‘অনুবাদক সব সময় উভয় সংকটের শিকার’
jugantor
‘অনুবাদক সব সময় উভয় সংকটের শিকার’

  জুননু রাইন  

২২ অক্টোবর ২০২০, ২৩:১৩:২৭  |  অনলাইন সংস্করণ

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৪৯ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক। হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন ১৯৮৯ সালে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন।

তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ : রাসোমন (১৯৮২), গালিভারের ভ্রমণকাহিনী (১৯৮৫), মিথের শক্তি (১৯৯৬), পেয়ারার সুবাস (২০০২), গোল্ডেন বাউ ইত্যাদি। অনুবাদকর্মের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: জুননু রাইন

যুগান্তর: স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাসাহিত্যে বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে যদি এ দেশের সাহিত্য বিবেচনা করি তো গুণে মানে বিস্তৃতিতে বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন দেখি।

যুগান্তর: আপনার বিবেচনায় স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য এমন কোনো সাহিত্য আন্দোলন হয়েছে, যা ইতিবাচক অর্থে পরিবর্তন আনতে পারত? আর যদি না হয়ে থাকে, এমন কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠা দরকার আছে কি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ইউরোপ আমেরিকার সাহিত্যে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে যেমন কোনো দার্শনিক, নন্দনতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং প্রকরণকেন্দ্রিক লেখক/কবি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে, আমাদের এখানে তেমন কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। ষাটের দশকে কিছু তরুণ লেখক পাশ্চাত্যের সাহিত্য আন্দোলনের প্রভাবে নিরীক্ষণধর্মী রচনায় মন দেন, কিন্তু তা আঙ্গিক নিয়ে খেলাধুলার মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে এভাবে লেখকরা প্রসঙ্গ প্রকরণ উভয় আত্মস্থ করেন এবং কিছু কিছু দার্শনিক মতবাদকে, যেমন পরাবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদ, জাদুবাস্তবতা, ইমেজিজম, অভিব্যক্তিবাদকে সৃজনশীলভাবেও নিজেদের সাহিত্যকর্মে ব্যবহার করেন। তবে সাহিত্য সৃষ্টিতে আন্দোলন চিন্তাভাবনাকে শান দিতে পারে, প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থান ও কালনির্ভর সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে আন্দোলনের খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না।

যুগান্তর: সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : দশকওয়ারি সাহিত্য আলোচনার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই। আর দশকওয়ারি সাহিত্যচর্চার তো প্রশ্নই ওঠে না। অন্য সবার মতো, সব কিছুর মতো সাহিত্যিকরাও তো এক একটা নির্দিষ্ট সময়েই বাস করেন এবং সে সময়টুকুতেই তারা কাজও করেন। একজন লেখক নিশ্চয়ই দশক গুনে গুনে লেখালেখি করেন না। সময়কে আমরা ভাগ করি বিচার বিশ্লেষণের শৃঙ্খলা এবং সুবিধার জন্য। কোনো এক কি দুই দশকে হয়তো সাহিত্যে একটা প্রবণতা মুখ্য হয়ে ওঠে। এবং তা অনেক লেখককেই প্রভাবিত করে। এ রকম ক্ষেত্রে আলোচনার সুবিধার জন্য সময়কে ভাগ করে দেখানো যেতে পারে।

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনাপরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : করোনা যেহেতু মানুষের জীবিকা ধরে টান দিয়েছে বেশ জোরেশোরেই, এ জন্য মনে হয় সাহিত্যে এর প্রভাব পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। অনলাইন সাহিত্য সৃষ্টির প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে বলেই মনে হয়, অন্যদিকে ছাপাখানার প্রকাশনা গেছে কমে। আসলে করোনাভাইরাস আর সাহিত্য পরস্পরবিরোধী। সাহিত্য যেখানে কাছে টানে, করোনা সেখানে দূরে সরিয়ে দেয়। একমাত্র ব্যক্তি প্রতিভার ওপরই নির্ভর করে করোনা নিয়ে সাহিত্য উন্নতমানের হবে কি না।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আমাদের স্বাধীনতাপরবর্তী মননশীলতা অনেক ব্যাপৃত এবং ধারালো হয়েছে সত্য, কিন্তু নৈতিকতার অধঃপতন ঘটেছে শোচনীয়ভাবে। এ জন্য রাজনীতিতে মিথ্যাচার, শঠতা, নীতিহীনতা এবং অর্থনীতিতে মুক্তবাজারের নামে লেসা ফেয়ার এবং বণিক বুদ্ধির সর্বত্রগামীতাকেই দায়ী করব। নৈতিকতার এ দুই ক্ষেত্রে আমরা বোধ হয় সর্বকালের সর্বনিু স্তরে এসে পৌঁছেছি যদিও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে চোখে পড়ার মতো।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আমাদের সাহিত্যে বিশ্বমানের কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস কম হলেও আছে। সে সবই ভারতীয় ভাষা এবং ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অনুবাদকের খামতি আছে।

যুগান্তর: অনুবাদের ক্ষেত্রে কোন বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ- যুক্তি, বিচারবুদ্ধি না কি সহজাত জ্ঞান?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : অনুবাদক সব সময় উভয় সংকটের শিকার : লক্ষ্য পাঠককে মাথায় রেখে অনুবাদ করতে গেলে মূল টেক্সট থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটাতে গিয়ে অনুবাদক যুক্তি, বিবেচনাবোধ এবং সাহিত্য অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। এভাবেই অনুবাদকর্ম একটি সৃষ্টিশীল কাজ হয়ে ওঠে।

যুগান্তর: অনুবাদ করতে গিয়ে ইংরেজির সঙ্গে বাংলার কী কী পার্থক্য অনুভব করেছেন? এ ক্ষেত্রে বাংলার সীমাবদ্ধতা, ব্যাপকতার বা ইতিবাচক গুণ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : বিভিন্ন জাতির ভাষার ভেতর যেমন বিস্ময়কর মিল, তেমনি অমিলও প্রচুর। মানবজাতি যেহেতু এক সময় এক কিংবা কাছাকাছি ভৌগোলিক দূরত্বে বাস করত সে জন্য ভাষাগত মিল আছে মেলা। বহু শব্দের উৎস একই, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করার ফলে, ভৌগোলিক, জলবায়ু, তাপমাত্রা, খাদ্যসামগ্রী প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিচিত্র জীবনযাপন করার ফলে তাদের ভাষার অমিলও সৃষ্টি হয়।

এ জন্য ভিন্ন সংস্কৃতির একটি ভাষা থেকে অন্য একটি ভাষায় সাহিত্যকর্ম অনুবাদ একটি দুরূহ কাজ। ইংরেজি নিঃসন্দেহে একটি সমৃদ্ধতর ভাষা। এতে যত শব্দ, যত ক্রিয়াপদ এবং সর্বনাম ব্যবহার করে বাক্যের ভেতরে বাক্যাংশ সৃষ্টির যে সুবিধা- বাংলায় তেমন নেই। আবার বাংলাতেও বাক্যের বিভিন্ন স্থানে ক্রিয়াপদ ব্যবহারের যে সুবিধা সেটা ইংরেজিতে নেই। আজ গোলকায়নের যুগে ভাষাগুলো পরস্পরের ওপর এসে পড়েছে।

অনেক ইংরেজি শব্দ যেমন বাংলাভাষায় ঢুকেছে তেমনি কিছু বাংলা, হিন্দি ও অন্যান্য ভাষার শব্দও ইংরেজিতে গেছে। তবে হ্যাঁ, অনুবাদ করতে গেলে লক্ষ ভাষায় অনুবাদকের মাতৃভাষাসুলভ সহজ স্বচ্ছন্দ দখল থাকতে হবে। এবং সাংস্কৃতিক ইকুইভ্যালেন্স আনতে অনুবাদককে সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সব যুগে সব সাহিত্যেই ভালো লেখকের এবং ভালো মানের পাঠকের অভাব থাকে। বাংলাসাহিত্য এবং বাঙালি পাঠক এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ভালো সাহিত্য সাধারণ পাঠক পড়–ন না পড়–ন তার প্রতি তাদের এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ, ভয় মেশানো শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। ভালো লেখক পাঠকের রুচি অনুযায়ী লেখেন না, বরং তিনি যেভাবে অনুভব করেন তা তার বিশ্বসাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতায় মিশিয়ে শিল্পোত্তীর্ণ করে প্রকাশ করেন। তিনি উন্নতমানের পাঠক সৃষ্টি করেন, পাঠক তাকে সৃষ্টি করেন না।

যুগান্তর: অনুবাদের ক্ষেত্রে ফরেনাইজেশন বলে যে কথাটি আছে, আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে এর ব্যাংখ্যা জানতে চাই, এ বিষয়টি কি মানা হয়, বিশেষ করে আমাদের দেশে যারা অনুবাদ করে তারা কী মানে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : মূল টেক্সটকে প্রায় অবিকৃত রেখে অনুবাদ করার নামই ফরেনাইজেশন, অর্থাৎ অনুবাদটা যে অন্য ভাষা, অন্য যুগ ও অন্য সংস্কৃতির একটা পরিবেশনা সেটা যেন লক্ষ ভাষার পাঠক বুঝতে পারেন সেভাবে মূলের প্রতি অনুগত থেকে অনুবাদ করা। কিন্তু এভাবে অনুবাদের সাহিত্য মূল্য শূন্যের কোঠায় কারণ তা লক্ষ ভাষার পাঠকের কাছে অচেনা এবং দুর্বোধ্যই থেকে যায়। বোর্হেস যমন বলেন, ‘আক্ষরিক অনুবাদের সাহিত্যিক মূল্য নেই।’

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের মধ্যেও যারা অনন্য তাদের নিয়ে আলোচনা কি খুব কম হয়েছে? আমার তো মনে হয় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়নি- এবং এখনও হচ্ছে।

তবে হ্যাঁ এদের বাইরেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন সেই চল্লিশের দশক থেকেই- তাদের নিয়ে আলোচনা, গবেষণা বেশ কমই। এর একটিই কারণ- আমাদের সমালোচনা সাহিত্য, গবেষণা সাহিত্য, মননশীল সাহিত্য বেশ পিছিয়ে, বিশেষ করে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায়।

যুগান্তর: ঠিক সময়ে যথার্থ অনুবাদ বিশ্বসাহিত্যে তুলে ধরতে পারলে প্রভাব বিস্তার করতে পারত বাংলাদেশে এমন লেখক ছিল বা আছে? এবং কেন তারা ঠিকঠাক অনূদিত হচ্ছেন না, সেই অন্তরায়গুলো এবং এখান থেকে উত্তরণের উপায়গুলো বলুন।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সামগ্রিকভাবে বাংলাসাহিত্যে আন্তর্জাতিক মানের লেখা অনেক। এদের মধ্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারও অনূদিত লেখা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বলে আমার জানা নেই।

রবীন্দ্রনাথও ঠিক ওই সময় (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পিছে) অনূদিত না হলে বিশ্বসাহিত্য সভায় স্থান পেতেন কিনা সন্দেহ। আজ তো ইউরোপ আমেরিকায় প্রায় বিস্মৃতই। বস্তুত বিশ্বযুদ্ধের চার পাঁচ বছরই তিনি ব্যাপক ভ্রমণ ও শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহে নিয়োজিত ছিলেন বলে নিজেকে পরিচিত করতে পেরেছিলেন। বাংলাসাহিত্যে আর কোনো লেখকের ভাগ্যে এ আন্তর্জাতিক সম্মান জোটেনি। এরপর হয়তো অনেকে অনূদিত হয়েছেনও। কিন্তু সেই খ্যাতি বা মর্যাদা তাদের জোটেনি।

এর একটি কারণ তো অবশ্যই ভালো ইংরেজি কিংবা বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলোয় অনুবাদের অভাব। আমাদের দেশে ইংরেজির ঐতিহ্য দুশ’ বছরেরও বেশি এবং ইংরেজি আমরা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিখিও শৈশব থেকেই।

তা সত্ত্বেও এ ভাষায় দক্ষতা আমাদের এমন হয়নি যে মাতৃভাষাতুল্য আয়াসে এতে লিখতে পারি। অনুবাদের প্রথম শর্তই হল মূল ভাষায় খুব ভালো দখল এবং লক্ষ্য ভাষায় একেবারে প্রথম ভাষাতুল্য দক্ষতা থাকতে হবে। এ দক্ষতাসম্পন্ন ইংরেজি কিংবা ফরাসি কিংবা স্প্যানিশ, চীনা, জাপানি, হিন্দি, উর্দু ভাষায় অনুবাদক আমাদের নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ একটাই- বহুভাষিক জনসংখ্যা সৃষ্টি করা।

এ কাজটি করতে গেলে দু-তিন পুরুষের বহু ভাষাচর্চা প্রয়োজন। আমাদের উপমহাদেশে উর্দুভাষী কিংবা হিন্দিভাষী বাংলাদেশি/বাঙালি লেখক যদি বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো তাদের ভাষায় অনুবাদ করতেন তো অন্তত উপমহাদেশে তারা পরিচিতি পেতেন। একইভাবে ভালো বাংলা জানা ইংরেজি/স্প্যানিশ/চীনা/জাপানি লেখক যদি আমাদের আন্তর্জাতিক মানের লেখা তাদের ভাষায় অনুবাদ করতেন তো বিশ্বসাহিত্যে আমাদের লেখকরা আলোচিত হতেন। এ ছাড়া আরও ব্যাপার আছে। রাজনৈতিকভাবে একটি দেশ যথেষ্ট মর্যাদার আসনে না থাকলে হয়তো তার ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতিও বিশ্ব দরবারে আগ্রহ সৃষ্টি করে না।

হতে পারে এ জন্যও অনেকে সরাসরি ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করছেন। আশা, বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর মনোযোগ আকর্ষণ করা। এভাবে অনেক দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি লেখক বাংলাভাষার সেরা লেখকদের চেয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশি পরিচিত। এ থেকে উত্তরণের পথ রাজনীতিকে উন্নত করা, সরকারিভাবে অনুবাদ সেল গঠন করে ব্যাপকভাবে দেশি-বিদেশি অনুবাদক নিয়োগ করে বাংলাসাহিত্যের সেরা গ্রন্থগুলো অনুবাদের ব্যবস্থা করা।

যুগান্তর: অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে, অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কী সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সাহিত্যের যে চারটি শাখা কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক, প্রবন্ধ সাহিত্য- তাদের মধ্যে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ শেষেরটি। এ শাখাকেই হয়তো বলা হচ্ছে মননশীল সাহিত্য। এখন মননশীল সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রয়োজন প্রচুর পড়াশোনা, গবেষণা মনস্কতা এবং ঋজু, চাঁচাছোলা ভাষার দক্ষতা। এ ভাষা কবিতার বা গল্পের বা নাটকের ভাষা নয়। একে পড়াশোনা করে আয়ত্ত করতে হয়। অন্যদিকে কবিতা বা গল্প লিখতে আবেগ, গীতলতা, সেন্টিমেন্ট ইত্যাদি সহজাত কিছু প্রবণতা দিয়ে হয়তো উতরে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রবন্ধ লিখতে যে চিন্তাভাবনা, পড়াশোনা বা গবেষণা মনস্কতা প্রয়োজন তা আমাদের মতো চটুল আবেগাকুল জাতি হয়তো দু’পুরুষের শিক্ষায় রপ্ত করতে পারেনি। এ জন্যই আমার মনে হয় গবেষণার ঐতিহ্য যতদিন না গড়ে ওঠে, যতদিন না একটা দশাসই হারের শিক্ষিত সমাজ সৃষ্টি হয়, ততদিন মননশীল সাহিত্যের পক্ষে এ দেশে রুগ্ন ও কৃশকায় না থেকে উপায় কী?

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালোলাগা এবং সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় জানতে চাই

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় : নীরব নিষ্ঠাবান কর্মী যিনি প্রতিদানের আশা না করে কাজ করেন যে কোনো ক্ষেত্রে, শিল্প সাহিত্য, রাজনীতি, কৃষি, অর্থনীতি, কলকারখানায়।

সবচেয়ে অপছন্দের বিষয় : স্তাবকতা, তোষামোদি, হাম-বড়ামি, অহংকার, মিথ্যাচার, গলাবাজি, ফেরেববাজি, ধান্দাবাজি- অসহ্য!

‘অনুবাদক সব সময় উভয় সংকটের শিকার’

 জুননু রাইন 
২২ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৪৯ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক। হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন ১৯৮৯ সালে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন।

তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ : রাসোমন (১৯৮২), গালিভারের ভ্রমণকাহিনী (১৯৮৫), মিথের শক্তি (১৯৯৬), পেয়ারার সুবাস (২০০২), গোল্ডেন বাউ ইত্যাদি। অনুবাদকর্মের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: জুননু রাইন

যুগান্তর: স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাসাহিত্যে বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে যদি এ দেশের সাহিত্য বিবেচনা করি তো গুণে মানে বিস্তৃতিতে বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন দেখি।

যুগান্তর: আপনার বিবেচনায় স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য এমন কোনো সাহিত্য আন্দোলন হয়েছে, যা ইতিবাচক অর্থে পরিবর্তন আনতে পারত? আর যদি না হয়ে থাকে, এমন কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠা দরকার আছে কি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস: ইউরোপ আমেরিকার সাহিত্যে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে যেমন কোনো দার্শনিক, নন্দনতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং প্রকরণকেন্দ্রিক লেখক/কবি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে, আমাদের এখানে তেমন কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। ষাটের দশকে কিছু তরুণ লেখক পাশ্চাত্যের সাহিত্য আন্দোলনের প্রভাবে নিরীক্ষণধর্মী রচনায় মন দেন, কিন্তু তা আঙ্গিক নিয়ে খেলাধুলার মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে এভাবে লেখকরা প্রসঙ্গ প্রকরণ উভয় আত্মস্থ করেন এবং কিছু কিছু দার্শনিক মতবাদকে, যেমন পরাবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদ, জাদুবাস্তবতা, ইমেজিজম, অভিব্যক্তিবাদকে সৃজনশীলভাবেও নিজেদের সাহিত্যকর্মে ব্যবহার করেন। তবে সাহিত্য সৃষ্টিতে আন্দোলন চিন্তাভাবনাকে শান দিতে পারে, প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থান ও কালনির্ভর সাহিত্যকর্ম সৃষ্টিতে আন্দোলনের খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না।

যুগান্তর: সাহিত্যের দশক বিভাজনকে কীভাবে দেখেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : দশকওয়ারি সাহিত্য আলোচনার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই। আর দশকওয়ারি সাহিত্যচর্চার তো প্রশ্নই ওঠে না। অন্য সবার মতো, সব কিছুর মতো সাহিত্যিকরাও তো এক একটা নির্দিষ্ট সময়েই বাস করেন এবং সে সময়টুকুতেই তারা কাজও করেন। একজন লেখক নিশ্চয়ই দশক গুনে গুনে লেখালেখি করেন না। সময়কে আমরা ভাগ করি বিচার বিশ্লেষণের শৃঙ্খলা এবং সুবিধার জন্য। কোনো এক কি দুই দশকে হয়তো সাহিত্যে একটা প্রবণতা মুখ্য হয়ে ওঠে। এবং তা অনেক লেখককেই প্রভাবিত করে। এ রকম ক্ষেত্রে আলোচনার সুবিধার জন্য সময়কে ভাগ করে দেখানো যেতে পারে।

যুগান্তর: করোনা পরিস্থিতিতে অথবা করোনাপরবর্তী সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : করোনা যেহেতু মানুষের জীবিকা ধরে টান দিয়েছে বেশ জোরেশোরেই, এ জন্য মনে হয় সাহিত্যে এর প্রভাব পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। অনলাইন সাহিত্য সৃষ্টির প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে বলেই মনে হয়, অন্যদিকে ছাপাখানার প্রকাশনা গেছে কমে। আসলে করোনাভাইরাস আর সাহিত্য পরস্পরবিরোধী। সাহিত্য যেখানে কাছে টানে, করোনা সেখানে দূরে সরিয়ে দেয়। একমাত্র ব্যক্তি প্রতিভার ওপরই নির্ভর করে করোনা নিয়ে সাহিত্য উন্নতমানের হবে কি না।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আমাদের স্বাধীনতাপরবর্তী মননশীলতা অনেক ব্যাপৃত এবং ধারালো হয়েছে সত্য, কিন্তু নৈতিকতার অধঃপতন ঘটেছে শোচনীয়ভাবে। এ জন্য রাজনীতিতে মিথ্যাচার, শঠতা, নীতিহীনতা এবং অর্থনীতিতে মুক্তবাজারের নামে লেসা ফেয়ার এবং বণিক বুদ্ধির সর্বত্রগামীতাকেই দায়ী করব। নৈতিকতার এ দুই ক্ষেত্রে আমরা বোধ হয় সর্বকালের সর্বনিু স্তরে এসে পৌঁছেছি যদিও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে চোখে পড়ার মতো।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আমাদের সাহিত্যে বিশ্বমানের কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস কম হলেও আছে। সে সবই ভারতীয় ভাষা এবং ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অনুবাদকের খামতি আছে।

যুগান্তর: অনুবাদের ক্ষেত্রে কোন বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ- যুক্তি, বিচারবুদ্ধি না কি সহজাত জ্ঞান?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : অনুবাদক সব সময় উভয় সংকটের শিকার : লক্ষ্য পাঠককে মাথায় রেখে অনুবাদ করতে গেলে মূল টেক্সট থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটাতে গিয়ে অনুবাদক যুক্তি, বিবেচনাবোধ এবং সাহিত্য অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। এভাবেই অনুবাদকর্ম একটি সৃষ্টিশীল কাজ হয়ে ওঠে।

যুগান্তর: অনুবাদ করতে গিয়ে ইংরেজির সঙ্গে বাংলার কী কী পার্থক্য অনুভব করেছেন? এ ক্ষেত্রে বাংলার সীমাবদ্ধতা, ব্যাপকতার বা ইতিবাচক গুণ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : বিভিন্ন জাতির ভাষার ভেতর যেমন বিস্ময়কর মিল, তেমনি অমিলও প্রচুর। মানবজাতি যেহেতু এক সময় এক কিংবা কাছাকাছি ভৌগোলিক দূরত্বে বাস করত সে জন্য ভাষাগত মিল আছে মেলা। বহু শব্দের উৎস একই, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করার ফলে, ভৌগোলিক, জলবায়ু, তাপমাত্রা, খাদ্যসামগ্রী প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিচিত্র জীবনযাপন করার ফলে তাদের ভাষার অমিলও সৃষ্টি হয়।

এ জন্য ভিন্ন সংস্কৃতির একটি ভাষা থেকে অন্য একটি ভাষায় সাহিত্যকর্ম অনুবাদ একটি দুরূহ কাজ। ইংরেজি নিঃসন্দেহে একটি সমৃদ্ধতর ভাষা। এতে যত শব্দ, যত ক্রিয়াপদ এবং সর্বনাম ব্যবহার করে বাক্যের ভেতরে বাক্যাংশ সৃষ্টির যে সুবিধা- বাংলায় তেমন নেই। আবার বাংলাতেও বাক্যের বিভিন্ন স্থানে ক্রিয়াপদ ব্যবহারের যে সুবিধা সেটা ইংরেজিতে নেই। আজ গোলকায়নের যুগে ভাষাগুলো পরস্পরের ওপর এসে পড়েছে।

অনেক ইংরেজি শব্দ যেমন বাংলাভাষায় ঢুকেছে তেমনি কিছু বাংলা, হিন্দি ও অন্যান্য ভাষার শব্দও ইংরেজিতে গেছে। তবে হ্যাঁ, অনুবাদ করতে গেলে লক্ষ ভাষায় অনুবাদকের মাতৃভাষাসুলভ সহজ স্বচ্ছন্দ দখল থাকতে হবে। এবং সাংস্কৃতিক ইকুইভ্যালেন্স আনতে অনুবাদককে সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সব যুগে সব সাহিত্যেই ভালো লেখকের এবং ভালো মানের পাঠকের অভাব থাকে। বাংলাসাহিত্য এবং বাঙালি পাঠক এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ভালো সাহিত্য সাধারণ পাঠক পড়–ন না পড়–ন তার প্রতি তাদের এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ, ভয় মেশানো শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। ভালো লেখক পাঠকের রুচি অনুযায়ী লেখেন না, বরং তিনি যেভাবে অনুভব করেন তা তার বিশ্বসাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতায় মিশিয়ে শিল্পোত্তীর্ণ করে প্রকাশ করেন। তিনি উন্নতমানের পাঠক সৃষ্টি করেন, পাঠক তাকে সৃষ্টি করেন না।

যুগান্তর: অনুবাদের ক্ষেত্রে ফরেনাইজেশন বলে যে কথাটি আছে, আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে এর ব্যাংখ্যা জানতে চাই, এ বিষয়টি কি মানা হয়, বিশেষ করে আমাদের দেশে যারা অনুবাদ করে তারা কী মানে?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : মূল টেক্সটকে প্রায় অবিকৃত রেখে অনুবাদ করার নামই ফরেনাইজেশন, অর্থাৎ অনুবাদটা যে অন্য ভাষা, অন্য যুগ ও অন্য সংস্কৃতির একটা পরিবেশনা সেটা যেন লক্ষ ভাষার পাঠক বুঝতে পারেন সেভাবে মূলের প্রতি অনুগত থেকে অনুবাদ করা। কিন্তু এভাবে অনুবাদের সাহিত্য মূল্য শূন্যের কোঠায় কারণ তা লক্ষ ভাষার পাঠকের কাছে অচেনা এবং দুর্বোধ্যই থেকে যায়। বোর্হেস যমন বলেন, ‘আক্ষরিক অনুবাদের সাহিত্যিক মূল্য নেই।’

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের মধ্যেও যারা অনন্য তাদের নিয়ে আলোচনা কি খুব কম হয়েছে? আমার তো মনে হয় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়নি- এবং এখনও হচ্ছে।

তবে হ্যাঁ এদের বাইরেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন সেই চল্লিশের দশক থেকেই- তাদের নিয়ে আলোচনা, গবেষণা বেশ কমই। এর একটিই কারণ- আমাদের সমালোচনা সাহিত্য, গবেষণা সাহিত্য, মননশীল সাহিত্য বেশ পিছিয়ে, বিশেষ করে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায়।

যুগান্তর: ঠিক সময়ে যথার্থ অনুবাদ বিশ্বসাহিত্যে তুলে ধরতে পারলে প্রভাব বিস্তার করতে পারত বাংলাদেশে এমন লেখক ছিল বা আছে? এবং কেন তারা ঠিকঠাক অনূদিত হচ্ছেন না, সেই অন্তরায়গুলো এবং এখান থেকে উত্তরণের উপায়গুলো বলুন।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সামগ্রিকভাবে বাংলাসাহিত্যে আন্তর্জাতিক মানের লেখা অনেক। এদের মধ্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারও অনূদিত লেখা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বলে আমার জানা নেই।

রবীন্দ্রনাথও ঠিক ওই সময় (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পিছে) অনূদিত না হলে বিশ্বসাহিত্য সভায় স্থান পেতেন কিনা সন্দেহ। আজ তো ইউরোপ আমেরিকায় প্রায় বিস্মৃতই। বস্তুত বিশ্বযুদ্ধের চার পাঁচ বছরই তিনি ব্যাপক ভ্রমণ ও শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহে নিয়োজিত ছিলেন বলে নিজেকে পরিচিত করতে পেরেছিলেন। বাংলাসাহিত্যে আর কোনো লেখকের ভাগ্যে এ আন্তর্জাতিক সম্মান জোটেনি। এরপর হয়তো অনেকে অনূদিত হয়েছেনও। কিন্তু সেই খ্যাতি বা মর্যাদা তাদের জোটেনি।

এর একটি কারণ তো অবশ্যই ভালো ইংরেজি কিংবা বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলোয় অনুবাদের অভাব। আমাদের দেশে ইংরেজির ঐতিহ্য দুশ’ বছরেরও বেশি এবং ইংরেজি আমরা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিখিও শৈশব থেকেই।

তা সত্ত্বেও এ ভাষায় দক্ষতা আমাদের এমন হয়নি যে মাতৃভাষাতুল্য আয়াসে এতে লিখতে পারি। অনুবাদের প্রথম শর্তই হল মূল ভাষায় খুব ভালো দখল এবং লক্ষ্য ভাষায় একেবারে প্রথম ভাষাতুল্য দক্ষতা থাকতে হবে। এ দক্ষতাসম্পন্ন ইংরেজি কিংবা ফরাসি কিংবা স্প্যানিশ, চীনা, জাপানি, হিন্দি, উর্দু ভাষায় অনুবাদক আমাদের নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ একটাই- বহুভাষিক জনসংখ্যা সৃষ্টি করা।

এ কাজটি করতে গেলে দু-তিন পুরুষের বহু ভাষাচর্চা প্রয়োজন। আমাদের উপমহাদেশে উর্দুভাষী কিংবা হিন্দিভাষী বাংলাদেশি/বাঙালি লেখক যদি বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো তাদের ভাষায় অনুবাদ করতেন তো অন্তত উপমহাদেশে তারা পরিচিতি পেতেন। একইভাবে ভালো বাংলা জানা ইংরেজি/স্প্যানিশ/চীনা/জাপানি লেখক যদি আমাদের আন্তর্জাতিক মানের লেখা তাদের ভাষায় অনুবাদ করতেন তো বিশ্বসাহিত্যে আমাদের লেখকরা আলোচিত হতেন। এ ছাড়া আরও ব্যাপার আছে। রাজনৈতিকভাবে একটি দেশ যথেষ্ট মর্যাদার আসনে না থাকলে হয়তো তার ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতিও বিশ্ব দরবারে আগ্রহ সৃষ্টি করে না।

হতে পারে এ জন্যও অনেকে সরাসরি ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করছেন। আশা, বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর মনোযোগ আকর্ষণ করা। এভাবে অনেক দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি লেখক বাংলাভাষার সেরা লেখকদের চেয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশি পরিচিত। এ থেকে উত্তরণের পথ রাজনীতিকে উন্নত করা, সরকারিভাবে অনুবাদ সেল গঠন করে ব্যাপকভাবে দেশি-বিদেশি অনুবাদক নিয়োগ করে বাংলাসাহিত্যের সেরা গ্রন্থগুলো অনুবাদের ব্যবস্থা করা।

যুগান্তর: অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে মননশীল সাহিত্যের চর্চা কম হয়ে থাকে, অথবা যা হচ্ছে তা মানের দিক থেকে যথাযথ না। আমরা কী সৃষ্টিশীল সাহিত্যের তুলনায় মননশীলতায় পিছিয়ে আছি?

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সাহিত্যের যে চারটি শাখা কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক, প্রবন্ধ সাহিত্য- তাদের মধ্যে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ শেষেরটি। এ শাখাকেই হয়তো বলা হচ্ছে মননশীল সাহিত্য। এখন মননশীল সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রয়োজন প্রচুর পড়াশোনা, গবেষণা মনস্কতা এবং ঋজু, চাঁচাছোলা ভাষার দক্ষতা। এ ভাষা কবিতার বা গল্পের বা নাটকের ভাষা নয়। একে পড়াশোনা করে আয়ত্ত করতে হয়। অন্যদিকে কবিতা বা গল্প লিখতে আবেগ, গীতলতা, সেন্টিমেন্ট ইত্যাদি সহজাত কিছু প্রবণতা দিয়ে হয়তো উতরে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রবন্ধ লিখতে যে চিন্তাভাবনা, পড়াশোনা বা গবেষণা মনস্কতা প্রয়োজন তা আমাদের মতো চটুল আবেগাকুল জাতি হয়তো দু’পুরুষের শিক্ষায় রপ্ত করতে পারেনি। এ জন্যই আমার মনে হয় গবেষণার ঐতিহ্য যতদিন না গড়ে ওঠে, যতদিন না একটা দশাসই হারের শিক্ষিত সমাজ সৃষ্টি হয়, ততদিন মননশীল সাহিত্যের পক্ষে এ দেশে রুগ্ন ও কৃশকায় না থেকে উপায় কী?

যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালোলাগা এবং সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় জানতে চাই

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় : নীরব নিষ্ঠাবান কর্মী যিনি প্রতিদানের আশা না করে কাজ করেন যে কোনো ক্ষেত্রে, শিল্প সাহিত্য, রাজনীতি, কৃষি, অর্থনীতি, কলকারখানায়।

সবচেয়ে অপছন্দের বিষয় : স্তাবকতা, তোষামোদি, হাম-বড়ামি, অহংকার, মিথ্যাচার, গলাবাজি, ফেরেববাজি, ধান্দাবাজি- অসহ্য!