‘বেসরকারি পাঠাগারগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে’
jugantor
‘বেসরকারি পাঠাগারগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে’

  জুননু রাইন  

৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৪:২৪:২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

মিনার মনসুরের জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০ সালে, চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (১৯৮৩) ও স্নাতকোত্তর (১৯৮৪)।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম মাইলফলক স্মারকগ্রন্থ ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ সম্পাদনা করেছেন ১৯৭৯ সালে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ‘আবার যুদ্ধে যাবো’ শিরোনামে একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছেন ১৯৮০ সালে।

১৯৮৩ সালে বাজেয়াপ্ত হয়েছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’। লেখালেখির শুরু সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে। মূলত কবি। তবে গদ্যেও দ্যুতিময় তার কলম। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘকাল। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন।

দীর্ঘ প্রায় এক যুগ কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক ও সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান হিসেবে। বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক। গদ্যপদ্য মিলিয়ে তার প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় ৩০।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: জুননু রাইন

যুগান্তর: স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলাসাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলাসাহিত্য কতদূর এগিয়েছে?

মিনার মনসুর: সময় নিশ্চিতভাবে সাহিত্যে তার একটি ছাপ রেখে যায়। আর সেই সময় যদি ভৌগলিক বিভাজন (বাংলা ভাগ), রক্ত ও অশ্রুসমুদ্র পাড়ি দেয়া একটি মুক্তিযুদ্ধ এবং সপরিবারে জাতির পিতাকে নৃশংসভাবে হত্যার মতো অভাবনীয় সব ঘটনার অভিঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়- তাহলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য; যেমনটি হয়েছিল ফ্রানজ কাফকার ক্ষেত্রে।

ফলে ভাষা ও সংস্কৃতি অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার সাহিত্যের স্বাদ আর আমাদের সাহিত্যের স্বাদ এক নয়। বহু বছর আগের এক সাক্ষাৎকারে অন্নদাশঙ্কর রায় আমাকে বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বাঙালিকে যদি কখনও বাংলাসাহিত্যের সন্ধানে বেরোতে হয়, তাকে যেতে হবে ঢাকায়।

ঢাকাই হবে বাংলাসাহিত্যের রাজধানী। (দ্রষ্টব্য : ‘আমার পিতা নয় পিতার অধিক’/মিনার মনসুর, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, পৃ. ১৫১)। আমার মনে হয়, তার এই ভবিষ্যদ্বাণী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

মিনার মনসুর: মননশীলতার চর্চা কিন্তু থেমে নেই। ফল্গুধারার মতো সেটি শুধু যে বহমান আছে তা-ই নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা এখন বিশ্বমানকে হয় ছুঁয়ে যাচ্ছে অথবা বিশ্বমানের সমান্তরাল হয়ে উঠেছে। তবে (আপনার আশঙ্কার সঙ্গে একমত হয়ে বলছি) সামগ্রিকভাবে আমার মনে হয় গ্রাফটি নিন্মমুখী।

যুগান্তর: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা জরুরি, না বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো জরুরি? বর্তমানে বাংলাদেশে এ বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা হচ্ছে বা কীভাবে মোকাবেলা করা উচিত?

মিনার মনসুর: আমি ফকির লালনের সহজিয়া দর্শনে বিশ্বাসী। একেবারে শৈশবে মর্মে গেঁথে যাওয়া সেই বাণী লক্ষ করুন: ‘একবার আপনারে চিনতে পারলে রে হবে অচেনারে চেনা...’। কিংবা ‘হাতের কাছে হয় না খবর কী দেখতে যাও দিল্লির শহর!’

আমার তো মনে হয়, এ দুটি বাণীর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আপনার জিজ্ঞাসার সবচেয়ে মোক্ষম উত্তরটি। সবার আগে নিজেকে চেনা দরকার। নিজেকে চিনতে হলে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চার, নিজের দেশকে, দেশের মানুষকে চেনার ও ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। লক্ষ করুন, আমাদের লালন যা বলেছেন সহস্রাধিক বছর আগে সক্রেটিসও ঠিক তাই বলে গেছেন।

যুগান্তর: সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো মন্দ বলবেন?

মিনার মনসুর: পুরস্কার তো এক ধরনের স্বীকৃতি। মানুষ মাত্রই তার কাজের স্বীকৃতি পেলে খুশি হয়। (এমনকি দেবতারাও তার ব্যতিক্রম নয়!) এটি তার মধ্যে নতুন উদ্যম-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর সৃষ্ট দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি আমাদের সমাজকে যেমন কলুষিত করেছে, তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক-পুরস্কারগুলোকেও কলুষিত করেছে শোচনীয়ভাবে। তার কুপ্রভাব সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

মিনার মনসুর: আমাদের সমালোচনা সাহিত্য আজ অবধি তার জন্মগত শারীরিক-মানসিক অপরিণতদশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছেন এটি যেমন সত্য, তেমনি সস্তার বাজারও যেন জমজমাট হয়ে উঠছে ক্রমেই। আমাদের গোষ্ঠীবদ্ধতামুক্ত ভালো মানের দায়িত্বশীল সাহিত্য পত্রিকা নেই।

সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতাগুলোও কর্তৃপক্ষের মারাত্মক অবহেলার শিকার। সব মিলিয়ে অবস্থাটা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

মিনার মনসুর: দুটোই সমভাবে সত্য।

যুগান্তর: প্রযুক্তির যুগে জ্ঞানার্জনের বাহন হিসেবে ছাপা বইয়ের ভূমিকা কমে যাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এখান থেকে উত্তরণের অথবা বইয়ে আকৃষ্ট করতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে?

মিনার মনসুর: হতাশার এই কৃষ্ণগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আমরা বহুমুখী তৎপরতা চালাচ্ছি। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটি হল, যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত বেসরকারি পাঠাগারগুলোকে আবারও সক্রিয় করে তোলা।

কারণ এগুলোই হল আমাদের প্রকৃত বাতিঘর। তাদের আমরা সুনির্বাচিত বই ও অর্থ সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। উদ্বুদ্ধ করছি নানাভাবে।

বর্তমানে রাজধানীর স্বনামধন্য ১০টি পাঠাগারকে নিয়ে ‘পড়ি বঙ্গবন্ধুর বই/সোনার মানুষ হই’ শীর্ষক একটি ধারাবাহিক পাঠ কার্যক্রম চলমান আছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহীত এ কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জাতির পিতার লেখা তিনটি বই- ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়াচীন’ পাঠে উদ্বুদ্ধ করছি।

অবিশ্বাস্য রকমের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, আমরা যে ঢালাওভাবে প্রায়শ বলে থাকি- ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইবিমুখ- কথাটি সত্য নয়। সঠিক সময়ে সঠিক ও সহৃদয় উদ্যোগ নেয়া গেলে তারা যে ব্যাপকভাবে বই পাঠে আগ্রহী হয়ে উঠবে- আমাদের এ কর্মসূচি তার প্রমাণ।

এটি একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি। এ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৮০০ পাঠাগারের মাধ্যমে দেশব্যাপী এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে চাই।

আমাদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা রয়েছে। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ডিজিটাল গ্রন্থপঞ্জি প্রণয়ন, বই নিয়ে আকর্ষণীয় উদ্বুদ্ধকরণ উপকরণ তৈরি করে গণমাধ্যমে প্রচার এবং পাঠাগারগুলোকে সম্পৃক্ত করে বিশিষ্ট লেখকদের জন্ম-মৃত্যু ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে বিশেষ পাঠ কার্যক্রম গ্রহণ অন্যতম।

যুগান্তর: আগে জেলা উপজেলা এমনকি পাড়া মহল্লাতেও সরকারি বেসরকারি লাইব্রেরি সক্রিয় ছিল। এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কারণ এবং এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায়গুলো কী?

মিনার মনসুর: নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান কারণটি হল, ‘এখন ঘরের খেয়ে বনের মোষ’ তাড়ানোর মতো মানুষ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। গ্রামে এমনকি ছোটখাটো কাজ করানোর মতো মানুষও খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃষি শ্রমিকের অভাবে বহু এলাকায় কৃষি কাজও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শহরের পাড়া-মহল্লার চিত্রও প্রায় অভিন্ন।

একদিকে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে উন্নত জীবনের প্রত্যাশা মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বই পড়া বা পড়ানোর জন্য যে বিশুদ্ধ অবকাশ দরকার সেটি কমে যাচ্ছে। পিতা-মাতারাও এখন আর সেভাবে সন্তানকে বই পড়ার কথা বলেন না।

বেরিয়ে আসার উপায় অবশ্যই আছে। আমার অফিসে একটি পদের বিপরীতে তিন হাজার পর্যন্ত আবেদন জমা পড়েছে। এতে বোঝা যায়, চাকরি বা কর্মসংস্থানের ওপর চাপ কতটা প্রবল। এ সংকটকেই কাজে লাগাতে হবে। পাঠাগার পরিচালনার ক্ষেত্রেও যত দ্রুত সম্ভব পেশাদারিত্ব নিয়ে আসতে হবে।

সম্ভব হলে প্রতিটি পাঠাগারে পূর্ণকালীন একজন গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দেয়া এবং পাঠাগারগুলোকে ডিজিটালাইজড করে তার সেবার পরিধি আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যাতে পাঠাগারগুলোর দরজা সবসময় খোলা থাকে এবং তরুণ-প্রবীণরা সেখানে আসতে তীব্র তাগিদ/আকর্ষণ অনুভব করে।

যুগান্তর: বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫০০০ বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না, এতে প্রকাশনায় আর্থিক এবং সময়ের ব্যাপক অপচয় হয়।

পাঠকও বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। এ বিষয়টি নিয়ে গ্রন্থকেন্দ্রের বা সরকারের কিছু করার আছে?

মিনার মনসুর: আপনি যে-কথাটি বলেছেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীও গত বইমেলার পর এমন একটি কথা বলেছিলেন এক আলোচনায়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আমরা মানসম্পন্ন বই প্রকাশ, বিপণন ও ক্রয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

ভবিষ্যতে এদিকে আরও বেশি নজর দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রকাশকদের সঙ্গে যৌথভাবে কিছু কার্যক্রম গ্রহণের প্রক্রিয়াও অব্যাহত আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল, ভালো পাঠক তৈরি করা। সেটি করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরা এদিকটাতেও কাজ করছি।

লক্ষ করলে দেখবেন, গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রকাশিত (সরাসরি অথবা প্রকাশকের মাধ্যমে) বইয়ের সংখ্যাই বেশি। প্রকাশনাবিষয়ক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, আর্থিক সচ্ছলতা (এবং কিছুটা রাতারাতি খ্যাতিমান হওয়ার তাগিদ থেকেও) যথেচ্ছভাবে বই প্রকাশিত হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।

অপেশাদার কিছু কিছু প্রকাশনা সংস্থাও টিকে থাকার স্বার্থে হয়তো এ সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে। আমি বলি, শত ফুল ফুটুক না। ক্ষতি কী! যা থাকার থাকবে। আর যা মুছে যাওয়ার তা মুছে যাবে।

যুগান্তর: প্রকাশনাগুলোতে যে সম্পাদনা পরিষদ থাকার কথা তা অল্পকিছু প্রকাশনীতে নামমাত্র থাকলেও বেশিরভাগ প্রকাশনীতে নেই। এ ব্যাপারে গ্রন্থকেন্দ্রের ভূমিকা বা আপনার কী পরামর্শ থাকতে পারে?

মিনার মনসুর: আপনার পর্যবেক্ষণ যথার্থ। যোগ্য সম্পাদক বা সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া ভালো মানের বই বা প্রকাশনা কখনই সম্ভব না। কিন্তু বাস্তবে এখানে বড় ধরনের শূন্যতা বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা দুটি।

প্রথমত অনেকের সম্পাদক নিয়োগের মতো সামর্থ্যই নেই। আবার কারও কারও সামর্থ্য থাকলেও আগ্রহ নেই। এছাড়া আরও কিছু গুরুতর সমস্যা রয়েছে- যার সঙ্গে শিল্প ও পেশাদারিত্বের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্যই বলা চলে। আমাদের প্রকাশনা কিন্তু দ্রুত আকারে বাড়ছে।

কিন্তু প্রকাশনাকে প্রকৃত শিল্প হয়ে উঠতে হলে এ দিকগুলোতে নজর দিতে হবে। তারা যত দ্রুত পেশাদারি মনোভাবকে স্বাগত জানাবে, পরিস্থিতিরও তত দ্রুত পরিবর্তন ঘটবে বলে আমি মনে করি।

যুগান্তর: শুধু বইমেলাকে কেন্দ্র করেই বই প্রকাশে প্রকাশকরা জোর দিয়ে থাকেন। বলা যায় বইমেলার আগের ৩ মাস থেকে বইমেলা শেষ হওয়া পর্যন্তই বই নিয়ে বেশিরভাগ প্রকাশকের কর্মকাণ্ড। এরপর তারা প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকেন। বই নিয়ে আলোচনা বিজ্ঞাপন তথা বিপণনের দায়িত্ব কি তারা যথাযথ পালন করে?

মিনার মনসুর: আমি যে পেশাদারিত্বের কথা বলছি- এ সমস্যাটিও তারই অংশ। আগ্রাসী ও সুপরিকল্পিত বিপণন কৌশল ছাড়া এ যুগে বিনিয়োগ বা শিল্পের কথা ভাবাই যায় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সুচিন্তিতভাবে এ কাজটি করা গেলে ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৩০০ বই বিক্রি করার জন্য প্রকাশককে গলদঘর্ম হতে হতো না। ভালো পাঠকের এ হাহাকারও থাকত না।

যুগান্তর: এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

মিনার মনসুর: লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।

নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ নাজিম হিকমতের ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল, ব্রাদার’, ফ্রানজ কাফকার ‘মেটামরফসিস’, বঙ্কিমের ‘কপালকুণ্ডলা’, মানিকের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘দুখিয়ার কুঠি’ এবং আলাউদ্দিন খাঁ’র ‘আমার কথা’সহ আরও যে বইগুলোর নাম বলতে পারলাম না তারা নিশ্চয় আমাকে ক্ষমা করবেন!

‘বেসরকারি পাঠাগারগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে’

 জুননু রাইন 
৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৪:২৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মিনার মনসুরের জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০ সালে, চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (১৯৮৩) ও স্নাতকোত্তর (১৯৮৪)। 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম মাইলফলক স্মারকগ্রন্থ ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ সম্পাদনা করেছেন ১৯৭৯ সালে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ‘আবার যুদ্ধে যাবো’ শিরোনামে একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছেন ১৯৮০ সালে। 

১৯৮৩ সালে বাজেয়াপ্ত হয়েছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’। লেখালেখির শুরু সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে। মূলত কবি। তবে গদ্যেও দ্যুতিময় তার কলম। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘকাল। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন। 

দীর্ঘ প্রায় এক যুগ কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক ও সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান হিসেবে। বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক। গদ্যপদ্য মিলিয়ে তার প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় ৩০।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: জুননু রাইন

যুগান্তর: স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলাসাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলাসাহিত্য কতদূর এগিয়েছে?

মিনার মনসুর: সময় নিশ্চিতভাবে সাহিত্যে তার একটি ছাপ রেখে যায়। আর সেই সময় যদি ভৌগলিক বিভাজন (বাংলা ভাগ), রক্ত ও অশ্রুসমুদ্র পাড়ি দেয়া একটি মুক্তিযুদ্ধ এবং সপরিবারে জাতির পিতাকে নৃশংসভাবে হত্যার মতো অভাবনীয় সব ঘটনার অভিঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়- তাহলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য; যেমনটি হয়েছিল ফ্রানজ কাফকার ক্ষেত্রে। 

ফলে ভাষা ও সংস্কৃতি অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার সাহিত্যের স্বাদ আর আমাদের সাহিত্যের স্বাদ এক নয়। বহু বছর আগের এক সাক্ষাৎকারে অন্নদাশঙ্কর রায় আমাকে বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বাঙালিকে যদি কখনও বাংলাসাহিত্যের সন্ধানে বেরোতে হয়, তাকে যেতে হবে ঢাকায়। 

ঢাকাই হবে বাংলাসাহিত্যের রাজধানী। (দ্রষ্টব্য : ‘আমার পিতা নয় পিতার অধিক’/মিনার মনসুর, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, পৃ. ১৫১)। আমার মনে হয়, তার এই ভবিষ্যদ্বাণী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

মিনার মনসুর: মননশীলতার চর্চা কিন্তু থেমে নেই। ফল্গুধারার মতো সেটি শুধু যে বহমান আছে তা-ই নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা এখন বিশ্বমানকে হয় ছুঁয়ে যাচ্ছে অথবা বিশ্বমানের সমান্তরাল হয়ে উঠেছে। তবে (আপনার আশঙ্কার সঙ্গে একমত হয়ে বলছি) সামগ্রিকভাবে আমার মনে হয় গ্রাফটি নিন্মমুখী।

যুগান্তর: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা জরুরি, না বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো জরুরি? বর্তমানে বাংলাদেশে এ বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা হচ্ছে বা কীভাবে মোকাবেলা করা উচিত?

মিনার মনসুর: আমি ফকির লালনের সহজিয়া দর্শনে বিশ্বাসী। একেবারে শৈশবে মর্মে গেঁথে যাওয়া সেই বাণী লক্ষ করুন: ‘একবার আপনারে চিনতে পারলে রে হবে অচেনারে চেনা...’। কিংবা ‘হাতের কাছে হয় না খবর কী দেখতে যাও দিল্লির শহর!’ 

আমার তো মনে হয়, এ দুটি বাণীর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আপনার জিজ্ঞাসার সবচেয়ে মোক্ষম উত্তরটি। সবার আগে নিজেকে চেনা দরকার। নিজেকে চিনতে হলে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চার, নিজের দেশকে, দেশের মানুষকে চেনার ও ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। লক্ষ করুন, আমাদের লালন যা বলেছেন সহস্রাধিক বছর আগে সক্রেটিসও ঠিক তাই বলে গেছেন।

যুগান্তর: সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো মন্দ বলবেন?

মিনার মনসুর: পুরস্কার তো এক ধরনের স্বীকৃতি। মানুষ মাত্রই তার কাজের স্বীকৃতি পেলে খুশি হয়। (এমনকি দেবতারাও তার ব্যতিক্রম নয়!) এটি তার মধ্যে নতুন উদ্যম-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। 

সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর সৃষ্ট দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি আমাদের সমাজকে যেমন কলুষিত করেছে, তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক-পুরস্কারগুলোকেও কলুষিত করেছে শোচনীয়ভাবে। তার কুপ্রভাব সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

মিনার মনসুর: আমাদের সমালোচনা সাহিত্য আজ অবধি তার জন্মগত শারীরিক-মানসিক অপরিণতদশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছেন এটি যেমন সত্য, তেমনি সস্তার বাজারও যেন জমজমাট হয়ে উঠছে ক্রমেই। আমাদের গোষ্ঠীবদ্ধতামুক্ত ভালো মানের দায়িত্বশীল সাহিত্য পত্রিকা নেই। 

সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতাগুলোও কর্তৃপক্ষের মারাত্মক অবহেলার শিকার। সব মিলিয়ে অবস্থাটা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

মিনার মনসুর: দুটোই সমভাবে সত্য।

যুগান্তর: প্রযুক্তির যুগে জ্ঞানার্জনের বাহন হিসেবে ছাপা বইয়ের ভূমিকা কমে যাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এখান থেকে উত্তরণের অথবা বইয়ে আকৃষ্ট করতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে?

মিনার মনসুর: হতাশার এই কৃষ্ণগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আমরা বহুমুখী তৎপরতা চালাচ্ছি। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটি হল, যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত বেসরকারি পাঠাগারগুলোকে আবারও সক্রিয় করে তোলা। 

কারণ এগুলোই হল আমাদের প্রকৃত বাতিঘর। তাদের আমরা সুনির্বাচিত বই ও অর্থ সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। উদ্বুদ্ধ করছি নানাভাবে।

বর্তমানে রাজধানীর স্বনামধন্য ১০টি পাঠাগারকে নিয়ে ‘পড়ি বঙ্গবন্ধুর বই/সোনার মানুষ হই’ শীর্ষক একটি ধারাবাহিক পাঠ কার্যক্রম চলমান আছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহীত এ কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জাতির পিতার লেখা তিনটি বই- ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়াচীন’ পাঠে উদ্বুদ্ধ করছি। 

অবিশ্বাস্য রকমের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, আমরা যে ঢালাওভাবে প্রায়শ বলে থাকি- ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইবিমুখ- কথাটি সত্য নয়। সঠিক সময়ে সঠিক ও সহৃদয় উদ্যোগ নেয়া গেলে তারা যে ব্যাপকভাবে বই পাঠে আগ্রহী হয়ে উঠবে- আমাদের এ কর্মসূচি তার প্রমাণ।

এটি একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি। এ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৮০০ পাঠাগারের মাধ্যমে দেশব্যাপী এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে চাই।

আমাদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা রয়েছে। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ডিজিটাল গ্রন্থপঞ্জি প্রণয়ন, বই নিয়ে আকর্ষণীয় উদ্বুদ্ধকরণ উপকরণ তৈরি করে গণমাধ্যমে প্রচার এবং পাঠাগারগুলোকে সম্পৃক্ত করে বিশিষ্ট লেখকদের জন্ম-মৃত্যু ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে বিশেষ পাঠ কার্যক্রম গ্রহণ অন্যতম।

যুগান্তর: আগে জেলা উপজেলা এমনকি পাড়া মহল্লাতেও সরকারি বেসরকারি লাইব্রেরি সক্রিয় ছিল। এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কারণ এবং এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায়গুলো কী?

মিনার মনসুর: নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান কারণটি হল, ‘এখন ঘরের খেয়ে বনের মোষ’ তাড়ানোর মতো মানুষ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। গ্রামে এমনকি ছোটখাটো কাজ করানোর মতো মানুষও খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃষি শ্রমিকের অভাবে বহু এলাকায় কৃষি কাজও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শহরের পাড়া-মহল্লার চিত্রও প্রায় অভিন্ন। 

একদিকে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে উন্নত জীবনের প্রত্যাশা মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বই পড়া বা পড়ানোর জন্য যে বিশুদ্ধ অবকাশ দরকার সেটি কমে যাচ্ছে। পিতা-মাতারাও এখন আর সেভাবে সন্তানকে বই পড়ার কথা বলেন না।

বেরিয়ে আসার উপায় অবশ্যই আছে। আমার অফিসে একটি পদের বিপরীতে তিন হাজার পর্যন্ত আবেদন জমা পড়েছে। এতে বোঝা যায়, চাকরি বা কর্মসংস্থানের ওপর চাপ কতটা প্রবল। এ সংকটকেই কাজে লাগাতে হবে। পাঠাগার পরিচালনার ক্ষেত্রেও যত দ্রুত সম্ভব পেশাদারিত্ব নিয়ে আসতে হবে। 

সম্ভব হলে প্রতিটি পাঠাগারে পূর্ণকালীন একজন গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দেয়া এবং পাঠাগারগুলোকে ডিজিটালাইজড করে তার সেবার পরিধি আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যাতে পাঠাগারগুলোর দরজা সবসময় খোলা থাকে এবং তরুণ-প্রবীণরা সেখানে আসতে তীব্র তাগিদ/আকর্ষণ অনুভব করে।

যুগান্তর: বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫০০০ বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না, এতে প্রকাশনায় আর্থিক এবং সময়ের ব্যাপক অপচয় হয়। 

পাঠকও বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। এ বিষয়টি নিয়ে গ্রন্থকেন্দ্রের বা সরকারের কিছু করার আছে?

মিনার মনসুর: আপনি যে-কথাটি বলেছেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীও গত বইমেলার পর এমন একটি কথা বলেছিলেন এক আলোচনায়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আমরা মানসম্পন্ন বই প্রকাশ, বিপণন ও ক্রয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। 

ভবিষ্যতে এদিকে আরও বেশি নজর দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রকাশকদের সঙ্গে যৌথভাবে কিছু কার্যক্রম গ্রহণের প্রক্রিয়াও অব্যাহত আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল, ভালো পাঠক তৈরি করা। সেটি করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরা এদিকটাতেও কাজ করছি।

লক্ষ করলে দেখবেন, গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রকাশিত (সরাসরি অথবা প্রকাশকের মাধ্যমে) বইয়ের সংখ্যাই বেশি। প্রকাশনাবিষয়ক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, আর্থিক সচ্ছলতা (এবং কিছুটা রাতারাতি খ্যাতিমান হওয়ার তাগিদ থেকেও) যথেচ্ছভাবে বই প্রকাশিত হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। 

অপেশাদার কিছু কিছু প্রকাশনা সংস্থাও টিকে থাকার স্বার্থে হয়তো এ সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে। আমি বলি, শত ফুল ফুটুক না। ক্ষতি কী! যা থাকার থাকবে। আর যা মুছে যাওয়ার তা মুছে যাবে।

যুগান্তর: প্রকাশনাগুলোতে যে সম্পাদনা পরিষদ থাকার কথা তা অল্পকিছু প্রকাশনীতে নামমাত্র থাকলেও বেশিরভাগ প্রকাশনীতে নেই। এ ব্যাপারে গ্রন্থকেন্দ্রের ভূমিকা বা আপনার কী পরামর্শ থাকতে পারে?

মিনার মনসুর: আপনার পর্যবেক্ষণ যথার্থ। যোগ্য সম্পাদক বা সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া ভালো মানের বই বা প্রকাশনা কখনই সম্ভব না। কিন্তু বাস্তবে এখানে বড় ধরনের শূন্যতা বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা দুটি। 

প্রথমত অনেকের সম্পাদক নিয়োগের মতো সামর্থ্যই নেই। আবার কারও কারও সামর্থ্য থাকলেও আগ্রহ নেই। এছাড়া আরও কিছু গুরুতর সমস্যা রয়েছে- যার সঙ্গে শিল্প ও পেশাদারিত্বের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্যই বলা চলে। আমাদের প্রকাশনা কিন্তু দ্রুত আকারে বাড়ছে। 

কিন্তু প্রকাশনাকে প্রকৃত শিল্প হয়ে উঠতে হলে এ দিকগুলোতে নজর দিতে হবে। তারা যত দ্রুত পেশাদারি মনোভাবকে স্বাগত জানাবে, পরিস্থিতিরও তত দ্রুত পরিবর্তন ঘটবে বলে আমি মনে করি।

যুগান্তর: শুধু বইমেলাকে কেন্দ্র করেই বই প্রকাশে প্রকাশকরা জোর দিয়ে থাকেন। বলা যায় বইমেলার আগের ৩ মাস থেকে বইমেলা শেষ হওয়া পর্যন্তই বই নিয়ে বেশিরভাগ প্রকাশকের কর্মকাণ্ড। এরপর তারা প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকেন। বই নিয়ে আলোচনা বিজ্ঞাপন তথা বিপণনের দায়িত্ব কি তারা যথাযথ পালন করে?

মিনার মনসুর: আমি যে পেশাদারিত্বের কথা বলছি- এ সমস্যাটিও তারই অংশ। আগ্রাসী ও সুপরিকল্পিত বিপণন কৌশল ছাড়া এ যুগে বিনিয়োগ বা শিল্পের কথা ভাবাই যায় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সুচিন্তিতভাবে এ কাজটি করা গেলে ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৩০০ বই বিক্রি করার জন্য প্রকাশককে গলদঘর্ম হতে হতো না। ভালো পাঠকের এ হাহাকারও থাকত না।

যুগান্তর: এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

মিনার মনসুর: লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।

নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ নাজিম হিকমতের ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল, ব্রাদার’, ফ্রানজ কাফকার ‘মেটামরফসিস’, বঙ্কিমের ‘কপালকুণ্ডলা’, মানিকের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘দুখিয়ার কুঠি’ এবং আলাউদ্দিন খাঁ’র ‘আমার কথা’সহ আরও যে বইগুলোর নাম বলতে পারলাম না তারা নিশ্চয় আমাকে ক্ষমা করবেন!