‘ভারতের আঞ্চলিক বাংলা থেকে আমাদের জাতীয় বাংলা আলাদা’
jugantor
‘ভারতের আঞ্চলিক বাংলা থেকে আমাদের জাতীয় বাংলা আলাদা’

  জুননু রাইন  

০৮ অক্টোবর ২০২০, ২৩:১৬:৪৯  |  অনলাইন সংস্করণ

সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি আসাদ মান্নান। বাংলা কবিতার মৌলিক বিষয় ও ভাবনায় তিনি জন্মসূত্রে পাঠক ও সমালোচক মহলে সমুদ্রের কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত ও খ্যাতিমান।

তার কবিতার মর্মমূলে নদী ও সমুদ্রের সঙ্গে চিরকালীন নারী ও নিসর্গের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে, যা বাংলা কবিতার শক্তি ও সম্ভাবনাকে ভিন্নমাত্রায় প্রসারিত করেছে।

বাংলাভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর আসাদ মান্নানের জন্ম ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সাতঘরিয়া গ্রামে। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ- ‘সুন্দর দক্ষিণে থাকে’, ‘সূর্যাস্তের উল্টোদিকে’, ‘সৈয়দ বংশের ফুল’, ‘ভালোবাসা আগুনের নদী’, ‘দ্বিতীয় জন্মের দিকে’, ‘যে-পারে পার নেই সে-পারে ফিরবে নদী’ ইত্যাদি।

স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‘বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার’, ‘জীবনানন্দ পদক ও পুরস্কার’, ‘কবিতালাপ পুরস্কার’, ‘মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সাহিত্য পুরস্কার’সহ আরও অনেক সম্মাননা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জুননু রাইন

যুগান্তর: দীর্ঘ সাহিত্যযাপনের অভিজ্ঞতায় গত ত্রিশ বছরের আলোকে বাংলা কবিতায় বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

আসাদ মান্নান : পরিবর্তনশীলতাই কবিতার একটি প্রধান গুণ। প্রত্যেকেই নিজের কবিতা লিখছেন নিজের মতো করে। নিজেকে পরিবর্তন করে কবি সামনে এগিয়ে যান। পরিবর্তন মানেই তো একটি নতুন পদক্ষেপ বা স্টেপ। সামনে হাঁটতে হলে পা বাড়াতে হবে। এটি ঠিক, জোর করে পরিবর্তনের পোশাক পরানো হলে সেটি আর পোশাক থাকে না। কবির কাজ প্রতিনিয়ত একটি কাঠামো ভেঙে আরেকটি কাঠামো তৈরি করা। আপনি যে ধরনের পরিবর্তনের প্রতি ইঙ্গিত করতে চাইছেন, আমি সেটিকে স্বীকার করেও বলতে চাই- আপনাকে দাঁড়াতে হলে একটি কাঠামোতে আসতেই হবে। বাংলা কবিতা কখনই এক জায়গায় থেমে থাকেনি। বিগত তিরিশ বছরে আসলে বাংলা কবিতা কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্বরহীন স্তব্ধতা বলে আমার মনে হয়েছে।

যুগান্তর: স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কোনো ধরনের কাব্যান্দোলন গড়ে ওঠেনি। এখানের কবিতার এ রকম ঝিমিয়ে পড়ার বিশেষ কী কী কারণ আপনি উল্লেখ করবেন?

আসাদ মান্নান : সাহিত্যের আন্দোলন মানে হল- এক ধরনের খেয়ালি মনের আড্ডার অস্থায়ী আওয়াজ। চিরকালীন শিল্প বা সাহিত্য একান্তভাবেই ব্যক্তিরই সৃষ্টি; তবে ধারা বলতে যদি আন্দোলনকে ধরা হয় তাহলে আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, আমাদের স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে আবহমান বাংলা কবিতায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসে আমাদের বাংলা কবিতা দিয়ে। বলা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে অনিবার্যভাবে একটি সমবায়ী স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে আমাদের কবিতা। স্বাধীনতার পর তা আরও বেগবান হয়। জাতীয় জীবনে নানা সংকটে আমাদের কবিতা নতুন স্বর ও শক্তি সঞ্চয় করে, যা সহজে শনাক্ত করা যায়। এখানে এসে আমাদের কবিতা একইসঙ্গে বাংলা কবিতা তো বটেই, বাংলাদেশের কবিতাও হয়ে ওঠে। ভারতের আঞ্চলিক বাংলা কবিতা থেকে আমাদের জাতীয় বাংলা কবিতা মর্মমূলে আলাদা হয়ে চলছে।

যদিও ভাষা এক, চলনও তার এক। অভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্টি হয়ে পৃথকভাবে চলছে। এখানের কবিতা ঝিমিয়ে পড়েছে- আমার তো তা মনে হয় না। অনেকেই বেশ ভালো লিখছেন। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে সৃষ্টিশীলতার তুমুল বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এর একটি নেগেটিভ দিক তো রয়েছে। সে প্রসঙ্গে এখানে বলার সুযোগ নিতে চাই না। ইতিবাচক দিকটি হল- তারুণ্যের যে রূপ, রস ও শক্তি তা সব সময় নতুনের দিকে যেতে চায় এবং যাবেই। এখানের কবিতাও সে দিকে যাচ্ছে।

যুগান্তর: সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন? এটি সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কতটা উপকারী বা অপকারী?

আসাদ মান্নান : পৃথিবীর অন্য ভাষার সাহিত্যে আমার জানামতে, দশক বলে কিছু নেই। তিরিশ দশকের আগে বাংলা সাহিত্যে দশক বলে কিছু ছিল না। নজরুল কোন দশকের, জীবনানন্দ কোন দশকের? জীবনানন্দকে তিরিশি কবি বলা হলেও একই সময়ের নজরুলকে আমরা সেভাবে দেখি না কেন? আসলে এগুলো সমালোচনা সাহিত্যের সীমারেখা। সৃষ্টিশীলতা একটি প্রবহমান বিষয়। এখানে দশকের কোনো স্থান নেই, কালিক সীমানা টানা সঙ্গত নয়।

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনাপরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

আসাদ মান্নান : ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংকট ও সম্ভাবনাকে অবলম্বন করে যুগে যুগে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। করোনা মহামারী যে ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে আমরা অবশ্যই আশা করতে পারি, হয়তো কোনো কোনো কবি-লেখকের হাত দিয়ে অসামান্য কবিতা বা কথাসাহিত্য সৃষ্টি হবে। ঠিক এ মুহূর্তে বিষয় হিসেবে করোনা বাংলা সাহিত্যসহ পৃথিবীর অন্যভাষার সাহিত্যেও উঠে আসছে। বিশেষ করে কবিতায়। কথাসাহিত্যের বিষয়টি আরও কিছুকাল হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। আড়ালে নিভৃতে হয়তো কোনো লেখকের আঙুল ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। আমরাও সে জন্য অপেক্ষা করছি।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

আসাদ মান্নান : একটি সমাজকে একজন মননশীল মানুষ যেভাবে আলোকিত করতে পারেন তাকে ধারণ করার ক্ষমতা বা শক্তি সমাজের থাকতে হবে। সমাজ তো আর কোনো ক্লাব বা আড্ডাখানা নয়, হুট করে আলো জ্বললে সব কিছু ফকফক করে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে! এর জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রবহমান প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদেরও কিছুটা অভাব বা সংকট থাকতে পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। সব দেশে অল্প-বিস্তর এ সংকট রয়েছে। ধীরে ধীরে আমরা অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে পারব।

আমরা হয়তো খোলা চোখে দেখছি না। সেই অনাদিকাল থেকে পৃথিবী এভাবে এগিয়ে এসেছে। আমরাও এগিয়ে যাব। সব সময় এ ধরনের সংকট ছিল। কিন্তু আমরা জানতে পারিনি। তখন মিডিয়া এত বেশি বিস্তৃত ছিল না। এখন তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সমাজের সব ধরনের অসঙ্গতি ও অনাচার যত সহজে আমরা জানতে পারছি আগে তো সেই সুযোগ ছিল না। একটি মননশীল মানবিক সমাজ বিনির্মাণে আমরা যদি তথ্যপ্রযুক্তি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারি তাহলে মননশীলতার যে ঘাটতি বা অবনতির কথা বলছেন তা থেকে সহজে উত্তরণ ঘটাবে।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন-

আসাদ মান্নান : আমাদের বাংলাভাষায় বহুগ্রন্থ রচিত হয়েছে, যেগুলো অন্যভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার। দুর্ভাগ্য এক্ষেত্রে আমরা খুব পিছিয়ে। আমাদের দেশে তেমন কোনো ভাষা ইন্সটিটিউট গড়ে উঠেনি, যার মাধ্যমে আমাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো অনুবাদ করা যেত। বিদেশি সাহিত্যপ্রেমী লোকদের বাংলাভাষা শিখিয়ে তাদের মাধ্যমে যদি আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোকে অনুবাদ করা যেত তাহলে হয়তো একটা বিরাট কাজ হতো। এ প্রসঙ্গে আমার রুশ সাহিত্যের বাংলা অনুবাদক ননী ভৌমিকের কথা মনে পড়ছে। তিনি রুশ ভাষা শিখে রুশ সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ করেছেন অনেক। অসাধারণ অনুবাদ। এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ থাকলে ভালো হয়। আমরা আশা করতে পারি, একদিন আমাদের এ অভাব পূরণ হবে।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো পাঠকের অভাব?

আসাদ মান্নান : ভালো লেখক বা ভালো পাঠক বলে কিছু নেই। লেখক লিখছেন তার মনের তাগিদে, পাঠক পড়ছেন তার রুচি ও সামর্থ্যানুযায়ী। অভ্যাসবশত কেউ কেউ পাঠক কিন্তু অভ্যাসবশত কেউ কেউ লেখক নন। লেখকের তাড়া ও তাড়নার সঙ্গে পাঠকের ক্ষুধাকে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই। যিনি হয়তো কবিতা পড়ে আক্রান্ত হলেন- আনন্দ লাভ করেন, তিনি হয়তো উপন্যাস বা গল্প পড়ে তেমনটি লাভ করেন না। দু’ধরনের পাঠক আছেন- কেউ আছেন সমালোচনার জন্য আর কেউ আনন্দের জন্য। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোয় বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে যত শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছেন, তারা যদি সাহিত্যের পাঠক হতেন তাহলে তো আমি এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতাম না! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাহিত্যের অধিকাংশ শিক্ষক পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য কোনও বই পড়েন না। শিক্ষার্থীদের কথা নাই বা বললাম।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম-

আসাদ মান্নান : সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের জন্য কবি বা লেখক লিখেন না। সেটি তার কাজও নয়। তবে কোনও গ্রন্থ পাঠ করে কেউ যদি কোনও পাঠ নিতে চান, সেটি আলাদা কথা। সাহিত্য তো ধর্মগ্রন্থ নয় যে, মানুষকে নীতি-নৈতিকতা শিখাবে। এবং সেটি হলে সাহিত্য আর সাহিত্য থাকবে না।

যুগান্তর: অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কি সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

আসাদ মান্নান : কবিতা হচ্ছে মননশীল সাহিত্যের চূড়ান্ত রূপ। আমি যেহেতু কবিতা ছাড়া অন্য কিছু লিখি না, কাজেই আমি অবশ্যই বলব- আমরা পিছিয়ে নেই। যারা এ ধারণা পোষণ করেন তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, মননশীল সাহিত্য গাভীর ওলানের বাঁট নয় যে, টান দিলেই দুধ বেরিয়ে আসবে। পাঠকের মননভূমিই মূলত মননশীল সাহিত্যের ধারক অন্য কেউ নন।

যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা-

আসাদ মান্নান : হানচব্যাক অব নটেরড্যাম ও পথের পাঁচালী।

যুগান্তর : এমন দুটো বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন-

আসাদ মান্নান : যদি দেশ, মানুষ ও মানবতাকে ভালোবাসতে চান তাহলে পড়ুন দুটো নয়, তিনটি বই- ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়া চীন’। এ তিনটি বই পাঠের পর আর একটি বই পড়ার জন্য পরামর্শ দেব- ‘কুয়াশা উপেক্ষা করে বসে আছে আশা’।
যুগান্তর: কবি না হলে কী হতে চাইতেন-

আসাদ মান্নান : কিছুই না; শুধু একজন প্রেমের আসামি।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ও সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়-

আসাদ মান্নান : সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়- বন্ধুর বন্ধুত্ব; সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়- বন্ধুর ঈর্ষা।

‘ভারতের আঞ্চলিক বাংলা থেকে আমাদের জাতীয় বাংলা আলাদা’

 জুননু রাইন 
০৮ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি আসাদ মান্নান। বাংলা কবিতার মৌলিক বিষয় ও ভাবনায় তিনি জন্মসূত্রে পাঠক ও সমালোচক মহলে সমুদ্রের কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত ও খ্যাতিমান।

তার কবিতার মর্মমূলে নদী ও সমুদ্রের সঙ্গে চিরকালীন নারী ও নিসর্গের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে, যা বাংলা কবিতার শক্তি ও সম্ভাবনাকে ভিন্নমাত্রায় প্রসারিত করেছে।

বাংলাভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর আসাদ মান্নানের জন্ম ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সাতঘরিয়া গ্রামে। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ- ‘সুন্দর দক্ষিণে থাকে’, ‘সূর্যাস্তের উল্টোদিকে’, ‘সৈয়দ বংশের ফুল’, ‘ভালোবাসা আগুনের নদী’, ‘দ্বিতীয় জন্মের দিকে’, ‘যে-পারে পার নেই সে-পারে ফিরবে নদী’ ইত্যাদি।

স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‘বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার’, ‘জীবনানন্দ পদক ও পুরস্কার’, ‘কবিতালাপ পুরস্কার’, ‘মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সাহিত্য পুরস্কার’সহ আরও অনেক সম্মাননা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জুননু রাইন

যুগান্তর: দীর্ঘ সাহিত্যযাপনের অভিজ্ঞতায় গত ত্রিশ বছরের আলোকে বাংলা কবিতায় বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

আসাদ মান্নান : পরিবর্তনশীলতাই কবিতার একটি প্রধান গুণ। প্রত্যেকেই নিজের কবিতা লিখছেন নিজের মতো করে। নিজেকে পরিবর্তন করে কবি সামনে এগিয়ে যান। পরিবর্তন মানেই তো একটি নতুন পদক্ষেপ বা স্টেপ। সামনে হাঁটতে হলে পা বাড়াতে হবে। এটি ঠিক, জোর করে পরিবর্তনের পোশাক পরানো হলে সেটি আর পোশাক থাকে না। কবির কাজ প্রতিনিয়ত একটি কাঠামো ভেঙে আরেকটি কাঠামো তৈরি করা। আপনি যে ধরনের পরিবর্তনের প্রতি ইঙ্গিত করতে চাইছেন, আমি সেটিকে স্বীকার করেও বলতে চাই- আপনাকে দাঁড়াতে হলে একটি কাঠামোতে আসতেই হবে। বাংলা কবিতা কখনই এক জায়গায় থেমে থাকেনি। বিগত তিরিশ বছরে আসলে বাংলা কবিতা কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্বরহীন স্তব্ধতা বলে আমার মনে হয়েছে।

যুগান্তর: স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কোনো ধরনের কাব্যান্দোলন গড়ে ওঠেনি। এখানের কবিতার এ রকম ঝিমিয়ে পড়ার বিশেষ কী কী কারণ আপনি উল্লেখ করবেন?

আসাদ মান্নান : সাহিত্যের আন্দোলন মানে হল- এক ধরনের খেয়ালি মনের আড্ডার অস্থায়ী আওয়াজ। চিরকালীন শিল্প বা সাহিত্য একান্তভাবেই ব্যক্তিরই সৃষ্টি; তবে ধারা বলতে যদি আন্দোলনকে ধরা হয় তাহলে আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, আমাদের স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে আবহমান বাংলা কবিতায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসে আমাদের বাংলা কবিতা দিয়ে। বলা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে অনিবার্যভাবে একটি সমবায়ী স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে আমাদের কবিতা। স্বাধীনতার পর তা আরও বেগবান হয়। জাতীয় জীবনে নানা সংকটে আমাদের কবিতা নতুন স্বর ও শক্তি সঞ্চয় করে, যা সহজে শনাক্ত করা যায়। এখানে এসে আমাদের কবিতা একইসঙ্গে বাংলা কবিতা তো বটেই, বাংলাদেশের কবিতাও হয়ে ওঠে। ভারতের আঞ্চলিক বাংলা কবিতা থেকে আমাদের জাতীয় বাংলা কবিতা মর্মমূলে আলাদা হয়ে চলছে।

যদিও ভাষা এক, চলনও তার এক। অভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্টি হয়ে পৃথকভাবে চলছে। এখানের কবিতা ঝিমিয়ে পড়েছে- আমার তো তা মনে হয় না। অনেকেই বেশ ভালো লিখছেন। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে সৃষ্টিশীলতার তুমুল বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এর একটি নেগেটিভ দিক তো রয়েছে। সে প্রসঙ্গে এখানে বলার সুযোগ নিতে চাই না। ইতিবাচক দিকটি হল- তারুণ্যের যে রূপ, রস ও শক্তি তা সব সময় নতুনের দিকে যেতে চায় এবং যাবেই। এখানের কবিতাও সে দিকে যাচ্ছে।

যুগান্তর: সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন? এটি সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কতটা উপকারী বা অপকারী?

আসাদ মান্নান : পৃথিবীর অন্য ভাষার সাহিত্যে আমার জানামতে, দশক বলে কিছু নেই। তিরিশ দশকের আগে বাংলা সাহিত্যে দশক বলে কিছু ছিল না। নজরুল কোন দশকের, জীবনানন্দ কোন দশকের? জীবনানন্দকে তিরিশি কবি বলা হলেও একই সময়ের নজরুলকে আমরা সেভাবে দেখি না কেন? আসলে এগুলো সমালোচনা সাহিত্যের সীমারেখা। সৃষ্টিশীলতা একটি প্রবহমান বিষয়। এখানে দশকের কোনো স্থান নেই, কালিক সীমানা টানা সঙ্গত নয়।

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনাপরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

আসাদ মান্নান : ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংকট ও সম্ভাবনাকে অবলম্বন করে যুগে যুগে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। করোনা মহামারী যে ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে আমরা অবশ্যই আশা করতে পারি, হয়তো কোনো কোনো কবি-লেখকের হাত দিয়ে অসামান্য কবিতা বা কথাসাহিত্য সৃষ্টি হবে। ঠিক এ মুহূর্তে বিষয় হিসেবে করোনা বাংলা সাহিত্যসহ পৃথিবীর অন্যভাষার সাহিত্যেও উঠে আসছে। বিশেষ করে কবিতায়। কথাসাহিত্যের বিষয়টি আরও কিছুকাল হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। আড়ালে নিভৃতে হয়তো কোনো লেখকের আঙুল ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। আমরাও সে জন্য অপেক্ষা করছি।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

আসাদ মান্নান : একটি সমাজকে একজন মননশীল মানুষ যেভাবে আলোকিত করতে পারেন তাকে ধারণ করার ক্ষমতা বা শক্তি সমাজের থাকতে হবে। সমাজ তো আর কোনো ক্লাব বা আড্ডাখানা নয়, হুট করে আলো জ্বললে সব কিছু ফকফক করে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে! এর জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রবহমান প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদেরও কিছুটা অভাব বা সংকট থাকতে পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। সব দেশে অল্প-বিস্তর এ সংকট রয়েছে। ধীরে ধীরে আমরা অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে পারব।

আমরা হয়তো খোলা চোখে দেখছি না। সেই অনাদিকাল থেকে পৃথিবী এভাবে এগিয়ে এসেছে। আমরাও এগিয়ে যাব। সব সময় এ ধরনের সংকট ছিল। কিন্তু আমরা জানতে পারিনি। তখন মিডিয়া এত বেশি বিস্তৃত ছিল না। এখন তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সমাজের সব ধরনের অসঙ্গতি ও অনাচার যত সহজে আমরা জানতে পারছি আগে তো সেই সুযোগ ছিল না। একটি মননশীল মানবিক সমাজ বিনির্মাণে আমরা যদি তথ্যপ্রযুক্তি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারি তাহলে মননশীলতার যে ঘাটতি বা অবনতির কথা বলছেন তা থেকে সহজে উত্তরণ ঘটাবে।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন-

আসাদ মান্নান : আমাদের বাংলাভাষায় বহুগ্রন্থ রচিত হয়েছে, যেগুলো অন্যভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার। দুর্ভাগ্য এক্ষেত্রে আমরা খুব পিছিয়ে। আমাদের দেশে তেমন কোনো ভাষা ইন্সটিটিউট গড়ে উঠেনি, যার মাধ্যমে আমাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো অনুবাদ করা যেত। বিদেশি সাহিত্যপ্রেমী লোকদের বাংলাভাষা শিখিয়ে তাদের মাধ্যমে যদি আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোকে অনুবাদ করা যেত তাহলে হয়তো একটা বিরাট কাজ হতো। এ প্রসঙ্গে আমার রুশ সাহিত্যের বাংলা অনুবাদক ননী ভৌমিকের কথা মনে পড়ছে। তিনি রুশ ভাষা শিখে রুশ সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ করেছেন অনেক। অসাধারণ অনুবাদ। এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ থাকলে ভালো হয়। আমরা আশা করতে পারি, একদিন আমাদের এ অভাব পূরণ হবে।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো পাঠকের অভাব?

আসাদ মান্নান : ভালো লেখক বা ভালো পাঠক বলে কিছু নেই। লেখক লিখছেন তার মনের তাগিদে, পাঠক পড়ছেন তার রুচি ও সামর্থ্যানুযায়ী। অভ্যাসবশত কেউ কেউ পাঠক কিন্তু অভ্যাসবশত কেউ কেউ লেখক নন। লেখকের তাড়া ও তাড়নার সঙ্গে পাঠকের ক্ষুধাকে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই। যিনি হয়তো কবিতা পড়ে আক্রান্ত হলেন- আনন্দ লাভ করেন, তিনি হয়তো উপন্যাস বা গল্প পড়ে তেমনটি লাভ করেন না। দু’ধরনের পাঠক আছেন- কেউ আছেন সমালোচনার জন্য আর কেউ আনন্দের জন্য। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোয় বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে যত শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছেন, তারা যদি সাহিত্যের পাঠক হতেন তাহলে তো আমি এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতাম না! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাহিত্যের অধিকাংশ শিক্ষক পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য কোনও বই পড়েন না। শিক্ষার্থীদের কথা নাই বা বললাম।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম-

আসাদ মান্নান : সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের জন্য কবি বা লেখক লিখেন না। সেটি তার কাজও নয়। তবে কোনও গ্রন্থ পাঠ করে কেউ যদি কোনও পাঠ নিতে চান, সেটি আলাদা কথা। সাহিত্য তো ধর্মগ্রন্থ নয় যে, মানুষকে নীতি-নৈতিকতা শিখাবে। এবং সেটি হলে সাহিত্য আর সাহিত্য থাকবে না।

যুগান্তর: অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কি সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

আসাদ মান্নান : কবিতা হচ্ছে মননশীল সাহিত্যের চূড়ান্ত রূপ। আমি যেহেতু কবিতা ছাড়া অন্য কিছু লিখি না, কাজেই আমি অবশ্যই বলব- আমরা পিছিয়ে নেই। যারা এ ধারণা পোষণ করেন তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, মননশীল সাহিত্য গাভীর ওলানের বাঁট নয় যে, টান দিলেই দুধ বেরিয়ে আসবে। পাঠকের মননভূমিই মূলত মননশীল সাহিত্যের ধারক অন্য কেউ নন।

যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা-

আসাদ মান্নান : হানচব্যাক অব নটেরড্যাম ও পথের পাঁচালী।

যুগান্তর : এমন দুটো বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন-

আসাদ মান্নান : যদি দেশ, মানুষ ও মানবতাকে ভালোবাসতে চান তাহলে পড়ুন দুটো নয়, তিনটি বই- ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়া চীন’। এ তিনটি বই পাঠের পর আর একটি বই পড়ার জন্য পরামর্শ দেব- ‘কুয়াশা উপেক্ষা করে বসে আছে আশা’।
যুগান্তর: কবি না হলে কী হতে চাইতেন-

আসাদ মান্নান : কিছুই না; শুধু একজন প্রেমের আসামি।

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ও সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়-

আসাদ মান্নান : সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়- বন্ধুর বন্ধুত্ব; সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়- বন্ধুর ঈর্ষা।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন