‘নারীচিত্ত জয়ের বাসনা থেকেই লেখা শুরু’
jugantor
‘নারীচিত্ত জয়ের বাসনা থেকেই লেখা শুরু’

  জুননু রাইন  

২১ জানুয়ারি ২০২১, ০৪:৫৭:২৫  |  অনলাইন সংস্করণ

বর্তমানে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক আনিসুল হক কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক এবং কিশোর আলোর সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সত্য ঘটনা নিয়ে তার লেখা মা উপন্যাসটি সম্প্রতি ১০০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এ রকম তার বেশ কয়েকটি উপন্যাস পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১০০।

আনিসুল হক রংপুর জিলা স্কুল এবং কারমাইকেল কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক এবং সাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জুননু রাইন

যুগান্তর : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সেই সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই।

আনিসুল হক : প্রথম লেখা ছাপার অক্ষরে দেখি রংপুরে। এটি ১৯৮৩ সালের দিকে। আমার বয়স তখন আঠারোর মতো। অনীক রেজা নামে একজন একটা পত্রিকা বের করেছিলেন, নাম ছিল ‘হƒদয়’। সেটায় প্রথম সংখ্যায় একটা গল্প আর একটা কবিতা লিখেছিলাম। দ্বিতীয় সংখ্যায় ছিল একটা গল্প, আর সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের সাক্ষাৎকার। নিজেও কবিতাপত্র বের করে নিজের কবিতা নিজে প্রকাশ করেছিলাম বলে মনে পড়ে। বুয়েটে এসে ইউকসুর একুশে স্মরণিকায় কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। কবি মিনার মনসুর তখন দেশবন্ধু নামের সাপ্তাহিক কাগজ ব্রডশিটে বের করতেন। সেখানেও নিজের কবিতা প্রকাশিত হলো। এরপর দৈনিক ইত্তেফাকে কচিকাঁচার আসরে ছড়া ছাপা হয়েছিল।

প্রথম নিজের লেখা ছাপা হওয়ার যে অনুভূতি, আর আজকে নিজের লেখা ছাপা হওয়ার যে অনুভূতি, তা একই রকম। আমি প্রত্যেকবার নতুন লেখকের মতো উত্তেজিত হই, উত্তেজনায় কাঁপতে থাকি। এটা একেবারে প্রেমের মতো। প্রতিটা প্রেমই প্রথম প্রেম। প্রতিটা কবিতা প্রকাশিত হওয়া মানেই প্রথম কবিতা প্রকাশিত হওয়া।

আমাদের সময়ে রংপুরে যেত ঢাকার পত্রপত্রিকাগুলো। ঈদসংখ্যাগুলো আমাদের মন তৈরিতে সাহায্য করেছে। বিচিত্রা, সন্ধানী আর রোববার। আমরা সৈয়দ শামসুল হকের লেখার জন্য অপেক্ষা করতাম। ১৯৭৭-৭৮ সালে হুমায়ূন আহমেদ তত জনপ্রিয় হননি। ঢাকা আসার পর কবিযশপ্রার্থী হিসেবে নানা কিছু করতাম। কবিদের বাসায় যেতাম। নির্মলেন্দু গুণ আমাদের বুয়েটের পাশের কলোনিতে থাকতেন। আজিমপুরে থাকতেন কবি মহাদেব সাহা আর হুমায়ুন আজাদ। শ্যামলীতে কবি শামসুর রাহমান। তাদের বাসায় যেতাম। অচিরেই আমরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শামিল হলাম। কবিতা, মিছিল, স্লোগান, টিয়ার গ্যাস, বুলেট- এসব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এর ভেতর দিয়েই আমরা সাহিত্য করেছি। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস নোবেল পুরস্কার পেলেন। আমরা এ নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন করছি। মানবেন্দ্রর অনুবাদে মিরোস্লাভ হোলুব কিংবা মার্কেস পড়ছি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা শিখছি সুবিমল মিশ্র পড়ে। তারপর তো আমরা দেশবন্ধু, পূর্বাভাস, বিচিত্রা, যায়যায়দিন, চলতিপত্র নানা পত্রিকার মাধ্যমে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি একাকার করে লিখতে শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছড়াসংকলন বের হচ্ছে, আমি ট্রেসিংয়ে তার অলংকরণ করে দিচ্ছি, কিংবা জাতীয় কবিতা উৎসবের জন্য দিনরাত খাটছি, এসবই উত্তাল আশির দশকের ঘটনা। দিনে মিছিল, রাতে আমরা বোদলেয়ার পড়ছি, সৈয়দ শামসুল হকের অন্তর্গত পড়ছি, এই করেছি। আবার মিছিলে মিছিলে আমার কবিতা পাঠ করছেন শিমুল মুস্তাফা, হাসান আরিফ- সেসবও ঘটছে।

যুগান্তর : আপনি তো গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-কলামসহ সাহিত্যের প্রায় প্রত্যেকটি শাখায়ই সক্রিয় আছেন। কোন বিষয়ে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

আনিসুল হক : আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। আমাকে মহাদেবদা উপদেশ দিয়েছিলেন, যদি কবি হতে চাও, খবরদার গদ্য লিখবে না। গদ্য লেখা শুরু করলে আর কেউ তোমাকে কবি বলবে না। এখনো আমার প্রিয়তম মাধ্যম কবিতা। আমি রোজ পড়ি। আমার কবিতার বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু যেহেতু আমি উপন্যাস লিখেছি, গল্প লিখেছি, কলাম লিখি, টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছি, লোকে আমার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত। তবে আমার সৃষ্টিশীল যে কোনো কাজই ভালো লাগে। আমি লিখতে পারলেই সুখী। একবার রোড অ্যাক্সিডেন্টে পা ভেঙে বিছানায় শুয়েছিলাম, মেরিনা বলেছিলেন, ওকে লেখার কাজ দাও। লিখতে পারলেই ও সুস্থ হয়ে উঠবে। কথা ঠিক। প্রতিটা লেখা প্রথম প্রেমের মতো আমাকে উত্তেজিত করে, আমি নিশিপাওয়া মানুষের মতো গ্রস্ত হয়ে লিখি, লেখা শেষ হলে আমার পরম একটা আনন্দ হয়। ছাপা হলে আমি শিশুর মতো মনে মনে হাততালি দিয়ে উঠি।

যুগান্তর : বাংলাদেশে কোন ধরনের কবিতা বেশি জনপ্রিয়? আপনার কোন ধরনের কবিতা পছন্দ? কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে?

আনিসুল হক : কবিতা অনেক রকম। জীবনানন্দ দাশ এ কথা বলেছেন। কবিতা যে কত রকম হতে পারে, আমেরিকায় এমন কবিতাও ছাপা হয়, যেখানে কবি কতগুলো অক্ষর এলোমেলো করে সারা পাতায় ছড়িয়ে রেখেছেন। এটাই তার কবিতা। আমি ফেসবুকে কবিতার সংকলন থেকে ছবি দিয়েছিলাম, একটা কবিতা আছে, মানুষ মহাকাশে দুটো নগ্ন মানবমানবীর ছবি পাঠিয়েছিল, সেই ছবিটা দিয়ে ছবির সাংবাদিকী বর্ণনা। এটাই কবিতা।
বাংলাদেশে আদৌ কবিতা জনপ্রিয় কিনা আমার সন্দেহ আছে। ভালো কবিতার জন্য ভালো পাঠক চাই। সেই ভালো পাঠক সারা পৃথিবীতে সব সময়ই কম। জনপ্রিয়তা কথাটাও তো আপেক্ষিক। অপরাধী গানের যত ভিউ, তত ভিউ তো আর রবিশংকরের সেতারের হবে না। কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে, আপনার এই প্রশ্নের উত্তরে বলব, কবিতা কবিতা হতে হবে। পাবলো নেরুদা বলেছেন, সব কিছুই সেধিয়ে দেওয়া সম্ভব কবিতায়, দেখতে হবে, তা যেন সাদা কাগজের চেয়ে উত্তম হয়। কবিতা যদি কবিতা হয়, তা পাঠককে একটু না একটু ঋদ্ধ করবেই।

যুগান্তর : এখনকার কবিতা দুর্বোধ্য, নাকি কবিতা পড়তে পারা বা বুঝতে পারার মতো পাঠক কমে যাচ্ছে?

আনিসুল হক : রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে, ‘বুঝিলাম না’, তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুঁকিয়া বলে, ‘কিছু বুঝিলাম না’, তাহাকে এই কথা বলিতে হয়, ইহাতে বুঝিবার কিছু নাই, এ যে কেবল গন্ধ।’ কবিতা পড়তে পড়তে কবিতার এক ধরনের আস্বাদ আমরা উপভোগ করতে শিখি। ধরুন, বাঁশি। বাঁশি শুনে যদি কেউ বলে, বুঝলাম না, বলতেই পারেন, তাকে কী বলবেন। নানা ধরনের অনেক কবিতা পড়তে পড়তে রুচি তৈরি হয়, বোধ তৈরি হয়, ইন্দ্রিয় সজাগ হয়।
কবিতার পাঠক চিরকাল কম ছিল। কিন্তু অল্পসংখ্যক পাঠকের জন্য লেখা কবিতার একটা অপরিসীম শক্তি আছে। আমরা কি নাটোরে গিয়ে বনলতা সেনের বাড়ি খুঁজি না। অথচ জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় দুরূহতম কবি।

যুগান্তর : আপনার ‘মা’ উপন্যাসের সম্প্রতি ১০০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ শুধু নয়, বরং বাংলাসাহিত্যেই এমন ঘটনা বিরল। বইটির এ সাফল্যের পেছনে উপন্যাসের বিষয় না উপস্থাপনশৈলীকে এগিয়ে রাখবেন?
আনিসুল হক : মা উপন্যাসটির কাহিনি মর্মস্পর্শী। মা, মুক্তিযুদ্ধ, মাতৃভূমি- বাংলাদেশের সবারই খুব প্রিয় বিষয়। তবে বিদেশি ভাষার পাঠক বা অবাঙালি পাঠকও মা বই দিয়ে আপ্লুত হয়েছেন। আমার কাছে তো পাকিস্তানি লেখিকাও ই-মেইল করেছিলেন, এ বই পড়ে আবেগাপ্লুত হয়ে। এমনিতেই বইটা কিন্তু সরল নয়। বাক্যও খুব ছোট ছোট কাটা কাটা নয়। কাহিনিতেও তিনটা সময়কাল একইসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে। আঙ্গিকগতভাবে বইটা পাঠককে চ্যালেঞ্জ করে। আমার মনে হয়, আসলে পাঠকরা ভালো। তারা ভালো জিনিস তারিফ করতে জানেন।

যুগান্তর : সাধারণত অনেক আলোচক এবং লেখকেরই ধারণা, ভালো লেখা খুব একটা জনপ্রিয় হয় না। যদি সেরকই হয়, তাহলে এটা কি ওই লেখকের সীমাবদ্ধতা? নাকি পাঠকের সীমাবদ্ধতা?
আনিসুল হক : এই রকম সরল কোনো সূত্র নেই। মার্কেস খুব জনপ্রিয়। দস্তয়েভস্কি কিংবা তলস্তয়ও জনপ্রিয় ছিলেন। আবার অনেক লেখক, যাদের কাল আর মনেও রাখবে না, তারা অজনপ্রিয় ছিলেন। লোকচক্ষুর আড়ালে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। আবার বহু লেখা আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়েছে।
একটা জিনিস স্পষ্ট করি। পপুলার লিটেরাচার বলতে একটা জিনিস আছে। আছে পাল্প ফিকশন। আরেকটা জিনিস আছে লিটেরারি ফিকশন। আমার আয়েশামঙ্গল যে ব্যালাড অব আয়েশা নামে হারপার কলিন্স বের করেছে, এরা এটাকে বলেছে, লিটেরারি ফিকশন। আবার আমি যদি একটা খুন-রহস্য-গোয়েন্দা কাহিনি লিখি, এটা যদি দুইশ কপিও বিক্রি না হয়, এটা হলো পপুলার ঘরানার জিনিস। আপনার অভিপ্রায় আসল। আপনি কি সাহিত্য করতে চাইছেন, নাকি জনপ্রিয় ফিকশন লিখতে চাইছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’ একটা লিটেরারি ফিকশন; কিন্তু হিমু হলো পপ লিটেরেচার। এখন মধ্যাহ্ন যদি হিমুর চেয়ে বেশি বিক্রি হয়, তবুও ওটা পপ বা পপুলার ঘরানার জিনিস নয়। এ জিনিসটা আমরা গুলিয়ে ফেলি। আমরা ভাবি, বিক্রি বেশি হলে সেটা জনপ্রিয়, বিক্রি কম হলে সেটা সিরিয়াস। আদৌ তা নয়। আপনি দেখবেন, চিলেকোঠার সেপাই অনেক মুদ্রণ হয়েছে, প্রদোষে প্রাকৃতজন অনেক মুদ্রণ হয়েছে। এগুলো সব সিরিয়াস। এগুলো জনপ্রিয় সাহিত্য নয়। কিন্তু ধরা যাক, মাসুদ রানার একটা বই কম বিক্রি হলেও সেটা সিরিয়াস নয়, সেটা ‘পপুলার’। এটা ঘরানার ব্যাপার।

যুগান্তর : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বর্তমানে বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো-মন্দ বলবেন?

আনিসুল হক : বাংলাদেশে পুরস্কার তেমন কোনো উপকারে আসে মনে হয় না। এত বেশিসংখ্যক পুরস্কার প্রচলিত আছে যে মনে রাখাই তো কঠিন, কে কবে কোন পুরস্কার পেলেন।

যুগান্তর : আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২১ সালে এসে কী বলবেন?

আনিসুল হক : সাক্ষরতার হার বেড়েছে। শিক্ষার গুণগত মান কমেছে; কিন্তু অনেক বড় হিমালয় রেঞ্জ থেকেই একটা এভারেস্ট পাওয়া যায়। আমাদের দেশেও নাই নাই করেও প্রচুর ভালো পাঠক আছেন। শিক্ষিত মননশীল মানুষ আছেন। একটা বড় সমস্যা, মেধাবীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কী আর করা!

যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

আনিসুল হক : না। গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা বেশি আলোচিত। তবে যতটা আলোচিত, ততটা পঠিত তারা নন। আমি তো বললাম, আমরা অনেকেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটা মন দিয়ে পড়িনি, পড়লে মর্ম বোঝার চেষ্টা করিনি, বুঝে থাকলে নিজেদের জীবনে তার কোনো প্রভাব পড়তে দিইনি।

যুগান্তর : বাংলা ভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

আনিসুল হক : এটা প্রজেক্ট করে হবে না। আমরা জাতীয় জীবনের অন্যত্র যদি উন্নতি করি, তাহলে আমাদের সাহিত্য নিয়েও পৃথিবীর দেশে দেশে আগ্রহ তৈরি হবে। বাজার নিজেই বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো খুঁজে নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে পৃথিবীর দেশে দেশে বইয়ের তাক ভরে ফেলবে। এখন তো ই-বুকের মাধ্যমে তা আরও সহজ। আমাদের মানিক, তারাশঙ্করই তো পৃথিবীর কাছে পৌঁছায়নি।

যুগান্তর : দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্তাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে।

আনিসুল হক : বহু মানুষ। বহু সাহিত্যিক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বা আনিসুজ্জামান স্যার নিরন্তর উৎসাহ দিয়েছেন। শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী উৎসাহ দেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ফরিদুর রেজা সাগর, আফজাল হোসেন, সেলিনা হোসেন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মোজাম্মেল বাবু, মিনার মনসুর, মুহাম্মদ সামাদ, তারিক সুজাত থেকে শুরু করে মেরিনা। একজনের নাম বললে বোধহয় মেরিনার কথাই বলতে হবে। কতজন যে আমাকে রোজ অনুপ্রাণিত করেন। আর আছেন পাঠকরা। পাঠিকারা। নারীচিত্ত জয়ের বাসনা থেকেই তো আমি লেখা শুরু করেছিলাম।

যুগান্তর : যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

আনিসুল হক : সমাজের কথা বলতে পারব না। এখন আমার প্রিয় তিনজন সাহিত্যিক হলেন, হাসান আজিজুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, শঙ্খ ঘোষ। আরও অনেকেই আমার প্রিয়। আপনার এ প্রশ্ন তো আমার বহু প্রিয়জনকে অখুশি করবে।

যুগান্তর : একজন অগ্রজ ও একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলাসাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আনিসুল হক : হাসান আজিজুল হক, মাসরুর আরেফিন।

যুগান্তর : এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

আনিসুল হক : উপন্যাস কী, জানার জন্য ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। কাহিনি থাকলে ফিকশন হয়, সব ফিকশন নভেল নয়, একটা কাহিনিকে নভেল হতে গেলে তার কতগুলো বৈশিষ্ট্য দরকার হয়। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ আর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ যিনি পড়েছেন, তার সঙ্গে কথা বলা সহজ।

‘নারীচিত্ত জয়ের বাসনা থেকেই লেখা শুরু’

 জুননু রাইন 
২১ জানুয়ারি ২০২১, ০৪:৫৭ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বর্তমানে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক আনিসুল হক কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক এবং কিশোর আলোর সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সত্য ঘটনা নিয়ে তার লেখা মা উপন্যাসটি সম্প্রতি ১০০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এ রকম তার বেশ কয়েকটি উপন্যাস পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১০০।

আনিসুল হক রংপুর জিলা স্কুল এবং কারমাইকেল কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক এবং সাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জুননু রাইন

যুগান্তর : প্রথম লেখা ছাপা হওয়ার অনুভূতি এবং সেই সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাই।

আনিসুল হক : প্রথম লেখা ছাপার অক্ষরে দেখি রংপুরে। এটি ১৯৮৩ সালের দিকে। আমার বয়স তখন আঠারোর মতো। অনীক রেজা নামে একজন একটা পত্রিকা বের করেছিলেন, নাম ছিল ‘হƒদয়’। সেটায় প্রথম সংখ্যায় একটা গল্প আর একটা কবিতা লিখেছিলাম। দ্বিতীয় সংখ্যায় ছিল একটা গল্প, আর সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের সাক্ষাৎকার। নিজেও কবিতাপত্র বের করে নিজের কবিতা নিজে প্রকাশ করেছিলাম বলে মনে পড়ে। বুয়েটে এসে ইউকসুর একুশে স্মরণিকায় কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। কবি মিনার মনসুর তখন দেশবন্ধু নামের সাপ্তাহিক কাগজ ব্রডশিটে বের করতেন। সেখানেও নিজের কবিতা প্রকাশিত হলো। এরপর দৈনিক ইত্তেফাকে কচিকাঁচার আসরে ছড়া ছাপা হয়েছিল। 

প্রথম নিজের লেখা ছাপা হওয়ার যে অনুভূতি, আর আজকে নিজের লেখা ছাপা হওয়ার যে অনুভূতি, তা একই রকম। আমি প্রত্যেকবার নতুন লেখকের মতো উত্তেজিত হই, উত্তেজনায় কাঁপতে থাকি। এটা একেবারে প্রেমের মতো। প্রতিটা প্রেমই প্রথম প্রেম। প্রতিটা কবিতা প্রকাশিত হওয়া মানেই প্রথম কবিতা প্রকাশিত হওয়া। 

আমাদের সময়ে রংপুরে যেত ঢাকার পত্রপত্রিকাগুলো। ঈদসংখ্যাগুলো আমাদের মন তৈরিতে সাহায্য করেছে। বিচিত্রা, সন্ধানী আর রোববার। আমরা সৈয়দ শামসুল হকের লেখার জন্য অপেক্ষা করতাম। ১৯৭৭-৭৮ সালে হুমায়ূন আহমেদ তত জনপ্রিয় হননি। ঢাকা আসার পর কবিযশপ্রার্থী হিসেবে নানা কিছু করতাম। কবিদের বাসায় যেতাম। নির্মলেন্দু গুণ আমাদের বুয়েটের পাশের কলোনিতে থাকতেন। আজিমপুরে থাকতেন কবি মহাদেব সাহা আর হুমায়ুন আজাদ। শ্যামলীতে কবি শামসুর রাহমান। তাদের বাসায় যেতাম। অচিরেই আমরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শামিল হলাম। কবিতা, মিছিল, স্লোগান, টিয়ার গ্যাস, বুলেট- এসব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এর ভেতর দিয়েই আমরা সাহিত্য করেছি। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস নোবেল পুরস্কার পেলেন। আমরা এ নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন করছি। মানবেন্দ্রর অনুবাদে মিরোস্লাভ হোলুব কিংবা মার্কেস পড়ছি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা শিখছি সুবিমল মিশ্র পড়ে। তারপর তো আমরা দেশবন্ধু, পূর্বাভাস, বিচিত্রা, যায়যায়দিন, চলতিপত্র নানা পত্রিকার মাধ্যমে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি একাকার করে লিখতে শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছড়াসংকলন বের হচ্ছে, আমি ট্রেসিংয়ে তার অলংকরণ করে দিচ্ছি, কিংবা জাতীয় কবিতা উৎসবের জন্য দিনরাত খাটছি, এসবই উত্তাল আশির দশকের ঘটনা। দিনে মিছিল, রাতে আমরা বোদলেয়ার পড়ছি, সৈয়দ শামসুল হকের অন্তর্গত পড়ছি, এই করেছি। আবার মিছিলে মিছিলে আমার কবিতা পাঠ করছেন শিমুল মুস্তাফা, হাসান আরিফ- সেসবও ঘটছে। 

যুগান্তর : আপনি তো গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-কলামসহ সাহিত্যের প্রায় প্রত্যেকটি শাখায়ই সক্রিয় আছেন। কোন বিষয়ে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

আনিসুল হক : আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। আমাকে মহাদেবদা উপদেশ দিয়েছিলেন, যদি কবি হতে চাও, খবরদার গদ্য লিখবে না। গদ্য লেখা শুরু করলে আর কেউ তোমাকে কবি বলবে না। এখনো আমার প্রিয়তম মাধ্যম কবিতা। আমি রোজ পড়ি। আমার কবিতার বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু যেহেতু আমি উপন্যাস লিখেছি, গল্প লিখেছি, কলাম লিখি, টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছি, লোকে আমার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত। তবে আমার সৃষ্টিশীল যে কোনো কাজই ভালো লাগে। আমি লিখতে পারলেই সুখী। একবার রোড অ্যাক্সিডেন্টে পা ভেঙে বিছানায় শুয়েছিলাম, মেরিনা বলেছিলেন, ওকে লেখার কাজ দাও। লিখতে পারলেই ও সুস্থ হয়ে উঠবে। কথা ঠিক। প্রতিটা লেখা প্রথম প্রেমের মতো আমাকে উত্তেজিত করে, আমি নিশিপাওয়া মানুষের মতো গ্রস্ত হয়ে লিখি, লেখা শেষ হলে আমার পরম একটা আনন্দ হয়। ছাপা হলে আমি শিশুর মতো মনে মনে হাততালি দিয়ে উঠি। 

যুগান্তর : বাংলাদেশে কোন ধরনের কবিতা বেশি জনপ্রিয়? আপনার কোন ধরনের কবিতা পছন্দ? কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে?

আনিসুল হক : কবিতা অনেক রকম। জীবনানন্দ দাশ এ কথা বলেছেন। কবিতা যে কত রকম হতে পারে, আমেরিকায় এমন কবিতাও ছাপা হয়, যেখানে কবি কতগুলো অক্ষর এলোমেলো করে সারা পাতায় ছড়িয়ে রেখেছেন। এটাই তার কবিতা। আমি ফেসবুকে কবিতার সংকলন থেকে ছবি দিয়েছিলাম, একটা কবিতা আছে, মানুষ মহাকাশে দুটো নগ্ন মানবমানবীর ছবি পাঠিয়েছিল, সেই ছবিটা দিয়ে ছবির সাংবাদিকী বর্ণনা। এটাই কবিতা। 
বাংলাদেশে আদৌ কবিতা জনপ্রিয় কিনা আমার সন্দেহ আছে। ভালো কবিতার জন্য ভালো পাঠক চাই। সেই ভালো পাঠক সারা পৃথিবীতে সব সময়ই কম। জনপ্রিয়তা কথাটাও তো আপেক্ষিক। অপরাধী গানের যত ভিউ, তত ভিউ তো আর রবিশংকরের সেতারের হবে না। কোন ধরনের কবিতা পাঠককে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে, আপনার এই প্রশ্নের উত্তরে বলব, কবিতা কবিতা হতে হবে। পাবলো নেরুদা বলেছেন, সব কিছুই সেধিয়ে দেওয়া সম্ভব কবিতায়, দেখতে হবে, তা যেন সাদা কাগজের চেয়ে উত্তম হয়। কবিতা যদি কবিতা হয়, তা পাঠককে একটু না একটু ঋদ্ধ করবেই।

যুগান্তর : এখনকার কবিতা দুর্বোধ্য, নাকি কবিতা পড়তে পারা বা বুঝতে পারার মতো পাঠক কমে যাচ্ছে?

আনিসুল হক : রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে, ‘বুঝিলাম না’, তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুঁকিয়া বলে, ‘কিছু বুঝিলাম না’, তাহাকে এই কথা বলিতে হয়, ইহাতে বুঝিবার কিছু নাই, এ যে কেবল গন্ধ।’ কবিতা পড়তে পড়তে কবিতার এক ধরনের আস্বাদ আমরা উপভোগ করতে শিখি। ধরুন, বাঁশি। বাঁশি শুনে যদি কেউ বলে, বুঝলাম না, বলতেই পারেন, তাকে কী বলবেন। নানা ধরনের অনেক কবিতা পড়তে পড়তে রুচি তৈরি হয়, বোধ তৈরি হয়, ইন্দ্রিয় সজাগ হয়।
কবিতার পাঠক চিরকাল কম ছিল। কিন্তু অল্পসংখ্যক পাঠকের জন্য লেখা কবিতার একটা অপরিসীম শক্তি আছে। আমরা কি নাটোরে গিয়ে বনলতা সেনের বাড়ি খুঁজি না। অথচ জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় দুরূহতম কবি।

যুগান্তর : আপনার ‘মা’ উপন্যাসের সম্প্রতি ১০০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ শুধু নয়, বরং বাংলাসাহিত্যেই এমন ঘটনা বিরল। বইটির এ সাফল্যের পেছনে উপন্যাসের বিষয় না উপস্থাপনশৈলীকে এগিয়ে রাখবেন?
আনিসুল হক : মা উপন্যাসটির কাহিনি মর্মস্পর্শী। মা, মুক্তিযুদ্ধ, মাতৃভূমি- বাংলাদেশের সবারই খুব প্রিয় বিষয়। তবে বিদেশি ভাষার পাঠক বা অবাঙালি পাঠকও মা বই দিয়ে আপ্লুত হয়েছেন। আমার কাছে তো পাকিস্তানি লেখিকাও ই-মেইল করেছিলেন, এ বই পড়ে আবেগাপ্লুত হয়ে। এমনিতেই বইটা কিন্তু সরল নয়। বাক্যও খুব ছোট ছোট কাটা কাটা নয়। কাহিনিতেও তিনটা সময়কাল একইসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে। আঙ্গিকগতভাবে বইটা পাঠককে চ্যালেঞ্জ করে। আমার মনে হয়, আসলে পাঠকরা ভালো। তারা ভালো জিনিস তারিফ করতে জানেন।

যুগান্তর : সাধারণত অনেক আলোচক এবং লেখকেরই ধারণা, ভালো লেখা খুব একটা জনপ্রিয় হয় না। যদি সেরকই হয়, তাহলে এটা কি ওই লেখকের সীমাবদ্ধতা? নাকি পাঠকের সীমাবদ্ধতা?
আনিসুল হক : এই রকম সরল কোনো সূত্র নেই। মার্কেস খুব জনপ্রিয়। দস্তয়েভস্কি কিংবা তলস্তয়ও জনপ্রিয় ছিলেন। আবার অনেক লেখক, যাদের কাল আর মনেও রাখবে না, তারা অজনপ্রিয় ছিলেন। লোকচক্ষুর আড়ালে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। আবার বহু লেখা আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়েছে। 
একটা জিনিস স্পষ্ট করি। পপুলার লিটেরাচার বলতে একটা জিনিস আছে। আছে পাল্প ফিকশন। আরেকটা জিনিস আছে লিটেরারি ফিকশন। আমার আয়েশামঙ্গল যে ব্যালাড অব আয়েশা নামে হারপার কলিন্স বের করেছে, এরা এটাকে বলেছে, লিটেরারি ফিকশন। আবার আমি যদি একটা খুন-রহস্য-গোয়েন্দা কাহিনি লিখি, এটা যদি দুইশ কপিও বিক্রি না হয়, এটা হলো পপুলার ঘরানার জিনিস। আপনার অভিপ্রায় আসল। আপনি কি সাহিত্য করতে চাইছেন, নাকি জনপ্রিয় ফিকশন লিখতে চাইছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’ একটা লিটেরারি ফিকশন; কিন্তু হিমু হলো পপ লিটেরেচার। এখন মধ্যাহ্ন যদি হিমুর চেয়ে বেশি বিক্রি হয়, তবুও ওটা পপ বা পপুলার ঘরানার জিনিস নয়। এ জিনিসটা আমরা গুলিয়ে ফেলি। আমরা ভাবি, বিক্রি বেশি হলে সেটা জনপ্রিয়, বিক্রি কম হলে সেটা সিরিয়াস। আদৌ তা নয়। আপনি দেখবেন, চিলেকোঠার সেপাই অনেক মুদ্রণ হয়েছে, প্রদোষে প্রাকৃতজন অনেক মুদ্রণ হয়েছে। এগুলো সব সিরিয়াস। এগুলো জনপ্রিয় সাহিত্য নয়। কিন্তু ধরা যাক, মাসুদ রানার একটা বই কম বিক্রি হলেও সেটা সিরিয়াস নয়, সেটা ‘পপুলার’। এটা ঘরানার ব্যাপার। 

যুগান্তর : সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের কী উপকারে আসে? বর্তমানে বাংলাদেশে সাহিত্য পুরস্কারকে সাহিত্যের জন্য কতটুকু ভালো-মন্দ বলবেন?

আনিসুল হক : বাংলাদেশে পুরস্কার তেমন কোনো উপকারে আসে মনে হয় না। এত বেশিসংখ্যক পুরস্কার প্রচলিত আছে যে মনে রাখাই তো কঠিন, কে কবে কোন পুরস্কার পেলেন। 

যুগান্তর : আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নিরিখে (’৭১-পরবর্তী) মননশীলতার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে ২০২১ সালে এসে কী বলবেন?

আনিসুল হক : সাক্ষরতার হার বেড়েছে। শিক্ষার গুণগত মান কমেছে; কিন্তু অনেক বড় হিমালয় রেঞ্জ থেকেই একটা এভারেস্ট পাওয়া যায়। আমাদের দেশেও নাই নাই করেও প্রচুর ভালো পাঠক আছেন। শিক্ষিত মননশীল মানুষ আছেন। একটা বড় সমস্যা, মেধাবীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কী আর করা!

যুগান্তর : এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন।

আনিসুল হক : না। গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা বেশি আলোচিত। তবে যতটা আলোচিত, ততটা পঠিত তারা নন। আমি তো বললাম, আমরা অনেকেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটা মন দিয়ে পড়িনি, পড়লে মর্ম বোঝার চেষ্টা করিনি, বুঝে থাকলে নিজেদের জীবনে তার কোনো প্রভাব পড়তে দিইনি। 

যুগান্তর : বাংলা ভাষার কোন গ্রন্থগুলো অন্য ভাষায় অনুবাদ হওয়া দরকার মনে করেন?

আনিসুল হক : এটা প্রজেক্ট করে হবে না। আমরা জাতীয় জীবনের অন্যত্র যদি উন্নতি করি, তাহলে আমাদের সাহিত্য নিয়েও পৃথিবীর দেশে দেশে আগ্রহ তৈরি হবে। বাজার নিজেই বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো খুঁজে নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে পৃথিবীর দেশে দেশে বইয়ের তাক ভরে ফেলবে। এখন তো ই-বুকের মাধ্যমে তা আরও সহজ। আমাদের মানিক, তারাশঙ্করই তো পৃথিবীর কাছে পৌঁছায়নি। 

যুগান্তর : দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পথে এমন একজন সাহিত্যিক বন্ধুর কথা জানতে চাই যে নানাভাবে আপনার লেখক সত্তাকে সক্রিয় থাকতে সহযোগিতা করেছে।

আনিসুল হক : বহু মানুষ। বহু সাহিত্যিক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বা আনিসুজ্জামান স্যার নিরন্তর উৎসাহ দিয়েছেন। শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী উৎসাহ দেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ফরিদুর রেজা সাগর, আফজাল হোসেন, সেলিনা হোসেন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মোজাম্মেল বাবু, মিনার মনসুর, মুহাম্মদ সামাদ, তারিক সুজাত থেকে শুরু করে মেরিনা। একজনের নাম বললে বোধহয় মেরিনার কথাই বলতে হবে। কতজন যে আমাকে রোজ অনুপ্রাণিত করেন। আর আছেন পাঠকরা। পাঠিকারা। নারীচিত্ত জয়ের বাসনা থেকেই তো আমি লেখা শুরু করেছিলাম। 

যুগান্তর : যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম।

আনিসুল হক : সমাজের কথা বলতে পারব না। এখন আমার প্রিয় তিনজন সাহিত্যিক হলেন, হাসান আজিজুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, শঙ্খ ঘোষ। আরও অনেকেই আমার প্রিয়। আপনার এ প্রশ্ন তো আমার বহু প্রিয়জনকে অখুশি করবে।

যুগান্তর : একজন অগ্রজ ও একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলাসাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আনিসুল হক : হাসান আজিজুল হক, মাসরুর আরেফিন।

যুগান্তর : এমন দুটি বই, যা পড়ার জন্য পাঠককে পরামর্শ দেবেন।

আনিসুল হক : উপন্যাস কী, জানার জন্য ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। কাহিনি থাকলে ফিকশন হয়, সব ফিকশন নভেল নয়, একটা কাহিনিকে নভেল হতে গেলে তার কতগুলো বৈশিষ্ট্য দরকার হয়। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ আর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ যিনি পড়েছেন, তার সঙ্গে কথা বলা সহজ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন