একগুচ্ছ কবিতা

  কামরুল আলম সিদ্দিকী ১১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০১ | অনলাইন সংস্করণ

কামরুল আলম সিদ্দিকী'র একগুচ্ছ কবিতা

মাঝি

রূপবান গাঁও!

নুয়ে পড়ে বাঁশঘর- - - -

বৈকালের ছায়া- - - -

তরণীর।

বাও মাঝি তোড়ে

আর একটু উজানে

ওই তীরে তার সুখনীড় ।

হাওরের বুকে- - -

কার যেন ভরা দুখে

হু হু নামে উজানের স্রোত ।

ঘোড়াঊত্রা নদী- - - -

মাঝি এইখানে তার

সাত পুরুষের সুখ- দুখ।

ধীরে বাও- - - ধীরে - - -

এইখানে হাফ ছেড়ে

নেবো মাঝি জীবনের সুখ।

এই মহাস্রোতে- - - -

বয়ে নাও তোড়ে

বলো মাঝি বলো- - -

তুমি কোন লোক!

আর একটা শীত ক্ষয়ে যাবে

আর একটা শীত ক্ষয়ে যাবে---

জীবনের হাতে গোনা ক'টি ঋতু থেকে।

আর একটা শীত ক্ষয়ে যাবে---

একটা নৈঃশব্দ্য জীবনীর মতো ঘোলাটে-নিরীহ কুয়াশা নিয়ে।

আর একটা শীত ক্ষয়ে যাবে অচিরেই---

আর একটা নৈঃশব্দ্য গল্প-সন্ধ্যা নিয়ে।

নাতিদীর্ঘ আয়ুষ্কাল নিয়ে শিশিরেরা আর আম-বোলের কাছে

তাদের জীবন-পাঠ রেখে যেতে পারলো না।

সরল রোদেরা শূন্য খলায় রেবেকার সাথে কী যেন

বলবে বলবে ব’লে ফুরিয়ে গেল আজও এক শীতের বিকেলে।

ডুমুর শাখায় প্রাচীন পাতারা আর একবার হলদে পাখির

বাসা হতে চেয়েও ঝরে যাবে এই পউষের সাথে।

আর একটা শীত নকসি-কাঁথার ওমে লোকজ-সাদা

ভালবাসা নিয়েও পালিয়ে যাবে এক জীবনী থেকে।

মায়া-জড়া উঠোনে কুসুমোষ্ণ রোদ ভালবাসা পাতবে না

আর আসছে বসন্তে।

আর একটা শীত ক্ষয়ে যাবে জীবনের হাতে গোনা আর

ক'টি ভালবাসার সাথে।

দিনলিপি

আমার পেছনে কোন্ প্রেমিকেরা লেগে আছ,

আমিতো সোনাগাছির কোন ষোড়শী কবিতা হয়ে জন্মাইনি,

আমি জংলি মাকালও নই, আমার বাইরে ধূলিমলিন বিবর্ণতা,

ভেতরে আমার আস্ত আস্ত হাকালুকি হাওড়, হিমালয়-আল্পস,

আমার হৃদয় ঘড়িতে নিয়মিত

বাজছে দেখো সমুদ্রের সাদা সাদা তরঙ্গবক,

ওখানে গাংচিল উড়লেই কি সততা হারায় নীলজল,

আমি মানুষ তরুলতা পাখি পতঙ্গ এমনকি সাপও ভালবাসি,

এটা কি আমার পাপ? তোমরা তোমাদের বুদ্ধু চোখে

চশমা লাগিয়ে আমার দেহে ভাসমান সাদা হাড়গুলোকে মনে করো শাপ যা কীনা

তোমরাই তোমাদের নিঃশ্বাসে পোষে রাখ, তোমাদের বগলতলে খুঁজলে পাব ইট,

আমার আর আমার পূর্বপুরুষের বুকে-পিঠে ঐতিহাসিক নেই কোন সিলমোহর,

বলতে পারো অনেকটাই বোকা-সিধা,

অবশ্য প্রত্নবিদ্যা, ইতিহাসবিদ্যা শোনা ও জানার বোধও তোমাদের নেই,

তোমরা কল্পকাব্য পুরাণবিদ্যার উপর ভর দিয়ে আমাকে দেখো;

আমি কি রাবণ, প্যারিস? আমিতো কানাইও হতে পারবোনা,

যদিও আমি বাজাই মায়াবীনি বীণ,

আমি মশাকেও পৃথিবীর উড়ন্ত পুষ্প মনে করি ।

আমি টিকটিকিদের ইতিহাস জীবনী বহু বছর ধরে জেনেও

সরলরেখায় আজো হেঁটে চলি।

আমার তুষানল আমার ভেতরেই নিভৃতে জড়িয়ে রাখি।

আমার আগুনস্বাক্ষী আমার হৃদয় চুল্লিতেও রাখিনা।

টিকটিকিদের পেটের ভেতর সাদা ডিমকেও আমি দেখি।

আমার মাথার ভেতর যে নক্ষত্র ডিম তা ফাটলে আরেকটা আকাশ বেরিয়ে আসবে

আর টিকটিকিরা আমার পেটের ভেতর থেকে সোনাগাছির ময়লা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

আমার উপর যে চারটা টেস্টামেন্ট নাযিল হয়েছে

আমি তাদের আমারই পরমাত্মা মনে করি।

দোঁআশ মাটির ঘরে

দোঁআশ মাটিতে নিশ্চল শুয়ে থাকার পরেও

জেগে থাকবে বুকের উপর ঘাস লতাদের খেলাঘর।

উড়ে যাবে বুকের ছাদ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কোন এক ধান উড়ানিয়ার

বৈশাখের বিচালি-খড়।

বেলীগুল্মের শুশ্রূষায় সকাল-সন্ধ্যায় যে আসবে

জানবোনা তারও পরিচয়?

ভোরের নির্মল বাতাসে উড়াবে যে ফুল জীবনের উল্লাস;

আমি কি তার পাবো আর কোনদিন জীবন-সুঘ্রাণ।

ঘাসফড়িঙ খুঁজতে এসে আমার পাঁজর ঠোকরাবে যে শালিক,

আমি কি তার ঠোঁট ছুঁয়ে দেখবো না একবার?

আমার পাশ দিয়ে কে তুমি হেঁটে যাবে শৈশব- কৈশোর- বৃদ্ধ?

কে তুমি ফাল্গুণ-পলাশ ফুটাতে ফুটাতে হেঁটে যাবে যৌবন!

দোঁআশ মাটিতে শুয়ে থেকে আমার বুকের উপর পাতা

ঝরাদের শোক তখনও কি নৈঃশব্দ্যেই সয়ে সয়ে যাবো;

এই আমার শতাব্দীর সব সয়ে উঠা স্নায়ু-কোষ-রক্ত-হাড়ের গল্পের মতো?

সইতে হবে কতোকাল জানি এই দুঃখপাড়ার অসুখ ঋতু ?

বসন্ত আসবে, আমার বুকের উপর গুল্মপাতারা দোলে দোলে গাইবে

জীবনের সুখ-বিসুখ,

তখনও আমাকে নৈঃশব্দ্যে জড়িয়ে রাখবে একাকি এক মাটির সিন্দুক!

আমারতো ছবিটাই হাতে আছে

হ্যাঁ আমারতো ছবিটাই হাতে আছে

বাকিটা এসেছি দিয়ে ফেরারি হবার দিন

ঝুঁটি শালিকের কাছে।

ওটা তুমি যদি চাও ওটারও মালিকানা সাফ কাওলা

করে দিতে পারি আজই সূর্য ঢলে যাবার আগে।

ইস্টিশিনের পথে আমার শাদা আর নীল কংকালটা

রেবেকার হাতে সঁপে দিয়ে যেতে চাই

একদিন সে আমারে কয়েছিল আমি তোমার রক্ত

চাইনাক কোনদিন, যদি পারো দুঃখটা কেবল সঁপে দিও

আমি ওটা দিয়েই এই চির দুঃখবনের দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেড়াবো।

দুই' শ ছ' খানা হাড় গুনে গুনে রেবেকার ঘুমন্ত দুঃখসিন্দুকে

রেখে যাবো আমি,

আমারে যতটুকু সুর দিয়েছিলো আমার অকৃপণ জীবনের মাঝি

আমি সব সুর রেখে যাবো মায়াঘুঘুদের বনবাসে।

ভোরবেলাকার শুভ্র্ সুখটুকু একদিন এক শুকপাখি চেয়েছিলো,

ইস্টিশিনে যাবার পথে ওটা আমি তার দুখু নীলগ্রামে রেখে যাবো।

শাদাশান্ত রোদছায়া সকালের

পুতুল- মার্বেলের দিন ইস্টিশিনের পথে পুটুলি বেন্ধে

গুল্মবনে দোল খাওয়া দোয়েল-কুলিদের জিম্মায় ওটা আমি থুয়ে যাবো।

আমার বনবালিকার মতো সরল আত্মাখানা আমারই মমতার

পূর্বপুরুষদের খুব কাছে শুয়ে দিও।

হ্যাঁ ছবিটাই হাতে আছে

ঘোর দুঃখ- সুখ বর্ষণের দুপুরবেলা কে আমার ভালবাসা

শাদা প্রত্নদিনের অরণ্য-বালকছবিটা চেয়েছো।

তুমি প্রত্নদিনের হয়তোবা সুখ হয়তোবা দুঃখের এক অসুখ বালিকা

আমি সেই ছবিটা ঘন সবুজ পদ্মপাতার খামে

জীবন হরকরা দিয়ে তোমার ছায়াগ্রামে পাঠিয়েছি।

ওটা খুব খুব ভাল করে তোমার শান্ত- শীতল বুকের জাবারে তুলে নিও।

কুলিয়ারচর রেল-স্টেশনে একরাত

দাঁড়াও, এ বিরাতের প্রত্ন-স্টেশন তোমাকে দেখুক।

তোমার বোহেমীয় চুলে আজ রাতে কুয়াশা-কুটির থাকুক।

তোমার প্রগাঢ় চোখ থেকে আটলান্টিক অথবা প্যাসিফিকে

এখন টাইফুন কিংবা হ্যারিকেন ঝড়;

ডোরাকাটা মাফলার-মুকুটে সহস্রাব্দ-প্রাচীন রহস্য- পুরুষ তুমি

কোন কাল থেকে আজ আবার উঠে এসে দাঁড়ালে

এই মধ্যরাতের স্টেশনে।

খুব শুভ্র কুয়াশা-পরীর দল এই ঠান্ডা নিস্তব্ধতায়

তোমাকে ডুবিয়েছে আজ গভীর আদিমতায়;

অমন নৈঃশব্দ্যতার মাঝেও উর্বশী কোণগুলো

তোমার প্রত্নীয় গন্ধে জেগে উঠছে সুপ্রাচীন জৈবনিক নন্দে।

নিদারুণ ঠান্ডা ভেদ করে তোমার কুখ থেকে নাচতে নাচতে

বেরিয়ে পড়ছে নিভৃতচারী পালস।

তোমার দরদী আত্মার ভেতর এখন এই গ্রামান্তরের

সাকুল্য ভালবাসা জানি বেমালুম ঢুকে গেছে আজ নিশ্চুপ নিশীথে!

এই কুলি-য়ার-চরের শতাব্দীপূর্ব মুখরতাগুলো আবার এসে নামলো তোমাকে ঘিরে।

এই স্টেশনের খুব কাছে খুব সাবধানে তোমার পদধ্বনি শুনে

কালি গাঙ এসে কানাকানি করছে স্নানঘাট।

তুমি কি সহস্রাব্দ আগের পূর্ব-পুরুষ ছিলে এই জনপদে!

কবি কি শুনছো, নাকি বধির হয়েছো এই রহস্য-নন্দের নিস্তব্ধ বিরাতে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter