‘শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, কেবল রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে’
jugantor
‘শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, কেবল রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে’

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৭ নভেম্বর ২০২০, ০০:৫০:০৪  |  অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, কেবল রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে’

আহমদ কবিরের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২ জুলাই, চট্টগ্রামে। স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া; মেট্রিকুলেশন পাস। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ; তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বাংলায় এমএ পাস ১৯৬৭। ১৯৬৮ সালে বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও গবেষক হিসেবে যোগদান।
’৬৯-এ প্রভাষক পদে সরকারি জগন্নাথ কলেজে নৈশভাগে যোগদান এবং একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে সমাজ ভাষাবিজ্ঞান প্রকল্পে (socio logistic project) একজন সদস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ। আহমদ কবির বাংলা একাডেমির ‘বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস’ প্রকল্পের একজন লেখক।

‘বাংলার ইতিহাস’ প্রকল্পের ভাষা-পর্যালোচক এবং অনুবাদক। প্রকাশিত গ্রন্থ- ‘রবীন্দ্র বাক্য : উপমা ও প্রতীক’, ‘সরদার জয়েনউদ্দীন’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘আহমদ শরীফ’, ‘সাহিত্য সমালোচনা’।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জুননু রাইন

যুগান্তর : দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন এবং সাহিত্যের অধ্যাপনাও করেছেন। এ সাহিত্য যাপনের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে উল্লেখ করার মতো বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?

আহমদ কবির : আমি পাকিস্তানি আমল থেকে এ ভূখণ্ডের সাহিত্যের একজন পর্যবেক্ষক। বিরুদ্ধ পরিবেশে ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এখানে যে সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, তার চরিত্র্য সম্পূর্ণ আলাদা।

বাংলা দেশের স্বাধীনতার পর নবউদ্যমে আমরা সৃষ্টিশীল ও মননবুদ্ধিতে এগিয়ে এসেছি। বাঙালি ও বাঙালি চেতনা নিয়ে অনেক গুরুতর কাজ এখানে হয়েছে। উল্লেখ্য, বেলি রোডকে কেন্দ্র করে নতুন নাটকও মঞ্চায়ন প্রথম শুরু হয়েছে।

যুগান্তর: স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে?

ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলাসাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলাসাহিত্যে কতদূর এগিয়েছে?

আহমদ কবির: আমি বলব না। এতদিন পর আমাদের মনে হচ্ছে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য অনেকটা হারিয়েছি। শিল্পমানেরও হানি ঘটেছে।

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

আহমদ কবির: সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে মননশীলতার বিশেষ উন্নতি ঘটেছে। তবে আমাদের মধ্যে এখনও গুটিকয় মননশীল লেখক আছেন যারা অপর বাংলায়ও স্বীকৃত।

যুগান্তর: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা জরুরি, না বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো জরুরি? বর্তমানে বাংলাদেশে এ বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা হচ্ছে বা কীভাবে মোকাবেলা করা উচিত?

আহমদ কবির: বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো সহজ নয়। অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল। এগুলো আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি দুটোই নষ্ট করছে। এ জন্য নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা বেশি করা উচিত।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

আহমদ কবির: ভালো লেখকের সংখ্যাও কমেছে, ভালো পাঠকও কমছে। এর জন্য দায়ী টেলিভিশন আর রাজনীতি। উপন্যাস গল্পও কেউ পড়ে না। বিশেষ লেখকের ছাড়া।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন

আহমদ কবির: গুরুত্বপূর্ণ ও ভালো লেখকেরা কম আলোচিত নয়। তবে অনেকে না পড়েও লেখকবিশেষের নামধাম ও বিজ্ঞাপন নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীরাও বাণিজ্য, প্রযুক্তি, চাকরি উপযোগী পড়া পড়তে চায়। তারা সাহিত্য পড়ে না।

তাছাড়া বাংলাভাষার যে সাহিত্যরূপ আছে বেশিরভাগ পড়ুয়া তা বোঝে না। শুধু ফর্মুলা অনুযায়ী ভালো ফল করার প্রয়াস।

যুগান্তর: লেখকের অর্ধ সত্য বক্তব্য কি সাধারণ মানুষের জন্য অর্ধপ্রাপ্তি যোগ করে? না বিভ্রান্ত করে? এতে পাঠক তথা জনগণের লাভ-ক্ষতির হিসাবটি কোথায় এসে দাঁড়ায়?

আহমদ কবির: অর্ধ সত্য বলা বা প্রকাশ করা তো ভারি ক্ষতিকর। এটা তো কেবল বিভ্রান্তি নয়, নৈতিক অবমূল্যায়ন।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই এমন তিনজন লেখকের নাম।

আহমদ কবির: নানা ঢংয়ের নানা রঙের লেখক বেরিয়েছে এবং এরা আলোচিত হচ্ছে। তবে এদের নাম নেয়ার প্রয়োজন নেই।

যুগান্তর: অনেক লেখককেই দেখা যায় কোনো এক রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে অন্য দলের সমালোচনা করেন।

লেখক কী ভিন্নভাবে নিজের অবস্থান থেকে যে কোনো দলের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরতে পারে না? কোনো আদর্শ লেখকের সার্বক্ষণিক সমর্থন পাওয়ার মতো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে আছে?

আহমদ কবির: সে রকম এখন পারেন না। এরা লাভ-লোভ ও পদ লাভের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করে, আদর্শের জন্য নয়। তবে বাম চেতনা থাকলে ওই রকম দলকে সমর্থন করা যেতে পারে।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার বলে মনে করেন?

আহমদ কবির : এ তালিকা বিরাট হবে।তবে বাংলাদেশের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধের উল্লেখযোগ্য লেখাগুলো বিদেশি ভাষায় অনুবাদ সমীচীন।

যুগান্তর : আগে জেলা উপজেলা এমনকি পাড়া মহল্লাতেও সরকারি বেসরকারি লাইব্রেরি সক্রিয় ছিল। এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কারণ এবং এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায়গুলো কী?

আহমদ কবির: এটা ঠিক। কিন্তু, এখন বাংলাদেশের সর্বত্র লাইব্রেরি অচল হয়ে আছে। পড়–য়ারা বেকার, রাজনৈতিক মস্তানির সঙ্গে যুক্ত। এদের জীবন ধারণের ব্যবস্থা থাকলে এরা লাইব্রেরিমুখী হবে।

যুগান্তর: বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫০০০ বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না, এতে প্রকাশনায় অর্থিক এবং সময়ের ব্যাপক অপচয় হয়।

পাঠকও বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

আহমদ কবির: উপায় ভালো বই প্রকাশ করা এবং ভালো পড়ুয়া তৈরি করা। রাজনীতি সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। দলীয় বই যতই রচিত হবে ততই গ্রন্থ জগতের ক্ষতি হবে।

যুগান্তর: শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

আহমদ কবির: তেমন কার্যকর নয়। শিক্ষা নিয়ে নানা রকম তেলেশমাতি। যারা শিক্ষার লোক নন, তাদের হাতে শিক্ষা পড়লে যা ঘটার তাই ঘটেছে।

যুগান্তর: দেশের ব্যাপক উন্নয়নের প্রচার চোখে পড়ছে। বলা হচ্ছে দেশ এখন ‘উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে’। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও কি উন্নয়ন হয়েছে?

উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের শিক্ষার উন্নয়ন সম্পর্কে জানতে চাই, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা...

আহমদ কবির: শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। কেবল শহরাঞ্চলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে, সেতু হচ্ছে, ওড়াল রেল হচ্ছে, পাতাল রেল হচ্ছে। শহর বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল। কিন্তু বিশাল বাংলা পড়ে আছে- বন্যায়, খরায়, ঘূর্ণিঝড়ে, জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের গ্রামবাংলার মানুষ।

যুগান্তর: স্কুল পর্যায়ে শিল্পবিষয়ক যে চারু ও কারুকলা বিভাগ ছিল, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা তা একেবারেই গুরুত্বহীনভাবে রেখেছে। কেউ চাইলে পড়তে পারে নাও পড়তে পারে; ফাইনাল পরীক্ষায় এর মার্কও যুক্ত হয় না। এ রকম একটি সীদ্ধান্ত সংস্কৃতিমনা বাঙালি জাতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?

আহমদ কবির: চারু ও কারুকলা স্কুলে আবশ্যিকভাবে পড়ানো উচিত। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে এগুলো পড়ানো হয়। আমি বলব এগুলোর সঙ্গে সঙ্গীতও পড়াতে হবে। এগুলো বাদ দিলে জাতীয় সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হবে।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম-

আহমদ কবির: বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও হাসান আজিজুল হক।

‘শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, কেবল রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে’

 যুগান্তর ডেস্ক 
২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:৫০ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি, কেবল রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে’
ছবি: যুগান্তর

আহমদ কবিরের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২ জুলাই, চট্টগ্রামে। স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া; মেট্রিকুলেশন পাস। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ; তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

বাংলায় এমএ পাস ১৯৬৭। ১৯৬৮ সালে বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও গবেষক হিসেবে যোগদান। 
’৬৯-এ প্রভাষক পদে সরকারি জগন্নাথ কলেজে নৈশভাগে যোগদান এবং একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে সমাজ ভাষাবিজ্ঞান প্রকল্পে (socio logistic project) একজন সদস্য। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ। আহমদ কবির বাংলা একাডেমির ‘বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস’ প্রকল্পের একজন লেখক। 

‘বাংলার ইতিহাস’ প্রকল্পের ভাষা-পর্যালোচক এবং অনুবাদক। প্রকাশিত গ্রন্থ- ‘রবীন্দ্র বাক্য : উপমা ও প্রতীক’, ‘সরদার জয়েনউদ্দীন’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘আহমদ শরীফ’, ‘সাহিত্য সমালোচনা’।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জুননু রাইন

যুগান্তর : দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন এবং সাহিত্যের অধ্যাপনাও করেছেন। এ সাহিত্য যাপনের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে উল্লেখ করার মতো বিশেষ কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?

আহমদ কবির : আমি পাকিস্তানি আমল থেকে এ ভূখণ্ডের সাহিত্যের একজন পর্যবেক্ষক। বিরুদ্ধ পরিবেশে ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এখানে যে সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, তার চরিত্র্য সম্পূর্ণ আলাদা। 

বাংলা দেশের স্বাধীনতার পর নবউদ্যমে আমরা সৃষ্টিশীল ও মননবুদ্ধিতে এগিয়ে এসেছি। বাঙালি ও বাঙালি চেতনা নিয়ে অনেক গুরুতর কাজ এখানে হয়েছে। উল্লেখ্য, বেলি রোডকে কেন্দ্র করে নতুন নাটকও মঞ্চায়ন প্রথম শুরু হয়েছে। 

যুগান্তর: স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাসাহিত্য কতটা বাংলাদেশি সাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছে? 

ব্রিটিশ-পাকিস্তান পর্বের বাংলাসাহিত্যের তুলনায় শিল্প-মানে এ সময়ের (’৭১ পরবর্তী) বাংলাসাহিত্যে কতদূর এগিয়েছে?

আহমদ কবির: আমি বলব না। এতদিন পর আমাদের মনে হচ্ছে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য অনেকটা হারিয়েছি। শিল্পমানেরও হানি ঘটেছে। 

যুগান্তর: আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১ পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২০ সালে এসে কী বলবেন?

আহমদ কবির: সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে মননশীলতার বিশেষ উন্নতি ঘটেছে। তবে আমাদের মধ্যে এখনও গুটিকয় মননশীল লেখক আছেন যারা অপর বাংলায়ও স্বীকৃত।

যুগান্তর: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা জরুরি, না বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো জরুরি? বর্তমানে বাংলাদেশে এ বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা হচ্ছে বা কীভাবে মোকাবেলা করা উচিত?

আহমদ কবির: বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো সহজ নয়। অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল। এগুলো আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি দুটোই নষ্ট করছে। এ জন্য নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা বেশি করা উচিত।

যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

আহমদ কবির: ভালো লেখকের সংখ্যাও কমেছে, ভালো পাঠকও কমছে। এর জন্য দায়ী টেলিভিশন আর রাজনীতি। উপন্যাস গল্পও কেউ পড়ে না। বিশেষ লেখকের ছাড়া।

যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কী কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন

আহমদ কবির: গুরুত্বপূর্ণ ও ভালো লেখকেরা কম আলোচিত নয়। তবে অনেকে না পড়েও লেখকবিশেষের নামধাম ও বিজ্ঞাপন নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীরাও বাণিজ্য, প্রযুক্তি, চাকরি উপযোগী পড়া পড়তে চায়। তারা সাহিত্য পড়ে না। 

তাছাড়া বাংলাভাষার যে সাহিত্যরূপ আছে বেশিরভাগ পড়ুয়া তা বোঝে না। শুধু ফর্মুলা অনুযায়ী ভালো ফল করার প্রয়াস।

যুগান্তর: লেখকের অর্ধ সত্য বক্তব্য কি সাধারণ মানুষের জন্য অর্ধপ্রাপ্তি যোগ করে? না বিভ্রান্ত করে? এতে পাঠক তথা জনগণের লাভ-ক্ষতির হিসাবটি কোথায় এসে দাঁড়ায়?

আহমদ কবির: অর্ধ সত্য বলা বা প্রকাশ করা তো ভারি ক্ষতিকর। এটা তো কেবল বিভ্রান্তি নয়, নৈতিক অবমূল্যায়ন।

যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই এমন তিনজন লেখকের নাম।

আহমদ কবির:  নানা ঢংয়ের নানা রঙের লেখক বেরিয়েছে এবং এরা আলোচিত হচ্ছে। তবে এদের নাম নেয়ার প্রয়োজন নেই। 

যুগান্তর: অনেক লেখককেই দেখা যায় কোনো এক রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে অন্য দলের সমালোচনা করেন। 

লেখক কী ভিন্নভাবে নিজের অবস্থান থেকে যে কোনো দলের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরতে পারে না? কোনো আদর্শ লেখকের সার্বক্ষণিক সমর্থন পাওয়ার মতো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে আছে?

আহমদ কবির: সে রকম এখন পারেন না। এরা লাভ-লোভ ও পদ লাভের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করে, আদর্শের জন্য নয়। তবে বাম চেতনা থাকলে ওই রকম দলকে সমর্থন করা যেতে পারে।

যুগান্তর: বাংলাভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার বলে মনে করেন?

আহমদ কবির : এ তালিকা বিরাট হবে।তবে বাংলাদেশের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধের উল্লেখযোগ্য লেখাগুলো বিদেশি ভাষায় অনুবাদ সমীচীন।

যুগান্তর : আগে জেলা উপজেলা এমনকি পাড়া মহল্লাতেও সরকারি বেসরকারি লাইব্রেরি সক্রিয় ছিল। এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কারণ এবং এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায়গুলো কী?

আহমদ কবির: এটা ঠিক। কিন্তু, এখন বাংলাদেশের সর্বত্র লাইব্রেরি অচল হয়ে আছে। পড়–য়ারা বেকার, রাজনৈতিক মস্তানির সঙ্গে যুক্ত। এদের জীবন ধারণের ব্যবস্থা থাকলে এরা লাইব্রেরিমুখী হবে। 

যুগান্তর: বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় ৫০০০ বইয়ের মধ্যে ৫০টি বইও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার যোগ্য হয় না, এতে প্রকাশনায় অর্থিক এবং সময়ের ব্যাপক অপচয় হয়। 

পাঠকও বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

আহমদ কবির: উপায় ভালো বই প্রকাশ করা এবং ভালো পড়ুয়া তৈরি করা। রাজনীতি সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। দলীয় বই যতই রচিত হবে ততই গ্রন্থ জগতের ক্ষতি হবে।

যুগান্তর: শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

আহমদ কবির: তেমন কার্যকর নয়। শিক্ষা নিয়ে নানা রকম তেলেশমাতি। যারা শিক্ষার লোক নন, তাদের হাতে শিক্ষা পড়লে যা ঘটার তাই ঘটেছে।

যুগান্তর: দেশের ব্যাপক উন্নয়নের প্রচার চোখে পড়ছে। বলা হচ্ছে দেশ এখন ‘উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে’। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও কি উন্নয়ন হয়েছে? 

উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের শিক্ষার উন্নয়ন সম্পর্কে জানতে চাই, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা...

আহমদ কবির: শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। কেবল শহরাঞ্চলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে, সেতু হচ্ছে, ওড়াল রেল হচ্ছে, পাতাল রেল হচ্ছে। শহর বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল। কিন্তু বিশাল বাংলা পড়ে আছে- বন্যায়, খরায়, ঘূর্ণিঝড়ে, জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের গ্রামবাংলার মানুষ। 

যুগান্তর: স্কুল পর্যায়ে শিল্পবিষয়ক যে চারু ও কারুকলা বিভাগ ছিল, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা তা একেবারেই গুরুত্বহীনভাবে রেখেছে। কেউ চাইলে পড়তে পারে নাও পড়তে পারে; ফাইনাল পরীক্ষায় এর মার্কও যুক্ত হয় না। এ রকম একটি সীদ্ধান্ত সংস্কৃতিমনা বাঙালি জাতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?

আহমদ কবির: চারু ও কারুকলা স্কুলে আবশ্যিকভাবে পড়ানো উচিত। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে এগুলো পড়ানো হয়। আমি বলব এগুলোর সঙ্গে সঙ্গীতও পড়াতে হবে। এগুলো বাদ দিলে জাতীয় সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হবে।

যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম-

আহমদ কবির: বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও হাসান আজিজুল হক।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন