোবাসলেই হবে মি. প্রেমিক, এবারও অন্যদিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলল অরিন।

আচ্ছা, তাই! তাহলে এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? সেও পাল্টা প্রশ্ন করলো, তুমিও তো লজ্জা পাচ্ছ। লজ্জা মেয়েদের ভূষণ, ছেলেদের না। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়ে হাত ধরে টান দিলাম অরিনকে; বুকের মধ্যে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে, ঠোঁটে লিপস্টিক কেন? আপাতত এটাই না হয় বাধা হয়ে থাক, এটুকু বলতেই ঘেমে গিয়েছে অরিন। জানি আমিও ঘামছি। কোনো হলুদে রাঙাতে চাই না নিজেকে, আমি আমাকে রাঙাবো শুধুই তোমার রঙে। আর ক্ষণে ক্ষণে হারাবো তোমার নগরে। ওরে বাবা, ভূগোল-রসায়ন নিয়ে দেখছি তোমার ইচ্ছের শেষ নেই! তাহলে দু’জনের এই প্রেম-ভালোবাসা গোপনে গোপনে আর কত দিন, এর বহিঃপ্রকাশ হবে কবে? অরিন জরিয়ে ধরে আছে আমায়। শোন, আরও শক্ত করে ধরতে হবে। আর এই প্রেম-ভালোবাসা আজীবনই গোপন থাক। শুধু বহিঃপ্রকাশ হোক দু’জনার উষ্ণ আকাঙ্ক্ষায়; স্বপ্নের ন্যায়।

লেখক: শাহজাদা সেলিম রেজা, সাংবাদিক, ssreza205@gmail.com

ছোট গল্প: উষ্ণ আকাঙ্ক্ষা

 শাহজাদা সেলিম রেজা 
২৩ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মাস্টার্স কিছুদিন আগেই শেষ হল। আগে থেকেই চাকরি থাকায় নতুন করে কিছু ভাবছি না। এখন লক্ষ্য নিজ পছন্দের এ পেশাতেই ভালো কিছু করার। পড়াশোনা শেষ হওয়ায় বাড়ি থেকে চাচ্ছে এবার যেন বিয়ে করি। কিন্তু বিয়েতে মোটেও আগ্রহ নেই। চাকরি, ঘোরাঘুরি আর আড্ডায় আরও কিছুদিন সময় কাটানোর ইচ্ছে আমার।

বাড়ির লোকজন সবাই অনেক বুঝালো আমায়। শেষ অবধি রাজিই হলাম। রাজি হয়েছি ঠিকই কিন্তু বিয়ে দেরিতে করার জন্য ছোট্ট একটা চাল খাটালাম মাথায়। যে মেয়েই পাত্রী হিসাবে দেখানো হয় তাকে পছন্দ হয়নি বলে জানিয়ে দেই। এভাবে প্রায় চার মাসে ছয়-সাতটা মেয়ে দেখলাম। আমি বিন্দাস ভালোই দিন কাটাচ্ছি। বিষয়টা আমার মেঝ আপা টের পেল। ছোট দুলাভাইকে সব খুলে বলে তারা উঠে পড়ে লাগল আমার ওপর। সাভারে মেয়ে দেখেছে তারা।

৩ জানুয়ারি মেয়ে দেখার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছি। আব্বা, বড় ভাই, ছোট দুলাভাই ও আমি যাব। বায়না ধরল মেঝ আপার ছেলে আশিক। দুলাভাই প্রাইভেট-কার রিজার্ভ করেছে। হালকা শীতে সকাল বেলার আরামের ঘুম হারাম করে কোথাকার কোন মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। কেউই কথা বলছে না আমার সঙ্গে। খুব রেগে আছে। থাক না রেগে; বিয়ে যত পরে হয় ততই আমার জন্য মঙ্গল। শুনেছি বিয়ের পর পুরুষরা পরাধীন হয়। গড়ে ওঠা নতুন পৃথিবীতে নাকি বউতন্ত্র চলে।

কথা বলা ছাড়া মানুষ কতক্ষণ থাকতে পারে? আমি ভাগ্নে আশিকের সঙ্গে ওর পড়াশোনা নিয়ে কথা বলছি। সূর্য উঠছে। শীতের সকালে সূর্যের হালকা তাপ ভালোই লাগছে। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এটার ইংরেজি কি হবে প্রশ্ন করলাম ভাগ্নেকে। সে আমার মুখপানে চেয়ে হাসছে কিন্তু উত্তর বলতে পারছে না। গাড়িতে থাকা কেউই উত্তর বলে দিল না আশিককে। জানি, ও এর উত্তর পারে কিন্তু এখন হয়তো মনে পড়ছে না। ততক্ষণে আমরা প্রায় সাভার চলে আসছি। আমাকে একা রেখে বাকিরা সবাই কেনা কাটার জন্য বাজারে গেল। পেছন পেছন আমিও গেলাম। তাদের কেনাকাটা দেখে মনে হচ্ছে যেন বিয়ের পর প্রথমবার শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি। বাজার শেষে সবাই গাড়িতে উঠছে এমন সময় আমি, ক্ষুধা লাগছে আমার। বড় ভাই এ কথা শুনেই ধমকের স্বরে, দেড় ঘণ্টাও হয় নাই নাস্তা করলি এখনই ক্ষুধা লাগে কিভাবে? গাড়িতে ওঠ, পনের বিশ মিনিট পর সবাই একসঙ্গে খাব।

গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা আমি। ফলমূলের ব্যাগ কাউকে দেইনি, আমার কাছেই রেখে দিয়েছি। ঠোঙা থেকে খুব সাবধানে একটা আপেল বের করলাম। ধোয়ার উপায় না থাকায় রুমাল দিয়ে মুছে ধীরে ধীরে খাচ্ছি। হঠাৎ পেছন থেকে ভাগ্নে আশিক, ওই মামা তুমি একলা কী খাও? পড়লাম বিপদে, সবকিছু নিয়ে গেল দুলাভাই। ড্রাইভার হাসছে। তিনিও এতক্ষণে বুঝেছেন বিয়েতে কোনো মত নেই আমার। অর্ধেক খাওয়া আপেলটা ভাগ্নেকে বাধ্য হয়ে দিলাম আর বললাম, সন্ধ্যায় কিন্তু ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

মেয়েদের বাসায় পৌঁছলাম। সবাই ফ্রেস হয়ে আসার পর আমাদের আপ্যায়ন শুরু হল। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে নিয়ে আসল, নাম অরিন। সবার অবস্থা দেখে বুঝলাম তারা আগে থেকেই মেয়েকে জানে। এখন শুধু আমাকে দেখানোর জন্য এই আয়োজন। কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না। রেজা কিছু প্রশ্ন করার আছে তোমার, দুলাভাইয়ের প্রশ্ন করার পর আমার হ্যা বা না বলার আগেই ভাগ্নে, আমার একটা প্রশ্ন আছে। ভাগ্নের কথায় সবাই হাসছে। মেয়েও মুচকি হাসছে আর আড়চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তবে সে যে নার্ভাস তা চোখে-মুখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মামার তো খিচুড়ি অনেক পছন্দ, আপনি কি খিচুড়ি রান্না পারেন? ভাগ্নের প্রশ্নে না হেসে পারলাম না। আমার নিজেরই মনে ছিল না বিষয়টা। সব খিচুড়িই রান্না পারে মেয়ে আমার, অরিনের মায়ের উত্তর। বুঝলাম মেয়ে শুধু রূপেই নয়, গুণেরও অধিকারী বটে। 

এদিকে প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই ভাগ্নে আবার, সূর্য পূর্ব দিকে উঠে এর ইংরেজি কি হবে? আসার সময় ভাগ্নেকে প্রশ্নটা করেছিলাম। কিন্তু সে এখানে পাল্টা আরেক জনকে প্রশ্ন করছে। এবার আব্বা, ভাই সবাই মুখ বন্ধ রাখতে বলল ভাগ্নেকে। তবে মনে মনে খুব খুশি আমি। হয়তো এটাই হবে মুক্তির নতুন পথ। অরিনকে আমাদের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়া হল। মেয়ে পক্ষের সঙ্গে কথা চলছে। হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখি ভাগ্নে আমাদের মাঝে নেই। মাঝখানে মাথা নিচু করে বসে আমি শুধু দুই পক্ষের কথা শুনছি আর ভাবছি, তাহলে কি শেষ পর্যন্ত অরিনের আঁচলেই বাঁধা পড়তে যাচ্ছি! দুই পরিবার আলোচনা করে দিনক্ষণও ঠিক করল।

অরিনদের বাড়ি থেকে আমরা সকলে বের হচ্ছি। ভাগ্নে আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকছে। গাড়ির দিকে এগিয়ে যাবার সময় চার কোনা ভাজের একটা রঙিন কাগজ দিল ভাগ্নে। কাগজটা কিসের জানতে চাইলাম। মামি তোমায় দিতে বলছে আর এ কথা কাউকে বলতেও না করেছে। ভাগ্নের কথা শুনে হাসছি। হঠাৎ দুলাভাই এগিয়ে এসে, এতদিনে তাহলে মেয়ে পছন্দ হল তোমার? মানে, দুলাভাইকে প্রশ্ন করলাম। সে হাসতে হাসতে, থাক আর মানে মানে করতে হবে না। চালিয়ে যাও।

সবাই গাড়িতে করে বাড়ির দিকে রওনা হল আর আমি বাসে উঠলাম ধানমন্ডির উদ্দেশে। পরদিন থেকে নিয়মিত অফিস করতে হবে। বেশ ক’দিন ছুটি কাটালাম। বাসায় ফেরার পর রাত ১০টার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন। প্রথমে রিসিভ করতে পারলাম না। আবারও ফোন আসল; রিসিভ করে জানতে চাইলাম কে? প্রশ্নটা কি অপরিচিত সবাইকে করেন, অপর প্রান্ত থেকে মিষ্টি কণ্ঠে। আপনি কে জানতে চাইলাম আর এর উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করছেন আমায়; আজব তো। আজ থেকে আপনি শুধু আমাকে জানবেন, চিনবেন; অন্য কাউকে না। ওহ আপনি। অরিনের সঙ্গে এভাবে দু’তিন সপ্তাহ কথা চলতে থাকল। এখন দু’জনেই আপনি থেকে তুমিতে এসেছি। কথায় কথায় গল্পের মতো বাস্তবেও রোমান্টিক হচ্ছি।

রাতে কথা হচ্ছে দু’জনের। এমন সময় হঠাৎ করেই অরিন, ছোট্ট একটা অনুরোধ করব রাখবে? এ ক’দিনে বেশ আবেগি হয়ে পড়েছে মেয়েটা। আচ্ছা অনুরোধটা কি সেটা তো আগে শুনি, সম্ভব হলে অবশ্যই রাখব। আগামীকাল চল দেখা করি আমরা, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াই। সেই বিয়ে ঠিক হওয়ার দিন আড়চোখে দেখা; তারপর থেকে তো শুধু ফোনে ফোনে...।

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বেলা ১১টার দিকে নবীনগর জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছলাম। সেদিন রোববার, সকলের অফিস খোলা থাকায় এমন সময় লোকজনও কম স্মৃতিসৌধে রাস্তায়। আমি ইনফর্মাল পোশাকে মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ফোন দিলাম অরিনকে, কোথায় তুমি? কিছুক্ষণ পর সে হাজির। হালকা হলুদ রঙের শাড়ি আর দিঘল কালো চুলের বেণীতে সাধারণ মেয়েটাকে অসাধারণ লাগছে। চোখ ফেরাতে কষ্ট হলেও চোখ ফেরালাম; শুধু মাত্র পথ চলার জন্য।

আজ তোমাকে এতো ভালো লাগছে কেন বলেই অরিনের বাম হাতে হাত রাখলাম। তুমিই ভালো জানো, অন্যদিকে তাকিয়ে অরিনের উত্তর। দু’জনেই লজ্জা অনুভব করছি। কথা বলতে বলতে আমরা স্মৃতিসৌধের একদম সামনের দিকে গেলাম। স্মৃতি স্তম্ভকে বিনয়ের সঙ্গে সালাম জানালাম। অরিনও আমার সঙ্গে সালাম জানালো। ফের বাইরের দিকে হাঁটছি। এখানে দেখা না করলে জানতামই না তুমি দেশকে কত ভালোবাসো। ওর এ কথার জবাব জানা না থাকার পরও বললাম, কোনো প্রেমিকের ভালোবাসাই লোক দেখানোর নয়। আর দেশকে সবসময় হৃদয় থেকে ভালোবাসতে হয়। শুধু দেশকে ভালোবাসলেই হবে মি. প্রেমিক, এবারও অন্যদিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলল অরিন।

আচ্ছা, তাই! তাহলে এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? সেও পাল্টা প্রশ্ন করলো, তুমিও তো লজ্জা পাচ্ছ। লজ্জা মেয়েদের ভূষণ, ছেলেদের না। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়ে হাত ধরে টান দিলাম অরিনকে; বুকের মধ্যে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে, ঠোঁটে লিপস্টিক কেন? আপাতত এটাই না হয় বাধা হয়ে থাক, এটুকু বলতেই ঘেমে গিয়েছে অরিন। জানি আমিও ঘামছি। কোনো হলুদে রাঙাতে চাই না নিজেকে, আমি আমাকে রাঙাবো শুধুই তোমার রঙে। আর ক্ষণে ক্ষণে হারাবো তোমার নগরে। ওরে বাবা, ভূগোল-রসায়ন নিয়ে দেখছি তোমার ইচ্ছের শেষ নেই! তাহলে দু’জনের এই প্রেম-ভালোবাসা গোপনে গোপনে আর কত দিন, এর বহিঃপ্রকাশ হবে কবে? অরিন জরিয়ে ধরে আছে আমায়। শোন, আরও শক্ত করে ধরতে হবে। আর এই প্রেম-ভালোবাসা আজীবনই গোপন থাক। শুধু বহিঃপ্রকাশ হোক দু’জনার উষ্ণ আকাঙ্ক্ষায়; স্বপ্নের ন্যায়।

লেখক: শাহজাদা সেলিম রেজা, সাংবাদিক, ssreza205@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন