‘সাহিত্যের বিশেষ পরিবর্তন ব্যক্তি প্রতিভার ওপর নির্ভরশীল’
jugantor
‘সাহিত্যের বিশেষ পরিবর্তন ব্যক্তি প্রতিভার ওপর নির্ভরশীল’

  যুগান্তর ডেস্ক  

১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৩:০২  |  অনলাইন সংস্করণ

জাহিদুল হক ১৯৬০-এর দশকের এবং আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি।

জন্ম আসামের বদরপুর রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসক পিতার কর্মস্থলে, ১৯৪৯ সালের ১১ আগস্ট তারিখে। মূল বাড়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার গুণবতী ইউনিয়নের আকদিয়া গ্রাম।

তিনি গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও গীতিকারদেরও অন্যতম। সিনিয়র এডিটর ও ব্রডকাস্টার হিসেবে বিখ্যাত জার্মান বেতার রেডিও ‘ডয়েচে ভেলে’তে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

উপ-মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশ বেতারে। সম্পাদনা করেছেন ‘বেতার বাংলা’ পত্রিকা। ছিলেন বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সম্মানিত সদস্য।

কবিতা লেখার জন্য ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন। লিরিক কবিতা লেখার জন্য পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের বিশেষ সম্মাননা।

ভ্রমণ করেছেন এশিয়া ও ইওরোপের প্রধান নগরীগুলো। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি: এ উৎসবে আমি একা, ব্যালকুনিগুলো, প্রেমকে করেছি বাড়ি, তোমার না আসার বার্ষিকী, আমার ভালোবাসার অটম প্রভৃতি।

যুগান্তর: দীর্ঘসময় ধরে বাংলা কবিতা চর্চা করে যাচ্ছে। গল্প প্রবন্ধেও আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছেন।

এ দীর্ঘ সাহিত্যযাপনের অভিজ্ঞতায় সামনের দিনগুলোতে সাহিত্যের বিশেষ কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন?

জাহিদুল হক: যুগান্তর আমার একাধিক উপন্যস, ছোটগল্প এবং অসংখ্য কবিতা ছেপেছে। যুগান্তরকে এ জন্য ধন্যবাদ। সাহিত্যের বিশেষ পরিবর্তন ব্যক্তি প্রতিভার ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানের লেখালেখিতে আমি তেমন কাউকেই খুব পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না, যে বা যারা আমাদের সাহিত্যে পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে করা যেতে পারে।

আমার কাছে সাম্প্রতিক অনেক লেখককে মেধাহীন লাগে। তবে কেউ কেউ মেধা নিয়ে উঁকি দিচ্ছে না তাও নয়। এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ বিষয়ে বলার সুযোগ নেই। কিন্তু নিশ্চয়ই বলব এক সময়। (সহযাত্রী বন্ধুরা, রাগ কোরো না!)

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনা পরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

জাহিদুল হক: আধুনিক সভ্যতাকে আমার কাছে মাঝে মধ্যে অসুস্থ বলে মনে হয়। পল গ্যগা এই সভ্যতাকে বহু বছর আগে অসুস্থ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাহিটি দ্বীপে পালিয়ে গিয়েছিলেন আদি প্রান্তিক মানুষদের কাছে।

আমি নিজেও আজারবাইজান কিংবা উজবেকিস্তানের কোনো প্রত্যন্ত আদিম অঞ্চলে পালিয়ে যেতে চাই। বর্তমান সভ্যতা মানুষের মধুর সম্পর্কগুলোকে ভেঙে দিয়েছে।

করোনা পরবর্তীকাল এ ভাঙনকে তীব্র করে তুলতে পারে। অন্যদিকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে পর্যালোচনা করলে মানুষ ও মানব সভ্যতার আয়ু যে আর দীর্ঘ নয় তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ধর্মগ্রন্থের ইঙ্গিত বাদ দিয়ে কমনসেন্স ইউস করে সাদা চোখেও আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি। আমি পালিয়ে গেলে আর কবিতা লিখব না, একটি মুদি দোকান দিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব।

যুগান্তর: আপনার লেখালেখির শুরু থেকে সাহিত্যে বিশেষ পরিবর্তনের সময়টি বলেন, কী ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়েছে?

জাহিদুল হক: আমাদের আধুনিক সাহিত্যে এখনও পর্যন্ত আমার বিবেচনায় তিনটি স্তরকে আমি শনাক্ত করতে পারি। প্রথম স্তরটি হল তিরিশের কবিতা।

তিরিশের কবিতা মানে শুধু জীবনানন্দ দাশ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা। দ্বিতীয় স্তরটি হল মিলিতভাবে চল্লিশ ও পঞ্চাশের কবিতা।

এ স্তরে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন ফররুখ আহমেদ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার ও শঙ্কঘোষসহ আরও কয়েকজন।

সেই কয়েকজনের নাম পরে এক সময়ে বলে দেব। তৃতীয় স্তরটি হল ষাটের দশক। আমি সাহিত্যের বিষয়ে যখন কথা বলি তখন সততার সঙ্গেই বলি। আমি যদি কিছু নাম এখন উল্লেখও করি তার বাইরেও কবি থেকে যাবে। কবিরা অগ্নিগিরির মতো প্রবাহিত হতে থাকে।

বিস্ফোরণ ঘটলেই আমরা নুতন যুগের দেখা পাই। কবিতা একটি ‘হারামজাদা’ ধরনের ভাষাশিল্প। এ শিল্পকে ধরে ‘কবি’ অভিধাটি অর্জন করা খুবই কঠিন। বাংলা সাহিত্যের বড় একাধিক কবির কবিতা ইতোমধ্যেই কালের বাতাসের ঝাপটায় কাঁপা শুরু করেছে!

ষাটের দশকের পরও সত্তর, আশি, নব্বই দশক পর্যন্ত অনেক কবি উল্লেখযোগ্য হয়েছে এবং হচ্ছে। আমার কপালে যাই থাক তাদের নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখব বলে প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। শিগগির সেটা ‘কপট পাঠক, দোসর, যমজ ভাই’-দের কাছে পৌঁছে যাবে।

বাংলাদেশের কবিতার ধারা খুব জীবন্ত আর এ কারণেই ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই পর্যন্ত কবিরা ঘাই মারছে কবিতার দীঘিতে।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার বলে মনে করেন?

জাহিদুল হক: বাংলাভাষায় বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রচুর বই রয়েছে বিশেষ করে কবিতার বই- যেগুলো মেধাবী অনুবাদকরা অনুবাদ করলে বিশ্বসাহিত্যে আমাদের একটা গৌরবদীপ্ত আসন তৈরি হলেও হতে পারে।

বাংলা একাডেমি শুধু অভিধান, জীবনী, ক্লিশে প্রবন্ধ এবং ‘বইমেলা’ নিয়েই কেন ব্যস্ত থাকে বুঝি না। বইমেলা তো বাংলা একাডেমির কাজ নয়।

আমাদের সৃষ্টিশীল গল্প, কবিতা, এবং উপন্যাসগুলো নির্বাচিত করে বিভিন্ন ভাষার শক্তিমান অনুবাদকদের কমিশন করিয়ে এনে গত পঞ্চাশ ধরে যদি সিরিয়াসলি অনুবাদের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারতাম কত গুরুত্বপূর্ণ বই আমাদের রয়েছে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার মতো।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

জাহিদুল হক: ভালো মানের লেখক এবং ভালো মানের পাঠক- উভয়েরই অভাব।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

জাহিদুল হক: কোনো প্রকৃত সৃষ্টিশীল লেখাই উপযোগ অর্থাৎ ইউটিলিটির সঙ্গে যুক্ত নয়।

নয় বলেই সেগুলো সমাজের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেবো খোপায় তারার ফুল’ সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে আমি বুঝি না।

তবে এসব লেখা মানুষের আত্মাকে রসময় করে, শুদ্ধ করে। সমাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে তেমন লেখকও আছে, মজা করে তাদের নাম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি, যেমন- ‘Asahi Shimbun’, ‘The Sunday Times’ এবং ‘The Wall Street Journal !!

এই তিনটি পত্রিকাকে আমি তিনজন লেখক বলে ধরলে কিংবা এদের লেখকবৃন্দ যাদের আমরা সাংবাদিক বলে জানি এবং তাদের লেখাকে গ্রহণ করি সেটাই সমাজের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই এমন তিনজন লেখকের নাম।

জাহিদুল হক: নিমাই ভট্টাচার্য, কাজী আনোয়ার হোসেন ও সুচিত্রা ভট্টাচার্য।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটা হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন

জাহিদুল হক: পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ লেখকই, বিশেষ করে সমকালে, কম আলোচিত হয়ে থাকে কিছু ভাগ্যবান লেখককে বাদ দিলে।

তবে যারা phenomenon হয়ে যায় যেমন- শেক্সপিয়র, দান্তে কিংবা রুমি- তাদের কথা আলাদা।

যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা কোনটি?

জাহিদুল হক: রুশ ভাষায় নির্মিত ‘হ্যামলেট’ চলচ্চিত্র।

যুগান্তর: জীবিত একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের নাম বলুন।

জাহিদুল হক: রাজনীতিতে একটু আধটু আদর্শ যে থাকে না তা নয়। তবে সামগ্রিকভাবে রাজনীতি কোনো আদর্শের বিষয় নয় বিধায় কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষে আদর্শবান (ব্যক্তিগতভাবে আদর্শবান হলেও) হওয়াটা সম্ভব কিনা এই নিয়ে আপনারা চিন্তাভাবনা করেন। আমি রাজনীতি একদম পছন্দ করি না।

যুগান্তর: দুই বাংলার সাহিত্যে তুলনা করলে বর্তমানে আমরা কোন বিভাগে এগিয়ে কোন বিভাগে পিছিয়ে?

জাহিদুল হক: ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ বাংলা বলতে আপনারা কি বোঝাচ্ছেন সেটাই আমার বোধগম্য নয়। আমি এক বাংলায় বিশ্বাসী, সেটা বাংলাদেশ। একটি রাষ্ট্র।

অর্থাৎ ‘এপার বাংলা ওপার ভারত’। হ্যাঁ, সে দেশে আমাদের কিছু বাংলাভাষাভাষী ভাইবোন থাকেন।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ এবং একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলা সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জাহিদুল হক: আগ্রজদের মধ্যে প্যারিসের Charles Baudelaire। আঁন্দ্রে জিদ বলেছেন ‘তুমি কেমন লেখ সেটি অগ্রজদের কাছে জিজ্ঞেস না করে অনুজদের কাছে জিজ্ঞেস করো’।

আমি এই সূত্রটি বিশ্বাস করি। অগ্রজ হিসেবে অনুজদের মূল্যায়ন না করে আমি তাদের মূল্যায়নের আশায় বসে থাকি। তবে অনুজ লেখক হিসেবে Scotland-এর Carol Ann Duffy'র নাম উল্লেখ করতে পারি।

যুগান্তর: এমন দুটো বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

জাহিদুল হক: Aristotle-এর 'Poetics' এবং জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনভি’।

যুগান্তর: লেখক না হলে কী হতে চাইতেন।
জাহিদুল হক: লেখক না হলেও আমি লেখকই হতে চাইতাম।

যুগান্তর: এক সময় বেশকিছু জনপ্রিয় গানের কথা আপনি লিখেছেন। বর্তমানে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আপনি দেখেন?

জাহিদুল হক: বর্তমানে আমাদের গানের হাল বেহাল হয়ে গেছে। আমি কিছু গান লিখেছিলাম বাংলা গানকে কাজী নজরুল ইসলামের পরে আরও একবার কবিতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য। নজরুলের সঙ্গে আমার তুলনাই হতে পারে না- তিনি মোৎসার্ট-এর সমান কম্পোজার- এত ক্ষুদ্র আমি, তবুও আমার দু-চারটে গান ক্ষদ্রেরই একটি প্রয়াস মাত্র।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়, সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় কী?

জাহিদুল হক: আমার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় একটি সে রকমের কবিতা লিখতে পারা, যে কবিতাটি আমাকেই মুগ্ধ করে। আমার সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় আমি একটি অসুস্থ সভ্যতার মধ্যে বসবাস করছি।

‘সাহিত্যের বিশেষ পরিবর্তন ব্যক্তি প্রতিভার ওপর নির্ভরশীল’

 যুগান্তর ডেস্ক 
১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৩ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

জাহিদুল হক ১৯৬০-এর দশকের এবং আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। 

জন্ম আসামের বদরপুর রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসক পিতার কর্মস্থলে, ১৯৪৯ সালের ১১ আগস্ট তারিখে। মূল বাড়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার গুণবতী ইউনিয়নের আকদিয়া গ্রাম।

তিনি গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও গীতিকারদেরও অন্যতম। সিনিয়র এডিটর ও ব্রডকাস্টার হিসেবে বিখ্যাত জার্মান বেতার রেডিও ‘ডয়েচে ভেলে’তে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। 

উপ-মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশ বেতারে। সম্পাদনা করেছেন ‘বেতার বাংলা’ পত্রিকা। ছিলেন বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের সম্মানিত সদস্য। 

কবিতা লেখার জন্য ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন। লিরিক কবিতা লেখার জন্য পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের বিশেষ সম্মাননা। 

ভ্রমণ করেছেন এশিয়া ও ইওরোপের প্রধান নগরীগুলো। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি: এ উৎসবে আমি একা, ব্যালকুনিগুলো, প্রেমকে করেছি বাড়ি, তোমার না আসার বার্ষিকী, আমার ভালোবাসার অটম প্রভৃতি।

যুগান্তর: দীর্ঘসময় ধরে বাংলা কবিতা চর্চা করে যাচ্ছে। গল্প প্রবন্ধেও আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছেন। 

এ দীর্ঘ সাহিত্যযাপনের অভিজ্ঞতায় সামনের দিনগুলোতে সাহিত্যের বিশেষ কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন? 

জাহিদুল হক: যুগান্তর আমার একাধিক উপন্যস, ছোটগল্প এবং অসংখ্য কবিতা ছেপেছে। যুগান্তরকে এ জন্য ধন্যবাদ। সাহিত্যের বিশেষ পরিবর্তন ব্যক্তি প্রতিভার ওপর নির্ভরশীল। 
বর্তমানের লেখালেখিতে আমি তেমন কাউকেই খুব পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না, যে বা যারা আমাদের সাহিত্যে পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে করা যেতে পারে। 

আমার কাছে সাম্প্রতিক অনেক লেখককে মেধাহীন লাগে। তবে কেউ কেউ মেধা নিয়ে উঁকি দিচ্ছে না তাও নয়। এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ বিষয়ে বলার সুযোগ নেই। কিন্তু নিশ্চয়ই বলব এক সময়। (সহযাত্রী বন্ধুরা, রাগ কোরো না!)

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনা পরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

জাহিদুল হক: আধুনিক সভ্যতাকে আমার কাছে মাঝে মধ্যে অসুস্থ বলে মনে হয়। পল গ্যগা এই সভ্যতাকে বহু বছর আগে অসুস্থ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাহিটি দ্বীপে পালিয়ে গিয়েছিলেন আদি প্রান্তিক মানুষদের কাছে। 

আমি নিজেও আজারবাইজান কিংবা উজবেকিস্তানের কোনো প্রত্যন্ত আদিম অঞ্চলে পালিয়ে যেতে চাই। বর্তমান সভ্যতা মানুষের মধুর সম্পর্কগুলোকে ভেঙে দিয়েছে। 

করোনা পরবর্তীকাল এ ভাঙনকে তীব্র করে তুলতে পারে। অন্যদিকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে পর্যালোচনা করলে মানুষ ও মানব সভ্যতার আয়ু যে আর দীর্ঘ নয় তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

ধর্মগ্রন্থের ইঙ্গিত বাদ দিয়ে কমনসেন্স ইউস করে সাদা চোখেও আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি। আমি পালিয়ে গেলে আর কবিতা লিখব না, একটি মুদি দোকান দিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব।
 
যুগান্তর: আপনার লেখালেখির শুরু থেকে সাহিত্যে বিশেষ পরিবর্তনের সময়টি বলেন, কী ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়েছে?

জাহিদুল হক: আমাদের আধুনিক সাহিত্যে এখনও পর্যন্ত আমার বিবেচনায় তিনটি স্তরকে আমি শনাক্ত করতে পারি। প্রথম স্তরটি হল তিরিশের কবিতা। 

তিরিশের কবিতা মানে শুধু জীবনানন্দ দাশ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা। দ্বিতীয় স্তরটি হল মিলিতভাবে চল্লিশ ও পঞ্চাশের কবিতা। 

এ স্তরে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন ফররুখ আহমেদ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার ও শঙ্কঘোষসহ আরও কয়েকজন। 

সেই কয়েকজনের নাম পরে এক সময়ে বলে দেব। তৃতীয় স্তরটি হল ষাটের দশক। আমি সাহিত্যের বিষয়ে যখন কথা বলি তখন সততার সঙ্গেই বলি। আমি যদি কিছু নাম এখন উল্লেখও করি তার বাইরেও কবি থেকে যাবে। কবিরা অগ্নিগিরির মতো প্রবাহিত হতে থাকে। 

বিস্ফোরণ ঘটলেই আমরা নুতন যুগের দেখা পাই। কবিতা একটি ‘হারামজাদা’ ধরনের ভাষাশিল্প। এ শিল্পকে ধরে ‘কবি’ অভিধাটি অর্জন করা খুবই কঠিন। বাংলা সাহিত্যের বড় একাধিক কবির কবিতা ইতোমধ্যেই কালের বাতাসের ঝাপটায় কাঁপা শুরু করেছে! 

ষাটের দশকের পরও সত্তর, আশি, নব্বই দশক পর্যন্ত অনেক কবি উল্লেখযোগ্য হয়েছে এবং হচ্ছে। আমার কপালে যাই থাক তাদের নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখব বলে প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। শিগগির সেটা ‘কপট পাঠক, দোসর, যমজ ভাই’-দের কাছে পৌঁছে যাবে। 

বাংলাদেশের কবিতার ধারা খুব জীবন্ত আর এ কারণেই ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই পর্যন্ত কবিরা ঘাই মারছে কবিতার দীঘিতে। 

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার বলে মনে করেন?

জাহিদুল হক: বাংলাভাষায় বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রচুর বই রয়েছে বিশেষ করে কবিতার বই- যেগুলো মেধাবী অনুবাদকরা অনুবাদ করলে বিশ্বসাহিত্যে আমাদের একটা গৌরবদীপ্ত আসন তৈরি হলেও হতে পারে। 

বাংলা একাডেমি শুধু অভিধান, জীবনী, ক্লিশে প্রবন্ধ এবং ‘বইমেলা’ নিয়েই কেন ব্যস্ত থাকে বুঝি না। বইমেলা তো বাংলা একাডেমির কাজ নয়। 

আমাদের সৃষ্টিশীল গল্প, কবিতা, এবং উপন্যাসগুলো নির্বাচিত করে বিভিন্ন ভাষার শক্তিমান অনুবাদকদের কমিশন করিয়ে এনে গত পঞ্চাশ ধরে যদি সিরিয়াসলি অনুবাদের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারতাম কত গুরুত্বপূর্ণ বই আমাদের রয়েছে বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার মতো।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব? 

জাহিদুল হক: ভালো মানের লেখক এবং ভালো মানের পাঠক- উভয়েরই অভাব।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম। 

জাহিদুল হক: কোনো প্রকৃত সৃষ্টিশীল লেখাই উপযোগ অর্থাৎ ইউটিলিটির সঙ্গে যুক্ত নয়। 

নয় বলেই সেগুলো সমাজের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেবো খোপায় তারার ফুল’ সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে আমি বুঝি না। 

তবে এসব লেখা মানুষের আত্মাকে রসময় করে, শুদ্ধ করে। সমাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে তেমন লেখকও আছে, মজা করে তাদের নাম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি, যেমন- ‘Asahi Shimbun’, ‘The Sunday Times’ এবং ‘The Wall Street Journal !! 

এই তিনটি পত্রিকাকে আমি তিনজন লেখক বলে ধরলে কিংবা এদের লেখকবৃন্দ যাদের আমরা সাংবাদিক বলে জানি এবং তাদের লেখাকে গ্রহণ করি সেটাই সমাজের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই এমন তিনজন লেখকের নাম।

জাহিদুল হক: নিমাই ভট্টাচার্য, কাজী আনোয়ার হোসেন ও সুচিত্রা ভট্টাচার্য। 

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটা হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন

জাহিদুল হক: পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ লেখকই, বিশেষ করে সমকালে, কম আলোচিত হয়ে থাকে কিছু ভাগ্যবান লেখককে বাদ দিলে। 

তবে যারা phenomenon হয়ে যায় যেমন- শেক্সপিয়র, দান্তে কিংবা রুমি- তাদের কথা আলাদা।
 
যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা কোনটি?

জাহিদুল হক: রুশ ভাষায় নির্মিত ‘হ্যামলেট’ চলচ্চিত্র।

যুগান্তর: জীবিত একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের নাম বলুন।

জাহিদুল হক: রাজনীতিতে একটু আধটু আদর্শ যে থাকে না তা নয়। তবে সামগ্রিকভাবে রাজনীতি কোনো আদর্শের বিষয় নয় বিধায় কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষে আদর্শবান (ব্যক্তিগতভাবে আদর্শবান হলেও) হওয়াটা সম্ভব কিনা এই নিয়ে আপনারা চিন্তাভাবনা করেন। আমি রাজনীতি একদম পছন্দ করি না।

যুগান্তর: দুই বাংলার সাহিত্যে তুলনা করলে বর্তমানে আমরা কোন বিভাগে এগিয়ে কোন বিভাগে পিছিয়ে? 

জাহিদুল হক: ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ বাংলা বলতে আপনারা কি বোঝাচ্ছেন সেটাই আমার বোধগম্য নয়। আমি এক বাংলায় বিশ্বাসী, সেটা বাংলাদেশ। একটি রাষ্ট্র। 

অর্থাৎ ‘এপার বাংলা ওপার ভারত’। হ্যাঁ, সে দেশে আমাদের কিছু বাংলাভাষাভাষী ভাইবোন থাকেন।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ এবং একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলা সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জাহিদুল হক: আগ্রজদের মধ্যে প্যারিসের Charles Baudelaire। আঁন্দ্রে জিদ বলেছেন ‘তুমি কেমন লেখ সেটি অগ্রজদের কাছে জিজ্ঞেস না করে অনুজদের কাছে জিজ্ঞেস করো’। 

আমি এই সূত্রটি বিশ্বাস করি। অগ্রজ হিসেবে অনুজদের মূল্যায়ন না করে আমি তাদের মূল্যায়নের আশায় বসে থাকি। তবে অনুজ লেখক হিসেবে Scotland-এর Carol Ann Duffy'র নাম উল্লেখ করতে পারি।

যুগান্তর: এমন দুটো বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

জাহিদুল হক: Aristotle-এর 'Poetics' এবং জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনভি’। 

যুগান্তর: লেখক না হলে কী হতে চাইতেন।
জাহিদুল হক: লেখক না হলেও আমি লেখকই হতে চাইতাম।

যুগান্তর: এক সময় বেশকিছু জনপ্রিয় গানের কথা আপনি লিখেছেন। বর্তমানে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আপনি দেখেন?

জাহিদুল হক: বর্তমানে আমাদের গানের হাল বেহাল হয়ে গেছে। আমি কিছু গান লিখেছিলাম বাংলা গানকে কাজী নজরুল ইসলামের পরে আরও একবার কবিতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য। নজরুলের সঙ্গে আমার তুলনাই হতে পারে না- তিনি মোৎসার্ট-এর সমান কম্পোজার- এত ক্ষুদ্র আমি, তবুও আমার দু-চারটে গান ক্ষদ্রেরই একটি প্রয়াস মাত্র।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়, সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় কী?

জাহিদুল হক: আমার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় একটি সে রকমের কবিতা লিখতে পারা, যে কবিতাটি আমাকেই মুগ্ধ করে। আমার সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় আমি একটি অসুস্থ সভ্যতার মধ্যে বসবাস করছি।