‘এখন মানুষ আর মানুষের মধ্যে নেই’
jugantor
‘এখন মানুষ আর মানুষের মধ্যে নেই’

  ইকবাল হাসান  

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২৩:৪১:১৬  |  অনলাইন সংস্করণ

ইকবাল হাসান, কবি ও গল্পকার। সত্তরের জনপ্রিয় উল্লেখযোগ্য কবিদের অন্যতম। জন্ম, ৪ ডিসেম্বর, ১৯৫২, বরিশালে, একটি বিদেশি মিশনারি হাসপাতালে। অর্থনীতিতে স্নাতক।

বসবাস: জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমানে কানাডার টরন্টো। পেশা : দেশে সাংবাদিকতা এবং বিদেশে কখনও ব্যবসা, কখনও স্রেফ শ্রমজীবী।

প্রকাশিত গ্রন্থ : অসামান্য ব্যবধান [কবিতা ১৯৮৬, আগামী], মানুষের খাদ্য তালিকায় [কবিতা ১৯৮৬, বইমন্চ], কপাটবিহীন ঘর [গল্প ১৯৯৪, আগামী ], জ্যোৎস্নার চিত্রকলা [কবিতা ১৯৯৭, অনাদি], দূর কোনো নক্ষত্রের দিকে [কবিতা ২০০০, ব্যতিক্রম], মৃত ইঁদুর ও মানুষের গল্প [গল্প ২০০০, আগামী], দূরের মানুষ কাছের মানুষ [ব্যক্তিগত নিবন্ধ/এলবাম ২০০০, ব্যতিক্রম], আশ্চর্যকুহক [উপন্যাস ২০০২, আগামী], শহীদ কাদরী কবি ও কবিতা [সম্পাদনা ২০০৩, আগামী], জলরঙে মৃত্যুদৃশ্য [কবিতা ২০০৩, আগামী], ছায়ামুখ [উপন্যাস ২০০৪, অন্যপ্রকাশ], কার্তিকের শেষ জ্যোৎস্নায় [গল্প ২০০৪, পারিজাত], দীর্ঘশ্বাসের পাণ্ডুলিপি [নিবন্ধ ২০০৪, পারিজাত], প্রেমের কবিতা [কবিতা ২০০৪, অন্যপ্রকাশ], ইকবাল হাসানের বারোটি গল্প [গল্প ২০০৫, অন্যপ্রকাশ], নির্বাচিত ১০০ কবিতা [কবিতা ২০০৯, অন্যপ্রকাশ], যুগলবন্দি [কবিতা ও সৈয়দ ইকবালের চিত্রকর্ম ২০১০, রয়েল], আকাশপরী [কবিতা ২০১০, রয়েল], চোখ ভেসে যায় জলে [প্রবন্ধ/নিবন্ধ ২০১০,অনন্যা], সুখলালের স্বপ্ন ও তৃতীয় চরিত্র [গল্প ২০১০, অনন্যা]। আর্কিটেক্ট [উপন্যাস, রয়েল, ২০১২] গল্পসমগ্র [গল্প ২০১২, রয়েল], পরী, হুমায়ূন আহমেদ ও ঝরা পালকের গল্প [মুক্তগদ্য ২০১২, রয়েল], আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ [সময়, ২০১৬] একদা চৈত্রের রাতে [রয়েল, ২০১৬], প্রেম-বিরহের অনুকাব্য [পরিবার, ২০১৬], নির্বাচিত গল্প [গল্প, ধ্রুবপদ, ২০১৬] ছায়ামুখ ও আশ্চর্যকুহক [যুগল উপন্যাস, ২০১৬, অনিন্দ্য], কিছু কথা কথার ভেতরে [পরিবার, ২০১৬], শহীদ কাদরী স্মারকগ্রন্থ [সম্পাদনা, বাংলা একাডেমি, ২০১৮], রিমান্ড, তেলাপোকা ও আকাশপরী [বৈভব, ২০১৯] ইত্যাদি। পুরস্কার : বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার।

যুগান্তর: দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন, কবিতা এবং গল্প উভয় বিভাগেই সমানতালে কাজ করে চলেছেন। এ দীর্ঘ সাহিত্যযাপনের অভিজ্ঞতায় গত বিশ বছরের আলোকে সাহিত্যের বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

ইকবাল হাসান: কিছু কিছু পরিবর্তন তো এসেছে। সময় তো আর থেমে থাকছে না। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে আমাদের সমাজে এসেছে বিশদ পরিবর্তন। এর ছায়া পড়েছে বোধ ও উপলব্ধিতে। ভাঙা গড়ার একটা খেলা চলছে ভেতরে ভেতরে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের গ্রামগুলো আর গ্রাম থাকছে না। সেখানে দখল নিচ্ছে কৃতকৌশলের কূটনীতি। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে কংক্রিটের জঞ্জাল। তবে এই যে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমরা গত বিশ বছরে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি, শনাক্তযোগ্য একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে- এটা কম কথা নয়। এ ছাড়া এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের। আমাদের গল্প, কবিতা, উপন্যাসে এর প্রতিফলন দৃশ্যমান। শিল্প-সাহিত্য হয়ে উঠছে এ পরিবর্তনের প্রতিচিত্র।

যুগান্তর: স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে কোন ধরনের কাব্যান্দোলন গড়ে ওঠেনি। এখানকার কবিতার এ রকম ঝিমিয়ে পড়ার বিশেষ কী কী কারণ আপনি উল্লেখ করবেন?

ইকবাল হাসান: ‘ঝিমিয়ে পড়েছে’ কথাটির সঙ্গে, দুঃখিত, একমত হতে পারলাম না। আমাদের তরুণ কবিরা তো দারুণ দেখাচ্ছে। সত্যি বলতে কী, আমি তরুণদের কবিতা পড়ে প্রাণিত হই, আলোড়িত হই।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের সাহিত্যে কোনো ধরনের কাব্য-আন্দেলন গড়ে ওঠেনি- এ বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। কবিতার ধারাই তো পাল্টে গেছে। এটাকেই আমি আন্দোলন বলি। নতুন নতুন আঙ্গিক তৈরি হচ্ছে, ব্যাপক ভাঙচুর হচ্ছে, উপমা উৎপ্রেক্ষার আর মিথের বিস্তারের পাশাপাশি মুখ্য হয়ে দার্শনিক প্রত্যয় ও প্রতীতি।
সত্তর আশি নব্বই ও শূন্য দশকে লেখা কবিতার সঙ্গে প্রাক-স্বাধীনতা সময়ের কবিতার তুলনামূলক আলোচনা আমার এ কথার প্রমাণ দেবে।

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনা পরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

ইকবাল হাসান: হ্যাঁ, অবশ্যই। কারও কারও লেখায় তো ইতোমধ্যে করোনার ‘ছোবল-চিত্র’ বিশদভাবে চিত্রিত হয়েছে। করোনা যেন আমাদের এক অপার্থিব পরাবাস্তব জীবন উপহার দিয়েছে। সারা বিশ্বকে যেন আলিঙ্গন করেছে করোনার বিষাক্ত মায়াজাল।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

ইকবাল হাসান: সত্যি বলতে কী, এখন মানুষ আর মানুষের মধ্যে নেই। লোভ-লালসা আর মানুষের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অস্থির হয়ে উঠেছে সমাজ-সংসার। ব্যাপক অবনতি হয়েছে মননশীলতার। দুর্নীতি এবং বিচারহীনতার কারণে দেশ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখন দুর্নীতি করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর আকার নিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে গোটা দেশকে। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় আমার জানা নেই।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

ইকবাল হাসান: আমাদের সাহিত্যে অসংখ্য গ্রন্থ আছে যা বিদেশি ভাষায় অনুবাদের দাবি রাখে। বাংলা একাডেমি অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও কিছু অনুবাদ একাডেমি করেছে। তবে আমি দেশে অনুবাদ একাডেমি নামে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছি।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

ইকবাল হাসান: দুটোই।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

ইকবাল হাসান: তিনজন কেন? আমি গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ ভ্রমণ মিলিয়ে অন্তত ত্রিশজন জীবিত লেখকের নাম বলতে পারি যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং ফেলবে।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই এমন তিনজন লেখকের নাম।

ইকবাল হাসান: খুব বেশি নয়, দশ পনেরোজন আছেন যারা যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে আলোচিত হতে ভালোবাসেন। আলোচনায় থাকার জন্য যা যা করা দরকার করেন। তবে এসবে কী এসে যায়! ধীমান পাঠকরা ঠিক বুঝতে পারে।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটা হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

ইকবাল হাসান: হ্যাঁ। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা শুধু লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসেন। তারা অনেকটাই নভৃতচারী। অনেকেই আছেন যারা আলোচনায় থাকা বা না-থাকাকে তেমন গুরুত্ব দেন না। যারা গুরুত্বপূর্ণ লেখক তারা লেখালেখির তাৎক্ষণিক আলোচনার চেয়ে বরং কালের বিচারের হাতে ছেড়ে দিতে ভালোবাসেন।

যুগান্তর: অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

ইকবাল হাসান: আই এগ্রি। তবে শুধু আমাদের দেশের কথা বলছেন কেন, পৃথিবীর সব দেশেই মননশীল সাহিত্যচর্চা কম হয়ে থাকে।

যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা।

ইকবাল হাসান: পথের পাঁচালী, তিতাস একটি নদীর নাম।

যুগান্তর: জীবিত একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের নাম বলুন।

ইকবাল হাসান: মতিয়া চৌধুরী।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ এবং একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলা সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইকবাল হাসান: যারা প্রচারবিমুখ, নিবেদিত প্রাণ, অগ্রজ অনুজ তারা সবাই আমাদের সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দু’জনের নাম বলে অন্যদের উপেক্ষা করা অনুচিত।

যুগান্তর: এমন দুটো বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

ইকবাল হাসান: আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ এবং জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’।

যুগান্তর: লেখক না হলে কী হতে চাইতেন।

ইকবাল হাসান: চিত্রকর।

যুগান্তর: গানে আছে ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’- আপনার জীবনে কয়বার এসেছিল?

ইকবাল হাসান: আমাকে কে আবার ভালোবাসতে যাবে? আমিই ছ’সাতজনকে ভালোবেসেছিলাম বিভিন্ন দশকে, তারাও কিছুদিন হয়তো ভালোবেসেছিল আমাকে। তারপর যা হওয়ার তাই হল, অপেক্ষাকৃত উন্নত ভালোবাসা পেয়ে তারা একে একে চলে গেল। আসলে তারা চলে যাওয়ার জন্যই এসেছিল, তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়, সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়।

ইকবাল হাসান: সবচেয়ে ভালো লাগে গান। সবচেয়ে খারাপ লাগে টক শোতে অর্থহীন রাজনৈতিক বিতর্ক।

‘এখন মানুষ আর মানুষের মধ্যে নেই’

 ইকবাল হাসান 
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ইকবাল হাসান, কবি ও গল্পকার। সত্তরের জনপ্রিয় উল্লেখযোগ্য কবিদের অন্যতম। জন্ম, ৪ ডিসেম্বর, ১৯৫২, বরিশালে, একটি বিদেশি মিশনারি হাসপাতালে। অর্থনীতিতে স্নাতক।

বসবাস: জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমানে কানাডার টরন্টো। পেশা : দেশে সাংবাদিকতা এবং বিদেশে কখনও ব্যবসা, কখনও স্রেফ শ্রমজীবী।

প্রকাশিত গ্রন্থ : অসামান্য ব্যবধান [কবিতা ১৯৮৬, আগামী], মানুষের খাদ্য তালিকায় [কবিতা ১৯৮৬, বইমন্চ], কপাটবিহীন ঘর [গল্প ১৯৯৪, আগামী ], জ্যোৎস্নার চিত্রকলা [কবিতা ১৯৯৭, অনাদি], দূর কোনো নক্ষত্রের দিকে [কবিতা ২০০০, ব্যতিক্রম], মৃত ইঁদুর ও মানুষের গল্প [গল্প ২০০০, আগামী], দূরের মানুষ কাছের মানুষ [ব্যক্তিগত নিবন্ধ/এলবাম ২০০০, ব্যতিক্রম], আশ্চর্যকুহক [উপন্যাস ২০০২, আগামী], শহীদ কাদরী কবি ও কবিতা [সম্পাদনা ২০০৩, আগামী], জলরঙে মৃত্যুদৃশ্য [কবিতা ২০০৩, আগামী], ছায়ামুখ [উপন্যাস ২০০৪, অন্যপ্রকাশ], কার্তিকের শেষ জ্যোৎস্নায় [গল্প ২০০৪, পারিজাত], দীর্ঘশ্বাসের পাণ্ডুলিপি [নিবন্ধ ২০০৪, পারিজাত], প্রেমের কবিতা [কবিতা ২০০৪, অন্যপ্রকাশ], ইকবাল হাসানের বারোটি গল্প [গল্প ২০০৫, অন্যপ্রকাশ], নির্বাচিত ১০০ কবিতা [কবিতা ২০০৯, অন্যপ্রকাশ], যুগলবন্দি [কবিতা ও সৈয়দ ইকবালের চিত্রকর্ম ২০১০, রয়েল], আকাশপরী [কবিতা ২০১০, রয়েল], চোখ ভেসে যায় জলে [প্রবন্ধ/নিবন্ধ ২০১০,অনন্যা], সুখলালের স্বপ্ন ও তৃতীয় চরিত্র [গল্প ২০১০, অনন্যা]। আর্কিটেক্ট [উপন্যাস, রয়েল, ২০১২] গল্পসমগ্র [গল্প ২০১২, রয়েল], পরী, হুমায়ূন আহমেদ ও ঝরা পালকের গল্প [মুক্তগদ্য ২০১২, রয়েল], আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ [সময়, ২০১৬] একদা চৈত্রের রাতে [রয়েল, ২০১৬], প্রেম-বিরহের অনুকাব্য [পরিবার, ২০১৬], নির্বাচিত গল্প [গল্প, ধ্রুবপদ, ২০১৬] ছায়ামুখ ও আশ্চর্যকুহক [যুগল উপন্যাস, ২০১৬, অনিন্দ্য], কিছু কথা কথার ভেতরে [পরিবার, ২০১৬], শহীদ কাদরী স্মারকগ্রন্থ [সম্পাদনা, বাংলা একাডেমি, ২০১৮], রিমান্ড, তেলাপোকা ও আকাশপরী [বৈভব, ২০১৯] ইত্যাদি। পুরস্কার : বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার।

যুগান্তর: দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন, কবিতা এবং গল্প উভয় বিভাগেই সমানতালে কাজ করে চলেছেন। এ দীর্ঘ সাহিত্যযাপনের অভিজ্ঞতায় গত বিশ বছরের আলোকে সাহিত্যের বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

ইকবাল হাসান: কিছু কিছু পরিবর্তন তো এসেছে। সময় তো আর থেমে থাকছে না। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে আমাদের সমাজে এসেছে বিশদ পরিবর্তন। এর ছায়া পড়েছে বোধ ও উপলব্ধিতে। ভাঙা গড়ার একটা খেলা চলছে ভেতরে ভেতরে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের গ্রামগুলো আর গ্রাম থাকছে না। সেখানে দখল নিচ্ছে কৃতকৌশলের কূটনীতি। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে কংক্রিটের জঞ্জাল। তবে এই যে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমরা গত বিশ বছরে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি, শনাক্তযোগ্য একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে- এটা কম কথা নয়। এ ছাড়া এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের। আমাদের গল্প, কবিতা, উপন্যাসে এর প্রতিফলন দৃশ্যমান। শিল্প-সাহিত্য হয়ে উঠছে এ পরিবর্তনের প্রতিচিত্র।

যুগান্তর: স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে কোন ধরনের কাব্যান্দোলন গড়ে ওঠেনি। এখানকার কবিতার এ রকম ঝিমিয়ে পড়ার বিশেষ কী কী কারণ আপনি উল্লেখ করবেন?

ইকবাল হাসান: ‘ঝিমিয়ে পড়েছে’ কথাটির সঙ্গে, দুঃখিত, একমত হতে পারলাম না। আমাদের তরুণ কবিরা তো দারুণ দেখাচ্ছে। সত্যি বলতে কী, আমি তরুণদের কবিতা পড়ে প্রাণিত হই, আলোড়িত হই।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের সাহিত্যে কোনো ধরনের কাব্য-আন্দেলন গড়ে ওঠেনি- এ বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। কবিতার ধারাই তো পাল্টে গেছে। এটাকেই আমি আন্দোলন বলি। নতুন নতুন আঙ্গিক তৈরি হচ্ছে, ব্যাপক ভাঙচুর হচ্ছে, উপমা উৎপ্রেক্ষার আর মিথের বিস্তারের পাশাপাশি মুখ্য হয়ে দার্শনিক প্রত্যয় ও প্রতীতি।
সত্তর আশি নব্বই ও শূন্য দশকে লেখা কবিতার সঙ্গে প্রাক-স্বাধীনতা সময়ের কবিতার তুলনামূলক আলোচনা আমার এ কথার প্রমাণ দেবে।

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনা পরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

ইকবাল হাসান: হ্যাঁ, অবশ্যই। কারও কারও লেখায় তো ইতোমধ্যে করোনার ‘ছোবল-চিত্র’ বিশদভাবে চিত্রিত হয়েছে। করোনা যেন আমাদের এক অপার্থিব পরাবাস্তব জীবন উপহার দিয়েছে। সারা বিশ্বকে যেন আলিঙ্গন করেছে করোনার বিষাক্ত মায়াজাল।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

ইকবাল হাসান: সত্যি বলতে কী, এখন মানুষ আর মানুষের মধ্যে নেই। লোভ-লালসা আর মানুষের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অস্থির হয়ে উঠেছে সমাজ-সংসার। ব্যাপক অবনতি হয়েছে মননশীলতার। দুর্নীতি এবং বিচারহীনতার কারণে দেশ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখন দুর্নীতি করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর আকার নিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে গোটা দেশকে। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় আমার জানা নেই।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

ইকবাল হাসান: আমাদের সাহিত্যে অসংখ্য গ্রন্থ আছে যা বিদেশি ভাষায় অনুবাদের দাবি রাখে। বাংলা একাডেমি অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও কিছু অনুবাদ একাডেমি করেছে। তবে আমি দেশে অনুবাদ একাডেমি নামে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছি।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

ইকবাল হাসান: দুটোই।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

ইকবাল হাসান: তিনজন কেন? আমি গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ ভ্রমণ মিলিয়ে অন্তত ত্রিশজন জীবিত লেখকের নাম বলতে পারি যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং ফেলবে।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই এমন তিনজন লেখকের নাম।

ইকবাল হাসান: খুব বেশি নয়, দশ পনেরোজন আছেন যারা যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে আলোচিত হতে ভালোবাসেন। আলোচনায় থাকার জন্য যা যা করা দরকার করেন। তবে এসবে কী এসে যায়! ধীমান পাঠকরা ঠিক বুঝতে পারে।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটা হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

ইকবাল হাসান: হ্যাঁ। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা শুধু লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসেন। তারা অনেকটাই নভৃতচারী। অনেকেই আছেন যারা আলোচনায় থাকা বা না-থাকাকে তেমন গুরুত্ব দেন না। যারা গুরুত্বপূর্ণ লেখক তারা লেখালেখির তাৎক্ষণিক আলোচনার চেয়ে বরং কালের বিচারের হাতে ছেড়ে দিতে ভালোবাসেন।

যুগান্তর: অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

ইকবাল হাসান: আই এগ্রি। তবে শুধু আমাদের দেশের কথা বলছেন কেন, পৃথিবীর সব দেশেই মননশীল সাহিত্যচর্চা কম হয়ে থাকে।

যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা।

ইকবাল হাসান: পথের পাঁচালী, তিতাস একটি নদীর নাম।

যুগান্তর: জীবিত একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের নাম বলুন।

ইকবাল হাসান: মতিয়া চৌধুরী।

যুগান্তর: একজন অগ্রজ এবং একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলা সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইকবাল হাসান: যারা প্রচারবিমুখ, নিবেদিত প্রাণ, অগ্রজ অনুজ তারা সবাই আমাদের সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দু’জনের নাম বলে অন্যদের উপেক্ষা করা অনুচিত।

যুগান্তর: এমন দুটো বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

ইকবাল হাসান: আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ এবং জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’।

যুগান্তর: লেখক না হলে কী হতে চাইতেন।

ইকবাল হাসান: চিত্রকর।

যুগান্তর: গানে আছে ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’- আপনার জীবনে কয়বার এসেছিল?

ইকবাল হাসান: আমাকে কে আবার ভালোবাসতে যাবে? আমিই ছ’সাতজনকে ভালোবেসেছিলাম বিভিন্ন দশকে, তারাও কিছুদিন হয়তো ভালোবেসেছিল আমাকে। তারপর যা হওয়ার তাই হল, অপেক্ষাকৃত উন্নত ভালোবাসা পেয়ে তারা একে একে চলে গেল। আসলে তারা চলে যাওয়ার জন্যই এসেছিল, তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়, সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়।

ইকবাল হাসান: সবচেয়ে ভালো লাগে গান। সবচেয়ে খারাপ লাগে টক শোতে অর্থহীন রাজনৈতিক বিতর্ক।